আমার প্রিয় কবি সৌমেন চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতা ' আত্মঘাতী স্মৃতিজল ' পড়ার পর কেন জানিনা আমার মধ্যেই মোচড় দিয়ে উঠল, সে কবিতার নিজস্ব অক্ষাংশ অথবা দ্রাঘিমাংশ আছে, নিম্নচাপ নেই, সরলবর্গীয় উদ্ভিদ আছে , বাইল্যাটারেল লাইন নেই অথচ তার একটা হৃদস্পন্দন আছে, আত্মার শরীর আছে, শরীরের ভেতর মেটাফোরিক আত্মা আছে, জাগতিক মুহুর্তরা আছে । আমি সেই কবিতা পড়ার পর একদম আমার নিজস্ব অনুভূতি গুলো ব্যক্ত করলাম মাত্র ।
মায়াবী জীবনের গর্ভ ছেড়ে যে হলুদ সূর্যাস্তেরা নরম বাসব জন্মবীজ এঁকে দিতে পারে, তারাই আবার নীল শুক্রকীটের নক্ষত্র পিঠে বসে অমৃতলোকের গান গেয়ে ওঠে
কবি নিজেই আদম ও সঙ্গমময় নদীপথের প্রাচীন বৃত্তান্তের গান লিখে চলেছেন কবিতা নামক আত্মঘাতী স্মৃতিজলের ভেতর । কবি সৌমেন চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পড়তে পড়তে আমি একটি চাঁদ গোলা জলে ডোবানো বাঁকা নদীর অবয়বের কথা ভাবছিলাম, যেখানে এইমাত্র কেউ দাহ পর্ব সেরে একমুঠো ছাই শরীরের অসংখ্য জীবাশ্ম পুরুষ নিয়ে ঘরে ফিরে যাচ্ছে কপাল ভর্তি করে। আবার সে প্রাচীন কৃষ্ণগহ্বরের নীল বিষাক্ত ঘরে ঢুকে যায় । নিজের বুকের উপর দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করে নটরাজ, সেখানে মায়াবী রঙের নিজের একটা কাল্পনিক রেখা চিত্র আছে কেবল ।
কবি নিজেকে শ্মশানের পাশে গজিয়ে ওঠা জীবাশ্মের পাজামায় মেলে চলেন । কোথাও কখন বলেছেন পূর্বজন্মের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে পারি । এমন অসাধারণ উচ্চারণের জন্যই তো শ্মশানের মৃতভোজী রুপকের আরেক নাম ঈশ্বর । না আমি কোন অশরীরীর কথা বলছি না যারা ভেতরে ভেতরে একটি কঙ্কাল হয়ে যাওয়ার পর আর শ্বাস-প্রশ্বাস শুনতে পায়নি, যারা দীর্ঘ শ্মশানের পাশে বসে থেকে নিজেকে আত্মহত্যার কতগুলো ধারাবাহিক কাল্পনিক রেখা অঙ্কন করে যায় কসাইয়ের মতো, তার কাছে চাঁদ কতটুকু বৈরাগ্য এনে দিতে পারে ।
আসলে পিতৃপুরুষ একটা নদীর নাম । নদীর কাছে এসে ধ্বংস হলে নদীটি সমুদ্রের কাছে গিয়ে মিশিয়ে অজস্র প্রশ্ন মুখে নিয়ে হেঁটে যায় ওই নীলকান্ত পুরের দিকে, সে তখন গোধূলির ভেতর নিজের শিলালিপি উপুড় করে দেয় । শিলালিপির কাছে এখানে আকাশ থাকে না, সকলেই স্থানাঙ্ক বিহীন, কখনো কখনো নির্জন নিভৃতে অকপটে বলে যান তার অসম্ভব ফসল খননের কথা । মাটির তলা থেকে যখন অ্যানথ্রাসাইট জীবাশ্ম নিয়ে আসেন তখনও তাদের হৃদ স্পন্দন শুনতে পারেন, তাই তিনি পদার্থবিদ্যার সারফেস টেনশন অথবা ইলাস্টিসিটির মত সব পুরুষদের একসাথে বুকে নিয়ে হেঁটে চলতে পারেন অন্তর্দাহের করিডোর অবধি । তিনি বিলীয়মান রং জানেন , তিনি জিওলজিক্যাল সার্ভে জানেন অথবা মাইটোকনড্রিয়া আবার গোনাডোট্রপিক হরমোন । সব জানেন কবি অবচেতন স্তর থেকে তুলে আনেন অসংখ্য অজগরের দেহ, তাদেরকে তিনি এঁকে দিতে পারেন নির্জনের আত্মকথা
মূলরোম ধরে আবারো উঠে যান দারোকা পুরীর ভেতর থাকা একাত্ম শরীরের কাছে, খুবই আবেগতাড়িত হয়েছেন এখানে তিনি নিজের ভেতর থাকা সব রিপু চক্রগুলোকে মেলে ধরেন নিজের নাভি মন্ডলের কাছে । নাভি থেকে উৎসারিত আলো নিয়ে তিনি একাই হেঁটে চলেছেন অসীম গন্তব্যের দিকে । তিনি মৃৎ শিল্পীর ভেতরে থাকা অজস্র কঙ্কাল কথা মাখা মানুষদের তিনি চিনে ফেলেন । যারা খুব আততায়ীর মতো অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে বিচিত্র মুখগুলোর ওপর, সেখানে তিনি হেমলক নিয়ে অপেক্ষা করেন । আসলে তিনি অজস্র পান্থপাদপের নিচে দাঁড়িয়ে জ্যোতির্ময় খুঁজছেন । বালিজল, প্রত্নযোণী অথবা মৃত্যু ঘট, এমন অসাধারণ কাব্যিক চেতনায় তিনি মৃত্যুকে একেবারে উপুড় করে দেখেছেন । কখনো মৃত্যুর স্থানাঙ্ক জ্যামিতি এঁকেছেন তার নিজস্ব পরিমিতির খাতায় । তিনি ধ্রুবসত্যকে কল্পনা করেছেন প্রতিটি পুরুষ মানুষ হিসেবে । অবশ্যই পুরুষ মানেই নিয়ারলি ইকুয়াল টু ঈশ্বর । এই অনুভবের কাছে এসে চমকে যাই বারবার কবির দীর্ঘ লেখা জীবনের জন্য অপেক্ষা করে থাকব আমরা, তিনি আরো লিখুন আরো অনুভবে এনে দিক প্রতিটি পাঠকের কাছে । আবিষ্কার হোক আরো প্রস্তর যুগের পর্দা ছিড়ে বেরিয়ে আসা সব রোমাঞ্চ পূর্ণ কথা, ঈশ্বর এগিয়ে যাক ওই শূন্য বিন্দু থেকে, কবি এগিয়ে চলুন সব কষ্ট কথা ফেলে ওই অমৃত কুম্ভের সন্ধানে ।
আত্মঘাতী স্মৃতিজল
সৌমেন চট্টোপাধ্যায়
ফসলের ঋণ পড়ে আছে
সন্ধ্যার নিজস্ব শ্রবনা নক্ষত্র মেঘে
মৃত্যুঘট নাভিপদ্ম শ্মশানের অন্ধকারে ডাকে…
চিতাছাই কাশবন অতিক্রম করে ছুঁয়ে যায়
হেমন্তের মাটির গভীর মজ্জা চেতনার জন্ম দিতে
পিতৃপুরুষের বীজ শুন্যতার শোকে
আত্মজের অপেক্ষায় অশরীরী হিম রুক্ষ রক্তঅশ্রু গাঁথে
গোধূলি মিড়ের দুখী দেহ
বালিজলে তুলে আনে প্রত্নযোনি - জন্মের উজ্জ্বল শিলালিপি
দেখো পোড়া আঁতুড়ঘরের দগ্ধ মায়া
হু হু মাঠে আমার রক্তাক্ত জন্মচিত্রে
অভিশপ্ত কান্নাসুর ঢালে
মায়াবী জীবন গর্ভ ছিঁড়ে
হলুদ সূর্যাস্তে জন্মবীজ এঁকে দিলে
নীল শুক্রকীটে নক্ষত্র যোনির ঘ্রান
প্রাচীন বৃত্তান্ত বয়ে আনে…
নির্জন শিকড়ে অযত্নের নিঃস্ব প্রান ভারী হলে
ফসলের ঋণে- প্রিয় শব্দ জেগে থাকে
নীরব নদীর আত্মঘাতী স্মৃতিজলে
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem