কেন বাঁচবো? কি জন্য বাঁচবো? কি আর আছে জীবনে যে বাঁচবো? নেই নেই কিচ্ছু নেই। আমার বাঁচার একমাত্র অবলম্বন, তা আজ শেষ।
তিথি মৃত। আর আমি বন্দী, এই চার দেওয়ালের মধ্যে। সারাক্ষণ সেই একই ভাবনা। একই রোমন্থন। একই রুদ্ধ দ্বারে বারবার কড়া নাড়া।
দিন রাত জুড়ে আমি কড়া নেড়ে বলছি- "জেগে উঠো তিথি, জেগে উঠো তুমি। দেখছো না সকাল হয়েছে? পূবদিক আলো করে সূর্য হাসছে, তুমি এখনো জাগবে না? কিন্তু......
তিথি মারা গেলো, অথচ আমি তাকে শেষ দেখা পর্যন্ত দেখতে পেলাম না। শেষ বারের জন্য তাকে একটু দেখতে পেলাম না। তাকে একটু ছুঁতে পারলাম না। তাকে বিদায় জানাতে পারলাম না। যন্ত্রণাকাতর তার চোখদুটো, একটু মুছে দিতে পারলাম না।
জানি না। আমি জানি না তিথি এখন কোথায়! হয়তো বাতাসে হয়ে আমারই চারপাশে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। হয়তো এক পাখি হয়ে আকাশে উড়ছে। হয়তো এক রামধনু হয়ে আকাশ আলো করে হাসছে। হয়তো ও এক নক্ষত্র হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
চলে গেলো। সবই চলে গেলো। শুধু রয়ে গেলো ছাই। তিথির একমুঠো সাদা রঙীন ছাই। কিন্তু ছাই সম্বল করে কি বাঁচা যায়?
ভাবতে পারি নি- সহসা একটা ঝড়, এমনি করে মুহূর্তেই সব কিছু বদলে দেবে। আমার জীবন থেকে প্রাণ কেড়ে নেবে, আমার রাত্তির থেকে স্বপ্ন কেড়ে নেবে! মাত্র পাঁচ দিন। আর সেই পাঁচ দিনেই রঙিন একটা স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেলো।
এখন কেমন করে আমি আমার মেয়ের কাছে দাঁড়াবো? কেমন করে আমি তাকে বলবো, "ঋতু, তোর মা আজ আর নেই"? আমাকে মৃত্যু দাও হে ঈশ্বর, আমাকে তুমি মৃত্যু দাও।
পাঁচ বছর আগে তিথি গর্ব করে বলেছিলো- জানো? আমি আজ "আই সি ইউ, নার্স ইন চার্জ"। কত গর্ব ছিলো ওর ও একজন আই সি ইউ, নার্স ইন চার্জ। অথচ ওর সেই গর্বের ধন, আজ ওর প্রাণ কেড়ে নিলো।
আমি নিশ্চিৎ এই মারণ রোগের জীবাণু ও কোন রুগীর কাছ থেকেই পেয়েছে। নিত্যদিন, ডজন ডজন মুমূর্ষু রুগীর নিরাময়ের জন্য যুদ্ধ করতে হতো ওকে। ছোট বড় সব মানুষকে, দুগ্ধপোষ্য শিশুর মতো দেখভাল করতে হতো ওকে। তাদের শোয়ানো, জাগানো, পাশ ফেরানো, নল দিয়ে খাওয়ানো- কত কিছু।
অথচ ও নিজে ব্লাড প্রেসারের রুগী। পিঠে ওর অনেকদিনের ব্যথা। ইদানীং সেই পিঠের ব্যথাটা মাত্রারিক্ত বেড়ে গিয়েছিলো। রাতে ও, প্যারাসেটামল খেয়ে ঘুমুতে যেত। তবুও পিঠের ব্যথাটা যেত না। মধ্য রাতে পিঠের ব্যথ্যা ওকে জাগিয়ে দিতো। তখন ও আবার একটা প্যারাসেটামল খেয়ে, বারান্দায় একটু পায়চারি করতো। এ জন্য, আমাকে ও কখনো জাগাতো না।
ঘটনাক্রমে, আমি যদি কখনো জেগে উঠতাম- তো ওকে আবার বিছানায় নিয়ে গিয়ে, ওর পিঠে একটু মালিশ করে দিতাম। এক রাতে মালিশ করতে করতে ওকে বললাম-
তিথি, তুমি বরং চাকরীটা ছেড়ে দাও।
তিথি বললো
নাহঃ তা হয় না অমল।
আমি বললাম-
আমাদের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আমার এখনো কয়েক বছর চাকরী আছে। আমাদের বেশ চলে যাবে।
ও বললো-
টাকাই কি সব জীবনে? মানুষ হয়ে মানুষের জন্য কিছু করবো না? তাহলে নার্স হলাম কেন? ব্যবসায়ী বা রাজনীতিক বা চোরও তো হতে পারতাম!
আমি আর কথা বাড়াই নি। আমি জানি- তিথি দৃঢ় চেতার মানুষ। যা ও করতে চায় না, তা ওকে দিয়ে করা করানো যায় না। আর যা ও ভালোবাসে, তা ও প্রাণের বিনিময়ে হলেও করবে। (চলবে)
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem