মাতৃভূমি
বাড়ির বারান্দার দেওয়াল
আর পাশের বাড়ির উঁচু প্রাচীরের মাঝখানে
যে একফালি সরু জায়গা ছিল,
সেই নিতান্ত অবহেলার জায়গাটা আসলে
বাড়ির প্রায় ত্রিশজন মানুষের জন্মস্থল।
এ বাড়ির পাঁচ বউয়ের
শুধু আনাগোনা ছিল ওই স্থানে।
বছর ভর।
নইলে ওটা নাকি অশুদ্ধ জায়গা।
আঁতুড়ের জায়গা।
ওখানে পা রাখলে স্নান করতে হয়।
যে স্থানে মানুষের জন্ম হয়,
সে স্থান আবার অশুদ্ধ হয় নাকি!
সে তো পৃথিবীকে জ্যান্ত করে রাখে।
পৃথিবীকে প্রাণ দেয়।
ওখানে অন্য কারও
যাওয়ার অধিকার ছিল না।
একমাত্র অধিকার ছিল ধাই মা-র।
কারণ ধাই মাকে কেউ ছোঁয় না।
ও অচ্ছুত।
ওকে ছুঁলেও স্নান করতে হয়।
বড় উঠোনের চারদিকে
চারটে দালান ঘর ছিল।
যার মধ্যে দুটো ভাঙা ভাঙা,
প্লাস্টার ওঠা পুরোনো দালান।
উঠোনে কচিকাঁচারা খেলাধুলা করতো,
ছুটোছুটি করতো।
রঙচটা দালানে মানুষ বাস করতো।
এক ছুটে উঠোনটা পেরিয়ে
গাব গাছের ডাল থেকে
পাকা গাব পেড়ে আনতো ছেলের দল।
পাকা গাবের বীজগুলো মিষ্টি হয়।
ওরা চুষতে থাকে।
গাব গাছকে ঘিরে
এ পাড়ার এক দঙ্গল ছেলে
লাঠি খেলা খেলতো ।
মিছেমিছি যুদ্ধ ।
বাড়ির পেছনের ঘাটে
মেয়ে বউরা স্নানে যেত।
কথা বলতো।
একটু আধটু রঙ্গ রসিকতাও করতো।
ঘোমটা টেনে ভেজা কাপড়ে
মাথা নিচু করে উঠোনে ফিরে আসতো,
লাল নীল হলুদ মূর্তির মতো।
কারো কোলে শিশু।
যেন আধভাঙা যামিনী রায়ের মূর্তি!
বাচ্চারা কাঁদতে কাঁদতে বড় হয়।
উঠোন আর দালান,
দালান আর উঠোনের ফাঁক গলে
কতদিন পেরিয়ে যায়।
নিষ্ঠুর সময়!
বড়রাও কাঁদে।
এখন।
কারণ ওই এক ফালি জায়গাটা
যেখানে ত্রিশ জন মানুষের জন্ম হয়েছিল,
সেই জায়গাটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
পাথর পড়েছে।
দেয়াল উঠেছে বুকের চারদিকে।
ওই এক ফালি জায়গায়
আজকাল মানুষের জন্ম হয় না।
বুকের মধ্যে নতুন ঘর,
নতুন ঘর জুড়ে শূন্যতা।
মিছেমিছি যুদ্ধ আজ সত্যি হয়েছে।
তবু জন্মভূমি বাড়তে বাড়তে
পুরো পৃথিবীটাই মাতৃভূমি হয়ে গেছে।
------------------------
© সঞ্জীব সাহা
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem