অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
দেখি- দর্পণ বাগানের মাটির উপর বসে। মুখে চোখে ওর যন্ত্রণার ছাপ। দিদি আর পিকু কাছে। আমরাও ছুটে গেলাম কাছে।
বেচারা দর্পণ, ব্যাটিং করতে গিয়ে ডান পা মচকে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়েছে। বিদুদা কাছে গিয়ে ডাক্তারি পেশাসুলভ ভঙ্গীতে, দর্পণকে বললো-
"দেখো তো দর্পণ, তুমি উঠে দাঁড়াতে পারো কি না! "
বিদুদা কলকাতার উদীয়মান অর্থোপেডিক সার্জেন। কষ্ট হলেও, ডাক্তারের কথা অন্যথা করা যায় না। দর্পণ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। দিদি পাশ থেকে, ওকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলো। বিদুদা আমার দিকে চেয়ে বললো-
"অমল দেখো তো, ফ্রিজে কোন বরফ পাও কি না। "
আমি বরফ নিতে বাড়ির ভেতর ছুটলাম। বরফ নিয়ে ফিরে দেখি- দিদি আর বিদুদার কাঁধে ভর করে, দর্পণ গুটি গুটি পায়ে বাড়ির বারান্দার দিকে এগিয়ে আসছে। বারান্দাতে স্তুপ করা চেয়ারগুলোর একটা নিয়ে, বারান্দায় পেতে দিলাম আমি। সূর্যের আলো কম হতে শুরু করেছে। তাই বারান্দার আলোগুলোও জ্বেলে দিলাম।
বিদুদা পিকুকে জিজ্ঞেস করলো
পিকু, Ankle Injury-র ট্রিটমেন্ট কি?
পিকু বললো
"RICE বাবা
Rest Ice Compression Elevation"
"তাহলে তোর কি করা দরকার? "
পিকু আর কিছু না বলে, দৌড়ে ঘরের ভেতরে গেলো। তারপর ওকে দেখলাম, হাতে একটা তোয়ালে আর গাড়ির চাবি নিয়ে, ও ওদের গাড়ির কাছে ছুটে গেলো। ফিরে এলো "ক্রেপ ব্যান্ডেজের" প্যাকেট নিয়ে। ও সেই ব্যান্ডেজটা ওর বাবার হাতে ধরিয়ে দিলো।
তারপর ও নিজে, বরফ গুলো আমার কাছ থেকে নিয়ে, সেগুলো তোয়ালে দিয়ে মুড়ে, ঠান্ডা তোয়ালেটা দর্পণের পায়ের উপর চেপে ধরলো। ছোট্ট পিকু, তার বাবার কাছ থেকে "ফাৰ্ষ্ট এইড" সুন্দর করে শিখেছে দেখে, দর্পণ হেসে ফেললো। ও একটু ঝুঁকে, পিকুর গালে আলতো করে একটা চুমু খেলো। বললো-
"my dear Piku, এখুনি কত্ত ডাক্তারি শিখে ফেলেছে! "
ছেলের কাজে খুশি হয়ে, দিদিও পিকুর গালে একটা চুমু খেলো। এমন সময় রান্না ঘরের ভেতর থেকে চোঁয়া এক গন্ধ ভেসে এলো। বিদুদা আঁতকে উঠলো-
যাঃ আমার মাংস পুড়ে গেলো। দিদির উদ্দেশ্যে বললো-
"লাবণ্য, দেখো দেখো। এখুনি দেখো।"
দিদির রান্না ঘরের উদ্দেশ্যে দৌড় লাগালো। বিদুদা আর একবার দর্পণের পা পরীক্ষা করে দর্পণের উদ্দেশ্যে বললো-
মনে হচ্ছে তুমি লাকি। হাড় ভাঙে নি। তবুও একটা xray করে দেখে নেওয়া যাক। আমার দিকে তাকিয়ে বিদুদা বললো-
"নীলুর নার্সিং হোম, এখান থেকে খুব দূরে নয়। তুমি যাবে? না আমি যাবো? "
দর্পণের জন্য সবাই কিছু না করছে। এমনকি পিকুও করেছে। কেবল আমি হাঁ করে দেখে যাচ্ছি। তাই দর্পণের জন্য কিছু একটা করার সুযোগ, হাত ছাড়া করতে চাইলাম না । বিদুদার উদ্দেশ্যে বললাম-
"নাহঃ আমিই যাচ্ছি। তুমি বরং রান্না সামলাও।"
বিদুদা বললো
বেশ, আমি নীলুকে এখুনি একটা ফোন করে দিচ্ছি।
ডাঃ নিলাদ্রী আচার্য্য বিদুদার ক্লাস মেট। বিদুদা ডাঃ আচার্য্যকে ফোন করলো। পিকু ওদের গাড়ির চাবি আমাকে ধরিয়ে দিয়ে বললো-
আমি কি যাবো, মামু?
দর্পণ পিকুর গালে একটা চুমু দিয়ে বললো-
নাহঃ সন্ধ্যে হয়ে গেছে। তুই বরং স্নান করে ফ্রেশ হয়ে নে পিকু।
বিদুদা বাইরে থেকে, দিদির উদ্দেশ্যে বললো-
দর্পণ xray করাতে শহরে যাচ্ছে। তোমার কি কিছু লাগবে লাবণ্য?
দিদি ভেতর থেকে উত্তর করলো,
"মাংসটা বেশ পুড়ে গেছে। আসার সময় একটু চিকেন বা মাটন আনুক।"
বিদুদা আমার উদ্দেশ্যে বললো -
চাবিটা আমাকে দাও, গাড়িটা আমি ড্রাইভওয়েতে এগিয়ে আনি। আর তুমি, দর্পণকে ধরে এগিয়ে এসো।
বিদুদা গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। আমি দর্পণকে বললাম-
এসো।
দর্পণ আমার কাঁধে হাত রেখে উঠে দাঁড়ালো। আমার কাঁধে হাত রেখে, ও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগলো। পায়ে ব্যথা হলেও, ও সেটা প্রকাশ করলো না। পিকুও আমার পিছু পিছু গাড়ি পর্য্যন্ত এলো। বেচারা পিকুর মন একটু খারাপ। ওর প্রিয় দর্পণ মাসি কষ্ট পাচ্ছে।
গাড়ির কাছে পৌঁছে দর্পণকে আমি গাড়িতে উঠতে সাহায্য করলাম। বিদুদা বললো-
Xray-হয়ে গেলে, তুমি xray-র ফটো তুলে আমাকে SMS করো। যদি ভেঙে থাকে তো প্লাস্টার করতে লাগবে। আমি তখন নিজেই নার্সিং হোমে আসবো।
আমি ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলাম। দর্পণ হাত নেড়ে পিকুকে বললো-
তোর জন্য কি আনবো পিকু?
"কিছু না মাসি। তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। আমরা গেমস খেলবো।"
দর্পণ আমার পাশে বসে। মনে করতে চেষ্টা করলাম, দর্পণকে পাশে নিয়ে এর আগে কখনো গাড়ি চালিয়েছি কিনা।
দর্পণ পাশ থেকে বললো -
"বারো বছর পর।"
বারো বছর পর কি?
"লাবণ্যের বিয়ের দিন, তুমি আমায় পাশে বসিয়ে গড়িয়াহাট নিয়ে গিয়েছিলে।"
তাই নাকি? দিদির বিয়ের দিন কেন গড়িয়াহাট গেছিলাম আমরা?
"বিদু-র জন্য কেনা পাঞ্জাবি, লাবণ্যের পছন্দ হয় নি। তো তুমি আর আমি বদলাতে গেছিলাম।"
তাই নাকি? ভুলেই গেছি আমি। আমার স্মৃতি বড় দুর্বল।
নাহঃ তা নয়। আসলে মেয়েদের স্মৃতি আর পুরুষদের স্মৃতি একটু অন্যরকম।
মানে?
"যা কিছু অনুভূতিপূর্ণ, তা মেয়েদের বেশ মনে থাকে। আর পুরুষদের মনে থাকে, এড্রিনালিন যুক্ত রোমাঞ্চ- স্পোর্টস, পলিটিক্স, যুদ্ধ এইসব।"
সেদিন আর কি করেছিলাম আমরা?
দর্পণ আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো। ওর সেই চাহনি বেশ গভীর। এজন কিছু একটা মাপার চেষ্টা করছে। আমি হাসলাম। ও তখন বললো-
"যদি সৌভাগ্য হয়, তো এক পূর্ণিমা রাতে, তোমাকে একটা কমলা বেনারসি শাড়ি দেখাবো আমি। সেটা যদি চিনতে পারো, তো সেদিন বলবো।"
কমলা বেনারসি শাড়ি?
"হ্যাঁ, কমলা বেনারসি শাড়ি।"
পূর্ণিমা রাতে?
"হ্যাঁ, পূর্ণিমা রাতে।"
কেন?
"পূর্ণিমা রাতে স্বপ্ন জাগে।"
স্বপ্ন জাগলে কি হয়?
"স্বপ্নের মধ্যে মানুষ নিজেকে দেখতে পায়।"
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem