কার্গিল যুদ্ধ অবলম্বনে অরুণ মাজীর উপন্যাস চড়াই উৎরাই ২৯
--------------
জানো তৃষ্ণা?
কয়েকদিন আগেও, এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিলাম আমি। মনে হয়েছিলো, এখান থেকে যেতে পারলে বেঁচে যাই আমি। অথচ এখন যাওয়ার সময় বেশ কষ্ট হচ্ছে। অনুতাপ হচ্ছে।
বিগত চার বছর ধরে, এদের সুখে ছিলাম আমি। দুঃখে ছিলাম আমি। এদের সঙ্গে ভলোবাসার এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আমার। আত্মার এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আমার।
এ এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিটা মুহূর্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু বারবার এরা রক্ষা করেছে আমাকে। প্রাণ বাঁচিয়েছে আমার। তুমিই বলো, এই ভালোবাসা আর কোথায় পাবো আমি? তাই মনে হয়, এদের সাথে আরও কিছুদিন থেকে যাই আমি।
কিন্তু না। তা আর হয় না। আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে পোস্টিং এসে গেছে । আমার রিপ্লেসমেন্ট ডাক্তারও, কাল এসে যাবে এখানে। তাই যেতেই হবে আমাকে।
তুমি তো জানো, আমাদের বিয়ের আট দিন পর, এখানে চলে আসতে হয়েছিলো আমাকে। কোন উপায় ছিলো না, ছুটি শেষ হয়ে গেলো। CO সেজন্য বেশ দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সেজন্য উনি তোমাকে একটা গিফ্ট দিয়েছেন। কি গিফ্ট বলো তো?
জানি, তুমি তা অনুমান করতে পারবে না। জানো? আমিও তা অনুমান করতে পারি নি। উনি আমাকে তিন সপ্তাহ ছুটি দিয়েছেন। এক্সট্রা ছুটি। স্পেশ্যাল ছুটি। আর সেজন্যই, আগামী কালই এখান থেকে চলে যাচ্ছি আমি।
তাহলে আমার ছুটিটা, কত দীর্ঘ হলো বলো তো? সাত সপ্তাহ। পুরো সাত সপ্তাহ।
জানো? তুমিও চলে এসো এখন। তুমি এলে, ছুটিটা দারুন ভাবে কাজে লাগাতে পারবো আমরা। হয়তো কোথাও একটা ঘুরতে যেতে পারবো আমরা।
অবশ্য, এত তাড়াতাড়ি তুমি টিকিট করবে কি করে? তবুও দেখো, যদি কিছু একটা করতে পারো। কলকাতা পৌঁছবো, অথচ তুমি থাকবে না; ভাবলেই কষ্ট হয় আমার।
মা এখনো জানে না, কালই রওনা দিচ্ছি আমি। মাকে আগে লিখেছিলাম, এক মাস পর যাচ্ছি আমি। তো মা খুব চমকে উঠবে! পজিটিভ সারপ্রাইজ সবার ভালো লাগে। তাই না? কাকীমাকেও এখনো জানায় নি। ভাবছি, আগামী কাল জম্মুতে পৌঁছে, কাকীমাকে ফোন করবো একটা।
যাওয়ার সময়, এ জায়গাটাকে প্রণাম করে যাবো। যুদ্ধক্ষেত্র তো কি? তবুও এই জায়গা আশ্রয় দিয়েছে আমাকে। খাবার দিয়েছে আমাকে। জীবনের চার বছর ধারণ করেছে আমাকে। তো প্রণাম করবো না? জানি না, ভবিষ্যতে আর কখনো এখানে আসা হবে কিনা!
সময় বয়ে যায়। সেই সঙ্গে বয়ে যায় মানুষের জীবন। কখনো হয়তো এই জায়গার স্মৃতি জেগে উঠবে। জেগে উঠবে কিছু সুখের কথা। কিছু দুঃখের কথা। কিছু দুঃস্বপ্নের কথা। আসলে সব স্মৃতিই তাই। কিছু সুখ। কিছু দুঃখ। কিছু দুঃস্বপ্ন।
হয়তো আর বেশিদিন এ চাকরি করবো না আমি। কিন্তু এই যে শিক্ষা, এই যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম আমি; তা কখনো ভুলবো না।
জানো? আমার এক সিনিয়র অফিসার বলছিলেন- যে বহু অফিসার আর্মিতে ত্রিশ বা চল্লিশ বছর চাকরি করেছেন। কিন্তু তারা এখনো কোন যুদ্ধ দেখেন নি। আর্মিতে চাকরি করলেন, অথচ তারা দেশের হয়ে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন না। বড় অনুতাপ তাদের। তাই না?
আমার সামান্য ক্ষমতায়, দেশের জন্য একটু তো করলাম আমি। যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন এ জন্য গর্ব বোধ করবো আমি। গর্ববোধ করবে আমার মা। গর্ববোধ করবে আমার উত্তরপুরুষ।
জানো? তুমি বরং চলেই এসো। অনেক কথা জমে আছে তোমার জন্য। আসলে কি জানো? দূরে থাকলে, ভালোবাসা আরও গাঢ় হয়ে উঠে। গভীর হয়ে উঠে। শূন্যতা মানুষকে চৈতন্যে ফিরিয়ে আনে।
কাছাকাছি আছি যখন
দূরে চলে যাই গো।
দূরে দূরে থাকি যখন
অন্তর জুড়ে থাকো গো।
আমরা বড় অদ্ভুত! তাই না? যখন আমাদের স্বাস্থ্য থাকে, তখন আমরা স্বাস্থ্য নষ্ট করি। আর যখন স্বাস্থ্য হারিয়ে যায়, তখন আমরা ধন সম্পদ খরচ করে স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করি। তুমি যখন কাছে ছিলে, হয়তো পড়াশুনা ইত্যাদি নিয়ে বেশি মেতে থেকেছি আমি। কিন্তু আজ তুমি দূরে, তো তুমিহীনতার দুঃখ বড় বেশি কষ্ট দিচ্ছে আমাকে। আমরা কি চাই, তাই আমরা জানি না। অথচ সেই চাওয়াকে পাওয়ার জন্য, পাগল হয়ে উঠি আমরা। সেই চাওয়াকে না পেলে, দুঃখে ক্ষোভে ফেটে পড়ি আমরা।
এত কথা লিখছি তোমাকে, কারণ লেখা বড় সহজ কাজ। কিন্তু নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করা বড় কঠিন। লোভ আমাদের চৈতন্যকে অবশ করে দেয়। অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ইচ্ছে, আমাদেরকে অন্ধ করে দেয়।
যাক গে, বেশ রাত হয়েছে এখন। কাল সারাদিন ধরে গাড়িতে থাকবো। তারপর আরও দুদিন ট্রেনে থাকবো। অন্তত তিনদিন লাগবে, এখান থেকে কলকাতা পৌঁছতে।
ভালো থেকো তুমি। কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতা চলে এসো। কলকাতা পৌঁছে, ফোন করবো তোমাকে।
ইতি
তোমার অমল।
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem