ছোট্টবেলায়, আমার স্কুলে যাওয়ার পথে, রাস্তার বাঁকে একটা বট গাছ ছিলো। সেই বটগাছটার ছায়া আর পরিবেশ, বেশ শান্ত সুশীতল ছিলো।
রাস্তার একধারে খাল, আর অন্যধারে সবুজ ধান জমি। স্কুল থেকে ফেরার পথে, প্রায়ই, গাছটার নীচে বসতাম আমি। ঘাসের উপর, খালের দিকে মুখ করে। খালের ওপারেও ছিলো, সারি সারি ইউক্যালিপ্টাস গাছ। আর তারপর সবুজ ধান জমি।
এই বট গাছটা, আমার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু হয়ে উঠেছিলো। উপমা অর্থে নয়। আক্ষরিক অর্থে। আমার বহু সুখ দুঃখের সাথী ছিলো এই গাছটা। সিডনি থেকে ফিরে, এখনো যখন গ্রামে যাই আমি, এই গাছটার নীচে দাঁড়ালে, কেমন যেন অন্যরকম এক অনুভূতি হয় আমার। সেই অনুভূতি সদর্থক এক অনুভূতি। আমি তাই, আমার বহু কবিতা আর উপন্যাসে, এই গাছটার কথা লিখেছি।
এখন বড় হয়েছি আমি। বুঝেছি, মানুষ হিসেবে আমরা যত বেশি অনুভূতিশীল আর সহমর্মী হবো, তত কম একাকীত্ব অনুভব করবো আমরা। আর যত বেশি ঘৃণা বা বিদ্বেষ পরায়ণ হবো আমরা, তত বেশি নিঃসঙ্গ বোধ করবো আমরা।
আমি যেহেতু এই গাছটাকে, অন্তরঙ্গ এক বন্ধু ভাবতাম, তাই গাছটাকে দেখে ভয়ঙ্কর এক আনন্দ অনুভব করতাম আমি। গাছটার সাথে অনেক অনেক কথা বলতাম আমি। সুখের কথা। দুঃখের কথা। ফিলোসোফিক্যাল চিন্তাভাবনার কথা।
আমি যেহেতু সবসময় উদ্ভট উদ্ভট ভাবনা ভাবি, তাই আমার মানুষ বন্ধুরা, আমার ভাবনার সাথে কখনো একাত্ম বোধ করতে পারে নি। তারা, কেউ আমাকে পাগল ভাবে। কেউ আমাকে এড়িয়ে যায়।
সেই অর্থে, আমি এক প্রকার নিঃসঙ্গ ছিলাম। আছি। থাকবোও। কিন্তু তবুও আমি প্রকৃত অর্থে নিঃসঙ্গ নই। আমি গাছের সাথে সত্যিকারের কথা বলতে পারি। নদীর সাথে কথা বলতে পারি। আকাশের সাথে কথা বলতে পারি। এখনো বলি। প্রতিদিন বলি। তাই কোনদিনই আমি, একাকী বা নিঃসঙ্গ বোধ করি নি।
আমার নিঃসঙ্গতা, আগে, এই গাছটার সাথে কথা বলে কাটিয়েছি আমি। আমার জীবনের সেই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে- এই মহাবিশ্বের পথ ঘাট প্রান্তর নদী গাছ, সবকিছুই, মানুষের ভয়ঙ্কর অন্তরঙ্গ বন্ধু হতে পারে। অবলা নদী ঘাট প্রান্তর বা বৃক্ষকে বন্ধু হিসেবে পেতে হলে, মানুষের চাই সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর অনুভূতিবোধ।
আগের যুগের মানুষের, এই গভীর অনুভূতিবোধ ছিলো। অতীতের মানুষ, প্রকৃতিকে, নিজের আত্মীয় ভাবতেন। কিন্তু আজ? তা প্রায় লুপ্ত। মানুষ আজ তাই জনারণ্যে একাকী। সঙ্গ মাঝে ভীষণই নিঃসঙ্গ। তোমরা ভালো থেকো। ডাঃ অরুণ মাজী /সিডনি
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem