Genre: A Literary Criticism title: মুসা আল হাফিজ- কবি নাকি পুরোহিত? subtitle: An Apology For Musa Al-Hafij Poem by Mohammad Mohi Uddin

Genre: A Literary Criticism title: মুসা আল হাফিজ- কবি নাকি পুরোহিত? subtitle: An Apology For Musa Al-Hafij

এক
কবি মুসা আল হাফিজ এক আশ্চর্য প্রতিভা। প্রতিভার কাজ হচ্ছে আলো আর অন্ধকারকে আলাদা করা। স্বভাবতই তখন দ্বন্দ্ব অনিবার্য । তবে এই দ্বন্ধ কবি-মনের অর্ন্তদ্বন্দ্ব নয়, এটা পাঠক কিংবা সমালোচকদের পার্শপ্রতিক্রিয়ার ফল। যার পেছনে থাকে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, আদর্শিক নানান থিওরিটিক্যাল ফ্রেইম। বাংলা সাহিত্যের এই আশ্চর্য প্রতিভাকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে সমালোচনা হবে। যেভাবে হয়েছে বড় প্রতিভাদের নিয়ে, কালে কালে।
ষোড়শ শতকে স্টিফেন গজন (১৫৫৪-১৬২৪) অগণিত অভিযোগ আনয়ন করেছিলেন কবি এবং কবিতার বিরুদ্ধে। অন্যদিকে কবি ও সাহিত্যবিশ্লেষক স্যার ফিলিপ সিডনি (১৫৫৪-১৫৮৬) উল্লেখযোগ্য অভিযোগ সমূহের মোকাবেলা করেন। An Apology for Poetry শিরোনামের (১৫৮০ সালে লিখিত হলেও ১৫৯৫ সালে মরোনোত্তর প্রকাশিত) স্টিফেন গজনের সেই সব প্রশ্নের সমুচিত জবাব দিয়েছিলেন, যেগুলো জবাব পাবার যোগ্যতা রাখে। সেন্স টু সেন্স প্রসেসে এই শিরোনামের অর্থ করলে দাঁড়ায়: কবিতা নিয়ে মিথ্যাচারের জবাব। তারই পথ ধরে আমার আজকের লেখার শিরোনাম An Apology for Musa Al-Hafij।

কবি মুসা আল হাফিজের বিরুদ্ধে দূর কিংবা নিকট ভবিষ্যতে সংস্কৃতির নামে, প্রগতির নামে এমনকি রাষ্ট্রীয় মদদে রচিত হবে কুৎসা। যদিও কাজটা অতটা সহজ হবে না। প্রতিভার বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো যখন কঠিন হয়ে পড়ে, তখন কৃত্রিম প্রশংসা করে একঘরে করে রাখার নজিরও বিশ্বসাহিত্যে আছে। তাই আমার মন বলছে ভবিষ্যতে কবি মূসা আল হাফিজের কবিতার বিরুদ্ধে যত আক্রমন আসবে তার মধ্যে অন্যতম হবে- উনি যতটা না কবি তার চেয়ে বেশি পাদ্রী (ধর্মগুরু) । যেমন করে বিংশ শতাব্দীর প্রতিভা টিএস এলিয়টকে নিয়েও বলা হয়েছিল।

টিএস এলিয়ট'র The Waste Land কবিতার মুখোমুখি দাঁড়াতে না পেরে তথাকথিত সমালোচনাকারীরা অনেকটা প্রশংসার সুরে বলতে চেয়েছেন এগুলো তো কবির কবিতা নয়, পাদ্রির সারমন। এ হচ্ছে কবিতার মঞ্চ থেকে কবিদের সাইড লাইনে পাঠিয়ে দেয়ার চতুর কৌশল, যা ব্যর্থ সমালোচকদের মধ্যে দেখা যায়। মুসা আল-হাফিজের বেলায়ও এটা পরিকল্পিতভাবে করা হবে। তবে সমালোচনাকারীরা পেরে উঠবে না এই দেবদারুর সামনে।

কবি মুসা আল হাফিজের কবিতার অন্তর্লাবণ্য, দার্শনিক চিন্তা, শব্দচয়ন, মেটাফর, বাণীমহিমা, ইঙ্গিত, মোটের উপর তার কাব্যশৈলীর সামনে মুখ থুবড়ে পড়া ছাড়া নিন্দুকদের করার তেমন কিছু থাকবেনা। যে কাব্য প্রতিভা কোরান, পুরান, ইতিহাস, দর্শন ইত্যাদি মন্থন করে সময়কে স্পর্শ করে, তাকে মোকাবেলার যোগ্য কণ্ঠস্বর যখন-তখন পাওয়া যায় না।

এক সময় প্রশংসার ছলে হয়তো বলবেন কবিতার উপকরণ হিসেবে কবি মুসা আল হাফিজ যে বিস্তরভাবে ধর্মীয় অনুসঙ্গ দিয়ে আধ্যাত্মিক আবহ তৈরী করেছেন, তাতে কবিতার ময়দানকে সার্থকভাবে তাফসির মাহফিলে রূপান্তরিত করছেন। এ যেন কবিতার পাঠঘর নয়, বরং ফুরকানিয়া মজলিশ যার মুহতামিম কবি মুসা আল হাফিজ। কিংবা এ যেন সুফিদের খানকা, যেখানে শব্দের শিরনী বিতরণ করছেন তিনি। অতএব, কবিতার আসনে সমাসীন হওয়ার চেয়ে বরং প্রার্থনালয়ের মিম্বরে তাকে বেশ মানাবে।

মিস্টিসিজম কবিতার সাথে মিত্রতা করে আসছে আদি থেকেই। কিন্তু সফল কবিরা তাকে অবলম্বন করেছেন। এমনকি কবিতার পিয়র চাইল্ড খ্যাত- জন কীটস (১৭৯৫-১৮২১) ও জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) কবিতাগুলোও মিস্টিসিজম দ্বারা সংক্রমিত, অমরত্বের তৃষায় তৃষিত। ধর্মীয় রুহজগতকে টেনে না আনলেও কীটস এর পলায়নবাদ বা জীবনানন্দ দাশের জন্মান্তরবাদ খুঁজে ফিরেছে আত্মার সুরক্ষা, আত্মার অমরত্ব । এরিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্ব) , ভার্জিল, (৭০-১৯ খ্রিস্টপূর্ব) , অভিদ (৪৩ খ্রিস্টপূর্ব- ১৭/১৮ খ্রিস্টাব্দ) , দান্তে (১২৬৫-১৩২১) , সিডনি (১৫৫৪-১৫৮৬) , ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০) , ম্যাথু আরনল্ড (১৮২২-১৮৮৮) সাক্ষী- সূচনালগ্ন থেকেই কবিতার কাজ ছিল পাঠককে নৈতিক শিক্ষা দেয়া। মূর্ত ও বিমুর্তের মিলণ ঘটানো।
মুসা আল হাফিজ ক্লাসিক্যাল মাস্টারদের পথেই হেঁটেছেন এবং সেটা সফলভাবেই। ইংরেজি সাহিত্যের অগ্রগণ্য কবিদের উল্লেখযোগ্য লেখার সাথে মিলিয়ে আলোচনা করলে বুঝা যাবে মুসা আল হাফিজকে ডিফেন্স করার প্রয়াস যতটা না ব্যক্তিক তার চেয়ে বেশি নৈর্ব্যক্তিক।

দুই
পশ্চিমা সাহিত্যের সুতিগাকার গ্রীক কিংবা পৃথিবীর সমগ্র সাহিত্যের রসদ জুগিয়েছে বিভিন্ন ধর্মের বিশ্বাসজাত বিষয়াদি। বিশ্বসাহিত্যের আদি কবিকুলের কাব্য প্রতিভার প্রথম পাঠ ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস। যার প্রমাণ প্রত্যেক দেশের সাহিত্যের আদিবইগুলো। আপাতত বিশ্ব সাহিত্য রেখে দৃষ্টি দেওয়া যাক শুধু ইংরেজি সাহিত্যে। ইংরেজি সাহিত্যে ধর্মীয় চেতনা যে পরিসরে এসেছে, তার পরিধি ব্যাপক। তাই পুরো সাহিত্য না এনে শুধু কবিতার প্রসঙ্গ আনতে যাচ্ছি । তাও সব কবিতা ছোট আকারের এই লেখায় উপস্থাপন করা সম্ভব নয়, সংগতও নয়; আমার বক্তব্যের প্রমাণের জন্য হিসেবে যতটুকু আনা দরকার, ততটুকুই আনব।

মেটাফিজিকাল কবিদের দেহের উর্ধ্বে ওঠে আত্মা বা পরমসত্তার জয়গান গাওয়ার যে প্রচেষ্টা, কবি মুসা আল হাফিজের কবিতার পরতে পরতে যেন তারই তপোধ্বনি। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, এডমান্ড স্পেন্সারের মত সমসাময়িক কিংবদন্তি লেখকদের ভিড় ঠেলে কাব্য জগতে তার স্বকীয় জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন মেটাফিজিকাল কবিতার পুরোধা- জন ডান (১৫৭২-১৬৩১) । যাকে বাদ দিলে ইংরেজি সাহিত্যের মেটাফিজিকাল কবিতার অভাবনীয় সৌন্দর্য বাদ যাবে। তিনি পাদ্রীও ছিলেন, এমনকি প্রখ্যাত গীর্জা সেন্টপলস এর ভাইস চ্যান্সেলরও হয়েছিলেন। সুতরাং মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত শায়েখ মুসা আল-হাফিজের নিশ্চয় কবি মুসা আল হাফিজ হওয়াতে কারো আপত্তি থাকার কথা না।

যাই হোক। শুরুর দিকে জন ডান প্রেমের কবিতা লিখলেও পরিণত সময়ে তার লিখিত কবিতার গায়ে পরিয়ে দিয়েছেন ধর্মীয় চেতনার চাদর । ঔ যে তার হলি বা পবিত্র সনেটগুলো; নামকরণই তো পাঠককে জানিয়ে দিয়েছে ভেতরে ধর্মীয় বোধের সুনিপুণ উপস্থাপনার কথা। মাত্র একটা কবিতার উদাহরণই যথেষ্ট- Holy Sonnet 14 or Batter my heart, three-person'd God। কবিতার শুরুর তিন লাইনে জন ডান কোন অধিপতির কাছে যেন ফরিয়াদ করছেন-
'হে ত্রয়ী সত্ত্বার স্রষ্টা!
আমার অন্তরসত্তায় ঝাঁড়া দাও- নবনির্মাণে।
এই ঝাঁড়া, পর্যবেক্ষণীয় বিরতি, ঘষামাজা-
ধরে নেব আমারই সংশোধনে;
যাতে আমি জাগরিত ও উত্থিত হতে পারি...।'
মনে হচ্ছে এটা কোনো কবির কবিতা নয়, যেন কোনো পাদ্রির কন্ঠে উচ্চারিত স্তোত্র। কবি মুসা আল হাফিজের মুক্তির ফরমানও রবের সান্নিধ্যে থাকার মধ্যে নিহিত। তাই মর্তলোকের সমুদয় আকষর্ণে না আটকে তার হ্নদয় লীন হয়ে আছে স্রষ্টার আলোয়-
'চিত্রপ্রদর্শনী, কবিতার শিবিরে, প্রাচীন সরল ভোর
জ্যোৎস্নার দারুণ ঢেউ নেই কোথাও!
আয়াজের মতো আমি মাতাই মাঠের ঘাস
পাখির মতো নীলিমায় ছড়াই বুকের আগুন
নিখোঁজ নিখোঁজ বলে হাতড়াই মেঘের নাড়িভুঁড়ি!
পেলাম না কোথাও
হৃদয়!
হৃদয়!
পেলাম না।
হে প্রভু আমার মজনু হৃদয়
তোমারই আলোয় তবে লীন হয়ে গেছে? ' (তোমার রহস্যে) ।'

জন ডান শয়তানের ধোকায় পড়লে সহজ সরল পথের জন্যে হাত তুলার জায়গাটা চিনিয়ে দিচ্ছেন কায়নোবাক্যে। যেমন-
'তোমার (মহান সৃষ্টিকর্তার) কাছে নিয়ে
তোমার গোলাম করে রাখলেই আমি হবো
সত্যিকারের মুক্ত, তোমার করুণায় বিধৌত না হলে
আমি হবো না কখনোই সূচি-শুদ্ধ।'
মুসা আল-হাফিজের বিশ্বাসও তাই। স্রষ্টার নাম জপ, ধ্যান ও প্রেমে তার সমস্ত আরোগ্য, সমুদয় বিজয়। যেমন -
'আমার নিঃশ্বাস থেকে কালের প্রান্তরে
জ্বলে উঠল সুগভীর বিজয়ের শিখা
আমার বিশ্বাস থেকে সমস্ত আত্মার পাখি
মহাকালে জিকির করছে স্বর্গীয় মৌতাতে।' (জয়যাত্রার গান) ।

কবি মুসা আল হাফিজের বলার যে আত্মবিশ্বাস, তা কেবল কবিমন বলতে পারে না, আবার কেবল ঋষিমন এককভাবে বলতে পারার কথা না। দুইয়ের যৌথ প্রযোজনাতেই সম্ভব। যেমন-
'এইবার দেহের কবর ভেঙে সত্তার পুনরুত্থান কে ঠেকাবে?
অস্তিত্বের প্রতিটি কণায় তরুণ নক্ষত্রের মতো জ্বলে উঠছে
পরমের নামের নামতা। রক্তের গহিনে তার ঘোরের ঘূর্ণি লেগে
সুবিমল যে জোয়ার সবেগে জেগেছে
তার তোড়ে জীবনের প্রাণ পেয়ে গেলে
আমি বলে আর কোনো প্রতিমা থাকবে না।
আমিহীন উদ্ভাসনের শুদ্ধপ্রাণঝড়ে
মহাবিশ্বে জেগে উঠব অন্তহীন অস্তিত্বের জ্বলন্ত তুর পাহাড়।' (ফানার প্রতীক্ষা)
তাই মুসা আল-হাফিজ কবি এবং পুরোহিত দুটাই।

তিন
মেটাফিজিকাল কবিদের মধ্যে জর্জ হারবার্ট (১৫৯৩-১৬৩৩) ও হেনরী ভন (১৬২১-১৬৯৫) প্রথম সারির কবি। কলেজ পড়ুয়া ষোল বছরের একটা ছেলে তার মাকে নববর্ষের উপহার হিসেবে দুটি সনেট লিখে পাঠিয়েছিল। যেখানে ছেলেটা প্রশ্নাকুল মনে জানতে চেয়েছে- 'কবিতায় কেন শুধু প্রেমের কথা বলা হবে? প্রকৃতির কথা এবং তার নিয়ন্তার কথা কেন বলা হবে না? ' জানতে চাওয়া সেই ছেলেটি জর্জ হারবার্ট। তাই তো তার পরিণত বয়সের কবিতায় সৃষ্টিকর্তার ঐশ্বরিক ক্ষমতা, সৃষ্টিকর্তার মহিমাসহ আধ্যাত্মিকতার পরশ জায়গা করে নিয়েছে।

জর্জ হারবার্ট এর Discipline, The Alter, Vertue, The Collar, Easter Wings, The Affliction, The Puplley সহ অসংখ্য কবিতায় ধর্মীয় চেতনার স্পষ্ট বার্তা পাই। ঠিক একইভাবে মুসা আল-হাফিজের কবিতা ফ্রয়েডিয় কামুক প্রেমকে পাশ কাটিয়ে, স্রষ্টা অনুমোদিত প্রেমের আবাহনের ভেতর দিয়ে জীবন ও জগতে স্রষ্টার শৈলী, করুণা ও প্রতিপালনের মহিমা তুলে ধরেছে। তার কবিতা ফিজিক্স এবং মেটাফিজিক্সসকে এক করে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের পথ দেখিয়েছে। ফ্রয়েডের মনোপ্রকল্প যে প্রভাব তৈরী করে, তা বিদ্ধ হয়েছে মুসা আল হাফিজের নিন্দায়। দীর্ঘ ও বিখ্যাত একটি কবিতায় তিনি লিখেন-
'সত্তার যে চাষাটি
জ্যোৎস্নাভরা খেতে করবে মনীষার চাষ, সে এখন
বোধের পাহাড় কাটে
ফ্রয়েডের ছদ্মমানুষ।' (মহাবিশ্বের করতালি)

অক্সফোর্ডের খাতায় নাম লেখানো হেনরি ভন লন্ডনে চলে গেলেন আইন পড়ার জন্যে, যদিও শেষমেষ হয়েছেন ডাক্তার। মুসা আল হাফিজের কবিতার বিষয়বস্তুর মতই সহমর্মিতা, সৌহার্দ, সহনশীলতা এবং আত্মশুদ্ধি- ঘুরে ফিরে এসেছে হার্বাটের কবিতায়। সেই সব কবিতার মধ্যে Peace, The Retreate, Regeneration অন্যতম। The Retreate কবিতার শেষ দুই লাইনে কবি সীমাহীন আশা প্রকাশ করেছেন- তিনি পুনরায় ফিরে যাবেন সৃষ্টিকর্তার কাছে, তার স্বর্গীয় নিবাসে। মুসা আল-হাফিজের 'ট্রেন' কবিতার ট্রেনও যাচ্ছে পরম সত্ত্বার কাছে-
'ট্রেন ছুটছি, সামনেই মঞ্জিল
হার্দিক হুইসেলে মাটির বিদ্যুতে জাগে ফেনিল দাবিনামা!
'কী চাই মাটির' আকাশের চারদিক কেঁপে শিরিন ধ্বনি ওঠে
মানুষের স্টেশনে নামো অনন্তের শ্লাঘা
সূর্যের সৈকত এসো চুপ করে শৈবালের পাশে
চুম্বকদিগন্তে ঐ সচ্ছল ঘাস, কেউ তার বুক মাড়িয়ো না
আর যিনি মহীয়ান, সত্তার ওয়াদাসহ
পাঠাতে হবে দূত। আদমের চর সাক্ষী
কলবের উলাসে নীলিমা হবে জিলানীর নিঃশ্বাস!
ট্রেনের ঝরোকা থেকে উড়বে প্রাণের পাখি কুসুম জিকিরে।'
হৃদয়ের আলো ও বিশ্বাসের জীবন্ত আলিঙ্গণ কতো ঐকান্তিক হলে কবিতা এরকম মহির্ষির মত প্রাজ্ঞ হয়ে ওঠে? উত্তরটা পাঠকের কল্পনা থেকেই আসুক।

কবিতার মনোযোগী পাঠক মাত্রই ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রবক্তা আলফ্রেড টেনিসন (১৮০৯-১৮৯২) এর নাম শুনে থাকবেন। Crossing the Bar নামে টেনিসনের একটা কবিতা আছে । কবিতার সমাপ্তিটা হয়েছে সৃষ্টিকর্তার সাথে দেখা হওয়ার এক স্বর্গীয় আত্মবিশ্বাসী প্রত্যাশা দিয়ে। কত মমতা নিয়েই না বলেছেন-
'যখনই অতিক্রম করব বালুচর
সরাসরি দেখা দেবেন আমার ইশ্বর।'
প্রভুপ্রেমী কবি মুসা আল-হাফিজ আলফ্রেড টেনিসনের প্রত্যাশাকে অতিক্রম করেন। কারণ ইতোমধ্যে তার হ্নদয় নিমজ্জিত হয়ে গেছে পরমসত্ত্বার সত্যে-
'হে প্রভু আমার মজনু হৃদয়
তোমারই আলোয় তবে লীন হয়ে গেছে? ' (তোমার রহস্যে)

ইংরেজ মহাকবি জন মিল্টনের (১৬০৮-১৬৭৪) মহাকাব্য আমাদের আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক জায়গা। সেখানে তিনি এ্যাডাম ও ঈভকে নিয়ে কাব্য করেছেন। মুসা আল হাফিজও তা করেছেন ঈভের হ্রদের মাছ ও আদমের আত্মজীবনী থেকে কবিতায়। ঈশ্বরের সাথে শয়তানের চিরন্তন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর মাঝখানে পড়ে মানুষের অসহায়ত্ব নিয়ে কথা বলেছেন মিল্টন। বাইবেলকে অবলম্বন করে তার কবিতা রচিত হয়। সেখানে স্বাধীনতা ছিলো মূল আকাঙ্খার বিষয়। মুসা আল হাফিজের ঈভ ও আদম বিষয়ক কাব্যে প্রেম, বিশ্বজনীনতা ও মানবমহিমা হলো মূল আকাঙ্খার বিষয়। এ বিষয়ে কথা অনেক দীর্ঘ হতে বাধ্য। ঈভের হ্রদের মাছ ও আদমের আত্মজীবনী কবিতাদ্বয় রোমান্টিকতার পাশাপাশি দার্শনিকতা ও ভাবুকতার দ্বারা বৈশিষ্টমণ্ডিত। এ নিয়ে কথা না বাড়িয়ে জন মিল্টনের On His Blindness শিরোনামের ছোট্ট একটা সনেটের প্রসঙ্গ আনা যাক। কবিতার বক্তা হতাশ। কেননা অর্ধজীবন পার হওয়ার আগেই সৃষ্টিকর্তা তাকে অন্ধ করে দিয়েছেন। যদি অন্ধ করে না দিতেন, তাহলে সে উপযুক্তভাবে তার সুপ্ত প্রতিভা দিয়ে সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করতে পারত। বক্তার ব্যথিত মন অভিযোগের সুরেই জানতে চায়, পরকালে তার হিসাবটা কি অন্যদের মতই হবে? তাকে কি একটু বিবেচনা করা হবে না? বক্তার অধৈর্য্য মন সহসা শান্ত হয়, পুনর্জাগরিত হয়। কারণ সে উপলব্ধির মোহনায় পৌছে যায়। সে বুঝতে পারে, কে অন্ধ কে বধির, কার কী আছে কার কী নেই, সব অভিযোগ পাশ কাটিয়ে যার যার অবস্থানে থেকে সৃষ্টিকর্তার আদেশ শর্তহীনভাবে মেনে নেওয়াটাই সুখ, উত্তম উপাসনা। এভাবে তার সত্তা উচ্ছ্বসিত হতে থাকে, হ্নদয়ের স্বাধ ধরা দেয় নতুন মুগ্ধতা নিয়ে। কবি মুসা আল হাফিজের কাব্যেও আমরা দেখবো ভিন্ন চরিত্রে একই ধারার ঘটনা ঘটে।
মুসা আল হাফিজ সিনাইয়ের তুর হিসেবে নিজের সত্তাকে ভাবতে পারার মাঝে আধ্যাত্মিক সুখ অনুভব করছেন। হ্নদয়ের সমস্ত সুখ, শিহরণ, নবজাগরণ যেন অতিইন্দ্রিয় অনুভূতিতে। কবি বলেন-
'যে দিন হলাম আমি সিনাইয়ের তূর
দগ্ধ হয়ে হই সেই মুগ্ধ উদ্ভাস
সত্ত্বায় জেগে উঠলো নিখিলের সুর
জীবনের নদী হলো তোমার উচ্ছাস
যে দিন পেলাম সেই হৃদয়ের স্বাদ
আহা সে কী দীপ্ত মুগ্ধ স্নিগ্ধ শিহরণ
প্রকৃতির রক্তজলে তারই ঐকনাদ
বৃষ্টির হরফ লেখে সেই বিবরণ
বিগত প্রহরে ছিলো মহাকাল কাছে
বুকে তার নদীর মতো গীতিকার ঢেউ
মাতামাতি করে চির ব্রীড়াতুর মাছে
অনন্তের চিত্রকর তিনি ছাড়া কেউ?
আমাতে তলিয়ে আমি তারে শুধু পাই
তার গানে সুর দিলে আমি আর নাই।' (তিনি) ।
এতে মুসা আল হাফিজকে কবি না পুরোহিত একক সম্ভাষণে না যেয়ে অপরিহার্যভাবে শব্দসমন্বয় করে বলতে হচ্ছে তিনি ঋষি-কবি, কবিতা-পুরোহিত।

চার.
থমাস গ্রে (১৭১৬-১৭৭১) এর Elegy Written in a Country Churchyard ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম একটি এলিজি হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। এই কবিতায় কবি গরীব মানুষের দুর্দশা দেখে কষ্টে কাতর। গ্রাম্য গোরস্থানে ঘুমিয়ে আছেন অনেক কৃষক, যারা শ্রম আর ঘামে, লাঙল আর কাস্তে দিয়ে মৃত্তিকার বুক জুড়ে তুলেছিলেন ফসলের চিৎকার। অথচ ওদের সমাধিতে আজ স্মৃতির ফলক নেই, নেই খোদাই করা প্রশংসাসূচক কোনো লেখা; ওরা জীবদ্ধশায়ও পায়নি কিছু। পেলেও সেটা উচ্চাবিলাসীদের অবহেলা।
মানবসৃষ্ট ইহকালীন এই ব্যবধান কবির মন মেনে নিতে পারছে না। হাহাকারে যখন কবি মন ভারাক্রান্ত ঠিক তখন পরকালের অস্তিত্ব তাকে সমাধানের দিকে নিয়ে যায়। ফলে তিনি কবিতা শেষ করেছেন দ্যা এপিট্যাফ এর মাধ্যমে। যেখানে উচ্চারিত হয়েছে সৃষ্টিকর্তার পরকালীন ন্যায় বিচারের প্রতি অগাধ আস্থা।
মুসা আল হাফিজের কাব্যদৃষ্টি শ্রেণীশোষনের বাস্তবতা এড়িয়ে যায়নি। তিনি দেখেছেন পুজিবাদ ও বস্তুবাদের হিংস্র থাবা কীভাবে গিলে খাচ্ছে মানবতা। তাদের কাতর বেদনার আওয়াজ তার কবিতায় শোনা যায়। সেই গোঙানি তিনি নিজের মধ্যেও শুনতে পান, যা উচ্চারিত হচ্ছে মেরুতে মেরুতে।
তৃতীয় বিশ্ব কবিতায় তিনি এভাবেই বলেছেন-
'আমার শয্যার পাশে আমিন রাজু
এতই পাংশু কেন হাফিজ ভাই, এতই করুণ
মৃত্তিকার প্রজনন খুঁজে সৃজনবাযু
তাই তৃণের মিছিলে ঝড়ের মতো নামছে অরুণ
আমার অশ্রান্ত হাসিতে বাতাস থমকে গেল
শিউরে উঠলেন কেবিনের রড বিপন্ন হাসির তাললয়ে
হ্যাঁ, বস্তুতান্ত্রিকতার চাকুনৃত্যে এখন হাসপাতালে হাসির
ছিন্নভিন্ন অভিধান।
ডাকলাম-'বন্ধু! ' হার্দিক তরলতায় কাতর আওয়াজ,
আমরা এভাবেই হৃদয় ঝরিয়ে ডাকি বন্ধু বা মানুষকে
দেখো দেখো আমার খুলি
প্রতিদিন ওরা এতে হানাদার ক্যাসেট ঢুকাতে আসে
দেহের লাবণ্য লুটে শোষক কোম্পানি
সঞ্চিত শস্য গিলে কারূন মহাগ্রাসে
তাই মেরুতে মেরুতে বাজে আমার গোঙানি।'
কবি মুসা আল হাফিজের কবিতা সাম্যের কথা বলে, সুখ-দুখ ভাগাভাগির কথা বলে, সবাইকে নিয়ে একসাথে বাঁটতে উদ্বুদ্ধ করে। এর নমুনা তার কাব্যভূবনে বহুবিস্তৃত। যেমন-
'বলা হয় যোগ করো, আমি যোগ করি আত্মশক্তিকে।
বলা হয় বিয়োগ করো, আমি বিয়োগ করি পরাজয়কে।
বলা হয় গুণ করো, আমি গুণ করি ভালোবাসাকে।
বলা হয় ভাগ করো, আমি ভাগ করি দুঃখকে।
বলা হয় সমীকরণ দাও, আমি দিই নিজের মধ্যে সবাইকে।
বলা হয় মান প্রকাশ করো, আমি প্রকাশ করি সফলতাকে।' (গণিত) ।
এমন হ্নদয়-উতসারিত মানবিক উপলব্দি পথ দেখায় আস্তিক-নান্তিক সবাইকে, জাগরিত করে হতাশায় নিমজ্জিত পথিককেও। তাদেরকে দেয় সংগ্রামের প্রেরণা। তারপরও পরাজিত, লাঞ্চিত, অবহেলিত, বিপন্ন জীবন নিয়ে যারা মারা গেলো, মুসা আল হাফিজ মাটির সাথে মিশে যাবার মধ্যেই তাদের সমাপ্তি দেখেন না। পরকালে তাদের মহাজীবনের উপসংহারে তার প্রগাঢ় আস্থা।

পাঁচ
রোমান্টিক যুগের পূর্বসুরী এবং ওল্ড টেস্টামেনের কবি বলে কাকে অভিহিত করা হয়? ধর্মীয় চেতনা লেপ্টে দিয়েছেন কবিতার থরে ভিতরে ঐ মরমী কবির নামটা যেন কী? এরকম প্রশ্ন করে দম নেয়ার আগেই নামটা চলে আসে- উইলিয়াম ব্লেক (১৭৫৭-১৮২৭) । Introduction (Songs of Innocence) - কবিতায় মেঘের ভেতর শিশুরূপী যিশুখ্রিস্টের কথা পাঠকরা জানতে পারে। The Lamb কবিতায় মেষের ছানা দিয়ে- আসমানি দাওয়াত, শান্তি ও মানবতার বার্তা নিয়ে জেরুসালেমে ভূমিষ্ট হওয়া ছেলেটির কথা তুলে ধরেন তিনি।
কবি মুসা আল-হাফিজ যে শিশুর কথা তার কবিতায় বলছেন সে শিশুটিও আল্লাহর নির্বাচিত নবী-
'নবজাত শিশুটিকে আশার সিন্দুকে জ্যোৎস্নার নদীতে ভাসাই,
জল আর মৃত্তিকার চুম্বনের শব্দ শুনে শুনে সিন্দুকটি
ভিড়বে এক নির্ধারিত কিনারায়,
অলৌকিক ওম থেকে শিশুকে ক‚লে তুলবে রমণীয় স্নেহ।
তারপর একদিন
দাজ্জালের রাজপ্রসাদে ফেরাউনের অহংকারে
শিশুটি কষে মারবে সত্যের চাটি।' (সত্যের চাটি) ।
নবীরাই তো নেতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে চপেটাঘাত। একজন কবি তো নবীকেই খুজবেন, বুঝবেন।
উইলিয়াম ব্লেক এর মতই সেই খোজাখুজিতে কবি মুসা আল-হাফিজ পিছিয়ে নেই। তাছাড়া উইলিয়াম ব্লেক Introduction (Songs of Experience) - কবিতায় তুলে ধরেন- চারণ কবির রূপ ধরে যিশু খ্রিস্ট কীভাবে সৃষ্টিকুলকে আকুতি জানান সঠিক পথে ফিরে আসার জন্য । The Voice of the Ancient Bird কবিতায় পাঠকরা জানল- সন্দেহ, অজ্ঞযুক্তির পাল্লায় পড়া অবিশ্বাসী মানুষগুলোর হোঁচট খাওয়ার কথা এবং শুনল- নবজাত সত্য তথা বিশ্বাসের পথে পা বাড়ানোর জন্যে উইলিয়াম ব্লেক এর ব্যাকুল আহবান।
মুসা আল-হাফিজের পেছনেও প্রলোভন। কিন্তু সমাগত সত্যের আহবান উপেক্ষা করা তার জন্যে কঠিন। ফলে তার কবিতার পাঠকরা শুনল আকাশের জানালা খুলে কারো আগমনীর ইতিবৃত্ত।
'পিছনে শহর
ইন্দ্রজাল হৃদ্যতার টানে ছুটছি পথিক...
তখনি আকাশের জানালা খুলে কে যেন
গতির তরঙ্গে মহাশূন্য কাঁপিয়ে তুলল
তার সত্তার সুরভিতে মরমি মহিমা
জীবনের নিসুপ্ত জলে জাগায় জলপ্রপাত।' (পরম প্রান্তরে) ।

উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০) ইংরেজির কাব্য জগতের রুমান্টিক যুগের অগ্রনায়ক। তাকে বলা হয় পেনথেয়িস্ট কবি। প্রকৃতির পরতে পরতে তিনি সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। বিমূর্ষ মন নিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে গেলে সতেজ মন নিয়ে ঘরে ফেরা যায়, এই নিরাময় ক্ষমতার অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। তাই তো অধিকাংশ কবিতায় প্রকৃতির আদলে সৃষ্টিকর্তাকে ভিন্নভিন্ন রূপে অঙ্কন করেছেন।
সৃষ্টিকর্তার এমন আবিষ্কারকে পেনথেয়িজম নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আসলে ওয়ার্ডসওয়ার্থের পেনথিইজম ধর্মীয় চেতনারই অন্য এক রূপ। মেঘ ভাঙলে বৃষ্টি তথা পানি হয়, পানি আকাশে জমাট হলেই মেঘ হয়। প্রক্রিয়া যাই হোক, কাহিনি এক। ঠিক একই রকম পেনথিইজম আর ধর্মীয় বিশ্বাসে মাখামাখি। প্রকৃতির মাঝে ওয়ার্ডসওয়ার্থ পথের দিশা পেয়েছেন। আপামর মানুষকে কবিতার মধ্য দিয়ে নীরব আকুতি জানিয়েছেন- প্রকৃতির মহিমায় মহিমান্বিত হওয়া জন্যে।
Tintern Abbey কবিতায় নিজের বোন ডরথী'কে পরামর্শ দিয়েছেন সতত প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে। এভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ধর্মীয় বোধ কবিতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। এজন্য সাহিত্যবোদ্ধারা তাকে সুপ্রিম প্রিস্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কবি মুসা আল হাফিজের কবিতা সামগ্রিক অর্থে এই প্যানথেয়িজমকে ধারণ করে পুরোদস্তুর। এমনকি সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে খুজে ফেরার ব্যাকুলতা তার মাঝে এত স্থির ও বৈচিত্রময়, যা চমকপ্রদ। তিনি মিস্টিসিজমের মত জঠিল বিষয়কে এক-বসাতে আস্বাদনযোগ্য খাবার বানিয়ে পরিবেশন করেছেন। তবে পেনথিইজমের মূল্যবোধের নানা রসদকে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলেন মুসা আল হাফিজ। তার কবিতা পরমে বিলীন হবার কথা বলেও monotheism বা অদ্বৈথবাদের সাথে ভিন্নমত জারি রাখে। আবার সৃষ্টি ও স্রষ্টার একত্বকে গ্রহণ না করেও dualism বা দ্বৈতবাদের সাথে তিনি বিরোধিতা জারি রাখেন। এমনকি তিনি দ্বৈতাদ্বৈতবাদকেও কবুল করেন না। তার ধারা ওহীবাহিত, যা সুফি ও কালামদার্শনিকদের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে এসেছে।
প্রকৃতিতে পরমকে খুজাখুজিতে পিছিয়ে নেই ম্যাড শেলী খ্যাত পিবি শেলীও (১৭৯২-১৮২২) । ছাত্র অবস্থাতেই 'The Necessity of Atheism' লিখে অক্সফোর্ড থেকে বহিস্কার হওয়ার প্রথম দুঃসাহসিকতা তার দখলে। ব্যাক্তি জীবনে ধর্মে উদাসীন হয়েও কবিতার মাঠে যেন সত্য সন্ধানী এক অক্লান্ত কৃষক, আত্মার পরিশুদ্ধিই বুঝি জীবনের সুন্দর ঠিকানা। আর সেই শুদ্ধতার পাথেয় আসে স্বর্গ থেকেই। যে পাখির সুরে তিনি খুঁজে পেয়েছেন অনাবিল সুখ কিংবা চৈতন্যের শক্তি কিংবা উন্নততর মানুষ হওয়ার দিক নির্দেশনা, সেই পাখিই নাকি আসছে স্বর্গ কিংবা এর খুব কাছাকাছি জায়গা থেকে।
তাই তো To a Skylark কবিতায় বলছেন-
'Hail to thee, blithe Spirit!
Bird thou never wert,
That from Heaven, or near it,
Pourest thy full heart
In profuse strains of unpremeditated art.'
তিনি এও বলতে দ্বিদাবোধ করেন নি যে, এমন মিষ্টি সুর- জাগতিক প্রেম কিংবা মদ কোনো কিছুতেই পাননি। স্কাইলার্ক পাখি কী এমন সুললিত সুরের বিস্তারক, যার উৎস পৃথিবীর কেউ জানে না। এমন সুরের রসদ নিশ্চয় স্বর্গ থেকে নেওয়া। তাই তো অকুন্ঠ চিত্তে পাখির কাছে নির্মল আহ্বান; মানবজাতিকে দাও এই মধুরতার বার্তা-
'Teach us, Sprite or Bird,
What sweet thoughts are thine:
I have never heard
Praise of love or wine
That panted forth a flood of rapture so divine.'
সঙ্গত কারণেই কবি মূসা আল হাফিজের ধ্যান ও জ্ঞানের রাজ্যও মেটাফিজিক্স। হেরা পাহাড়ে বিচ্ছুরিত হয়েছিল যে ঐশীজ্ঞান, সেই জ্ঞানই তার পথচলার নিমিত্ত। মানবসৃষ্ট মতবাদসমূহের চর্চা এই মর্ত্যলোকে কম হলো না, ফলাফল সবারই জানা। তাই কবি মুসা আল হাফিজের কবিতা পথপ্রদর্শক হয়ে বিশ্ববাসীকে বলতে চাচ্ছে সত্য এদিকে নয়, ঐ দিকে গেছে!

ছয়
ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম কবি, যাকে বাদ দিলে ভিক্টেরিয়ান যুগ অপূর্ণ থেকে যাবে; যিনি সাহিত্য সমালোচনা, শিক্ষা, ধর্ম, নৃতত্তসহ লেখালেখির বিভিন্ন শাখায় সব্যসাচীর মত স্বাক্ষর রেখেছেন, তিনি হলেন- ম্যাথু আরনল্ড (১৮২২-১৮৮৮) । তাঁর কাব্য থেকে উদাহরণ টানলে Self Dependence, Morality, The Buried Life সহ অনেক কবিতাই আনা যাবে। তা না করে তার Dover Beach, Schoolar Gypsy এর কথাই বলা যাক।
Dover Beach কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে মানবকুল দূরে সরে গেছে। যার ফলেই মানবকুল যন্ত্রণা ও আত্মঅবমাননার দিকে ধাবমান। মানবতা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়েছে। Schoolar Gypsy কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন প্রজ্ঞাবান এক চরিত্রকে। কিন্তু এই জ্ঞানী লোকটি বর্তমান (ভিক্টরীয়) যুগের বিশ্বাস বিবর্জিত মানুষগুলোর সাথে বড়ই বেমানান। তাই সে দূরে চলে যাচ্ছে।মুসা আল হাফিজের কবিতায়ও প্রজ্ঞাবান মানুষেরা উপস্থিত হন। তাদের সাথে দীর্ঘ দার্শনিক সংলাপ হয় তার। শেষে তারা এই উত্তরাধুনিক কালের মানুষের পচন ও পতন দেখে এখান থেকে চলে যান। মুসা আল হাফিজ জানাচ্ছেন-
'অত: পর আমাকে আশীর্বাদ করে আপনারা
স্বর্গলোকে চলে যাচ্ছিলেন আর
আমি এই গাড়ীর চাকায় পিষ্ট সময়ে
ধর্ষিতার রোদন ও কৃষকের খেতপোড়া গন্ধের ভেতর থেকে
চিৎকার করছি- আপনারা আসুন!
হে মহান মানুষেরা, এই মর্তলোকে আসুন! ' (ওমর খৈয়ামের জন্মদিনে)
ম্যাথু আরনল্ড তার সময়ের প্রবণতার সমালোচনা করেছিলেন । কারণ বিশ্বাস থেকে সরে এসে ওরা আত্মাহীন মানুষে পরিণত হয়েছে। জাগতিক লোভ লালসা তাদের আত্মিক উপকরণগুলো নষ্ট করেছে।
মুসা আল হাফিজও সমালোচনা করছেন তাঁর কালের। প্রজ্ঞাপুরুষ ওমর খৈয়ামের সাথে আলাপে তিনি জানান-
'আগাছা থেকে ধান ফলাবেন বলে
প্রথমে উচ্ছেদ করা হয়েছে ধানের চারা
পানির বদলে প্রশ্রাব দিয়ে উর্বরতার পরীক্ষা করা হচ্ছে
আলোসন্ত্রাসের জন্য সূর্যকে নিষিদ্ধ করতে চাইছেন বাদুড়েরা
হৃদয়কে নিলামে তোলা হলে কালের ক্রেতারা
দাম হাকেনি বলে সে এখন সর্বাধিক আদনা আসবাব!
হৃদয়ের কথা শুনে ওমর খৈয়াম শিউরে উঠলেন।
যেন শুনেছেন ইশ্রাফিলের বাঁশি থেকে উচ্চারিত কোনো সুর!
জানতে চাইলেন, হৃদয় উপেক্ষিত হলে মানুষ কীভাবে আছে?
বললাম, যেভাবে থাকে সাপের মুখে ব্যাঙ! ' (ওমর খৈয়ামের জন্মদিনে)
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লড়াই তাই লড়তে হবে। সেই লড়াইয়ের পতাকা উত্তোলন করছেন মুসা আল হাফিজ। ঘোষণা করছেন-
'অতএব, পশ্চিম থেকে ধেয়ে আসা হৃদয়হীন
দর্শনের বিরুদ্ধে আমরা জ্বালিয়ে দিয়েছি বিশ্বাসের বিদ্যুৎশিখা
নির্জীব রাত্রি সাপের উদরের মতো মৃত্যুগহবরে ইতিহাসের
খুরের দাপটে কাঁপছে।
একদিকে ঘোষিত হচ্ছে আশা ও আশ্বাসের আজান,
অপরদিকে আকাশের স্তরে স্তরে হতাশার আলকাতরা
সেঁটে দিচ্ছে দুঃসময়ের ক্যানভাসার!
মানুষের মুখোশপরা জন্তুর মিছিলে প্রগতির নামে চলছে জরার শোরগোল।' (নতুন দিনের কাব্য)
এখানে পশ্চিমা জ্ঞানের হ্নদয়হীন দর্শন বলতে ভোগবাদের মৃত্যুফাদ বা চোরাবলির কথা বলতে ছেয়েছেন কবি। যা সভ্যতার সংকটের জন্যে দায়ী। সাথে অভয় দিচ্ছেন, বিশ্বাসের জ্যোতিকে প্রতিহত করতে পারবে না মিথ্যার দূরভিসন্ধি! কবি মুসা আল-হাফিজ এভাবে মানুষসৃষ্ট জ্ঞানের চোরাবালির বার্তবাহক না হয়ে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বংশীবাদক হতে চেয়েছেন।

সাত
আপাদমস্তক আশাবাদের কবি বলে অভিহিত রবার্ট ব্রাউনিং(১৮১২-১৮৮৯) এর কবিতায় ঘুরফিরে যা আসছে তা হচ্ছে- ধর্মীয় আশাবাদ। The Patriot কবিতায় আমরা কী দেখি? কবিতার নায়ক যে কিনা মাত্র বছর খানেক আগে বীরের বেশে শহরে এসেছিল। দেশবাসীও বীরোচিতভাবে তাকে গ্রহন করে। বছর খানেক অতিক্রান্ত হতে না হতেই ভুল বুঝে তার স্বজাতি বীরত্বের গায়ে খলনায়কের তকমা লাগিয়ে দেয়। শহরে আসার সময় ফুল জুটলেও এখন পাথরের আঘাতে তাকে দেয়া হচ্ছে বিদায়ী সম্ভাষণ! মানুষের ভুল বিচারে সে যখন মর্মাহত, ক্ষতবিক্ষত ঠিক তখন মনে আশার ঝিলিক- জাগতিক না পাওয়ায় বা বিপদে লুকিয়ে আছে উত্তম প্রতিদান, উতকৃষ্ট মূল্যায়ন । পরম করুনাময়ের ফয়ছালাই তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ।
মুসা আল-হাফিজ যেন রবার্ট ব্রাউনিং এর রোহানি কবি-বন্ধ‚ যিনি কিনা অপ্রত্যাশিত বিপদকে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহের মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। আত্মজীবনী কবিতায় তিনি লিখেন-
'ও পিতা!
ইউসুফের রক্ত ঝরিয়েছে তার ভাইগণ
নেকড়ের কোনো দোষ নেই! '
ও ইউসুফ!
এরা তোমারই ভাই
যদিও নেকড়ের অধিক!
তোমাকে শেষ করার
আয়োজনে হয়তো
রয়েছে মহাশুরু!
যাও,
মৃত্যুকূপের অন্ধকারে
আছে মিশর জয়ের চাবি! '
কবি মুসা আল-হাফিজের কবিতায় ধর্মীয় আশাবাদ তীব্র। আধারের বুকে একজন কবি হবেন দ্বীপশিখা। আর সেই দ্বীপশিখার উতসমূল যখন অধ্যাত্মিকতার নূরের সাথে একাকার, তখন কোনো হতাশাই আর পথ রোধ করতে পারে না। যার বহিঃপ্রকাশ কবি মুসা আল হাফিজ করেছেন এভাবে-
'আলকাতরা অন্ধকারে বিশ্বাসের জয় লিখে
রক্তের পিপাসা সেই আমার আমির খোঁজে
ইবলিস, জল্লাদ, বেশ্যা আর আগুনের বিরুদ্ধে
ছুড়ে দিলাম সত্তার অমিয় জিকির
হারানো আমির নৃত্যে মেতে উঠল রাতের হৃদয়।' (রাত্রের কবিতা) ।
The Patriot কবিতার নায়কের মতই কবি মুসা আল হাফিজের পুরুস্কৃত হওয়ার জায়গা- স্রষ্টা। এভাবে কবি যখন ঋষি হন আর ঋষি যখন কবি হন, পাঠকরা ভাগ্যবান হন। পুরোহিত-কবি মুসা আল হাফিজ পাঠককে করে তুলেন প্রার্থনার সঙ্গী, প্রেমার্থী যে প্রেম নিবেদিত হয় প্রভুর দিকে। সেই প্রেম প্রভু ও মানুষে, মানুষ ও সৃষ্টিজগতে একাকার। পরস্পর পরস্পরের পরমাত্মীয়।

আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের দিকপাল, যার কথা কিংবা যার কবিতা বাদ দিলে অপূর্ণ থেকে যাবে ইংরেজি আধুনিক সাহিত্য; তিনি হলেন নোবেল লরিয়েট টি. এস. এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) । আমেরিকার সেইন্ট লুইস শহরে জন্ম হলেও ইংল্যান্ডের লন্ডনের মাটি থেকে মাথা তুলেছে তার কাব্য প্রতিভা । ফলে স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছেন লন্ডনবাসী কবি পরিচয়। তার বিখ্যাত সেই The Waste Land কবিতা সম্পর্কে আমরা জানি। যেটি পৃথিবীকে দেখিয়েছিল কবিতা আর অকবিতার তফাৎ। একভাগে ছিল পড়াশুনাবিমুখ কবিদের অকবিতা আর অন্যদিকে ছিল মহর্ষির মত প্রাজ্ঞ কবিদের নির্মিত কবিতা । কবিতাটি পাঠকদের জন্যে এনেছিল জীবনের বার্তা; কবিদের জন্যে ছিল কবিতা শেখার বার্তা।
মুসা আল হাফিজের কবিতা ফ্যাক্ট ও ফ্যান্টাসির ভারসাম্যের মিশেল । যার ফলে উপস্থাপিত বয়ান কাল্পনিক না হয়ে, হয়ে ওঠে প্রমাণিক। এমনকি ক্রিয়েটিভ লেখালেখির পয়েটিক লাইসেন্স এর অজুহাত দেখিয়ে মনগড়া কথা বলেন না তিনি। সাধারণ গদ্যেও তার চরিত্র একই। ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্যে ব্যাপক দখল থাকার কারণে, প্রয়োজনীয় রেফারেন্স এনে নিজের চিন্তাকে করে তুলেন নৈর্ব্যক্তিক। তিনি অনুঘটকের ন্যায় ভূমিকা পালন করে পাঠককে সত্যনিষ্ট উপলব্দির দিকে অনুগামী করে তুলেন। লেখকের প্রাজ্ঞতা বা ধ্যনের সমস্তটুকু কলমের কালিতে উপস্তাপিত হতে অনেক সময় হেরফের হয়! এ ক্ষেত্রে মুসা আল হাফিজ অনন্য। তার কবিতা অগ্রসর পাঠকের।তিনি তরল ও সস্তা আবেগের ফেনা নিয়ে ব্যবসা করেন না। শব্দের অপচয় ও মর্মের অপমান তার কাব্যে নাজায়েজ।
আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের দিকপাল, যার কথা কিংবা যার কবিতা বাদ দিলে অপূর্ণ থেকে যাবে ইংরেজি আধুনিক সাহিত্য; তিনি হলেন নোবেল লরিয়েট টি. এস. এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) । আমেরিকার সেইন্ট লুইস শহরে জন্ম হলেও ইংল্যান্ডের লন্ডনের মাটি থেকে মাথা তুলেছে তার কাব্য প্রতিভা । ফলে স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছেন লন্ডনবাসী কবি পরিচয়। তার বিখ্যাত সেই The Waste Land কবিতা সম্পর্কে আমরা জানি। যেটি পৃথিবীকে দেখিয়েছিল কবিতা আর অকবিতার তফাৎ। একভাগে ছিল পড়াশুনাবিমুখ কবিদের অকবিতা আর অন্যদিকে ছিল মহর্ষির মত প্রাজ্ঞ কবিদের নির্মিত কবিতা । কবিতাটি পাঠকদের জন্যে এনেছিল জীবনের বার্তা; কবিদের জন্যে ছিল কবিতা শেখার বার্তা।
কবি মুসা আল হাফিজের কবিতা ফ্যাক্ট ও ফ্যান্টাসির ভারসাম্যের মিশেল। যার ফলে উপস্থাপিত বয়ান কাল্পনিক না হয়ে, হয়ে ওঠে প্রমাণিক। এমনকি ক্রিয়েটিভ লেখালেখির পয়েটিক লাইসেন্স এর অজুহাত দেখিয়ে মনগড়া কথা বলেন না তিনি। সাধারণ গদ্যেও তার চরিত্র একই। ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্যে ব্যাপক দখল থাকার কারণে, প্রয়োজনীয় রেফারেন্স এনে নিজের চিন্তাকে করে তুলেন নৈর্ব্যক্তিক। তিনি অনুঘটকের ন্যায় ভূমিকা পালন করে পাঠককে সত্যনিষ্ট উপলব্দির দিকে অনুগামী করে তুলেন। লেখকের প্রাজ্ঞতা বা ধ্যনের সমস্তটুকু কলমের কালিতে উপস্তাপিত হতে অনেক সময় হেরফের হয়! এ ক্ষেত্রে মুসা আল হাফিজ অনন্য। তার কবিতা অগ্রসর পাঠকের।তিনি তরল ও সস্তা আবেগের ফেনা নিয়ে ব্যবসা করেন না। শব্দের অপচয় ও মর্মের অপমান তার কাব্যে নাজায়েজ।
মুসা আল হাফিজের অভিব্যাক্তি টিএস এলিয়টের মতো হয়ে উঠে সর্বজনীন। উচ্চমার্গীয় চিন্তা আর উপযুক্ত শব্দচয়নের মিত্রতা আছে তার রচনায়। উচ্চমর্গীয় গভীর দার্শনিক চিন্তাকে পাঠকের বোধগম্যতায় নিয়ে আসতে পারা খুব দুরহ ব্যাপার। এটা যে কোন কবির জন্য কঠিন। কারণ উচ্চমর্গীয় চিন্তা দৈনন্দিন শব্দে প্রকাশিত হতে চায় না আর দৈনন্দিন জীবনের শব্দগুলো সুগভীর তাত্ত্বিক আলোচনা উপস্থাপন করতে পারে না। তাই বাংলা সাহিত্য উচুমানের লেখা আর পাঠকের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের দুস্তর ব্যবধান। কবি মুসা আল হাফিজ এমন কবি যার শব্দচয়ন, উপমা, বলার ভঙিমা ধারণ করেছে উচ্চমার্গীয় দার্শনিক আলাপ, একই সাথে প্রোতিত হয়েছে পাঠকের অন্তরে! কবি মুসা-আল হাফিজ এর লেখা হয়ে উঠছে, অরো হয়ে উঠবে, চাপ্পানো হাজার বর্গমাইলের সুচিন্তার, সুদ্ধতার পথিকৃত।
The Waste Land কবিতায় টি. এস. এলিয়ট ১ম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইংল্যান্ড তথা গোটা ইউরোপের যন্ত্রনা, হাহাকার, হতাশা, বিকৃত যৌন কর্ম, পাপাচার, নৈতিক অধঃপতনে জর্জরিত অন্তঃসারশূন্য যাপিত জীবনের রীতি নীতি, অমানবিকতার আস্ফালন ইত্যাদি ফটোগ্রাফারের মত তুলে ধরেছেন। চারুশিল্পির মত শব্দের বুননে চিত্রিত করেছেন বাস্তবতা। কীভাবে মানুষগুলো ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের পবিত্রতা থেকে ছিটকে পড়ে লন্ডন শহর তথা পৃথিবীকে নরক বানিয়েছে। আধুনিক মানুষ সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি টেড় না পেলেও টি. এস. এলিয়ট তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে টেড় পেয়েছেন বলেই প্রশ্নাকুল মনে জানতে চেয়েছেন-
'এখানে তো শুধু তুমি আর আমি
তাহলে উনি কে যে তোমার সাথে হাঁটছে?
গুনলে তো দেখি তুমি আর আমিই
কিন্তু যখনি সামনে থাকাই যেন কোনো এক সত্তা
সর্বদা আমাদের সাথে থাকে! '
একই কন্ঠস্বর কবি মুসা আল হাফিজের সেজদা কবিতায়-
'যারা জানতে চান আমার অস্তিত্ব, সবার ভাবনায় আমি আছি।
আমার অস্তিত্বকে যারা অস্বীকার করছেন
তাদের মধ্যে যেমন আছি,
তেমনি যারা স্বীকার করছেন, তাদের মধ্যেও আছি!
আমাকে যে প্রমাণ করতে হচ্ছে আমার থাকা-
এটাই আমার থাকার প্রমাণ! '
সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের এমন মাধুর্যপূর্ণ কাব্যিক উপস্থপনা দেখে পাঠকরা ভাবুক না হয়ে পারে না! টি. এস. এলিয়ট আধুনিক মানুষ তথা সভ্যতার সমস্যা তুলে ধরেই দায়িত্ব শেষ করেন নি, দিয়েছেন সমাধানও। সমাধানের মূলমন্ত্র দিতে গিয়ে বেছে নিয়েছেন ভারতীয় উপনিষদের ধর্মীয় উপাখ্যান। কোনো এক সময় উত্তর ভারত খরা এবং দুর্ভিক্ষে জর্জড়িত ছিল। আক্রান্ত মানুষ ফরিয়াদ করেছিল পরমাত্মার কাছে।
প্রার্থনা কবুল হলো। অধিশ্বর বজ্রধ্বনির মধ্য দিয়ে সুধালেন একই শব্দ তিনবার- Da, Da, Da। এই শব্দগুলোর রয়েছে উপদেশমূলক অর্ন্তনিহিত অর্থ- প্রথম Da বলতে Datta যার অর্থ মানবকুলকে আত্মউৎসর্গীত মনোবাসনা রপ্ত করতে হবে; দ্বিতীয় Da বলতে Dayadhavam যার অর্থ সৃষ্টিকুলের প্রতি সহানুভুতিশীল হতে হবে; তৃতীয় Da বলতে Damyata যার অর্থ মানুষকে সংযমী হতে হবে। কবিতার শেষ অংশে বর্ণিত উপনিষদের এই ঘটনাটি প্রতিকী অর্থে বলা হয়েছে।
এককথায় যদি বলি তাহলে বলা চলে আধুনিক ইউরোপের মানুষকে তথা গোটা পৃথিবীর প্রতি টি. এস. এলিয়টের আহবান ছিল- হে মানবকুল যদি পরিত্রান পেতে চাও, চলে এসো ধর্র্মীয় অনুশাসনের ছায়াতলে! টিএস এলিয়টের মত কবি মুসা আল হাফিজের কাব্যদৃষ্টিও ধারণ করেছে আশপাশ- ক্ষুধা, শ্রেণীশোষণ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ব্যক্তিক ও সামষ্টিক নৈতিক স্খলন যার সমাধান হিসেবে কবি মুসা আল হাফিজও কাব্যের শৈলীতে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন ধর্মীয় প্রেসক্রিপসন। তাই তার কবিতা রঙ্গলীলা না হয়ে, হয়ে উঠেছে মানবমুক্তির পরিত্রাণপত্র। যা এসেছে কবি আর ঋষি মনের যুগলবন্ধী থেকে। তাই বাংলা সাহিত্যের উত্তরাধুনিক কবি ও পুরোহিতের নাম- মুসা আল হাফিজ।

আট
ধর্ম এবং কবিতার সম্পর্ক নিয়ে বাংলা সাহিত্যে একদম খোলাখুলি কথা বলেছেন ড. হুমায়ুন আজাদ। যদিও তাঁর মধ্যে অতিমাত্রার স্ববিরোধ আছে। প্রথাবিরুধী লেখক হিসেবে বিশ্বাস- অবিশ্বাসের তর্কে আমরা তার উদাহরণ প্রায়ই আনি। তাই তার প্রসঙ্গ এখানে না টেনে পারছি না।
ব্যক্তি হুমায়ুন আজাদ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে অন্যদের মত ভন্ডামি না করে তার অবস্থানটা পরিস্কার করেছেন। লেখক হুমায়ুন আজাদ লেখায়ও পাঠককে তার অবস্থান পরিস্কার করে সততা দেখিয়েছেন, যেখানে অন্য অবিশ্বাসীরা সৎ সাহস না দেখিয়ে পাঠকের সাথে করেছেন প্রতারণা। ধর্মে বা বিশ্বাসে হুমায়ুন আজাদের আপত্তি থাকলেও, সাহিত্যে ধর্মের প্রভাব স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি। তার লেখা একটা লাইন আমার অবিশ্বাস বই থেকে উদ্ধৃতি করতে ইচ্ছে হচ্ছে- 'বিশ্বের সাহিত্যের বড়ো অংশ দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বাসের ভিত্তির উপর...।'
ভাষাবিদ, সমালোচক এবং কবি হুমায়ুন আজাদ তার আমার অবিশ্বাস বইয়ে কবুল করেছেন যে, টি. এস. এলিয়টের কবিতায় ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মের প্রতি অঙ্গীকার কতো গভীর। এই বিশ্বাসটুকু তার ভালো লাগেনি। তা সত্তেও আজাদ অকপটে স্বীকার করেছেন টি. এস. এলিয়টের কাব্য প্রতিভার কথা। আজাদ লিখেছেন - 'টি. এস. এলিঅটের অজস্র চিত্রকল্প আর উক্তিতে আমি মুগ্ধ...।... এগুলো ষাটের দশকে যেভাবে আলোড়িত করত আমাকে, যেভাবে আমার চোখের সামনে দাঁড় করাত অবনর্ণীয় দৃশ্যের পর দৃশ্য, আজো করে...।...আজো আমি গুন গুন করতে ভালোবাসি- 'Here is no water but only rock/Rock and no water and sandy road'...'Who is the third who walks always beside you? '
এভাবে হুমায়ুন আজাদ- কবিতার ভাষ্যকে মেনে না নিলেও কবিতার সৌন্দর্য তথা টি. এস. এলিয়টের কাব্য প্রতিভার সমাদর করতে কার্পণ্য করেননি। তাছাড়া হুমায়ুন আজাদ এই বইয়ে- কবিতায় ধর্মীয় বিশ্বাস বা দর্শন এর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি থাকা নিয়ে আরেকটু খোলাসা করেছেন- 'দর্শন বাজে হয়েও কবিতা অসাধারণ হতে পারে, আর গুরুগম্ভীর দারুণ দর্শনসম্পন্ন হয়েও কবিতা হতে পারে শোচনীয়রুপে নিকৃষ্ট।' অর্থ্যাৎ কবিতায় কতখানি বিশ্বাস কতখানি অবিশ্বাস আছে, তার চেয়ে বড় কথা- কবিতায় শিল্পমান কতখানি আছে সেটা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হুমায়ুন আজাদ তার বক্তব্যের সততা ধরে রাখতে পারেননি কবি আল-মাহমুদের বেলায়। অচিরেই হুমায়ুন আজাদের খলিফারা মুসা আল-হাফিজের প্রশ্নেও একই পথে হাটবেন।
কেননা কবি মুসা আল হাফিজের কবিতার যে কাব্যশৈলী তা অস্বীকার করা অসম্ভব। সেক্ষেত্রে কবি মুসা আল হাফিজের বেলায় হুমায়ুন আজাদের মতই স্ববিরোধীতা করা ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প হাতে নেই। আধুনিক বাংলা কবিতা নামে ১৯৯৪ সালে হুমায়ুন আজাদের একটি সংকলন বের হয়। যেখানে দাবি করা হয় - 'এ যাবৎ আধুনিক কবিতার যত সংকলন বের হয়েছে এমনকি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত আধুনিক কবিতা (১৯৫৪) এর সংকলনটিও ত্রুটি বহন করে। কেননা এখানে সংমিশ্রন ঘটেছে কবিতা ও অকবিতার।'
আমি অতীতের প্রকাশিত কবিতা সংকলনের অসম্পূর্ণতা কিংবা পূর্ণতার ব্যাপারে বলতে চাচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি- এই সংকলন নিয়ে। এই সংকলনে সবার জায়গা হলো ।অথচ আধুনিক কবিতার পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ খ্যাত আল মাহমুদ এর জায়গা হলো না। কেন হলো না? তার কবিতা আধুনিক হয়নি বলে? তার কবিতা অকবিতা বলে? চিত্রকল্প, রুপক, উপমা, অণুপ্রাস বিবর্জিত বলে? তার জায়গা হয়নি কেন, তা না বললেও পাঠকরা বুঝে নিয়েছেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রলেপ কবিতায় ছিল বলেই বাতিল করা হয় আল-মাহমুদকে।
কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ উপন্যাসে সোনালি কবিনকে ব্যঙ্গ করে, আল মাহমুদকে- আলি মাহমুদ বলে, কবিতার মঞ্চ থেকে হুমায়ুন আজাদ ফেলে দিতে চেয়েছেন। কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসান রশিদের কবি হওয়ার জন্যে রক্তমাংশের ঊর্ধ্বে উঠার যে সংগ্রাম, তা বাংলা সাহিত্যে অভূতপূর্ব। হুমায়ুন আজাদের সামগ্রিক কাব্য দর্শনের সাথে আল- মাহমুদকে অস্বীকার করার ব্যাপারটা হূমায়ুন আজাদের নিজেরই স্ববিরোধীতা। ধর্মীয় বিশ্বাস অপ্রিয় হওয়ার পরেও টিএস এলিয়ট এর কাব্য প্রতিভাকে গ্রহণ করতে পারলে আল-মাহমুদকে নয় কেন? আল-মাহমুদ কে বাদ দিতে যেয়ে আজাদের বইয়ের পূর্ণতাই বাদ পড়ে গেছে।
ফিরে আসি মুসা আল হাফিজের কথায়। যারা বর্তমানে ধর্মকে উৎখাত করা বা যৌনতার বিকৃত বর্ণনা দেয়া বা আবহমান বাংলার সংস্কৃতির বুকে চাবুক মারাকে মনে করেন কবিতা বা আধুনিক কবিতা, তাদের জন্যে মুসা আল হাফিজ পয়েটিক ডিফেন্সের নাম। কবি আল মাহমুদের সময়ে ডানে বামে তাঁর সমকক্ষ মেধাবী ছিলেন।আল মাহমুদ সবাইকে ছাপিয়ে উঠে এসেছেন। কিন্তু কবি মুসা আল হাফিজের সময়টা একান্ত তার। নিছক কবিতা দিয়ে তাকে সংজ্ঞায়িত করার কোনো সুযোগ নেই।তার চিন্তার জগতটা অনালোচিত হলেও বিপুলা। তাঁর গভীরতা, ব্যাপ্তি ও বহুমাত্রিকতার তুলনা করবো, এমন প্রতিভার সন্ধান মিলছে না, অদুর ভবিষ্যতেও দেখছি না।
ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য এই পাচটা শাখাকে একসাথে ধারন করে কলম ধরার নজির বাংলা সাহিত্যে খুব একটা নেই। বরং উল্টোটা ঘটেছে, বিরোধ বেঁধেছে, লেখকের এক জ্ঞান পথ রোধ করেছে আরেক জ্ঞানের। না চাইলেও ব্যাক্তি লেখকরা চিন্তায় তৈরী করেছেন বৈরিতা! অনেকেই বহুমাত্রিত জোতির্ময় হতে যেয়ে থুবড়ে পড়েছেন, মুখ থুবরে পড়ার প্রথম সারিতে আছেন অনেকেই, সেদিকে যাচ্ছি না। মুসা আল হাফিজ এখানে ব্যতিক্রম। তিনি অনেকটা শেক্সপিয়ারের মত ওয়ান ম্যান শো। তাই তাকে মোকাবেলার জ্ঞানীয় পথ বন্ধ, তাই অজ্ঞতার কোন ভয়ঙ্কর পথ কেউ বেছে নেয় কিনা, আমি জানি না। তাই প্রার্থনা রেখে গেলাম কবি মুসা আল হাফিজ এর জন্যে।

নয়
গ্রিক থেকে শুরু করে পুরো ইউরোপের কবিতায় জায়গা করে নিয়েছে অলিম্পিয়াসে বাসরত দেব-দেবীদের কল্পকাহিনী। শুধু কি কবিতায়? অলিম্পিয়াস তথা পৌরাণিক কাহিনী প্রচারে অনেকটা পাদ্রিসুলভ ভূমিকা পালন করেছে পুরো ইংরেজি সাহিত্য! তাইতো ইংরেজি সাহিত্যের নির্যাস পেতে হলে আগে গিলতে হয় গ্রীক পুরানের ভেতর- বাহির। সেখানে আমরা কেন নিজের ধর্মীয় বোধকে, ধর্মীয় অনুষঙ্গকে (যা সাহিত্য রচনার উর্বর পটভূমি হতে পারত সব লেখকদের জন্যে। যেটা ইতোমধ্যে কবি মুসা আল হাফিজ করে দেখিয়েছেন!) শত্রু বানিয়ে খুনের গোপন বাসনা লালন করছি?
কবিতায় ধর্ম আনলেই আপনি সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবেন, এমন না। আমাদের মহামতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি বাংলা সাহিত্যের পুরো আকাশজুড়ে বিরাজমান, যখন Song Offerings এ ঋষির মত অঞ্জলি দিয়ে যাচ্ছিলেন, প্রতিটি শব্দের ভেতরে, তখন সচেতন পাঠক সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পায় নি, পেয়েছে একজন কবির কাব্যিক আরাধনা। যার মধ্যে দিয়ে সকল ধর্মের মানুষ একটা পথের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা করেছে। ইউরোপও তাই দেখেছে, বস্তুবাদের জোয়ারে তারা যখন কুলহারা, তখন রবীন্দ্রনাথের আরাধনায় তথা বিশ্বাসের নৌকায় উঠতে চেয়েছে, এ জন্যেই তো সেকালের প্রতিষ্টিত ইংরেজ কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েটস, নোবেল কমিটিকে অনুরোধ করেছিলেন যোগ্য রবীন্দ্রনাথের গলায় পুরুস্কারটি পরিয়ে দিতে। Song Offerings এর দ্বিতীয় মুদ্রণে ডব্লিউ. বি. ইয়েটস ভুমিকাও লিখে দিয়েছিলেন। ডব্লিউ. বি. ইয়েটস আলোড়িত হয়ে বলেছিলেন- 'Translations from Rabindranath Tagore have stirred my blood as nothing has for years…'
১৯১৩ সালে মূলত রবীন্দ্রনাথকে পুরুস্কার দেয়া হয়নি! তাহলে কাকে দেয়া হলো? সৃষ্টিকর্তার প্রতি রবীন্দ্রনাথের নিবেদিত আত্মসমপর্ণ এবং তার শিল্পমূল্যকে সেদিন পুরুস্কৃত করা হয়েছিল। তাই তো ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের কবিতার ব্যাপারে অকপটে বলতে পেরেছিলেন- 'কবিতাগুলো এমন মাটি থেকে জন্মেছে, যেখানে কবিতা আর ধর্ম একই বাঁধনে বাঁধা (… they yet appear as much the growth of the common soil as the grass and the rushes. A tradition, where poetry and religion are the same thing) ।'
যেনতেন কেউ মন্তব্যটা করলে ছুড়ে ফেলা যেত, বলেছেন বিংশ শতাব্দির অন্যতাম মেধাবী একজন কবি। আমাদের আদি বই চর্যাপদ এ যদি ফিরে তাকাই সেখানেও তো একটা ধর্মের গুণকীর্তনই পাই। যদিও আজকাল সেই চর্যাপদেরও যত্ন নেই। কবি মুসা আল-হাফিজ শেকড়মুখী কবি তাই তো ব্যথিত হচ্ছেন তার আদি কবিদের প্রতি সমকালীনদের উদাসীনতা দেখে। লিখছেন-
'নদীও তো কোথাও আবৃত্তি করছে না চর্যাপদ
একটি ক্ষুধার্ত ভ্রমর জানিয়ে গেল
বাগানে একটি ফুলও আর ফুটবে না
রাত্রির নিঝুম প্রহরে সিদ্ধান্ত হয়েছে।' (ইনসাফের প্রতি খোলা চিঠি) ।

ডব্লিউ. বি. ইয়েটস এর কথাকে একটু বর্ধিত করে আমি বলব- নদীতে যেভাবে ভেতর থেকে আপন মনে চর জেগে উঠে, প্রত্যেক দেশের কবিতাও তেমনি আপনা আপনিই জেগে উঠবে তার মাটি ও মানুষ থেকে। আরেকটু গভীর করে বললে- প্রতিটি বাঙালির অন্তর খুঁড়লে অতিন্দ্রিয় আধ্যাত্মিকতার ঘ্রানের ছড়াছড়িই তো পাই। সুতরাং কবিতায় ধর্মীয় বিষয় আসাটা অপরিহার্য। আর সেটিই করেছেন কবি মুসা আল হাফিজ । এটা নিয়ে বাকা চোখে তাকানোর সুযোগ কই?
হ্যাঁ তাকানোর একটা ক্ষেত্র আছে, তা হলো- শিল্পমান। বিষয়গত দিক এর পাশাপাশি কবি মুসা আল হাফিজের কবিতার অন্তর্ছন্দ, গঠনশৈলী, শব্দ-সমন্বয়, অর্থের দ্যোতনা, বহুমাত্রিক রিদম, রুপক, চিত্রকল্প উপমা, মেটাফর, অনুপ্রাস, কনসিট- তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা না জানিয়ে পারবে না যে কোনো সr সমালোচক।

দশ
আমি বিশ্বাস করি সময়ের পালাবদলে জীবন ধারা এবং কবিতার ধারায় পরিবর্তন হবেই। কবিতা বিভিন্ন বাক নেবে, যেটা আগেও নিয়েছে এবং এটাই জীবন এবং কবিতার অনিবার্য নিয়তি। তবে এতে কবিতার ভাষা, তাল- লয়, ঢং বদল হলেও সত্যের বদল হয় না। কেননা সত্যের শুরু ও শেষ স্বরূপ একই। তাই মুসা আল-হাফিজ প্রাসঙ্গিক আছেন, থাকবেন। কেননা নদী যেমন জলকে বহন করে, তার কবিতা তেমনি সুন্দর ও সত্যকে বহন করেছে, যা প্রবাহমান থাকবে অনাদিকাল।
আমরা আমাদের যুগের পথে হাঁটব। তবে নিজের স্বকীয় পথ তৈরী করতে হলে জানতে হবে পূর্বসুরীদের পথ। অনেকগুলো পথ জানা হলে নিজের পথটা বেরিয়ে আসবে সহজে সঠিকভাবে; আর এই পথ হবে টেকসই, না হয় কোথাও ফারাক থেকে যাবে। প্রয়োজনে আমরা অতিক্রম করব পূর্বসুরীদেরও। তবে এই অতিক্রমটা তাদেরকে জেনে, অবহেলা করে নয়। না হয় এটা অতিক্রমের বদলে হবে বিচ্ছিন্নতা। কবিতা কোনো বিচ্ছিন্ন শাখা নয়, তার আছে সুগভীর শেকড়। এই ক্ষেত্রে শেকড় সন্ধানী কবি মুসা আল হাফিজ এর কবিতা অতীত আর বর্তমানের সেতু হয়ে উঠেছে।

পাঠকরা ভাববেন না যে আমি ইংরেজি কবিতার ধর্মীয় ব্যাপারগুলো এনেছি মুসা আল হাফিজকে সেনাপতি বানিয়ে বাংলা কবিতায় ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার জন্যে। আমি কৃষকের লাঙ্গল ছুয়ে বলছি, শ্রমিকের দেশপ্রেম মাখা ঘাম ছুয়ে বলছি, আমার গর্ভধারিনী মা'কে ছুয়ে বলছি এবং আমার ভবিষ্যতব্য কবরের মাটি ছুয়ে বলছি- আমি এসকল প্রসঙ্গ এনেছি- কবিতাকে রক্ষা করতে।
অপ্রিয় হলেও সত্য, বর্তমানে একটা মেধাবী প্রজন্ম সাহিত্য চর্চায় নামলেও তাদেরকে ধর্মবিদ্বেষী করে তাদের মেধাকে একমুখী করে কী ক্ষতিটা না-ই করছেন কেউ কেউ! গোত্র বিশেষের লাভ হলেও ক্ষতি হচ্ছে কবিতার তথা পুরো বাংলা সাহিত্যের। আমার কথাগুলো সবাইকে যে মেনে নিতে হবে, তা নয়। উপলব্দির ব্যাপারে ভিন্নমত থাকতে পারে। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। আমার বক্তব্য মানতেই হবে এমন চরমপন্থাতে আমি নাই। বোধের ব্যাপারে চূড়ান্ত বলতেও কিছু নেই। কেউ যদি মনে করে আমি যে পথে হেঁটেছি এটাই একমাত্র পথ, এই পথেই সবাইকে হাঁটতে হবে, এটা বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই নয়, যদিও এই বাতুলতা অনেকেই লালন করেন আজকাল। প্রগতিশীলতার কয়েকটা মাপকাটির মধ্যে একটা অন্যতম মাপকাটি হচ্ছে- সহনশীলতা। এটা কবিতা-প্রেমী বা কবিতা-কর্মীদের মধ্যে থাকা চাই। ক্ষুদ্র চিন্তা মানুষকে ক্ষুদ্র করে। অন্যদিকে সহনশীল চিন্তা মানুষকে বড় করে। মানুষ, পৃথিবী তথা মহাবিশ্বের চেয়েও বড়- একমাত্র চিন্তার ব্যাপকতার বলেই।

সর্বশেষ একটা পরিচিত গল্প দিয়ে কবি মুসা আল হাফিজের কাব্যমূল্যায়ন শেষ করতে চাই। কনফুসিয়াস (৫৫১-৪৭৯ খ্রিস্টপূর্ব) সর্বজনবিদিত চীনের একজন লেখক ও দার্শনিক। যার জ্ঞান ও সদগুণ তার চারপাশকে বিমোহিত করে রেখেছিল। তার কাছে একবার অগণিত অনুসারি এসে হাজির হন। তারা জানতে চান- 'আপনি নিশ্চয়ই স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা জানেন। এই রাস্তার ব্যাপারে আমাদের বলুন! '
কনফুসিয়াস আসলে স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা জানেন না। এই না জানাকে কী করে এই শুভাকাঙ্খিদের সামনে বলবেন, তিনি বুঝতে পারছেন না। অনুসারীরা এই সত্য মেনে নিতেও সম্ভবত প্রস্তুত না। একদিন তিনি নিজ সন্তানকে ডাকলেন। বললেন বাবা অনুসারীদের সত্যটা বলতে না পারলেও অন্তত তোমার কাছে বলতে আমার দ্বিধা নেই । আমি সত্যি স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা জানি না। তবে এই নাও একখানা বই। যেটা তোমাকে এবং তোমাদেরকে স্বর্গে যাওয়ারর রাস্তা দেখালে দেখাতেও পারে! বইটি ছিল কবিতার। ঠিক একইভাবে আমিও পাঠকদেরকে বলতে চাই- এই নাও কবি মুসা আল-হাফিজের কবিতার বই, তার আত্মায় যে সত্যের আওয়াজ রয়েছে, তাতে স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা পেলেও পেতে পারেন।

মোহাম্মদ মহি উদ্দিন
পিএইচডি গবেষক
এডুকেশনাল লিডারশীপ, পলিসি এন্ড টেকনোলজি স্টাডিজ
আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র
৩০২ রিড স্ট্রিট, ২০ মে, ২০২৪,
mohi.sust6049@gmail.com

COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success