শিকড়-শিখর Poem by A K Sarker Shaon

শিকড়-শিখর

বুড়ো খোকা বাড়ি যাবে
সেই কতদিন পরে!
ছোট্ট মনা ধরছে বায়না,
সে ও যাবে গায়ের নীড়ে!

'মা, কেউ নেই সেখানে,
আজ কেউ থাকে না সেথা'!
'তবুও যাবো, শুধু দেখবো,
তোমার আতুড়-ঘর কোথা? '

দিন দুই আগে সরবে-গরবে
বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে;
সাঝের বেলা মনে লাগে দোলা
পাগলার জলে ডিঙ্গিতে ভেসে!

জল্লা থেকে আলীয়াবাদ চিড়ে
সোজা পশ্চিমে গোপালপুর!
আগে সড়ক ছিলো মহা ফাঁকা
আজ ঘন বসতিতে ঘনপুর!

অভ্যেস মত সাত সকালে
রওয়ানা বাড়ীর আশে;
'আমার সাথে যাচ্ছো বাবা,
বললো মামনি হেসে'!

দেখতে হয়েছে মায়ের মত,
সে যেন মায়ের অনুলিপি!
ধন্য আমি তাঁর কারণে,
মা হারা হইনি অদ্যপি!

মেঘনা নদীর আঁচল তলে
রূপালী স্রোতের ঢেউ খেলে;
তীরের বাঁকে ছায়াতলে
সুজলা-সুফলা গ্রাম মেলে!

বায়ে শ্রীরামপুর ডানে কান্দি
সামনে ছোট্ট আয়তোলা;
পরের ডানে সাদেকপুরে
হাট বসতো পড়ন্ত বেলা!

সেই হাটের তরতাজা টেকা
আর বাইলা মাছ নিয়ে;
বাবা ফিরতেন সাঝের পরে
বাড়ি ঘর সব মাতিয়ে!

তেলে ভাজা শুকনো মরিচ
টেকা মাছের আল্লাহ ভাজি,
দু'থালা ভাত নিমিষেই সাবাড়,
মা বলতেন, 'আরও নে পাঁজি! '

সেই হাট, টাকা মাছ নাই,
নাই মায়ের যাদুকরী রান্না!
অতীতের স্মৃতি কাতরতায়
আসে বুক ফেটে কান্না!

ডানে দড়ির মত কান্দি,
আমরা স্কুল মাঠে রোদে;
মা বললো, 'দাড়াও, ছবি তুলি,
গোপালপুর থাক প্রচ্ছদে! '

তিন দিকে চোখ জুড়ানো
বিশাল সবুজ ধানের চক!
তার মাঝে গায়ের বাজার,
যেন হীরক খন্ড চকচক!

কান্দি শেষে বায়ে মোড়
সোজা দক্ষিণে আমার ধাম!
পানশিরের রহমানের ভাষা
পশতুতে, 'ইনহাস্ত ওয়াতানম'!

অগে ছিল সর্পিল গোপাট
পাশে আরো সর্পিল খাল;
আজ পাকা রাস্তা হয়েছে
সেই খাল যেন জঞ্জাল!

বর্ষার শেষে লাল পানিতে
যবে আধ-মরা মাছ ভাসে;
ছেলে বুড়োর খালে মাছ
ধরার স্মৃতি আজও হাসে!

সমতটের রূপসী তন্বী
গোপালপুর তার নাম!
সারি সারি সুন্দর বাড়ি
শত গুনী মানীর ধাম!

মিষ্টি সকালে দুর্বাতলে
শিশিরের ঝিলিক খেলে!
ক্ষেতে হাওয়ার ঢেউ দেখে
মন হারায় সুরের তালে!

লাঙ্গল কাঁধে কৃষাণ চলে
মনে তাঁর স্বপ্ন দোলে;
গোলায় তুলে সোনার ফসল
কষ্ট লুকাবে হাসির তলে!

ডোবা-পুকুর-বিল, ভাঁটা,
যমনাই-মেঘনার জলে!
সময়ে অসময়ে মাছ ধরেছি
বাবার দেয়া কনি জালে!

'বাবা নামো, চলে এসেছি
এখানে সব রাস্তার শেষ!
এখানেই তোমার শেকড় পোঁতা
এখানেই সবার উন্মেষ! '

পাশেই শ্যামল কবরস্থান
মানবের অন্তিম ঠিকানা!
কত নিবাসী মাটিতে মিশি,
নিশ্চিহ্ন নাম নিশানা!

হায়রে মানুষ কতো বেহুশ
দেমাগ পোষে বার আনা!
মরার ঠিক আগেও বেঠিক,
সহজ সরল পথে চলে না!

আদু শাহ ঘুমিয়ে আছে
কবরের পশ্চিম সীমা ঘেষে!
শত ফকিরের মিলন মেলা
১৭ ফাগুন তাঁর ওরসে!

কবরের পাশে শেফালী দিঘী
টলটলে জলে টুইটুম্বর!
শৈশবে সাঁতার কেটেছি কত
লাজ ভুলে হয়ে দিগম্বর!

বড় হয়ে আড্ডায় মেতেছি
সবুজ পূব-পাড়ে বসে!
শ্রীরামপুরের বটগাছ দূরের
নারায়ণপুর অনায়াসে!

শেফালী গায়ের রাজকন্যা,
রাজার মন ছিলো তাঁর বাবার!
তাঁর স্বপ্ন-সাধ নিভালো
যৌতুক লোভী এক সীমার!

অজুর কালে মন গলে
জলে অশ্রুতে একাকার!
কবরস্থানে নিরব নির্জনে
ফাতেহা পাঠ দরকার!

এসো নিরবে যারা আছো ভবে
হাত তুলে প্রার্থনা করো বন্ধুরা!
সকাতরে বলো "রাব্বির হাম
হুমা কামা রাব্বায়ানি সাগীরা"!

গায়ের উত্তরে ছোট বাজার
সব ঘর পাকা সেমি পাকা!
চার দেয়ালের মাঝে আজ
সব হৃদ্যতা পড়ছে ঢাকা!

বিশাল বট বৃক্ষের ছায়ায়
আগে জমতো বাজার-হাট!
মাটির ভিটায় গমের ছাউনি
ছিলো কিছু ব্যাপারীর ডাট!

আগামী নির্মানে স্কুলে-পানে
ছুটছে শিশু দলে দলে!
বই বগলে কিশোর চলে
কিশোরী ধায় বেনী তুলে!

আমরা যেতাম ঐ নবীনগরে
প্রাচীন বনেদী সেই স্কুল!
যেখান থেকে তারা হয়ে
বিশ্ব মাতিয়েছে কত ফুল!

সারা বর্ষায় নৌকা ভাড়ায়
স্কুলপানে ক'জন ছাত্র সওয়ার!
বই খাতা ছুড়ি উল্লাসে মরি
আনন্দ আড্ডাই হতো সার!

কার গাছের শশা কচি;
কাঁঠাল-জাম্বুরা কার ফলে;
বুইদ্দ্যা মা'র কলার ছড়ি
হজমের পরিকল্পনা চলে!

হাবিব, জামাল, চপল, শফিক,
রওশন, মোবারক-শমছি;
খায়ের, নজু, আমির, সেন্টু
কতকের নামও ভুলে গেছি!

এক সাথে পাঠ-খেলা-চলা
এক সাথে জল্পনা কল্পনা!
সে সব আজ শুধুই স্মৃতি
শত কাঁদিলেও ফিরবে না!

হাটের দিন গা'য়ের বাজারে
সবার সাথে দেখা মেলে!
কতদিন পর দেখা বলে
গলাগলিতে হৃদয় গলে!

আলাপচারিতায় চা ষ্টলে
সুখ দুখের কথা চলে!
বিদায় কালে ভেজা গলে
'সময় পেলে এসো' বলে!

বর্ষা এলে বিলের তলে
শাপলা ফোটে খালে বিলে!
গয়না নৌকায় পাল তুলে
মাঝি গায় দরাজ গলে!

নায়রী আসে ঝি-ঝিয়ারী
দাঁতে হাসির ঝিলিক তুলে!
বাবা-মা ভাইয়ের দু'নয়নে
আনন্দাশ্রুর ঢেউ খেলে!

সনের পয়লা পরাণের মেলা
বুড়া জোয়ান হয় উতলা!
হৈ চৈ করে যায় যে বেলা
মনে ভাসে আনন্দের ভেলা!

মধু মাসে ফলের মেলা
আম-জাম-লিচু-কাঁঠাল;
আষাঢ়-শ্রাবণে নৌ-পার্বনে
পালের নৌকা তালমাতাল!

নদীর পাড়ে কাশবনে
আনন্দের হুল্লোড় চলে;
তাই-না দেখে মাঝি উতলা
দুঃখ-কষ্ট বেমালুম ভুলে!

হেমন্ত-নবান্নে, পৌষ-পার্বনে
খুশীর জোয়ার সবার মনে!
চাঁদের হাট সার্থক হতো
গীত-গল্প-বই দেখে শুনে!

খেলার মাঠে চারপাশ জুড়ে
উল্লাসিত দর্শকের কোলাহলে;
টাই শিল্ডের ফাইনাল খেলায়
মাটি কাঁপতো ঢোলের তালে!

শীতের সকাল সবাই নাকাল
নাড়া জ্বেলে ওম নেয়া;
দুপুরে হিম শীতল জলে
কী যে কষ্টে হতো নাওয়া!

চকের কোলে দৃষ্টি দিলে
সবার চোখ ধাঁধিয়ে যেতো!
সরিষা ক্ষেতের হলুদ রাজ্যে
কার না মন হারাতো?

মটর-গমের সবুজ দেখে
নীল আকাশ হতো তন্ময়!
সাঝের বেলায় মটর পোড়ায়
হা করতো বুড়া যুবায়!

স্কুলের তিন বাড়ী দক্ষিণে
ফুফুর বাড়ির পুকুরের জল!
কাকের চোখের মত স্বচ্ছ,
বারো মাস-ই টলমল!

তার পাড়ে পা রাখিলেই
ফুফু নিত্য তুলতো কোলে!
মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে
চোখ মুছতো খুশীর ছলে!

অতীত নীড়ে মনে পড়ে
ফুফুর হাসিমাখা মুখ!
গাল বেয়ে অশ্রু ঝরে
ভেসে যায় আমার বুক!

একটু দক্ষিণে খাল ডিঙ্গিয়ে
মোদের সরকার বাড়ি শুরু!
পশ্চিমের গোপাট আজ লোপাট
যেথায় চলতো হালের গরু!

মোর ছায়া অঙ্গনে এলে
চাচীরা ডাকে বড় আদুরে;
'কেডাও ইলা কাদির মিয়া নি
আয়োনা বেডা আমরার ঘরে! '

বোন-ভাবীরা ঠিসারা করে
'ইলা অহন বড় লোক,
আমরারে মনত রাখবো,
পড়ছে কি কোন শোক? '

বিস্ময়ে সবাই তাকায়
মামনির দিকে ঘুরে ফিরে;
আদরে কাছে টেনে বলে,
'চিনোনি গো আমরারে! '

মামনি ফ্যাল ফ্যাল করে
সলাজে তাকায় বাপের দিকে;
তাঁরা যে স্বজন-আপন
বলা হয়নি কথার ফাঁকে!

আপন-পর বাপেরা-ই কি চেনে?
সে চিনবে কেমন করে?
এপার্টমেন্ট বিশ্ব বাহিরে নিঃশ্ব,
শো-শা জীবন পাঁচিল ঘিরে!

সবাই করে চাকরগিরি
আসলে কর্পোরেট কামলা!
কাজের রাজ কৃষিকাজ
সেটা বুঝতে যায় যে বেলা!

বামনা পুকুরের উত্তর-পুবে
আমার বাপের আদি চত্বর!
বিদেশ ঘুরে গায়ে ফিরে
গড়লেন এক চৌচালা ঘর!

একাত্তরে বাস্তুহারা যবে
সে ঘর দিলো ঠাঁই মমতায়!
আজ বিধ্বস্ত করুণ দেখে
বুক ফাটে চাপা কান্নায়!

পশ্চিমে পুকুর পূবে ক্ষেত
মাঝে সবুজ পুকুর পাড়!
কালো আম গাছের ছায়ায়
পড়ার নামে দিবস পার!

বর্ষার ক্ষণে পশ্চিম জানে
ভাসা পানির ঘূর্ণিজলে!
ভুতি জামের ডাল থেকে
লাফিয়েছি সকালে-বিকালে!

পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে
বসতি শুরু আশির জুনে!
পরে ঠাঁই পাগলার বাড়ি
দৈয়ের সুনাম সূধী জানে!

নব্বইয়ের দশকে সরব বাড়ি
'ছায়া-নীড়' ছদ্মনামে!
ছবির মত স্বপ্ন সাজানো
মা-বাবার অক্লান্ত শ্রমে!

আগাগোড়া দেশ-প্রেমিক
সহজ সরল সৎ সুমন!
দেখছি ঘুরে বিশ্ব জুড়ে
বাবার মত বিরল সুজন!

মিঠে কড়া মা আমার
গুনী অতি প্রত্যুৎপন্নমতি!
মিষ্ট-ভাষী সরলা বিদুষী
বিধি সৃজিছেন অল্প অতি!

বাবার কোমল মনের তলে
কড়া শাসনের হুন্কার তোলে!
নিমিষেই সব হাওয়ার মিলে
মায়ের পিছে আঁচল তলে!

পিঠাপিঠি ভাই বোনে
নিত্য খুনসুটি চলে!
দূরে গিয়ে আঁড়াল হলে
বুক ভাসায় চোখের জলে!

ফুলে-ফলে মায়া-মমতায়
যখন বাড়ি চাঁদের হাট!
চাকরি টানে আমরা তিনে
নোঙ্গর ফেলছি অন্য ঘাট!

বিয়ের পরে বোনেরা দূরে
স্বপ্ন সাজায় স্বীয় অংঙ্গন!
বাবা মা শান্ত ধীর
চাঁদের হাটে শুরু ভাঙ্গন!

ছিয়ানব্বইয়ে শোকে ভাসিয়ে
মা ঠাঁই নিলেন স্বর্গলোকে!
পাথর বাবা পিছু নিলেন
দুই বছরেই তাঁর শোকে!

সেই থেকে বাড়ী শ্রীহীন
প্রায় দু'যুগ পরিত্যক্ত!
যার মাটিতে মিশে আছে
বাবা মায়ের ঘাম-রক্ত!

দশক পরে ভিটায় আজ
কুলীন ছেলে বড় ধীমান!
আপন পর চিনেনি শিকড়
তবু সে জ্ঞানী বিদ্বান!

জাংলা মাচায় মুখটি ঢেকে
ভিটা রয়েছে দুঃখ ঘিরে!
আঁড়ালে অভিমানে জনমদুখী
মা কাঁদছেন রুদ্ধদ্বারে!

মায়ের সজল মুখ কল্পে
উচ্ছ্বাসে বুক উঠলো কেঁপে!
চিৎকার করলে হালকা হতো
বুকের আগুন যেতো চেপে!

বুকের অনলে সজল চোখ
মামনি মুছালেন নিজ রুমালে!
ভিটার পরে বসিয়ে দিয়ে
মুখ ঢাকলেন করতলে!

মায়েরা কাঁদে মুখ লুকিয়ে
সুসন্তান বোঝে অনুভবে!
মায়ের দান মায়ের ঋণ
শুধবে কে বিশ্ব ভবে?

মায়ের ছায়া মায়ের মায়া
যুগে যুগে ফিরে আসে!
সুখে দুঃখে পদে-বিপদে
ত্রাতা হয়ে সদা উদ্ভাসে!

মা মাতা মা কন্যা
মা-ই পূণ্য জন্মভুমি!
মা মাটি মা ধরতী
তাই মায়ের পদ চুমি!

কবিতাঃ মায়ের-ছায়া
কাব্যগ্রন্থঃ শিকড়-শিখর
এ কে সরকার শাওন
শাওনাজ, উত্তরখান, ঢাকা!
৫ অক্টোবর ২০২০

শিকড়-শিখর
Sunday, September 13, 2026
POET'S NOTES ABOUT THE POEM
This a poem containing my parents, family, blood, birthplace, relatives & own locality of childhood.
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success