আমার এক প্রফেসর পেসেন্ট, আজ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- "ডঃ মাজী, ঈশ্বর কি সত্যিই আছেন? এখন পৃথিবীতে তো নাস্তিকের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে! " সিডনির এই প্রফেসরকে, আজ আমি- আমার পাড়ার বটু বাগদির গল্প শোনালাম।
আমার পাড়ার বটু বাগদি, "মরিশাস দ্বীপের" নামও শুনে নি, আর তা চোখেও দেখেনি। সে আর তার বৌ,"মরিশাস" লেখা একখন্ড কাগজ, তাদের রান্না ঘরে দেখতে পেলো। তারপর- বটু আর তার বৌ কাদির মধ্যে, নীচের এই কথোপকথন হলো-
ব: মরিশাস আবার কি? তাল শাঁস, আম শাঁস- অনেক শাঁস শুনেছি। মরিশাস তো শুনি নি!
কা: হয়তো মরিশাস কোন পাখির নাম হবে! হয়তো রাজহাঁসের কোন আত্মীয় হবে!
ব: মরিশাস আর ছাইপাঁশ এর মধ্যে কিন্তু অনেক মিল! মরিশাস সেরকম কিছু একটা হবে!
কা: না গো না। মরিশাস কোন পাখির নামই হবে!
ব: তুই মুখ্যু কাদি। আমি বলছি মরিশাস ছাইপাঁশ কিছু হবে!
কা: তুই পুরুষ মানুষ বলে কি, বড় পন্ডিত হয়েছিস নাকি? আমি মুখ্যু কেন হবো? তোর বাপ মুখ্যু, তোমার মা মুখ্যু, তোর চৌদ্দ পুরুষ মুখ্যু! ইত্যাদি।
বটু আর কাদিতে এমনিতে গলায় গলায় প্রেম। কিন্তু আজ তাদের মধ্যে প্রথমে তর্কাতর্কি, পরে হাতাহাতি, তারপর চুলোচুলি- তারপর তাদের মধ্যে কথা বন্ধ, রান্না বন্ধ, সারাদিন খাওয়া বন্ধ।
"ঈশ্বর কি? ঈশ্বর কি আছেন? " এই সব প্রশ্ন নিয়ে তর্ক- বটু আর কাদির "মরিশাস" নিয়ে তর্কের চেয়েও বেশি হাস্যকর। কেন?
যারা আস্তিক, তারা ঈশ্বরকে চাক্ষুস দেখে নি। যারা নাস্তিক, তারাও ঈশ্বরের অস্তিত্ব যে নেই- তা কখনো প্রমাণ করতে পাবে না।
বটু কিভাবে প্রমাণ করবে- মরিশাস ছাইপাঁশ? ট্রেনের টিকিট কাটার পয়সা তার নেই। আমাদের গ্রামে কোন পন্ডিতেও নেই, যে বটু তাকে তা জিজ্ঞেস করবে। বটু মরিশাস দেখেনি বলে কি মরিশাসের অস্তিত্ব থাকতে নেই? তুমি ও তো সময়কে কখনো চোখে দেখো নি! তাহলে সবসময় এতো "সময় সময় " করো কেন?
মানুষ কোন কিছু দেখে নি মানেই যে তার অস্তিত্ব নেই, তা তো নয়! মানুষ ভাবে সে তার শিক্ষা আর বুদ্ধি বলে, অনেক কিছুই জেনে ফেলেছে। সত্যিই কি তাই? মানুষ মঙ্গল গ্রহে মহাকাশযান পাঠিয়েছে। এই ব্যাপারটা, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের তুলনায় ঠিক কতটা উল্লেখযোগ্য?
ধরো কোন এক জঙ্গলে, একদল পিঁপড়ে- একশো পুরুষের ক্রমাগত চেষ্টায় গুড়ের একটা স্তুপ বানিয়েছে। তুমি একদিন জঙ্গলে গিয়ে দেখলে, বাদামি রঙের ছোট্ট একটা ডেলা পাথরের নীচে পড়ে! তুমি তোমার নখের একটা টোকায়, মুহূর্তে সেটাকে গুঁড়িয়ে দিলে। তোমার তুলনায়, গুড়ের ডেলাটা কিছুই নয়। পৃথিবীর আকারের তুলনায় গুড়ের ডেলাটা আরও কিছু নয়।
তোমার গ্রামের তুলনায় তুমি কতটুকু? ভারতবর্ষের তুলনায় তোমার গ্রাম কতটুকু? সৌরজগতের তুলনায় ভারত কতটুকু? সৌরজগতের ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯...... % শূন্যস্থান। সেই শূন্যস্থান সহ ধরলে, সৌরজগতের তুলনায় পৃথিবী কিছুই নয়। আবার বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের তুলনায়, সৌরজগৎ- একটা বিন্দুর কয়েক কোটি ভাগের একভাগের চেয়েও ছোট।
একশো পুরুষের চেষ্টায় একদল পিঁপড়ের বানানো একটা গুড়ের ডেলা, পৃথিবীর সাপেক্ষে কতটা উল্লেখযোগ্য? মানুষের সহস্র জন্মের চেষ্টায় মহাকাশ বিজয়, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের তুলনায় কতটা উল্লেখযোগ্য? বিন্দুমাত্র উল্লেখযোগ্য নয়। তাহলে বুঝতে পারছো- মানুষের সাফল্য বা ক্ষমতা মহাবিশ্বের তুলনায় কতটা নগন্য?
ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব কোনটাই মানুষের সম্পূর্ণ অনুধাবন যোগ্য নয়। তাই ঈশ্বরকে তুমি খুঁজতে পারো। কিন্তু ঈশ্বর আছে কি নেই- সে প্রশ্নের শেষ উত্তর তুমি দিতে পারো না। কেবল আজ কেন, আগামী এক হাজার কোটি বছরেও, মানুষ এর সঠিক উত্তর দিতে পারবে না।
তাহলে মানুষ কি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে না? আলবৎ খুঁজবে। হাজারবার খুঁজবে।মানুষ যেমন অসীম এই মহাবিশ্বকে জানতে চাইবে, ঠিক তেমনি মানুষ অসীম গুনের ঈশ্বরকেও জানতে চাইবে। কিন্তু ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব নিয়ে মানুষের মধ্যে ঝগড়া বা মারামারি কোনদিন কাম্য নয়।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem