Bengali Poem কিশোরী Poem by Sanjib Saha

Bengali Poem কিশোরী

কিশোরী

আমাদের পাশের বাড়ি ছিল নাজ্জুদের। নাজ্জু ওর আসল নাম নয়। আসল নামটা হতে পারে নাজরানা অথবা নারজানা। ও নিয়ে কোনও দিন মাথা ঘামাই নি। ঘামানোর কথাও নয়। ওরা উর্দুতে কথা বলতো। আমরা বাংলায়। আমরা হিন্দু, ওরা মুসলমান। মহরমের দুপুরে যখন লাঠিখেলার দলের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সারা দুপুর কাটিয়ে বাড়ি ফিরতাম, বুকটা দুরদুর করতো। বাবা কিন্তু কোনো দিন বকাবকি করেন নি। তবু কী এক দ্বিধায় বাবাকে এড়াতে বাড়ির চারপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করতাম। আমাদের বাড়ির চৌকো প্রকাণ্ড উঠোনের চারপাশে বড় বড় ঘর। দক্ষিণ আর পশ্চিম দিকে দালান গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে। উত্তর আর পুবদিকে চারচালা বড় বড় টিনের ঘর।
দালানের গা ঘেঁষে যে ডালিম গাছটা ছিল, তার নিচে দাঁড়িয়ে বাবাকে পরখ করার চেষ্টা করলে নাজ্জুদের ঘরের জানালা খুলে যেত। জানালা দিয়ে বাড়ানো ফর্সা হাতে মেহেন্দির রঙ, লতা পাতা আঁকা। ও ওদের দরজা খুলে মেহেন্দি গাছের তলায় দু'বাড়ির মাঝের দরজা দিয়ে আমাকে আমাদের পুবের ঘরে চালান করে দিত। একটা মিহি হাসি ওর সুন্দরী পাতলা লাল ঠোঁটে লেগে থাকতো।
আমাদের উঠোন আর ওদের উঠোনের গন্ধ আলাদা ছিল। আর কেউ না বুঝলেও আমরা দুজনে বুঝতাম। সকালে আমাদের উঠোনে ওরা এক্কা দোক্কা খেলতো। বিকেলে ওদের উঠোনে যখন আমরা গোল্লাছুট খেলতাম, নাজ্জু তখন উনুনে রুটি সেঁকতো। সেই গন্ধে সারাবাড়ি ম ম করতো।
তারপর একদিন যুদ্ধ এল। আকাশ থেকে বোমা পড়তে থাকলো। মানুষ ছুটোছুটি করে ঘর উঠোন গা গঞ্জ ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো। ওরা বেরোল না। আমরা বেরোনোর সময় জানালায় দেখি দাঁড়িয়ে আছে নাজ্জু। চোখ ছলছল। আমি ওর দিকে ছুটে যাওয়ার আগেই কে একজন হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে সামনের ভিড়ে ঠেলে দিল আমাকে।

পৃথিবীতে কত যুদ্ধ হয়। গণহত্যা হয়। ইরাক ইরান গাজা ইউক্রেন ইসরাইল বোমা বারুদের গন্ধে ভরে যায়। কত মানুষ মরে। তবু শতাব্দী পেরিয়েও নাজ্জুর রুটি সেঁকার গন্ধ আজও মরে না। বাতাস ম ম করে।

কিশোরী মেয়ের চোখের জন্য যুদ্ধ থেমে যায়।
--------------------
© সঞ্জীব সাহা

COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success