মাথার উপর আকাশ। অদূরে বিস্তৃত কলকাতা। চোখে স্বপ্নের ছায়া।
আমাদের বাড়ির ছাদে দাঁড়ালে কলকাতার অনেকটা দেখা যায়। আকাশের অনেকটা দেখা যায়। নিজের অনেকটা দেখা যায়। এই ছাদ আমার আশ্রম। এই ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে, নিজের সাথে অনেক কথা বলি আমি। আমার মতো যুবতী মেয়েদের, এই বয়সে যেসব নিয়ে সচরাচর ভাবার কথা নয়, আমি সেসব ভাবি। আমি ভাবি- আকাশের বুক এতো শূন্য, তবুও আকাশ এতো মায়াবী কেন? এতো আকর্ষণীয় কেন?
শূন্যতারও কি সৌন্দর্য্য আছে? আকাশ শূন্য বলেই, আকাশের বুক চিরে আমাদের দৃষ্টি চলে যায়, দূরের কোন নক্ষত্রের দিকে। আকাশ যদি পূর্ণ হতো, তো এই নক্ষত্রগুলোকে আমরা দেখতে পেতাম না? শূন্যতারও কি অতি আবশ্যক এক অবদান আছে।
মানুষের জীবনেও কি শূন্যতা অতি আবশ্যক? শূন্যতা আছে বলেই কি, মানুষ তার জীবনে অনেক অনিবর্চনীয় সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারে? শূন্যতা কি জীবন আর মহাবিশ্ব দেখার আয়না?
হয়তো তাই। কৌতূহল হলো অন্যেরাও কি তাই ভাবে? ডান দিকে অমল মুখার্জীর দিকে চেয়ে দেখলাম- উনিও আমার মতো আকাশে মগ্ন। ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম-
আচ্ছা অমলবাবু, আপনি পূর্ণতা ভালোবাসেন? অথবা শূন্যতা?
উনি আমার কথার উত্তর না দিয়ে, আমার দিকে চেয়ে মৃদু হাসতে শুরু করলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম-
হাসির কি আছে? প্রশ্নটা কি ছেলেমানুষী হয়ে গেলো?
"জানো প্রীতি, আমি ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেছি।"
মানে?
"মানে হলো- আমার প্রলম্বিত যৌবন বেলায় অবশেষে ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেছি আমি। "
বুঝলাম না। হেঁয়ালি না করে, একটুখুলে বলুন।
'প্রীতি, মানুষের সঙ্গে অন্য জীবদের তফাৎ এই যে- মানুষ উন্নত চিন্তা করতে পারে। আর অন্যান্য জীবরা ততটা চিন্তা করতে পারে না। মানুষ হিসেবে মানুষকে তখনই সুন্দর লাগে, যখন সেই মানুষ উন্নত চিন্তা করতে পারে। চিন্তা করার ক্ষমতা মানুষের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুণ। তুমি সুন্দর চিন্তা করতে পারো।"
এই একটা কথাতেই আপনি বুঝে গেলেন? অথবা আমি যুবতী মেয়ে বলে, সস্তা তারিফ করছেন?
"প্রীতি, আমিও চিন্তা করতে ভালোবাসি। তুমি আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে শূন্যতার সৌন্দর্য্যের কথা ভাবছো। আমিও এই ভাবনাটা প্রায়ই ভাবি। তাই তোমার প্রশ্নটা বেশ সহজেই বুঝতে পারলাম।"
আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এখনও পেলাম না।
"You are no one to demand my answer Ms. Acharya."
আমার কথা আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন? মেয়েদের মতো ঝগড়ুটে নাকি আপনি?
নাহঃ প্রীতি। তোমার সাথে ঝগড়া করার মতো এতো আহাম্মক আমি নই। যে ফুলের রূপে মোহিত তুমি, সেই ফুলের সাথে ঝগড়া যদি করবে; তো তার রূপ দেখে জীবন ধন্য করবে কখন? আমি জাস্ট মজা করলাম।
আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু এখনও পেলাম না।
শূন্যতা আর পূর্ণতা একে অপরের পরিপূরক। শূন্যতা নাহলে তুমি পূর্ণতা অনুভব করতে পারবে না। পূর্ণতা না হলে তুমি শূন্যতা অনুভব করতে পারবে না। কাজেই শূন্যতা আর পূর্ণতা সমান সুন্দর।
অমল মুখার্জী কথা বললে, ওনার ভেতর থেকে কেমন যেন এক আলো বের হয়। এই পুরুষটার কেবল, বুক আর বাহুর পেশীই শক্ত নয়, অনুভৱ আর বুদ্ধির পেশীও সমান শক্ত। মনে মনে ভাবলাম, আমিও কি তাহলে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে গেছি? দুষ্টুমি মাথায় এলো আমার। জিজ্ঞেস করলাম-
চিঠিটা এমন করে লিখলেন কেন?
"কেমন করে? "
একজন অল্প পরিচিত মেয়েকে সেন্সুয়াল এক চিঠি লিখতে বাধলো না আপনার?
"I am in love with you. Without passionate words, how could I express what I feel aboutyou? I wrote what I felt aboutyou."
আপনার লজ্জা হয় না?
"লজ্জা কিসের? তোমাকে যেদিন থেকে দেখেছি, সেদিন থেকে কেবল তোমাকেই ভাবছি আমি।"
কেন? আমেরিকাতে আর কাউকে পছন্দ হলো না?
"পছন্দ হলে সুযোগ ঘটে নি। সুযোগ ঘটলে পছন্দ হয় নি। পুরুষ হয়ে নারী সাহচর্যের জন্য যে ছোঁক ছোঁক করি নি, সেই মিথ্যে বলি কি করে? "
কেন? আমাকে খুশি করতে।
"নাহঃ আমি পারি না।"
আপনি রোমান্টিক নন তাহলে।
"উঁহু, বরং উল্টোটা।"
মানে?
"রোমান্সের জন্য অনুভবের দরকার। মিথ্যেরআবরণ নয়।"
মায়ের বাগানটা দেখবেন না?
"তুমি তো দেখালেই না।একটা অনুরোধ করবো, প্রীতি? "
কি?
"আমাকে তুমি অমল নামে ডেকো।"
আমি কিন্তু আপনার প্রেমে পড়ি নি।
"তুমি কিন্তু আমাকে ইতিমধ্যেই ছুঁয়ে দিয়েছো।"
মানে?
"তুমি আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে, প্রায় পাঁচ মিনিট আমার হাতে হাত রেখেছো। মানুষের কথা ছলনা করে। হৃদয় করে না।"
আঁতকে উঠলাম আমি। ইশঃ নিজের অজান্তেই আমি ওনার হাতে হাত রেখেছি? আমি তা টেরও পাই নি? লজ্জায় দাঁতে ঠোঁট কাটলাম আমি।
অমল মুখার্জী আমার দিকে চেয়ে বললেন-
"এতে লজ্জার কি আছে? এটা আকাশের দোষ। প্রকৃতিরসৌন্দর্য্য এতটা শক্তিশালী, সে মানুষের গর্ব কেড়ে নিয়ে তাকে সরল সুন্দর শিশু
বানিয়ে দেয়।বুদ্ধির আবরণ খুলে হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দেয়। প্রকৃতির ক্ষমতার কাছে মানুষের কোন ঘোমটা টিকে না।
ইশঃ আমি ধরা পড়ে গেছি। নিজের কাছে নিজে ধরা পড়ে গেছি আমি। আমি অমল মুখার্জীর প্রেমে ডুবেছি। ওনার মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম
- মানুষটা উচ্ছ্বাসী কিন্তু প্রশান্তও বটে। ওনার দৈহিক আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য, কিন্তু বুদ্ধির আকর্ষণ আরও বেশী। টি শার্টের আবরণ ভেদ করে বুকের পেশী বেরিয়ে
আসতে চাইছে। কিন্তু দেশের আবরণ ভেদ করে অন্তরের সৌন্দর্য্য ঠিকরে পরতে চাইছে।
আমার শূন্য অন্তর হটাৎ পূর্ণ মনে হলো। হয়তো সত্যিই মানুষটা ভালোবাসার যোগ্য।হয়তো মানুষটার পেশী বহুল বুকে আঁচড় কাটতে কাটতে, তাকে গোপন কোন
কথা বলার যোগ্য।
উনিও আমার দিকে মায়াবী এক তৃষ্ণা নিয়ে চেয়ে রইলেন। আমি বললাম-
চলো অমল, বাগনাটা ঘুড়ে আসি।
অমল তার হাতটা ধরার জন্য, আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
আর আমি......
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem