প্রথম ক্লাসে প্রথম পরিচয়,
মুখচোরা বসে লাস্ট বেঞ্চিতে,
টিফিন হয়েছে সবে,
একটা অপরিচিত কণ্ঠে
চমকে উঠলো মুখচোরা,
'কি নাম তোমার, আমি রজনী, '
'কৃষ্ণ, কৃষ্ণচন্দ্র দাস।'
লাজুক মুখচোরা আর কিছু বলেনি,
ভারী অদ্ভুত ছেলে তো-
বলবে বোধহয় রজনীর দল।
মেসে বসে ম্যাকবেথ পড়তে শুরু করবে,
একটা টিয়া আসে এই সময়,
আজ আসেনি ছোলা খেতে।
একটু ভেবে চোখ বোজে কৃষ্ণ,
বেশ অদ্ভুত তো, তাকে কেন জিজ্ঞাসা করলো।
'আজ জিজ্ঞাসা করব।'
আজ ও টিফিন হয়েছে,
রজনী আজ আর এদিকে আসেনি,
ওদিকে মেয়ের দলে বসে আড্ডা দিচ্ছে,
যাবে কি যাবে না তাই ভাবছে।
না, মুখচোরা আজ ব্যর্থ।
ছুটি হয়েছে, প্রকান্ড ডালিমে টিয়ার মেলা,
রজনী দেখছে আর ছবি তুলছে,
'রজনী কেমন আছো, বই সব কিনলে? '
'ও কৃষ্ণ, তুমি অত চুপচাপ কেন?
কাল তো আমার সাথে কথা বললে না।
কোনো অসুবিধা বুজি...'
'না তা না, অপরিচিত তুমি...'
'বেশ তো পরিচয় করে নাও,
আমি রজনী রায়, তালচেড়ে বাস,
বুজলে, তোমার টা আবার শুনি,
যাবে ওই পার্কে...'
'না মানে এখন, পড়ানো আছে,
বেশ কাল রোববার যাবো, '
'বিকালে এস কিন্তু ডালিমতলায়।'
সেদিন রাত্রে রজনী বিনিদ্র উভয়ের,
কি জানি কি হয়েছে,
যা ফোন নম্বর তা নেওয়া হয়নি,
ভুলে গেছে ওরা।
সন্ধ্যা নামছে, ডালিম নীড়ে পাখি জমছে,
বাদামওয়ালা বাদাম চায় হাক পারছে,
একা দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ সকালে তার কথা ভাবছে,
আজ বাড়ি গেলে বেশ হতো,
বোনটা বড় একা,
একটু পড়াতে তো পারতো,
মাধ্যমিক দেবে এবার...
'ও কৃষ্ণ কখন এলে,
একটু দেরি হয়ে গেল,
আজ বাড়ি গেলাম না তোমার জন্য,
কথা দিয়াছি যে, আসবো,
তুমি গেলে না, কথা দিয়াছ বলে বুজি।'
কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতায় শুধু পাতার পতন,
ডালিম নীড়ে পাখিরা সব শান্ত আজ,
সন্ধ্যা নামছে ডালিম তলে,
মুখচোরার শীতল হাতে হটাৎ উষ্ণতা,
'আমার তোমায় ভালো লাগে,
কাটাবে আমার সাথে সারাজীবন, '
নিস্তব্ধতায় মুড়ছে আকাশ।
'এই ক দিনে আমায় না চিনে
এত বড় কথা বলে দিলে,
সবটা জানলে বলতে না নিশ্চয়,
আমি আনাড়ি, আনকোরা,
আমি বাউন্ডুলে মাত্র।'
'আমি সব জেনেই বলেছি,
নৃপেন বলেছে আমায়,
তোমায় ভালো লাগে,
তাই বলেছি, তুমি আলাদা,
আমায় ভালো না লাগলে বলে দাও,
আমি রাগ করবো না।'
আধ ঘন্টা নিশ্চুপ সর্বত্র,
পাতার মরমর আর বাদামওয়ালার ডাক
শোনা যায় মাত্র,
স্থির ডালিম তলে কৃষ্ণ এখন উত্তপ্ত,
হাত ছেড়ে রজনী এগিয়ে চললো,
একটা ডাক কি আসবে না...
'এই যে শোনো, তোমার ফোন নম্বর কত? '
'চল আজ ওই নার্সারি তে যাই,
কত ফুল আর ফুলের গাছ,
আজ একটা কিনবো, বুজলি।'
'বেশ তো চল।'
শেষ করা ভুট্টার প্যাকেট টা
ছুড়ে ফেলে হাত ধরলো।
স্নিগ্ধ বিকালে দক্ষিণে বাতাস বইছে,
দুপুরে ক্লাসের ভাপসানো গরম উধাও,
আগামী সপ্তাহে পরীক্ষা,
বেশ নাম করেছে দুজনে,
পরীক্ষার আগে আজ শেষ দেখা,
'আচ্ছা দিনটাকে স্মরণীয় করা যায় না,
দাঁড়া আসছি, ' বলেই দৌড়।
'একা বসে বোরিং লাগে,
ওই তো আসছে বোধহয়,
হাতে কি? '
'তুই সেদিন গোলাপ দিলি,
এটা তোর জন্য, একবারে গোটা,
যত্ন করে লাগাস টব কিনে একটা,
আর ফুল হলে দিবি রোজ আমায়।'
একটা গোলাপ গাছ কিনেছে সে,
নিচের পাতা গুলো ঝরে গেছে।
'আর শোন কাল বাড়ি যাচ্ছি,
একদম ফোন করবি না
পরীক্ষার আগে, বুঝলি,
তুই কবে যাবি রে? '
'কাল যাব, তবে ফিরে আসবো,
এখনেই থাকলে পড়া বেশ জমে।'
না ফোন করেনি কৃষ্ণ,
পরীক্ষার হলে আবার দেখা,
দুজনের চোখ গুলো ঢুকে গেছে,
রাত জেগে বোধহয়।
'বেস্ট অফ লাক,
ভালো করে পরীক্ষা দিস,
আর শেষ দিন মনে আছে তো? '
শেষ পরীক্ষা দিয়ে দুজনে ডালিমতলায়,
'বড় একখানা পাহাড় নামলো মাথা থেকে,
কতদিন কথা, দেখা নেই,
বাবা তোকে আমাদের বাড়ি যেতে বলেছেন,
আমি রবিবার যাবো, বোনকেও নিয়ে যাবি।'
'আমি তোদের বাড়ি? '
'আরে ভয় লাগছে না কি?
অত ভয় নেই, আমি তোর কথা বলেছি,
তোকে দেখতে চাইছেন।'
রেল স্টেশন হতে পাঁচ কিমি,
রিকশায় বসে তিনজন তালচেড়ের পথে,
শান্ত, নির্জন একটা গ্রাম,
পাশে বইছে একটা নদী, অরু,
বিশাল বাঁশবন আর আমবাগানে ভর্তি,
একটু দূরেই তাদের বাড়ি,
একতলা পুরোনো দুটি ঘর মাত্র,
বাপ আর বিধবা পিসি, এই দুয়ের বাস।
কৃষ্ণর ব্যবহারে সন্তুষ্ট রজনীর পিতা,
অসহায় সে, মেয়ের ভালোলাগা তার ভালোলাগা,
সব উল্টো লাগলো কৃষ্ণর,
সারা পথ ধরে হিন্দি সিনেমার ভিলেন বাপ
কথা ভেবে সে ছিল অস্থির,
এ যে সব উল্টো,
অনভিজ্ঞ কৃষ্ণর নতুন জগৎ আর একটু মিললো,
চাকরি জোটানোর অদম্য জেদ চেপে বসলো।
ওই মানিক রতন হলেই
রজনী কৃষ্ণর সারা জীবন একসঙ্গে চলা পাকা।
বিকালে ফিরবে সে,
দুপুরটা বেশ জমেছিল,
আড়ষ্ট কাটিয়া কৃষ্ণের বোন
এখন রজনীর বেস্ট ফ্রেন্ড
বয়স পার্থক্য ভুলে,
বেরোনোর মুখে একা কৃষ্ণর
হাত দুটো ধরে পিসিমার কথা,
'পাগলি মেয়ে একটা,
মা মরা মেয়েটাকে সুখে রেখো।'
তপ্ত বাতাস একটু হালকা,
সন্ধ্যায় মেসে এসে দেখলে
সেই গোলাপে নতুন পাতা এসেছে,
জল নেই বলে কুঁকড়ে গেছে পাতাটা,
এক ঘটি জল দিয়ে শান্ত কৃষ্ণ।
পুব আকাশে চাঁদ উঠেছে পূর্ণিমার,
ক্লান্ত বোন ঘুমাচ্ছে,
না আজ তার ঘুম আসেনি,
রেলিং ধরে দূর আকশে চেয়ে
কি যেন খোঁজে যেন,
ওই তারাগুলো পিছনে
অনন্তে মন ছুটে চলে যেন,
এই অনন্তে সে এক মূল্যহীন বিন্দু,
তবুও সে কারো কাছে দামি হয়তো।
হটাৎ তিনটে ঘন্টা পড়লো,
না এবার শুতে হবে।
রেজাল্ট বের হয়েছে,
কৃষ্ণ ফার্স্ট, রজনী সেকেন্ড,
অসাধারণ, এক বাক্যে সবাই বলে,
কৃষ্ণ খুশি হতো রজনী ফার্স্ট হলে,
'কিরে আমার উপর বেজায় রাগ হচ্ছে না রে?
দেখ তোকে হারিয়ে দিলাম, '
'হুম, খুব রাগ হয়েছে আমার বুঝলি,
আমি একটা প্রশ্ন লিখিনি জানিস।'
একা অপরাজিত কৃষ্ণ,
সে তো তার প্রাণের দোসর,
একটা আত্মিক মিল যেন তাদের টানে,
কে ও, এক বছরে এত বোঝাপড়া,
অনন্ত আকাশে একটাই প্রশ্ন ছোড়ে,
উত্তর পায় ডালিম তলের পাতার মর্মরতায়
আর গোলাপ কুড়িতে।
আজ পকেটে সেই চারা গাছটার
প্রথম গোলাপটা তাকে দেবে,
গোলাপের কাঁটাও আজ ফুটেছে হাতে,
সে হোক, কত স্মৃতির এ গোলাপ,
কবি হলে যে কত কবিতা লিখতো,
সাত পাঁচ ভেবে মরছে,
এদিকে রজনী আসে না,
আবার ফোন করি,
রিং হতে চললো, ধরে না কেউ,
তবে কি টাটকা গোলাপ বাসি হবে,
রিং বাজছে, রিং বাজছে,
হটাৎ অপরিচিত নারী কণ্ঠ,
হোকচকিয়া শুনলো,
'খুব জ্বর তার,
আজ আসবে না।'
সাতদিন পর সেই ডালিম তলে,
রজনী একটু রুগ্ন এখনো, বাড়ি যাইনি,
'সেদিন এলে খুব খুশি হতাম রে,
কিন্তু দেখ কোথা থেকে জ্বর এসে হাজির,
গোলাপটা একেবারে শুকিয়ে গেছে রে! '
'তোর চাকরিটার কি হলো? '
'মনে হয় হয়ে যাবে।'
'চাকরি পেলে আমাকে ছেড়ে পালাবি বল? '
'এক থাপ্পড় খাবি বলে দিলাম, '
'এই শোনরে, শোন বলছি, '
গটগট করে উঠে পালালো রজনী রেগে।
কি ভাগ্য ওদের! দুজনেই চাকরি একসঙ্গে,
কৃষ্ণর গ্রুপ সি চাকরি পাক্কা,
ওদিকে রজনী ভাবি শিক্ষিকা,
আনন্দে রজনীর বাবা মেসে হাজির,
'একদম রাজযোটক!
ফাইনাল পরীক্ষা ভালো করে দাও,
তারপর তোমাদের চার হাত এক করে আমি ক্ষান্ত! '
আর পনেরো দিন পর পরীক্ষা,
দুই অনাথের জীবনে এসেছে আনন্দ জোয়ার,
ফোন বন্ধ, শেষ পরীক্ষার ব্যস্ততা তুঙ্গে।
পরীক্ষার হলে বাইরে সেই চেনা
বেস্ট অফ লাক, শেষ পরীক্ষার পর ডালিম গাছ।
বাধা ধরা রুটিন।
পরীক্ষা শেষ,
ডালিম তলে মরমর ধ্বনিতে আজ শুধু আনন্দ,
'আগামী মাসে বাইশ তারিখ দিন ঠিক হয়েছে,
পরীক্ষার আগেই আমি জানতাম,
বলিনি যদি সেকেন্ড হয়ে যাস,
তুই ফার্স্ট হবি আমি বলে দিলাম
আমায় হারিয়ে।
আর শোন আমাদের বাড়িতেই অনুষ্টান হবে,
বুজলেন মশাই।
কেনাকাটা যা আছে এই সাতদিনে শেষ করবো।'
সব কেনাকাটা রেডি,
ছোট অনুষ্টানের ছোট আয়োজন,
প্রায় একমাস দেখা হয়নি ওদের,
আর তো সাতদিন পর বিয়ে,
একবার ফোন করবো তাকে,
দেখি যদি আসে ডালিমতলে।
'দারুন দেখাচ্ছে রে তোকে,
কালো টিপ পড়েছিস কেন,
লাল পড়তে হয়, একদম ক্লিওপেট্রা!
শোন আমি সেই বিখ্যাত লাইন মুখস্ত করেছি,
'দ্য বার্জ শী স্যাট ইন...' '।
'পাগল না কি তুই!
চল ওদিকে ঘুরে আসি।'
হটাৎ বোমার শব্দ,
গুলি চলছে রে,
'পালাও, পালাও, পালাও...'
হাত ধরে লুকোনোর চেষ্টা,
লুটিয়ে পড়লো রজনী,
ফেটে যাওয়া চোখে দেখল,
কলো টিপে একটা গর্ত,
বুলেট খোদাই করেছে কালো টিপটাকে,
সব চুপ, একবার কাঁপলো রজনীর হাতটা,
বাকহীন, শ্বাসহীন, শ্বশানপুরী যেন।
সব থেমে গেছে,
রাস্তায় বাসগুলো আজও চলছে,
ডালিম গাছটাও আজ একই স্থির,
বাইশের অনুষ্টানই কেবল বন্ধ,
কৃষ্ণকে পাঠানো হয়েছে হসপিটালে
মনের রোগ সারাতে,
গোলাপ গাছটা বোধহয় শুকিয়ে কাঠ,
সত্যি কৃষ্ণ ফাস্ট হয়েছে রজনী হারিয়ে,
রেজাল্ট কিন্তু এখনো বেরোয়নি!
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem