অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
বাড়ি ভর্তি লোকজন। থেকে থেকে সানাইয়ের সুর। স্যাক্সোফোনের পোঁ পোঁ। ব্যান্ড পার্টির দুম দুম। তুমুল হৈ চৈ। চীৎকার। চেঁচামেচি। ছুটাছুটি। দাপাদাপি। হাসাহাসি। তর্কাতর্কি। ঘটনা। এমনকি ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটে চলেছে আজ।
আহাঃ বিয়ে। দর্পণ চ্যাটার্জী সাথে অমল বোসের বিয়ে। বহু প্রতীক্ষিত বিয়ে।
সত্যি কথা বলতে কি, বারবার খেই হারিয়ে ফেলছি আমি। বাড়িতে যারা আসছে, তারা সবাই আমার আত্মীয় বা বন্ধু। তারা সবাই আমার কাছের। যেহেতু আমার জন্যই তাদের এখানে আসা, তাই তাদের সবাইকে সমুচিত শ্রদ্ধা জানানো, তাদের সঙ্গে দুটো কথা বলা, তাদের আবগেকে শ্রদ্ধা করে, হাসি হাসি মুখে তাদের সঙ্গে একটা দুটো সেল্ফি তুলা- এসবই আমার একনিষ্ঠ কর্তব্য। লিখিত নয়, অলিখিত। অলিখিত হলেও, ভীষণই গুরুত্বপূর্ণ।
আর বিপদটা কিন্তু এখানেই। এতো লোকের আবেগকে, এক সাথে সন্মান জানানো কিন্তু বেশ কঠিন। কেন কঠিন? যে কেউ ভাবতে পারে, তাকে আমি যথাযোগ্য নজর দিই নি। তবুও, সারাদিন ধরে এই অসাধ্যকে সাধন করার জন্য লড়ে গেলাম আমি। ফল? এখন সবে সন্ধ্যে। আর এখনই আমি রীতিমত পর্যুদস্ত।
অথচ আজ আমার বিয়ে বলে কথা। তাই না? গোদের উপর বিষফোঁড়া, রাত্রি দুটোর সময় বিয়ের লগ্ন। হ্যাঁ, রাত্রি দুটো। লগ্ন না মানলে বিয়ে শুভ হয় না। নিশ্চিৎ, বিয়ে শেষ হতে হতে প্রায় সকাল হয়ে যাবে। অথচ এই ক্লান্তি নিয়ে, আমাকে চোখ মেলে জেগে থাকতে হবে। ঈশ্বরকে যথাযোগ্য শ্রদ্ধা জানিয়ে মন্ত্র পাঠ করতে হবে। শপথ নিয়ে বলতে হবে, যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম।
কথাটা হলো- বিয়ে আমরা সবাই করি, কিন্তু এই বিয়ে ব্যাপারটা কি? আমরা তা ক জন ভালো করে বুঝি? আমরা বিয়ে করি কেন? বিয়ে না করলে মহাভারত কতটা অশুদ্ধ হতো? বিয়ে না করেও কি, পুরুষ আর নারী একসাথে থাকতে পারে?
মজার কথা হলো, সমাজবদ্ধ জীবনে, অনেক কিছু বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নেই। বিজ্ঞানের পথে যদি তার উত্তর খুঁজতে চাও, তুমি একাকী হয়ে যাবে। এমনকি তোমার আত্মীয় বন্ধুও তোমাকে পরিত্যাগ করবে। সমাজ চাই, তুমি সে সবের উত্তর উইপোকা খাওয়া শাস্ত্রের মধ্যে খুঁজো। উইপোকা খাওয়া হলেও শাস্ত্র পবিত্র!
তো শাস্ত্র মতে বিয়ে কি? "বিবাহ" শব্দটি (বি) পূর্বক (বহ্)ধাতু, ও (ঘঞ্)প্রত্যয়যোগে তৈরী। (বহ্)ধাতুর অর্থ বহন করা এবং (বি) " উপসর্গের অর্থ বিশেষরুপে। অতএব বিবাহ শব্দের অর্থ হলো- বিষেশ রুপে বহন করা। অর্থাৎ বিবাহের মাধ্যমে একজন পুরুষকে, তার স্ত্রীর ভরণ-পোষণ এবং মানসম্ভ্রম রক্ষার সার্ব্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। বেদে বলা হয়েছে-
উদীর্স্বাতো বিশ্বাবাসো নমসেলামহে ত্বা।
অন্যামিচ্ছ প্রফর্ব্যং সং জায়াং পত্যা সৃজ।।
অর্থাৎ তুমি যাও, অবিবাহিতা নারীকে তোমার অর্ধাঙ্গিণী কর। এবং তাকে সমান অধিকার প্রদান কর। কি সাংঘাতিক গুরুতর ব্যাপার! তাই না?
হিন্দু শাস্ত্র মনুসংহিতায়, আট রকম বিয়ের উল্লেখ আছে। সেগুলো হলো-
(১)ব্রাহ্ম
(২)আর্য
(৩)প্রাজাপত্য
(৪)আসুর
(৫)গান্ধর্ব
(৬)রাক্ষস
(৭)দৈব
(৮)পৈশাচ
আমাদের দেশে ব্রাহ্ম বিবাহই স্বীকৃত এবং পালনীয়। ব্রাহ্ম বিবাহ হলো - কন্যার পিতা, তার কন্যাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে, অলংকার দিয়ে সাজিয়ে, কোন বিদ্বান ও সদাচারী পুরুষের হাতে তুলে দেবেন। লক্ষণীয়, শাস্ত্র মতে সেই পুরুষকে বিদ্বান ও সদাচারী হতে হবে! অর্থাৎ তুমি যদি শাস্ত্রের কথা মানো, তাহলে- চোর ডাকাত খুনী বা মূর্খদের গলায় কোন নারী বরমাল্য পরাবে না।
ওহে মুখপোড়া শাস্ত্র, চোর ডাকাত মূর্খ বলে কি মানুষ নয়, তারা? তাদেরও কি ছাদনা তলায় টোপর পরে, "যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম" মন্ত্র উচ্চারণ করতে সাধ জাগে না? দুঃখের বিষয় হলো, মুখপোড়া শাস্ত্র এ এব্যাপারে নীরব।
অতীত ভারতে, গান্ধর্ব বিবাহ চালু ছিলো। গান্ধর্ব্য বিয়েতে, নারী আর পুরুষ শপথ করে, পরস্পরের মধ্যে গলার মালা বিনিময় করতো। মহারাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলা, গান্ধর্ব্য মতে বিয়ে করেছিলেন।
আমি অমল বোস মনে করি, আধুনিক ভারতেও, গান্ধর্ব্য বিয়ে চালু হোক। তাহলে অন্তত রাত জেগে, অর্দ্ধাহারে, কোন পুরুষ বা নারীকে মন্ত্রপাঠ করতে হবে না। পেটের মধ্যে আগুন জ্বললে, ঈশ্বর স্তুতি গাওয়া যায়? ঘুমে, চোখ ঢুলু ঢুলু করলে ঈশ্বর স্তুতিতে ভক্তি আসে?
হিন্দু বিয়েতে শাস্ত্রীয় আচার কি? শুভলগ্নে, নারায়ণ অগ্নি শিব দূর্গা গুরু ইত্যাদি দেবতাকে আহ্বান করতে হবে। পুরোহিত এবং আত্মীয় স্বজনদেরকে সাক্ষী রাখতে হবে। "মঙ্গল" মন্ত্র উচ্চারণ হেতু, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে তোমাকে বিয়ে করতে হবে। তারপর বিয়ে শেষ হতে হবে, যজ্ঞ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
অগ্নি দেবতার কাছে শপথ না করলে, হিন্দু মতে কিছুই হয় না। কি শপথ করতে হয়?
"যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম ।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব ।।
তোমার এই হৃদয় আমার হোক। আমার এই হৃদয় তোমার হোক।
আমি অমল বোস, বিজ্ঞানের ছাত্র। কোন কিছু না ভালো করে না জেনে, তা গ্রহণ করা আমার স্বভাব নয়। গতরাতে, রাতজেগে, আমি তাই, হিন্দু বিয়ে নিয়ে রীতিমত গবেষণা করেছি। শুধু, গবেষণা করলেই হবে? আমি যে বিয়ে সম্পর্কে কতটা সিরিয়াস, তা আমার হবু বৌকে জানাবো না? নইলে, আমার হবু বৌ, আমাকে ভরসা করবে কেন?
অতএব আমার গবেষণার উপরোক্ত ফল আমি, দর্পণকে whatsaap মারফত এ লিখে পাঠিয়েছি। আর দর্পণ কি উত্তর করেছে?
তুমি এখনো জেগে? তুমি না বড় পাগল।
পৃথিবীতে এমন কোন বাঙালী পুরুষকে আমি জানি না, যে তার অর্দ্ধাঙ্গিনীর আদুরে গলায় "পাগল" ডাক শুনতে চায় না! অর্থাৎ, আমার রাত জাগা আর গবেষণা দুইই সার্থক। আমি ধন্য। দর্পণ আমাকে পাগল বলেছে। ভাবা যায়!
ওহে দর্পণ, জেগে আছো তুমি? আর একবার পাগল বলে ডাকবে আমায়?
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem