অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
দর্পণ আমার দিকে চেয়ে শুয়ে। আমিও ওর দিকে চেয়ে। দর্পণ বললো-
"শোন, আবার তুমি লেখা শুরু করো।"
বলছো?
"হ্যাঁ। তোমার লেখা নিছক লেখা নয়। গভীরতা আছে। যারা পড়বে, তারা ভাবতে বাধ্য হবে।"
লিখতে যে জানতাম, সেটাই তো ভুলে গেছিলাম। তুমি বললে বলে, সকালে উঠে চেষ্টা করলাম।
দর্পণ চকিতে উঠে, কিছু না বলে বিছানার কোণ থেকে খাতাটা নিয়ে, আবার চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো। তারপর লেখাটা বের করে, শুয়ে শুয়ে আবার সেই লেখাটা পড়তে লাগলো। ওর বুকের উপর হাত রেখে, আমি ওর দিকে চেয়ে রইলাম। পড়া শেষে ও বললো-
"অবিশ্বাস্য সুন্দর অমল। ভীষণই গভীর আর হৃদয়স্পর্শী।"
হাসলাম আমি। কিছু বললাম না। আমি জানি, দর্পণ আর দিদি- এরা দুজনেই শিল্প সাহিত্য সংগীত ভালোবাসে। এরা এখনো নিয়ম করে, নাচ গানের চর্চা করে।
সত্যি কথা বলতে কি, দর্পণদের বাড়ি, আমাদের বাড়ি, বিদুদার বাড়ি- আমরা সবাই কম বেশি, সাহিত্য-শিল্প-কলা সম্পর্কে উৎসাহী। আমার মা বাবা, দর্পণের মা বাবা, বিদুদার মা বাবা- এই তিন পরিবার মিলে একত্রে, এখনো এখানে ওখানে নাচ গানের অনুষ্ঠানে ভিড় জমায়।
বাবা একজন ডাক্তার। সেও কিন্তু বলে, একটু হারমোনিয়াম বাজিয়ে, দু কলি গাইতে না পারলে, নিজেকে বাঙালী মনে হয় না। বাড়িতে থাকলে, দুপুরের খাওয়ার পর মায়ের কাজ হলো- বিছানায় বা বারান্দায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে, গাদা গাদা উপন্যাস পড়া। শরৎচন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্র যুগের এমন কোন ভালো উপন্যাস নেই, যা মা পড়ে নি। শুধু বাংলা উপন্যাস নয়। সুযোগ পেলে মা ইংরেজি উপন্যাসও পড়ে।
আমার মা বাবার কাছ থেকেই, দিদি আর আমি শিখেছি- ভালো বই হলো এক রত্নখচিত লুক্কায়িত দ্বীপ। তোমাকে আগে সেখানে পৌঁছতে হবে। তারপর সেখানে মণি কাঞ্চন খুঁজতে হবে। গভীরতাযুক্ত ভালো বই পড়ার অভ্যাস, এক ধরণের অমৃতের পথে যাত্রা।
শুধু জ্ঞান আহরণই নয়। বই এমন এক প্রকার বন্ধু, সে তোমাকে একাকীত্বে সাহচর্য দেবে। দুঃখে আনন্দ দেবে। হতাশায় আশা দেবে। আঁধারে আলো দেবে। বই এমন এক প্রকার ক্ষমাযুক্ত বন্ধু, সে তোমার সাথে কখনো ঝগড়া করবে না। মারামারি করবে না। তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ করবে না।
আমাকে ভাবতে দেখে, দর্পণ জিজ্ঞেস করলো-
"কি ভাবছো? "
দেখো, বাঙালী মানেই, আমরা সবাই কম বেশি একটু লিখতে পারি। তুমি যদি চেষ্টা করো, তুমি হয়তো আরও ভালো লিখতে পারবে।
"না পারবো না। চেষ্টা করেছি আমি।"
মানে?
"আমার লেখা তথ্যপূর্ণ হয়। কিন্তু লেখার মধ্যে আমি ভাব ঢুকাতে পারি না।"
মানে?
"তুমি লিখতে থাকলে, তুমি সত্যিই এক বড় লেখক হতে পারবে। কিন্তু আমি লিখতে থাকলে একজন সাধারণ লেখকই থাকবো।"
কি করে জানলে, তুমি?
"এই দেখো কি লিখেছো তুমি-"
এই বলে দর্পণ লেখাটার একটু অংশ পড়তে শুরু করলো-
হয়তো নেশাগ্রস্ত হয়েই তার কপালে সিঁদুর এঁকেছি আমি। কিন্তু সেদিন মদের ঐ নেশা কেন করেছিলাম আমি? তাকে স্পর্শ করতে চেয়ে, বারবার ব্যর্থ হয়ে, হতাশাগ্রস্ত হয়ে, তবেই না নেশাগ্রস্ত হয়েছিলাম আমি। অর্থাৎ, তার প্রেমে উন্মত্ত ছিলাম আমি। অধৈর্য্য ছিলাম আমি। বোধহীন ছিলাম আমি। সেই নারী তখন, এতোটাই আমার জীবন স্বপ্ন কল্পনা হয়ে উঠেছিলো!
অথচ ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর পরিহাস! সেই নারীকেই কিনা, "দিদি" নামে ডেকে আসছি! সে আমার কাছ আসতে চাইলে, দূরে দূরে সরে গেছি আমি!
কি সাংঘাতিক যন্ত্রণা সেই নারীর! তাই না? তার কপালে সিঁদুর এঁকে দেওয়া পুরুষ, আজ ভুল গেছে তাকে! যে পুরুষ- স্বপ্নে তাকে দেখে, ডজন ডজন প্রেমের কবিতা লিখতো, সেই পুরুষ সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেছে তাকে! যে পুরুষ নির্লজ্জ্যের মতো সবার সামনে একদিন চুম্বন করেছিলো তাকে, সেই পুরুষ ভুলে গেছে তাকে!
লেখার এই খন্ডাংশ টুকু পরে, দর্পণ আমার দিকে চেয়ে বললো-
তুমি চরিত্রের গভীরে ঢুকে গিয়ে তাকে এঁকেছো। চরিত্রের সাথে তুমি এক হয়ে, প্রতিমুহূর্তে তুমি প্রশ্ন করেছো নিজেকে। তুমি এইভাবে খুঁড়তে পারো বলেই, তুমি বড় এক লেখক হতে পারবে। আমি তা পারি না। আমার লেখা সংবাদপত্রের প্রবন্ধ হয়ে যায়, সাহিত্য হয় না।
হাসলাম আমি। বললাম-
কিন্তু লিখবো তার সময় কোথায়?
দর্পণ আমার বুকে, জোরে এক চিমটি কেটে বললো-
"সময় কোথায় মানে? কাজের ফাঁকে ফাঁকে লিখো। অনেক সময়।"
তারপর আমার দিকে চেয়ে বললো
"শোন, একটা কথা বলবো? "
কি?
"বেশ কিছু সময় ধরে আমি আর লাবণ্য ভাবছি- আমরা আমাদের চাকরী ছেড়ে দেবো।"
চাকরী ছেড়ে কি করবে?
"ভাবছি, তোমার বিজনেসের কিছুটা অংশ আমরা কিনে নেবো। তুমি ৪০% রেখে দেবে। কিন্তু লাবণ্য আর আমি, ৩০% করে কিনে নেবো। তারপর আমরা, বাড়িতে বসে একটা ব্রাঞ্চ চালাবো।"
তাতে লাভ কি তোমাদের?
"ধুস, প্রতিদিন কি আর অফিসে যেতে ভালো লাগে? বারো বছর নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর বিয়ে করতে যাচ্ছি। তো অফিসে গিয়ে সময় নষ্ট করবো বলে?
শোন, সম্পর্কের মধ্যে ব্যবসা, এতে একটু আপত্তি আছে আমার।
"কিসের আপত্তি? "
সম্পর্কের মধ্যে ঝামেলা হতে পারে।
"ঝামেলা? ঝামেলা কেন? "
বেশ, তুমি আর দিদি যখন চাইছো, তো ব্যাপরটা আমি বাবার হাতে ছেড়ে দিলাম। বাবা যা বলবে সেটাই ফাইন্যাল।
"কাকুর কথাই ফাইন্যাল তো? আর মত পরিবর্তন করবে না? "
নাহঃ করবো না।
"বেশ কাকুকে এখনই ফোন করছি আমি।"
ভীষণ এক উৎসাহের সাথে, দর্পণ শোয়া অবস্থা থেকে লাফিয়ে উঠে, বিছানার ব্যাক রেস্টে ঠেস দিয়ে বসলো। তারপর গুনগুন করে গাইতে থাকলো
আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব
হারিয়ে যাব আমি তোমার সাথে (২)
সেই অঙ্গীকারের রাখী পরিয়ে দিতে
কিছু সময় রেখো তোমার হাতে।
গান বন্ধ করে, ওর নীচের ঠোঁট দাঁত দিয়ে কামড়ে, ও আমার দিকে চেয়ে হাসলো। ওর এই বসন্ত আকীর্ণ প্রফুল্লতা দেখে, আমিও হাসলাম। দর্পণ তারপর স্পিকার অন করে ফোন করলো। বললো-
লাবণ্য, আমি দর্পণ। শোন, অমলকে ওর বিজনেস কেনার কথাটা বললাম।
দিদি
"হুঁ, তো ভাই কি বললো? "
দর্পণ
"ও বললো- কাকু যেটা বলবে, সেটাই ফাইন্যাল।"
"হুঁ ও বড্ড শয়তান ছেলে। ও এখন কোথায়? "
"এখানে।"
"ঊহঃ তোরা পরস্পর এখন চিটে আছিস। বেশ ভাইকে এখন ফোনটা দে।"
"তুই বল। ও শুনছে।"
"তুই বড় শয়তান অমল। তুই নিজে ডিসিশান নিতে পারিস না? বাবাকে জড়াচ্ছিস কেন? "
আমি বললাম-
নিজেদের মধ্যে ঝামেলা হলে, তখন সামলাবে কে?
কেন? উকিল সামলাবে।
উকিল? বাড়ির ঝামেলায় উকিল?
দর্পণ বললো
হ্যাঁ, উকিল। তুমি যদি আমাদেরকে ঠকাও, তোমাকে উকিল দিয়ে শায়েস্তা করবো আমরা।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem