এক হাভাতির গল্প
ভালোবাসার শব্দ চেনো তোমরা?
আমি চিনেছিলাম ।
ভুল হলো হয়তো চিনতে পারিনি ।
আমার মত মেয়ে
এমন করে কি চিনতে আছে!
এইতো সেদিন সবে আঠারোই পা পড়েছে।
না না, দিনকাল যেমনই হোক,
থালায় অন্নের যত অভাবই হোক,
আমার শরীরটা কেমন যেন পুষ্ট হয়ে উঠলো। আর পুষ্ট হলেই তো চাওয়া,
চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে
একটা সামঞ্জস্য না থাকলে
হৃদয়টা খুলে কি দেখানো যায়!
আমার হৃদয়টাকে যে খুলেছিল,
তার অস্তিত্ব আজও ছটফটায়।
কিন্তু সব কিছু কি ধরা পরে
বিস্তৃত মধ্যাহ্নে!
এখনো অনেক দিন যেতে হবে ।
আবির রং মেখে গায় গোধুলিতে,
কালভার্টের ওপারে বটের ছায়ায়
তোমরা পেয়েছ কি সুখ,
আমার মতই বিপন্ন কপালে ।
আমার দৃষ্টি বড় আনমনা করে,
উন্মোচিত হতে থাকে কতকিছু।
বাতাসকে গায়ে মাখলে মনে হয়
গ্লেসিয়ারে ঝড় উঠেছে ।
এমন শীতল হাওয়া আসে,
অথচ বাইরে তখন উত্তাপ,
এক সমুদ্র জল উছলে ওঠে
আমার স্নায়ুতে,
বৃষ্টির কথা বলে
আমি ফিরে যেতে চাই,
পড়ন্ত বিকেলে ঝরা পাতা
রং হারায় সবুজে হলুদে ।
এরপরও তো আমার বাঁচার সাধ জাগে।
মা গেছে হঠাৎই ক'দিন আগে।
আমি কি করবো কোথায় যাবো,
কত মানুষ কত পথ ধরে নিয়ে আসে,
আমি বলি আমার এই অঙ্গন থাক ।
এই করোনায় মা গেছে অস্তাচলে।
বাবা অন্ধ ।
তবু তো তার হাতটা পুরুষ্টু শক্ত,
ওই যে হাওড়ার গলিতে
হাতুড়িপেটাত আগুনে সারা শীতে।
সেই হাত সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে,
আমাকে জড়িয়ে ধরত ।
আমি বলতাম ছাড়ো ছাড়ো বাবা,
তোমার হাত বড় শক্ত ।
বাবা বলতো, একদিন এই শক্ত হাতেরই
দরকার হবে সমাজে।
আচ্ছা, এখন তো সমাজে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই মূলকথা - সারকথা,
সারা বিশ্বজুড়ে।
সামাজিক দূরত্ব!
আমি যখন বাইরে পা বাড়াই,
তখন উত্তর মেরু থেকে বরফ ছুঁয়ে
শীতল বাতাস এসে আমার গায় মিশে যায়।
মনে হয় এ পৃথিবী সত্যিই শীতল হতে চলেছে।
মানুষ বলছে মুখ বন্ধ রাখ,
আবরণে মুখ ঢাকো,
চোখে ঠুলি পড়ো,
মাথা ঢাকো, তোমার বুদ্ধি ঢাকো।
এটাই নাকি তোমাকে বাঁচাবে
ভাইরাসের হাত থেকে ।
একের পর এক ঢেউ আসে,
প্রথম ঢেউ দ্বিতীয় ঢেউ তৃতীয় ঢেউ,
ঢেউয়ের পরে ঢেউ আসে।
আসতে পারে--
তবে এ পৃথিবী মনুষ্যসমাজকে
দূরে রেখে বেঁচে থাকবে কতদিন।
আমি আজকাল
ঘরের পাশের পুকুরে দাঁড়ালে,
আমার আঠারো বছরের মুখটা
অস্পষ্ট হয়ে আসে,
কাঁপতে থাকে জলের ঢেউয়ে,
জলের সঙ্গে অস্পষ্টতা' নিয়েই
আমাকে বেঁচে থাকতে হয় ।
তবুও ওই শক্ত হাত দুটো ধরতেই হবে
নিদারুণ অন্ধ মায়ায়,
গণ্ডিটাকে পার করে দিতে হবে ।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
আজ থেকে কুড়ি কোটি বছর আগে ডাইনোসরের কি এমনই অবস্থা হয়েছিল,
কত বড় তার দেহ,
চারদিকে সবুজ গাছপালা,
মানুষ ছিল না---
আর এখন মানুষ থেকেও মানুষ নেই,
তাকিয়ে দেখি সমাজ বলছে,
মানুষকে দূরে যেতে হবে,
সরে যেতে হবে,
সরে সরে যেতে হবে,
হয়তো তাই আমার থালায়
ভাতের অভাব,
ভাতের অভাব আছে থাকবেও হয়তোবা।
আমার দেহে তার ছাপ পড়বে কি?
এমনিতে শরীর পুরুষ্ট হলে
ভেতরে চোখ মুখ খুলে যায়,
সেখানে ভালোবাসা কথা বলে।
সেখানে হৃদয় জুড়ে উড়ে চলে পাখি।
পাখির ডানায় আসে সুখ,
আমার শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে
সবুজ গালিচায়।
আকাশের বৃষ্টি ধরে নিতে হাতে,
নীল চোখ বয়ে যায় নদীতে।
আমি বলেছিলাম,
তোমাদের ব্যর্থ প্ররোচনা নিয়েই তো
আমাদের বাঁচতে হয়,
কারণ ভাবনা আর ভালোবাসা সবই তো জীবাশ্ম হয়ে যেতে চায়।
তোমার ছোঁয়া
আমাকে অনেকটাই প্রলুব্ধ করেছিল। বলেছিলাম, ভালোবাসার কথা বলতে পারি না, আমি বুঝিই বা কতটুকু,
শুধু হৃদয়ে একটা বাজনা বাজে,
একটা তরঙ্গ ওঠে,
সজনে পাতা তিরতির করে কাঁপে,
ভেসে যেতে ইচ্ছে করে ।
কিন্তু সব ইচ্ছে তো পূর্ণ হয় না।
বাবার অন্ধকারের সুযোগ
আমি নিতে পারি না।
কিন্তু আমি তো মানুষ ।
আমার হৃদয় জুড়ে শুধু ভালোবাসা।
এক প্রেম থেকে অন্য প্রেমে
চলে যেতে পারি ।
রাত্রির অন্ধকার ফিরে আসে যদি,
আমার চোখের আলোয়
জ্বালাতে পারবো কি সবটুকু।
তোমরা ফিরে যাও,
ফিরে যেতে পারো,
আমার কোন গল্প নেই
আমাকে লোকে অমৃতা ভাবে,
জানে অমৃতার মৃত্যু হয় না -হয়তোবা ।
তোমার হাত যেদিন আমাকে স্পর্শ করেছিল, সেদিন আমি তোমাকে ফিরে যেতে বলি।
আমি প্রভাতে একটু আলো মেখে গায়,
যদি উড়ে যেতে পারি সকাল-সন্ধ্যায়
তবে জন্ম স্বার্থক হবে মনে মনে ভাবি।
আমার সকাল হয়
দোকানের ছোটখাটো দু'চারটে
খাতা বই বিক্রি করে ।
বাবাকে খাওয়াতে হবে,
আমার স্বপ্নকে বাঁচাতে হবে,
আমার ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে হবে,
অথচ আমার পাতে ভাত পড়ে না ।
শুধু নিষ্পাপ চোখের পাশে
ঐ আঁশটে গন্ধ ভরা হাত
আর হাতের স্পর্শ,
আমি কি ভালোবাসতে পারি!
সমস্ত জীবন জুড়ে তাই বয়ে যায় কথা--
আমার সবটুকু আকাশ ঝাপসা হয়ে যায়।
---------------------------
© সঞ্জীব সাহা
ভালোবাসার শব্দ চেনো তোমরা?
আমি চিনেছিলাম ।
ভুল হলো হয়তো চিনতে পারিনি ।
আমার মত মেয়ে
এমন করে কি চিনতে আছে!
এইতো সেদিন সবে আঠারোই পা পড়েছে।
না না, দিনকাল যেমনই হোক,
থালায় অন্নের যত অভাবই হোক,
আমার শরীরটা কেমন যেন পুষ্ট হয়ে উঠলো। আর পুষ্ট হলেই তো চাওয়া,
চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে
একটা সামঞ্জস্য না থাকলে
হৃদয়টা খুলে কি দেখানো যায়!
আমার হৃদয়টাকে যে খুলেছিল,
তার অস্তিত্ব আজও ছটফটায়।
কিন্তু সব কিছু কি ধরা পরে
বিস্তৃত মধ্যাহ্নে!
এখনো অনেক দিন যেতে হবে ।
আবির রং মেখে গায় গোধুলিতে,
কালভার্টের ওপারে বটের ছায়ায়
তোমরা পেয়েছ কি সুখ,
আমার মতই বিপন্ন কপালে ।
আমার দৃষ্টি বড় আনমনা করে,
উন্মোচিত হতে থাকে কতকিছু।
বাতাসকে গায়ে মাখলে মনে হয়
গ্লেসিয়ারে ঝড় উঠেছে ।
এমন শীতল হাওয়া আসে,
অথচ বাইরে তখন উত্তাপ,
এক সমুদ্র জল উছলে ওঠে
আমার স্নায়ুতে,
বৃষ্টির কথা বলে
আমি ফিরে যেতে চাই,
পড়ন্ত বিকেলে ঝরা পাতা
রং হারায় সবুজে হলুদে ।
এরপরও তো আমার বাঁচার সাধ জাগে।
মা গেছে হঠাৎই ক'দিন আগে।
আমি কি করবো কোথায় যাবো,
কত মানুষ কত পথ ধরে নিয়ে আসে,
আমি বলি আমার এই অঙ্গন থাক ।
এই করোনায় মা গেছে অস্তাচলে।
বাবা অন্ধ ।
তবু তো তার হাতটা পুরুষ্টু শক্ত,
ওই যে হাওড়ার গলিতে
হাতুড়িপেটাত আগুনে সারা শীতে।
সেই হাত সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে,
আমাকে জড়িয়ে ধরত ।
আমি বলতাম ছাড়ো ছাড়ো বাবা,
তোমার হাত বড় শক্ত ।
বাবা বলতো, একদিন এই শক্ত হাতেরই
দরকার হবে সমাজে।
আচ্ছা, এখন তো সমাজে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই মূলকথা - সারকথা,
সারা বিশ্বজুড়ে।
সামাজিক দূরত্ব!
আমি যখন বাইরে পা বাড়াই,
তখন উত্তর মেরু থেকে বরফ ছুঁয়ে
শীতল বাতাস এসে আমার গায় মিশে যায়।
মনে হয় এ পৃথিবী সত্যিই শীতল হতে চলেছে।
মানুষ বলছে মুখ বন্ধ রাখ,
আবরণে মুখ ঢাকো,
চোখে ঠুলি পড়ো,
মাথা ঢাকো, তোমার বুদ্ধি ঢাকো।
এটাই নাকি তোমাকে বাঁচাবে
ভাইরাসের হাত থেকে ।
একের পর এক ঢেউ আসে,
প্রথম ঢেউ দ্বিতীয় ঢেউ তৃতীয় ঢেউ,
ঢেউয়ের পরে ঢেউ আসে।
আসতে পারে--
তবে এ পৃথিবী মনুষ্যসমাজকে
দূরে রেখে বেঁচে থাকবে কতদিন।
আমি আজকাল
ঘরের পাশের পুকুরে দাঁড়ালে,
আমার আঠারো বছরের মুখটা
অস্পষ্ট হয়ে আসে,
কাঁপতে থাকে জলের ঢেউয়ে,
জলের সঙ্গে অস্পষ্টতা' নিয়েই
আমাকে বেঁচে থাকতে হয় ।
তবুও ওই শক্ত হাত দুটো ধরতেই হবে
নিদারুণ অন্ধ মায়ায়,
গণ্ডিটাকে পার করে দিতে হবে ।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
আজ থেকে কুড়ি কোটি বছর আগে ডাইনোসরের কি এমনই অবস্থা হয়েছিল,
কত বড় তার দেহ,
চারদিকে সবুজ গাছপালা,
মানুষ ছিল না---
আর এখন মানুষ থেকেও মানুষ নেই,
তাকিয়ে দেখি সমাজ বলছে,
মানুষকে দূরে যেতে হবে,
সরে যেতে হবে,
সরে সরে যেতে হবে,
হয়তো তাই আমার থালায়
ভাতের অভাব,
ভাতের অভাব আছে থাকবেও হয়তোবা।
আমার দেহে তার ছাপ পড়বে কি?
এমনিতে শরীর পুরুষ্ট হলে
ভেতরে চোখ মুখ খুলে যায়,
সেখানে ভালোবাসা কথা বলে।
সেখানে হৃদয় জুড়ে উড়ে চলে পাখি।
পাখির ডানায় আসে সুখ,
আমার শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে
সবুজ গালিচায়।
আকাশের বৃষ্টি ধরে নিতে হাতে,
নীল চোখ বয়ে যায় নদীতে।
আমি বলেছিলাম,
তোমাদের ব্যর্থ প্ররোচনা নিয়েই তো
আমাদের বাঁচতে হয়,
কারণ ভাবনা আর ভালোবাসা সবই তো জীবাশ্ম হয়ে যেতে চায়।
তোমার ছোঁয়া
আমাকে অনেকটাই প্রলুব্ধ করেছিল। বলেছিলাম, ভালোবাসার কথা বলতে পারি না, আমি বুঝিই বা কতটুকু,
শুধু হৃদয়ে একটা বাজনা বাজে,
একটা তরঙ্গ ওঠে,
সজনে পাতা তিরতির করে কাঁপে,
ভেসে যেতে ইচ্ছে করে ।
কিন্তু সব ইচ্ছে তো পূর্ণ হয় না।
বাবার অন্ধকারের সুযোগ
আমি নিতে পারি না।
কিন্তু আমি তো মানুষ ।
আমার হৃদয় জুড়ে শুধু ভালোবাসা।
এক প্রেম থেকে অন্য প্রেমে
চলে যেতে পারি ।
রাত্রির অন্ধকার ফিরে আসে যদি,
আমার চোখের আলোয়
জ্বালাতে পারবো কি সবটুকু।
তোমরা ফিরে যাও,
ফিরে যেতে পারো,
আমার কোন গল্প নেই
আমাকে লোকে অমৃতা ভাবে,
জানে অমৃতার মৃত্যু হয় না -হয়তোবা ।
তোমার হাত যেদিন আমাকে স্পর্শ করেছিল, সেদিন আমি তোমাকে ফিরে যেতে বলি।
আমি প্রভাতে একটু আলো মেখে গায়,
যদি উড়ে যেতে পারি সকাল-সন্ধ্যায়
তবে জন্ম স্বার্থক হবে মনে মনে ভাবি।
আমার সকাল হয়
দোকানের ছোটখাটো দু'চারটে
খাতা বই বিক্রি করে ।
বাবাকে খাওয়াতে হবে,
আমার স্বপ্নকে বাঁচাতে হবে,
আমার ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে হবে,
অথচ আমার পাতে ভাত পড়ে না ।
শুধু নিষ্পাপ চোখের পাশে
ঐ আঁশটে গন্ধ ভরা হাত
আর হাতের স্পর্শ,
আমি কি ভালোবাসতে পারি!
সমস্ত জীবন জুড়ে তাই বয়ে যায় কথা--
আমার সবটুকু আকাশ ঝাপসা হয়ে যায়।
---------------------------
© সঞ্জীব সাহা
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem