ঠিক বত্রিশ বছর পরে
আজ দেখা হবে হারানো বন্ধুর সংগে
চায়ের আড্ডার অগ্রভাগে!
তাই ফুলবাবু সেজে আগে-ভাগে
ভেন্যুতে পৌঁছাই বত্রিশ মিনিট আগে!
ঐ তো চাঁদমুখ দেখা যায়,
কালো-হলুদের নকশাখচিত
জামদানি শাড়ির আঁচলান্তে,
একাকী বসে দূরের টেবিলে
দূর-দ্বীপবাসিনী এক প্রান্তে!
বিধি বুঝি আজ বেশ
সুপ্রসন্ন, অকৃপণ, উদার;
বত্রিশ বছরে আমায় দিলেন
এক অনন্য উপহার!
সে কী! মায়াময় দৃষ্টি!
মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!
তাঁর চোখে চোখ পড়তেই
হাত উঁচিয়ে হাসিমুখে ইশারায়
জনান্তিকে ডাকিল আমায় একান্তে!
'আরে জগু যে, এসো এসো,
এই চেয়ারটায় বসো মোর মুখোমুখি;
তারপরে কেমন আছো বলো?
আশা করি তুমি বেশ সুখী! '
বসামাত্রই থমকে দাঁড়াল সময়,
যেন নিঃশব্দে মিলাল দুই হৃদয়!
বত্রিশ সেকেন্ডের নিষ্পলক চাওয়াচাওয়ি
চোখে চোখে যেন উত্তাল যমুনায়
নাও বেয়ে হারিয়ে যাওয়া হাওয়ায়
৩২ বছরের হাজারো অনুক্ত ব্যাকুলতায়
৩২ সেকেন্ডে বয়ে গেল নদী হয়ে নীরবতায়!
শব্দরা সব পালাল বহুদূরে অজানায়,
দু'জোড়া চোখ জড়ালো সুরের মায়ায়!
সম্বিত ফিরে সংযত হয়ে শুধাই,
'কী করে বুঝলে জেরীন;
তুমি কি জ্যোতিষী? '
'জ্যোতিষী আমি হয়তো নই
তবে জগুর তো চিরহিতৈষী! '
'বটে! তা আমি আছি বেশ;
বদলাইনি খুব একটা বড়!
কতদিন পরে দেখা মোদের
অনুমান কি করতে পারো? '
'অনুমান বলছ কী হে জগু?
'৮৯-এ শেষ দেখা, '৯০-এ শেষ চিঠি,
ফলাফল জানিয়ে লিখেছিলাম।
অতঃপর অরবিটহীন বুনো নক্ষত্র,
অন্তহীন ছুটে চলা অবিরাম যত্রতত্র! '
'হ্যাঁ, হ্যাঁ, সোনালি অতীত জেরীন
আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম;
কলেজের শ্যামল ছায়ে দক্ষিণা বায়ে
মজার আড্ডায় গল্প-কবিতায়
মনের ক্যানভাসে কত ছবি আঁকতাম!
ম্যারাথন আড্ডায় পেরিয়ে যেত
ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিমিষেই;
ক্ষিপ্র ঘোড়ার বেগে মহাকালে
কোথায় হারালো দিনগুলি সেই! '
'বাদ দাও আমার কথা জেরীন;
তুমি কেমন আছো বলো?
চায়ের আড্ডায় নামের তালিকায়
সেই প্রিয় নামটি দেখে নয়নে
আনন্দের ঝিলিক খেল তনুমনে! '
সে স্বভাবসুলভ স্মিত হেসে বলল,
'এতকাল পরে স্মরণে রেখেছ মোরে!
সে আনন্দ ধরে রাখি কেমন করে!
তা কেমন দেখছ আমায়?
আমি কি আগের মতই আছি?
না কি অনেক বদলে গেছি? '
'দুষ্টু-মিষ্টি হাসি ছাড়া
বাকি সব বদলেছে নীরব,
বদলেছে দেহাবয়ব;
আজ বেশ ভরাট মুখাবয়ব,
হয়তো বদলেছে সব অনুভব! '
'পাঁজি তুমি, দুষ্টু তুমি, তুমি তথৈবচ;
এবার থামো কথা-কবিতার কাজি!
সবাই এসে গেছে দেখো,
ঐ যে ডাকছে চায়ের আড্ডার মাঝি! '
ইঁদুর কপালে হলে যা হয়
বন্ধু জিএম চেঁচিয়ে কয়,
'এই জগু, জেরীনকে নিয়ে
তাড়াতাড়ি চলে আয়;
পরে কথা বলার ঢের সময় পাবি,
কেক কাটবার সময় বয়ে যায়।'
আশাহত জেরীন বলে,
'চলো যাই, সময় আর নাই।
প্রার্থনা থাকল শুধু একটাই,
আবার যেন বত্রিশ বছর পরে
শুধু বত্রিশ মিনিটের তরে দেখা পাই;
এমন মহতী কোনো আড্ডায়!
যা গত বত্রিশ বছরেও পাই নাই! '
সেই ক্ষণে বিগলিত মনে
ছলছলো নয়নে শুধাই,
'দেখা হয় তো! কথাও হয় বন্ধু;
আলো-আঁধারে প্রতিদিন প্রতিক্ষণে
কোনো কিছুই ভুলি নাই এতদিনে! '
আনত আননে বলে সে ক্ষণে,
'শোন জগু, বত্রিশ বছরেও
যদি কভু আর দেখা না পাই;
তোমার ক্ষমায় দিও মোরে ঠাঁই।
আমার শেষ চাওয়া একটাই-
ভালো থেকো বন্ধু, এবার বিদায়! '
সে চলে গেল হনহন করে।
একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার পথের পানে।
কারো প্রতি আমার অভিযোগ নাই মনে;
বত্রিশ বছরেও একবার পাই বা না পাই,
সে তো আছেই মনের গহীন বনে!
অতঃপর আমিও এগোলাম,
পথে মেঝেতে চিকচিক করা
তাঁর অশ্রুকণাগুলো ডিঙিয়ে,
যা গড়াচ্ছে স্বীয় গণ্ডদেশ বেয়ে!
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem