অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
জানো হিমেল,
তোমাকেও আমার সেই একই প্রশ্ন। তোমার সাথে যদি মুহূর্মুহূ এতো বিচ্ছেদই ঘটবে, তো এতো যন্ত্রণা বুকে বাঁচবো কি করে?
ভাবছো হিমেল কে? তুমি যে রেস্টুরেন্টে কাজ করো, সেখান থেকেই জানলাম; তোমার নাম হেমা। কিন্তু আমি তোমার নাম রেখেছি হিমেল। জিজ্ঞেস করছো- কেন রাখলাম এই নাম?
হিমেল হাওয়া যেমন, সাহার মুরুভূমির উত্তপ্ত বুক স্নিগ্ধ শীতল করে দেয়; তেমনি তোমার আবির্ভাবও, আমার বুক স্নিগ্ধ শীতল করে দেয়। তোমাকে দেখলে হৃদয় জুড়িয়ে যায়। অতৃপ্ত রুক্ষ্ম জীবনের জ্বালা জুড়িয়ে যায়।
তোমাকে দেখলে স্বপ্নহীন জীবনে আবার একবার স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে হয়। তোমাকে দেখলে, সুরহীন জীবনে- আবার একবার রাখাল সেজে, মাঠে ঘাটে প্রান্তরে বাঁশি নিয়ে সুর তুলতে ইচ্ছে হয়।
এখন ভাবছো, আমি কে? তোমাদের রেস্টুরেন্টের এক্কেবারে ভেতরে, ডানদিকের কোনে মধ্য তিরিশের যে ছেলেটি তোমার দিকে অপলকে, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, সে-ই আমি।
তুমি আমাকে বেশ দেখেছো। একবার নয়, আজ নিয়ে পরপর সাত সন্ধ্যে দেখেছো। অবশ্য তুমি আমাকে দেখেই মুহূর্তে ঘাড় ঘুড়িয়ে নিয়েছো।
কিন্তু আমি? কেবল তোমাকে দেখার জন্যই তোমাদের রেস্টুরেন্টে আসি। কেবল দুদিন এখানে থেকে, কলকাতা ফেরার কথা ছিলো আমার; কিন্তু কলকাতা আমি ফিরি নি।
ফিরবোও না। কেন ফিরবো? তোমার সাথে নিভৃতে দুটো কথা যদি না বলতে পারি, তো ফিরবো কেন?
তুমি কথা বলবে না? বেশ, বলো না। আমিও যাবো না।
ভাবছো, পরিণত বয়সে এ কি ছেলেমানুষী? ছেলেমানুষীই বটে। কিন্তু এতদিন পরিণত মানুষের মতো আচরণ করে যে সুখ আমি পাই নি, যে উচ্ছ্বাস আমি অনুভব করি নি; সেই সুখ আর উচ্ছ্বাস আমি তোমাকে দেখে পেয়েছি। তোমার জন্য আমি বারবার ছেলেমানুষ হতে পারি।
এখন ভাবছো- তোমাকে সরাসরি না বলে, চিঠি লিখছি কেন? আসলে কি জানো, তোমাকে দেখলে আমার কথা হারিয়ে যায়। হৃদয়ের মধ্যে ভূকম্প শুরু হয়। মনের মধ্যে টাইফুন টর্নেডোর তান্ডব শুরু হয়।
বিগত সাত দিন ধরে চেষ্টা যে করি নি, তা নয়; কিন্তু ব্যর্থ আমি। তা ছাড়া এতো কথা গুছিয়ে বলার মতো সুযোগ কি, ঐ ভিড় রেস্টুরেন্টের মধ্যে পাওয়া যায়? তাই ভাবলাম চিঠিই লিখি।
আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই। দেবে একটু সুযোগ? একটু? দিব্যি দিয়ে বলছি, গুটিকয় কথাই বলবো। তার চেয়ে আর বেশি কিছু চাইবো না। যদি চাও, তোমার কাজের শেষে। অথবা সকালে। অথবা দুপুরে। তোমার খুশি মতো। তুমি দাতা। আমি গ্রহীতা। যা দেবে তাতেই ধন্য হবো।
ইতি
অমল
নাহঃ পদবী দেওয়ার দরকার নেই। পদবীর মধ্যে একপ্রকার লুক্কায়িত অহং থাকে। আমি যদি গ্রহীতা তো অহং আমার থাকবে কেন? গ্রহীতা যদি বা নাও হতাম, তবুও অহং আমার থাকবে কেন? এই তো আজই আমি পাহাড়ের চূড়া থেকে মৃত্যুর সৌরভ শুঁকে এসেছি। তো আমার অহং থাকবে কেন?
চিঠিটা কি ভাবে দেবো? খামে? নাহঃ খামে হলে, হিমেলের সংকোচ হতে পারে। তার চেয়ে বরং কেবল দু ভাঁজ করে মুড়ে দেওয়াই ভালো।
আজই দেবো? এখন সময় কত? রাত প্রায় বারোটা। উঁহু, রেস্টুরেন্ট কবেই বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে? গোটা একটা রাত অপেক্ষা করতে হবে? গোটা একটা রাত? হায় ভগবান! গোটা একটা রাত!
২.
আমি আমার দেহের অন্তর থেকে বেরিয়ে, শূন্যে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি। আমার নীচে পাহাড় পর্বত নদী অরণ্য বাগান। আর উপরে দৃশ্যমান শূন্যস্থান। ঊহঃ কি অনির্বচনীয় এই রূপ!
আমি ক্রমশঃ একটু একটু উপরে উঠছি। পেঁজা তুলোর মতো মেঘের স্তর ভেদ করে আমি গ্রহ সূর্য নক্ষত্রের দিকে এগিয়ে চলেছি। জোট উপরে উঠছি, একটু একটু করে আলো কমছে। কিন্তু সেই মৃদু আলোর মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, আমার মাথার উপর ঊজ্জ্বল জ্যোতিষ্করাজি মিটি মিটি হাসছে। দেখছি, কিছু ধূসর বর্ণের গোলাকার গ্রহ উপগ্রহ। তাদের কারও কারও রঙিন বলয়। আহাঃ কি নয়নাভিরাম এই দৃশ্য। কি স্নিগ্ধ মমতা মাখানো এই স্থান। আমি কোথায়? আমি কি স্বর্গলোকে?
গভীর এক উত্তেজনার মধ্যে চোখ খুলে গেলো আমার। বুঝলাম, স্বপ্ন দেখছিলাম আমি। আহাঃ স্বপ্ন এতো সুন্দর হয়? এই স্বপ্ন আরও দীর্ঘ হলো না কেন?
একটু হতাশ হলাম আমি। আহাঃ আরও যদি কিছুক্ষণ থাকতাম ঐ আলোকরাশির মাঝে! এই প্রকার স্বপ্নই তো এক স্বর্গপ্রাপ্তি। মানুষের এক ঘেঁয়ে অভ্যাসের জীবনে, এই প্রকার স্বপ্নই তো একটু আশা। নইলে কি আছে এই মনুষ্য জীবনে?
ভাবলাম, এতো সুন্দর স্বর্গীয় স্বপ্ন তো দেখি নি আগে। আজ তবে কেন দেখলাম? আমি কি তবে প্রেমে পড়েছি? হয়তো হ্যাঁ। হয়তো না। কিন্তু অপরিচিতা এক মেয়েকে এক ঝলক দেখেই কি প্রেমে পড়া সম্ভব? এখনো কিছুই জানি না তার। কেবল, কয়েকবার মাত্র দেখেছি তাকে।
প্রেমে পড়লে, প্রেম সম্পর্কিত কোন স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু এ স্বপ্ন তো অন্যরকম। এ স্বপ্ন তো গ্রহ নক্ষত্র আলোকরাশি সজ্জিত। এ স্বপ্নে কোন নারী নেই। নারী স্পর্শ নেই। নারী কামনা নেই। এ স্বপ্ন কেবল আলোকে, প্রত্যক্ষ করা। এ স্বপ্ন কেবল সুন্দর এক জগতে উত্তরণ।
তবে কি আমি, কোন তপস্যা স্থলে এসেছি? কিন্তু কি সেই তপস্যা স্থল? আমি কোন মন্দিরে যাই নি। কোন তীর্থে যাই নি। তবে হ্যাঁ, আমি পাহাড়ের চূড়া থেকে টাইগার হিলের উপর দিয়ে অস্তমিত সূর্যকে দেখেছি। দূর থেকে আমি হিমালয়কে দেখেছি। তবে কি হিমালয় এক তপস্যাক্ষেত্র?
হিমের আলয় হিমালয়, ভারতীয়দের পুণ্যভূমি। তার উত্তরদিকে তিব্বতীয় মালভূমি। দক্ষিণদিকে গাঙ্গেয় সমভূমি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন- ভারতীয় টেকটনিক প্লেট, ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেটের নিচে চাপা পড়লে, তৈরী হয়েছে এক উঁচু খাঁজ। আর এই উঁচু খাঁজই হলো আজকের হিমালয়।
এই হিমালয় পর্বতমালায় রয়েছে পঞ্চাশটারও বেশি পর্বত, যাদের উচ্চতা ৭ কিলোমিটারের বেশি। নাহঃ দুর্লভ অভূতপূর্ব অভাবনীয়- মানুষের অভিধানের কোন বিশেষণই এর শ্রেষ্ঠত্বকে ব্যাখ্যা করতে পারবে না। হিমালয় কেবল হিমালয়। একম। অদ্বিতীয়ম।
আজকের পাঁচ দেশ জুড়ে হিমালয় পর্বতমালা বিরাজমান। ভারত চীন ভুটান নেপাল পাকিস্তান। এই হিমালয়ে বাস করে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ। তাদের প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে হিমালয়কে পূজা করে। ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির জিনে, হিমালয় বিদ্যমান। ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ জানুক বা না জানুক- বাস্তব হলো, এই উপমহাদেশের মানুষের রক্তে হিমালয়ের আশীর্বাদ রয়েছে। কেবল আধ্যাত্মিক দিক থেকে নয়, তাদের জৈবিক ক্ষুধা নিবৃত্তির মধ্যে। ভারত যে এখনো মরুভূমি হয়ে উঠে নি, তা এই হিমালয় জনিত বৃষ্টির কারনে।
সমগ্র হিমালয় জুড়ে রয়েছে বনাঞ্চল। উষ্ণমন্ডলীয় চিরসবুজ ও অর্ধ-চিরসবুজ গাছপালা দিয়ে তৈরী এই বনাঞ্চল। এখানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নানা জাতের বৃক্ষ, বাঁশ লতা ও গুল্ম। এই বনাঞ্চল ভারতীয় উপমহাদেশের ফুসফুস।
কিন্তু দুঃখ হলো, জ্ঞান পাপী মানুষ এই বনাঞ্চল যথেচ্ছ ভাবে ধ্বংস করছে। হিমালয়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যকে ধ্বংস করছে। অথচ আমরা জানি- যা কিছু সুন্দর নয়নাভিরাম, তাকে ছুঁতে নেই। তাকে তার উৎস স্থলেই রেখে দিতে হয়। কেবল দূর থেকে তার রূপ রস গন্ধ স্পর্শ অনুভব করতে হয়। তাকে ছুঁলে বা অধিকার করতে চাইলে, তার মৃত্যু ঘটে।
অথচ মানুষ যা কিছু ছুঁয়েছে, তার মৃত্যু ঘটেছে। নদী ছুঁয়েছে তো নদীর সৌন্দর্য্যের মৃত্যু ঘটেছে। অরণ্য ছুঁয়েছে তো অরণ্যের সৌন্দর্য্যের মৃত্যু ঘটেছে। নারী ছুঁয়েছে তো নারীর সৌন্দর্য্যের মৃত্যু ঘটেছে।
প্রকৃতি আর নারী সমার্থক। নারীই প্রকৃতি। প্রকৃতিই নারী। নারীও, ফুল আর প্রকৃতির মতো। তাকে ছুঁতে বা অধিকার করতে নেই। প্রকৃতিকেও নারীর মতো তার উৎস স্থলে রেখে দিতে হয়।
আমি তাই দেবতা পূজা করার জন্যও ফুল তুলার বিরোধী। ফুল যদি তার বৃন্ত থেকে খসে পড়ে, তো সেই ফুলকে তুমি দেবতার পূজার জন্য ব্যবহার করতে পারো। কিন্তু বৃন্ত থেকে তুলে নয়। বৃন্ত থেকে ফুল তুলা, এক প্রকার হত্যা। তুমি হত্যা করে দেবতাকে খুশি করবে?
প্রকৃতি অবলা বলে, আমরা তাদের উপর অত্যাচার করি। আমরা- অবলা নারীর উপর অত্যাচার করি, অবলা গরুর উপর অত্যাচার করি। সবল হয়ে দুর্বলকে অত্যাচার করা আমাদের এক প্রকার জন্মগত ব্যাধি। পরিণাম? আজকের ক্ষয় আর অন্ধকার।
কতক্ষণ ভাবছি আমি? দেখি দেখি। দু ঘন্টা? নাহঃ এবার একটু ঘুমোনো যাক। চিঠিটা তো হিমেলকে দিতে হবে দুপুরে!
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem