নিজস্ব আজানে হৃদয়ের অতল থেকে উঠে আসা আলপথ / গৌতম রায়। Poem by Soumen Chattopadhyay

নিজস্ব আজানে হৃদয়ের অতল থেকে উঠে আসা আলপথ / গৌতম রায়।

নিজস্ব আজানে হৃদয়ের অতল থেকে উঠে আসা আলপথ / গৌতম রায়।

কবি সৌমেন চট্টোপাধ্যায় পেশায় একজন খনি প্রযুক্তিবিদ ।লেখালেখি শুরু ১৯৯৯ সাল থেকে। ' মানভূমের অশ্রুগন্ধ ' শীর্ষনামে দীর্ঘ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর কাব্য সাধনার স্বকীয়তার স্বাক্ষর বহন করে। সৌমেন কবিতা চর্চায় কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষায় যান নি। আবহমান বাংলা কবিতার ঘরানাটিকে নিজ চর্চায় ধরে রেখেছেন। নাগরকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও সৌমেন কবিতায় বক্তব্য উপস্থাপনে তিনি নগর জীবনের উপকরণকে অনুসঙ্গ হিসেবে ব‍্যবহার করেন নি, যাকিছু সব উঠে এসেছে চিরাচরিত গ্রামীণ সভ‍্যতা থেকে। যেখানে শালিনী নদীর গহীন খাতে অমৃতধারা প্রবাহিত। যেখানে বাউলের একতারা মেঘরাগে লালনগীতি, সুফিগান গায়। শালিনীর জল আর নদী আত্মার সঙ্গে কবি একাত্ম অনুভব করেন এই বাংলা মায়ের সন্তান হিসেবে, যেখানে রাখালিয়া বাঁশির মায়াবি সুর মুর্ছনা মরমীর দহন দিনের অঞ্জলি ভরে ওঠে দেবজলে। কবির কলমে উঠে এসেছে এই পেলব কোমল আবহে ধর্মধ্বজী ধর্মান্ধদের নিষ্ঠুর রক্তপাত, বারুদের পোড়াগন্ধে জর্জরিত নিষ্ঠুরতা, যেখানে জ্বরাতুর আর্দ্র মুখ নিষ্ফল শূন্যে চেয়ে থাকে, শান্তি বিঘ্নিত হয়, বৃহৎ দুঃখের কোনো সমাধান হয় না। সময় সমকাল সচেতন কবি বলেন, 'আমিতো জেনেছি / প্রাচীন গ্রন্থের ধর্ম রোদ্দুর ছড়ানো - / সে তো মানুষের সংরক্ষিত ইতিহাস/সে তো পৃথিবীর বাড়ন্ত সংসারে একান্তে শান্তির নম্র অহংকার।' তাই কবির সময়ের কাছে প্রশ্ন ঃ দাঙ্গাবাজদের আগুনে 'দুঃখিত নদীর তটে আজ অশ্রুমতী / পৃথিবীর হাড় মাংস পুড়বে কী শেষ রাতে? '

কবি সৌমেনের কবিতা গ্রামবাংলার একটি নিবিড় নির্জন পরিবেশের আবহে নিজস্ব আজানে হৃদয়ের অতল থেকে উঠে আসা আলপথ। যার শান্ত স্বরলিপিতে জেগে ওঠে এক সর্বব‍্যাপী বিষণ্ণতার ধুন। তাই তাঁর কবিতায় স্মৃতি মেদুরতা, নিঃসঙ্গতা, মৃত্যুচেতনা বারেবারে আসে। তাঁর স্বজন হারানো মৃত্যু চেতনা বড়ো ইউনিভার্সাল। সূর্য পোড়া আলো প্রতিদিন নিঃস্ব করে যায় আমাদের ঘোর অন্ধকারে রেখে, কৃষ্ণচতুর্দশীতে স্বজনের মৃত্যু সুপ্রাচীন হয়েও নক্ষত্র পোড়া ছাইয়ের স্তূপে যুক্ত হয়ে পৃথক একাকী নরম মৃত্যু মানুষের দেশে ঘুরে বেড়ায়, মানুষকে এই চেতনা বিষণ্ণ করে। 'জন্মঋণ' কবিতায় দহন উপান্তে এসে উপলব্ধি করেছেন, 'এখন নিভন্ত চিতার আগুন ধোঁয়া গন্ধের চণ্ডাল/ জীবনের কাছে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনার গান গায়/ দহনের সাথে নিজেকে পোড়াবে বলে / দহনে দহনে দেবতাবাতাসের গভীরে মানুষ জন্ম ওড়ে।'---- ' নিঃসঙ্গ জীবন সম্ভ্রান্ত আগুনে পোড়ে/ গর্ভজলে প্রতিভার পোড়াগন্ধ জন্ম জন্ম অন্নজল চেয়ে / নিজেকে জন্মের প্রেমে ঋণী রাখে।'প্রতিটি মানুষই এক একটি স্বতন্ত্র ব‍্যক্তিত্ব, সেই ব‍্যক্তিত্বের কাছে সে নিঃসঙ্গ। এই নিঃসঙ্গ জীবন চিতার ধোঁয়া গন্ধে নয়, আরও সূক্ষ্মতম ঘ্রাণে সম্ভ্রান্ত আগুনে পোড়ে আর গর্ভজলের প্রতিভা যা জন্মসূত্রে প্রাপ্ত তা ' অন্নজল ' ইন্ধন চেয়ে জন্মপ্রেমে সার্থকতা প্রতিপন্ন করে মানুষকে ঋণী করে। মনুষ্য জন্মের সার্থকতা কী তা কবি এই 'জন্মঋণ' কবিতায় তুলে ধরেছেন। জায়মানতা, চলমানতা জীবনের ধর্ম, এই গতিশীলতায় রূপান্তরে রূপান্তরে জীবন এগিয়ে যায় নিহিত চেতনার আলোকে। কবি আলোকপ্রাপ্ত জীবনকে মাতৃঋণ, জন্মঋণ বলে মনে করেছেন । এই অনুভব, এই আনুগত্য বিজ্ঞান চেতনায় আলোকপ্রাপ্ত অনুভাবি মন না হলে এই কবিতা লেখা সম্ভব নয়।

সৌমেনের কবিতা বৃহত্তর জগতের জীবনের ভেতর আত্মখননের গবেষণা পত্র। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে একটা মায়াবী অঞ্জন লাগে চোখে হদয়ে । কমনীয় দৃশ্যকল্পের ভেতর দিয়ে যাত্রা করতে করতে একটা ঘোরের জার্নি বলে মনে হয়। সৌমেন তাঁর কাব‍্যমহিম জাদুতে আমাদের যেখানে নিয়ে যান সেখানে বড়ো একমুখী আবেশে পা ফেলতে হয়, তাড়াহুড়ো করলে কল্পদৃশ‍্যপট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, এই কারণে বড়ো মনোযোগী থাকতে হয় পা ফেলার প্রতি মুহূর্তে। পাঠক তাঁর কবিতার এমন একটা সম্মোহন আছে যাকে আপনি মিশ করতেও চাইবেন না। তাঁর কবিতায় একটা গা ছমছম শিহরণ কাজ করে যাত্রা পথে, যে যাত্রার লক্ষ্য হলো চন্দ্রদগ্ধা গৃহ যাকে কবি মণিঘরও বলেছেন, তার 'লুপ্তোদ্ধার'। এই প্রত্নঘরে কালের গর্ভে সভ‍্যতা সংস্কৃতি হারিয়ে যায়। কিন্তু বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখলে এ পৃথিবীতে কোনো কিছুই কী হারায়? মহাকাল মহাপৃথিবী সবকিছুই ধরে রাখে আমাদের আবিস্কারের আড়ালে সেই মণিঘরের গৌরব উদ্ধার অনুসন্ধিৎসু হিসেবে মানুষ নিরন্তর করে চলেছে - এই খনন চিরকালীন। নজরুল এ বিষয়ে লিখেছেন, ' তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় নাতো কভু।/ আমরা অবোধ, অন্ধ মায়ায় তাইতো কাঁদি প্রভু।--- হারালো মোর প্রিয় যারা, / তোমার কাছে আছে তারা, / আমার কাছে নাই তাহারা - হারায়নিকো তবু।'

সৌমেন গদ্য ছন্দে, কখনও টানা গদ‍্যে কবিতাগুলি লিখেছেন, আবহমান নিরপিত ছন্দে নয়। তাঁর কবিতায় ভাবপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে পংক্তিতে পংক্তিতে সঠিক এবং অভিনব শব্দবন্ধ উঠে এসেছে যা কবিতাকে সুষমামণ্ডিত এবং গতি দান করেছে। এরকম কিছু শব্দবন্ধ - 'দেবতাবাতাস', 'পরিযায়ী স্মৃতিছবি', 'মিশরজন্ম', 'মেঘসুর', 'নরমমৃত্যু', ' মায়ার যুবতীভোর', 'বৃষ্টিভদ্রা রাত', 'চন্দ্রগন্ধা রাত', 'অনুরাধা আলোর গভীর', 'নিঝুম কাফন' ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলি কবিতায় আরোপিত নয়, কবিতার প্রয়োজনে এসেছে।

টানা গদ‍্যে লেখা একটি কবিতা আমার মন হৃদয়কে বিশেষ ভাবে নাড়া দিয়েছে। সেই কবিতায় কবি সৌমেন প্রাচীনত্বের সঙ্গে একটা শেকড়ের যোগ, সুতীব্র টান অনুভব করেছেন। ইট কাঠ পাথরের আর্বান সভ‍্যতা নয়, গাছ গাছালি নদী মাঠঘাট ফসল পশুপাখি সমৃদ্ধ গ্রামীণ প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে নিজের একাত্মতা অনুভব করেছেন কবি।'দুঃখিত পাহাড় তলে যারা কাদা মেখে বীজধান পুঁতে ছিল রুক্ষ মাটিতে, অনেক আষাঢ়ের শেষে তারা অঘ্রাণের গোধূলিতে ঘরে ফিরে দেখেছে বাপ ঠাকুরদার সুপ্রাচীন অশ্রু বিন্দু কুয়াশার মৃত জলকণা অন্ধকার ছুঁয়ে আছে। তবু পশ্চিম দিগন্তে ধূ ধূ মাঠের শেষে সূর্য তার বেদনার হাত ফিরে ফিরে বাড়ায়- কাশীদাসী মহাভারত থেকে বিদূরের প্রাচীন কণ্ঠস্বর শুনতে পাই - তখন সমুদ্র পাখিদের মতো অনন্ত জলরাশি পেরিয়ে আমি এই সোনালী হলুদ দেশে ফিরে আসি আলো অন্ধকারে।'(কবিতা- পশ্চিম দিগন্তে ধূ ধূ মাঠের শেষে সূর্য তার বেদনার হাত ফিরে ফিরে বাড়ায়) ।সৌমেনের কবিতা ধীর ও ধৈর্য্য সহকারে পড়তে হয় নাহলে খেই হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।কবি সৌমেন এটা দেখিয়েছেন যে, পল্লী বাংলার নিভৃতি নিরালার মধ্যে একটা নম্র সরব উচ্চারণ আছে। গ্রামবাংলার প্রতি গভীর টান ভালোবাসা না থাকলে এমন কবিতা লেখা সম্ভব না। জীবনানন্দের পর এতো সাবলীল ভাবে আত্মিক ভাষায় মাটির প্রতি শিকড়ের প্রতি প্রেম নিবেদন এবং সর্বত্র প্রসারি আবেদন বোধহয় বাংলা কবিতায় কমই রচিত হয়েছে, যা সৌমেন সম্ভব করে তুলেছেন। তাঁর স্বকীয়তা অবিরাম থাক এবং পরবর্তীতে আরও আরও সুন্দর সুন্দর কবিতা রচনা করে বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করুন এই আশারাখি।

গৌতম রায়
সুভাষনগর, আদ্রা
আদ্রা, পুরুলিয়া- ৭২৩১২১
চলভাষ- ৯৪৩৪৫৪০৬৫১
১৫-ই জানুয়ারি, ২০২২
Show quoted text

COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Soumen Chattopadhyay

Soumen Chattopadhyay

Raghunathpur, purulia west Bengal
Close
Error Success