Bengali Poem এক ফাতেমার গল্প Poem by Sanjib Saha

Bengali Poem এক ফাতেমার গল্প

এক ফাতেমার গল্প

আমি ফাতেমা।
আমাকে চেনার কথা নয়।
তবু কেউ কেউ চিনে নেয় ।
আসলে ঘুম থেকে উঠে
খবরের কাগজ নেওয়া,
তারপর বাড়ি বাড়ি দরজায় দরজায়
খবরের কাগজ গুলো পৌঁছে দেওয়া,
এই আমার ভালোবাসার কাজ।

আমার তো আর বাড়ি নেই ।

রাস্তার ধারে খড় ছাওয়া ঘর,
সেখানে বাঁশের মাচায়
একটা শোয়ার ব্যবস্থা ।
রান্নার আড়ম্বর নেই,
আড়ম্বর তো দেখানোর জন্য,
আমার আবার দেখানোর কী আছে?
আমার হাসি দেখলে নাকি
বাচ্চারা কেঁদে ওঠে,
কিন্তু ওদের মুখে একটু হাসি
দেখার জন্য দিনরাত আমার হেঁটে চলা।
দিনের শেষে ঘরের বাইরে
একটা চুলাতে আগুন জ্বলে,
ফুটন্ত পানিতে চাল ফোটে,
ভাতের গন্ধ বেরোয়,
এই গন্ধটায় আমার কাছে যথেষ্ট।
একটু নুন মরিচ, দু'চারটে আলু-পটল,
মিলিয়ে আমার রাতের খাবার চলে।
দিনের বেলা এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে
চা বিস্কুটে সময় চলে যায়,
লোকে বলে, ফাতেমা তুই পাগলের মত
ঘোরাঘুরি করিস কেন?
তুই যে বাড়ি বাড়ি কাগজ বিলি করিস
পয়সা পাস?
আমি তো শুধু পয়সার জন্যে
কাজ করি না,
ঐ কাগজে অনেক বুদ্ধি
আগুনের মতো জ্বলজ্বল করে ।
আমি সেই আগুনটা বাড়িতে বাড়িতে
দিয়ে আসতে চাই ।
কী ভাবছো আমি বাড়িতে বাড়িতে
আগুন ধরিয়ে দিতে চাই,
এত সাহস কোথায়,
তবুও আগুন জ্বললে মানুষ উজ্জ্বল হয়।

আমার ঘর বাড়ি ভাই বোন সবই ছিল
ওরা বলে তোর মাথা খারাপ।
আর খারাপ মাথা নিয়ে
সমাজে বাস করা যায় না ।
আমি তো সমাজটাকেই পাল্টাতে চাই,
সমাজের মাথার ঠিক আছে তো?
তাই যদি ঠিক থাকতো
তবে........!

এই যে খবরের কাগজে, ছেড়া বই এর পতায়
জ্ঞানবুদ্ধি চকমক করে,
আমি সেগুলো আমার রাস্তার ধারের
ময়লা ধরা আর জট পড়া চুলের
বাচ্চা গুলোর মধ্যে চালিয়ে দিতে চাই ।

আমি ওদেরকে নিয়ে বসি।
রাস্তার আলোয় সুর করে নামতা পড়াই,
ওরা অক্ষর চিনলে মনে হয়
এক একটা বরকত সালাম
তৈরি হয়ে গেল দেশে।
এবার ওরা বুদ্ধিতে শান দেবে,
চকমকির আলোয় মাতৃভাষা
চকচক করে উঠবে।

ওরা আসে
কেউ কেউ দুএকটা পেয়ারা বেগুনের অংশ, আলু দু-এক মুঠো চাল নিয়ে আসে,
আমি বলি আবার এসব কেন,
ওরা বলে বনভোজন হবে ।
আমি বলি তবে তাই হোক,
ওদের ফোকলা দাঁত সর্দিজড়ানো কন্ঠে
আনন্দের বন্যা বয়।

আমার উনুনে ভাত ফোটে
সেই আগুনে চকচক করে ওদের মুখ।
আমি বলি --
ওরে তোরা একে অপরের মুখ দেখতে পাস? আগুনে আলোর মুখ?
ওরা বলে, তোমার মুখ দেখতে পাই।
তুমি যে দিকে তাকাও,
সেই মুখগুলো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে,
আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই।

বাবা বলতেন,
জ্ঞানের আলো জ্বালাস,
গ্রামেগঞ্জে পথে-প্রান্তরে।
গাছ কথা বলে,
কান পাতলে শুনতে পাবি।
বাতাসের গন্ধ আছে,
সেই গন্ধ বুকে টেনে নিস।
আলো ছড়িয়ে দিস রাতের শেষে,
সেই আলোয় জাগবে পৃথিবী,
মনের অন্ধকার দূর হবে ।

একদিন এই ফুটপাতের ছোট জায়গায়,
ওই জাহানারা শাহানারাদের পাশে
এসে বসেছিলেন সাঈদ স্যার।
সেই মানুষটিও বাবার মতই বলছিলেন,
মানুষের মনে আলো জ্বালো,
মনের অন্ধকার দূর হবে।
ফাতেমা তোমার আলোয় মানুষ জাগবে,
তোমায় সেলাম।
সাঈদ স্যার মাথা স্পর্শ করে বলছিলেন,
তোমার মত করে তুমি বাঁচো মা।
সাঈদ স্যারের ছবি আমি
খবরের কাগজে দেখেছি,
একবারে প্রথম পাতায়।
পৃথিবী কত মান্য করে মানুষটাকে।

সেই সাঈদ স্যার বলে কিনা
আমি নত হয়ে
তোমাকে সেলাম জানাই ফাতেমা,
তোমার পাগলামি
আমার পাগলামিকেও যে ছাড়িয়ে যায়,
তোমার মত করেই তুমি বেঁচে থাক মা।

ঠিকই তো, আমি বাঁচতে চাই।

এখন সকাল-সন্ধ্যায় উড়ে যেতে যেতে
যত পাখি কথা বলে,
বাতাসের ঢেউ নিয়ে ফিরে আসে
যে চোখ অন্তরালে,
আমি সেই চোখে হাত পেতেছি
আমার সন্তানে ভরিয়ে দাও পৃথিবী,
হে ঈশ্বর!

ছেঁড়া বই আর খবরের কাগজ নিয়ে
চুলে পাক ধরা
উঁচু দাঁতের শীর্ণ শরীর নিয়ে
আমি পৌঁছে যাই,
এক রাস্তা থেকে অন্য রাস্তায়,
এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে,
এক শিশু থেকে অন্য শিশুতে।

কারণ আমি দেখতে চাই,
উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে মানুষ
এই পৃথিবীতে - প্রতিনিয়ত।
----------------------------------
© সঞ্জীব সাহা

COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success