চাঁদে যে বুড়িটা চরকা কাটে
ওটা আমার ঠাম্মা।
-
ঠাম্মা আমাকে রঙ বেরঙের গল্প বলতো।
লাল নীল হলুদ সবুজ কত কি।
একদিন ঠাম্মা বললো-
অমল, তোকে একটা, হলদে-নীল গল্প বলবো।
আমি তো লাফিয়ে অস্থির।
বললাম-
ঠাম্মা, হলদে নীল গল্পটা, ভূতের গল্প?
ঠাম্মা বললে, শোন তবে-
এক ছিলো রাজপুত্তুর।
হলদে নীল বরণ
সোনালী লাল গাল
কাজল কালো চোখ।
-
সে যখন ছোট্ট ছিলো
তখন তার মা,
চলে যায় মেঘের দেশে।
না মেঘের দেশে ঠিক নয়।
মেঘের পরের দেশে।
রাজপুত্তুর
তার মাকে, এক পাহাড় ভালোবাসতো।
খুব কষ্ট হতো তার।
স্বপ্নে, প্রতি রাতে, তার মাকে দেখতো সে।
দেখতো, তার মা, আকাশ দেশের বাগানে,
সুন্দরী এক পরী।
সেই বাগানটা, মেঘের উপর উড়ে বেড়াতো।
কত ফুল, কত ফল সেখানে।
তার মা তাকে বলতো-
তুই তাড়াতাড়ি বড় হ খোকা।
তারপর আমাকে তুই,
তোর কাছে নিয়ে আসবি।
-
রাজপুত্তুরের তো তর সয় না।
তাড়াতাড়ি বড় হবে বলে-
প্রতিদিন সে, এক সাগর দুধ খেতো,
এক নদী ঘি খেতো।
রাজপুত্তুরের গায়ে কি জোর!
পক্ষীরাজে, টগবগিয়ে ছুটতো সে।
-
গায়ে যখন তার খুব জোর
একদিন সে আকাশ যাত্রা করলো।
সে যখন- মেঘেদের দেশে পৌঁছবে পৌঁছবে করছে,
ঠিক তখন, নীল রাক্ষস তার পথ আটকালো।
রাজপুত্তুর বললো-
একি! আমাকে তুমি বাধা দিচ্ছো কেন?
জানো না, মায়ের কাছে যাচ্ছি আমি?
আমার এখন খুব তাড়া।
-
রাক্ষস বললো, এটা আমার দেশ।
আমাকে যুদ্ধে না হারালে
যেতে তুমি পারবে না।
রাজপুত্তুর বললো, তুমি জানো না?
আমার ঠাম্মা বলেছে -
কারও সাথে খামোকা লড়াই করতে নেই।
এখন রাস্তা ছাড়ো তুমি।
তোমাকে আমি মায়ের বাগান থেকে
লাল হলুদ ফুল দেবো।
-
দুষ্টু রাক্ষসটা, তবুও রাস্তা ছাড়লো না।
সে রাজপুত্তুরের, কান মুলে দিলো।
রাজপুত্তুর তো রেগে টাঁই!
সে তখন তরোয়াল বের করে, খুব যুদ্ধ করলো।
ঝন ঝন, টং টং, দুম দুম, ঢিসুম ঢিসুম
কত্তো সব কান ফাটানো আওয়াজ।
রাজপুত্তুরের সাথে, রাক্ষস কি আর পারে?
রাজপুত্তুর এক ক্যারাটে প্যাঁচ দিলো,
ব্যাস, রাক্ষস ব্যাটা কুপোকাত।
কিন্তু দুর্ভাগ্য, দুষ্টু রাক্ষসটা,
রাজপুত্তুরকে কামড়ে দিয়েছিলো।
রাজপুত্তুর তাই, অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলো।
-
যখন তার ঘুম ভাঙলো, সে দেখলো-
নরম নরম এক গদিতে, শুয়ে আছে সে।
আর একজোড়া সোনালী চোখ, তাকে দেখছে।
পরে সে বুঝলো, ওটা গদি নয়।
রাজকন্যা মেঘবতীর, নরম নরম কোল।
-
রাজপুত্তুর রাজকন্যাকে বললো-
তুমি কে?
আমাকে ধরে রেখেছো কেন?
-
রাজকন্যা বললো-
"সে কি গো রাজপুত্তুর, তোমাকে ধরে রাখবো কেন?
তুমিই তো আমার কোলে, আছড় খেয়ে পড়লে!
আচ্ছা রাজপুত্তুর, তোমার কান লাল কেন গো?
কেউ তোমার, কান মুলেছে নাকি? "
-
রাজপুত্তুর তো রেগে টাঁই, সে বললে-
আমি রাজপুত্তুর, কার সাহস আমার কান মুলে?
আমি আমার মায়ের কাছে যাচ্ছিলাম।
তুমি কি জানো?
আমার মা, আকাশ দেশের পরী।
-
রাজকন্যা জিজ্ঞেস করলো-
"তুমি কোন দেশের রাজপুত্তুর? "
রাজপুত্তুর বললো-
আমি নিশ্চিহ্নপুরের রাপুত্তুর।
এই এত্তো বড় রাজ্য সেটা।
একটা বড় ঘর। একটা বড় দালান।
লক্ষী সরস্বতী, চাঁপা টগর-
এরা সবাই আমার প্রজা।
-
জানো রাজকন্যা,
আমাদের লক্ষী এত্তো এত্তো দুধ দেয়।
আর সেজন্যই, আমার গায়ে এত্তো জোর।
বদমাইশ রাক্ষসটাকে আমি,
এক প্যাঁচে মেরে দিয়েছি।
-
রাজকন্যা বললো
"তোমার তো, একটা মাত্র লক্ষী।
কিন্তু আমার, এক মেঘ গরু আছে।
তারা আমাকে, এক বৃষ্টি দুধ দেয়।"
-
রাজপুততুর বললো-
লক্ষী একা হবে কেন?
আর তুমি কি জানো? লক্ষী কত্তো সুন্দর?
ওর দুধে দূর্বা-দূর্বা গন্ধ। কি মিষ্টি, আর কি সুন্দর!
একবার খেলে, ঠোঁটে লেগে থাকবে তোমার।
আর তোমার গরুর দুধে তো, শুধু মেঘ মেঘ গন্ধ।
একটুও স্বাদ নেই।
-
রাজকন্যা বললো-
খবরদার আমার গরুর দুর্নাম করবে না বলছি।
একটা লড়াই হয়ে যাবে এখুনি ।
আমার দেশে এসে, আমাদের বদনাম?
ওই তো তোমার, এক ফোঁটা রাজ্য
আর চারটে প্রজা। হুঁ! "
-
রাজপুত্তুর রেগে টাঁই।
সে বললো-
"খবরদার আমায় রাগাবে না
আমার ঠাম্মাকে বলে দেবো আমি,
তোমার কান মুলে দেবে সে।
-
জানো রাজকন্যা,
আসল কথাই, বলতে ভুলে গেছি তোমাকে।
আমার ঠাম্মা আমাকে
এক পৃথিবী হামি দেয়।
একটা কথা বললে- একটা হামি।
দুটো বললে পাঁচটা হামি। তিনটা বললে দশটা হামি।
ঠাম্মার হামিগুলো, খুব সুন্দর, আর নরম নরম গরম।
-
তোমার সাথে খামোকা এতক্ষণ বকলাম আমি।
আমার ঠাম্মা হলে,
এতক্ষণে এক মহাদেশ হামি পেতাম আমি।
তোমাদের মেঘ দেশটা, একদম বাজে!
কেউ হামি দেয় না এখানে।
অবশ্য তুমি যদি চাও,
হামি দেওয়া তোমায়, শিখিয়ে দিতে পারি আমি।
-
রাজকন্যা বললো-
বুঝেছি, তোমার খুব, হামি খাওয়ার শখ।
ঐ পুচকে একটা রাজ্য থেকে,
মেঘের দেশে এসছো হামি খেতে?
তোমার সাহস তো কম নয়!
-
রাজপুত্তুর বললো-
আমার ঠাম্মা বলে-
হামি দিতে, শুধু ঠোঁট আর হৃদয় চাই।
রাজ্য ছোট বা বড়, তাতে কি কিছু আসে যায়?
রাগাবে না বলছি।
রেগে গেলে, জোর করে হামি নিয়ে নেবো আমি।
-
যাকগে, ঠাম্মা বলেছে -
লড়াই করতে নেই।
এখন চললাম আমি, আমার মায়ের কাছে।
আমার রাজ্যে, তোমার নেমন্তন্ন রইলো।
যদি চাও, তো তৈরী থেকো।
ফেরার সময়, তোমায় নিয়ে যাবো আমি।
-
ব্যাস, রাজপুত্তুর তারপর আকাশ দেশে হাজির।
আকাশ দেশটা কি সুন্দর, ঠিক পেঁজা তুলোর মতো।
সেখানে রঙ বেরঙের পাখি, লাল-সবুজ গাছ-গাছালি;
উঁচু-নীচু পাহাড়, আঁকা-বাঁকা নদী, ঢেউ খেলানো সাগর;
কালো-হলুদ-নীল-লাল ফল, জবা-গাঁদা-টগর-গোলাপ ফুল;
আর কাঁচের মতো স্বচ্ছ প্রাচীর। সেগুলো-
এমনি-এমনি বন্ধ হয়, আর এমনি-এমনি খোলে।
রাজপুত্তুরের চোখ তো, এক্কেবারে চড়ক গাছ;
ইশ: মা তাকে, কেন যে এখানে রাখে না!
-
নাচতে নাচতে সে চীৎকার করলো-
আমি এসে গেছি মা, আমি এসে গেছি।
কিন্তু তার মায়ের আর সাড়া নেই।
সে আবার ডাকলো-
মা, আমি খোকা, তুমি কোথায়?
মা, মা, ও মা।
-
অনেক ডাকাডাকির পরেও
তার মায়ের কোন সাড়া নেই।
রাপুত্তুরের বুকটা, ছ্যাঁৎ করে উঠলো।
বুকটা, কান্নায় ভেঙে পড়লো।
কাঁদতে কাঁদতে আবার ডাকলো সে-
মা, মা, ও মা.............
হটাৎ রাজপুত্তুর দেখলো,
তার ঠাম্মা তাকে বলছে-
রাজপুত্তুর, ঘুমোতে ঘুমোতে কাঁদছো কেন তুমি?
স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি?
এসো, আমার বুকে এসো।
তোমাকে এক পৃথিবী, হামি দিই আমি।
-
রাজপুত্তুর খুব লজ্জা পেলো।
ইশ: এক সাগর দুধ খেয়ে, এত্তো বড় হয়ে গেছে সে;
অথচ এখনো কিনা
বাচ্চাদের মতো ঘুমের মধ্যে কাঁদে সে।
রাজপুত্তুর বললো-
আচ্ছা ঠাম্মা, যে কান্নাটা শুনলে, ওটা কি সত্যিই আমার কান্না?
ছোট্ট টগরের কান্না নয় তো?
জানো ঠাম্মা, টগর কিন্তু, আমার মতো সুর করে কাঁদে।
ও আসলে
আমার মতো, এখনো বড় হয় নি তো, তাই।
-
রাজপুত্তুরের ঠাম্মা বললো-
ঠিকই বলেছো তুমি। ভুল শুনেছি আমি।
এখন আমার বুকে এসো তুমি,
তোমাকে এক পৃথিবী হামি দিই আমি।
- - - -
গল্পটা বলার পর -
আমারও ঠাম্মা আমাকে, এক পৃথিবী হামি দিলো।
-
আমার ঠাম্মা
মারা যাওয়ার সময়, আমায় বলেছিলো-
অমল, চাঁদ আমায় চরকা কাটতে ডেকেছে,
আমি এখন চাঁদের দেশে যাচ্ছি।
তুই যখন বড় হবি-
আমাকে তুই
ওখান থেকে নিয়ে আসবি।
-
ভাবছি-
এবার আমি চাঁদের দেশে যাবো,
ঠাম্মাকে নিয়ে আসবো।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem