ধরো, তোমার বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে গেছো তুমি। চিংড়ি, ইলিশ, পাঁঠার মাংস, দই, আইসক্রিম- একদম এলাহি ব্যাপার। চেঁটেপুঁটে পরমানন্দে খাচ্ছো তুমি।খেতে খেতে হটাৎ এমন একজনকে নজর করলে, যাকে তুমি পছন্দ করো না। ব্যাস- তোমার খাওয়া-দাওয়া গোল্লায়। গা-টা তোমার গুলিয়ে উঠলো। খাওয়ার প্লেট রেখে তুমি চুপচাপ বসে রইলে। অনুষ্ঠানে, তোমার পরিচিত লোকজনের সাথে ভালো করে তুমি কথা বললে না। তারাও তোমার উপর মনঃক্ষুন্ন হলো।
এই ঘটনার কারনে, তোমার নেমন্তন্ন করা বন্ধুর সাথে, ভালো করে তুমি কথা বলো না। আর তোমার বন্ধুও তোমাকে আর, তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে সাহস পায় না। এইভাবে ভালো মন্দ বিচার করতে গিয়ে, তুমি তোমার আত্মীয় বন্ধুর সাথে ভীষণ তিক্ত সম্পর্ক গড়লে।
ফল? কয়েক বছরের মধ্যে- তোমার বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় পরিজনের সংখ্যা প্রায় শূণ্য। তোমার খেলার পৃথিবী, হাসার পৃথিবী, দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার পৃথিবী-একটু একটু করে কমে, প্রায় অবলুপ্ত হয়ে গেলো। তুমি নিঃসঙ্গ একাকী হয়ে গেলে। দুঃখ ভাগ করলে দুঃখ অর্দ্ধেক হয়। আনন্দ ভাগ করলে আনন্দ দ্বিগুন হয়। তুমি নিঃসঙ্গ বলে- দুঃখ তোমার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠলো। হতাশা আর অবসাদের কালো গহ্বরে নিমজ্জিত হলে তুমি। তখন তুমি কি করলে? ঈশ্বর, ভাগ্য, আর মানুষকে নিষ্ঠুর একচোখা ইত্যাদি বলে গালি করতে শুরু করলে।
কবর খুঁড়লো কে? তুমি নিজে। তাই না? সকলের দোষ-গুণভালো মন্দ বিচার করে- তোমার পৃথিবীকে তুমি নিঃসঙ্গ করে ফেলেছো। যাকে তুমি সামান্য সমালোচনা ভাবছো, তা কিন্তু সামান্য নয়। যাকে তুমি ছোট খাটো বাছ-বিচার ভাবছো, তা কিন্তু ছোট খাটো ব্যাপার নয়। তোমার অবসাদগ্রস্ত আঁধারময় জীবনই তো তার প্রমান।
দুর্ভাগ্যবশত- এশীয় মহাদেশের সংস্কৃতি, পাশ্চাত্য দেশের সংস্কৃতির চেয়ে অনেক বেশী সংস্কারাচ্ছন্ন ও অন্ধ বিশ্বাসযুক্ত (dogmatic) । ছোট বেলা থেকে আমরা বড্ড বেশি মানুষকে বিচার করতে শিখি। এর ফলে সেই বদ অভ্যাস দূর করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এই বদ অভ্যাস আমাদেরকে নিঃসঙ্গতা আর অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। আদর্শ বন্ধু খুঁজতে গিয়ে আমরা গাঁ উজাড় করে ফেলি। তবুও আদর্শ বন্ধু খুঁজে পাই না। ছুঁচ হয়ে আমরা চালুনির ফুটো খুঁজি কেন?
মানুষকে ভালোবাসো হে ভাই, মানুষকে ভালোবাসো। বিচার করতে যেও না, কেবল ভালোবাসো। তা যদি পারো, তাহলে তোমার পৃথিবী কখনো ছোট হয়ে যাবে না। কোন মানুষের মধ্যে যদি ভালো কিছু খুঁজে না পাও, তবে কোন দোষ তার দেখো না। তোমার ভোঁতা মুখ হাতা দিয়ে বন্ধ রাখো। মুখ বন্ধ রাখার অভ্যাস, ভবিষ্যতে তোমাকে অবসাদ আর যন্ত্রণা থেকে বাঁচাবে।
অরুণ মাজী তোমাদেরকে প্রায়ই বলে- "ভালো মন্দের বিচার মানুষের ক্ষমতার বাইরে"। রামচন্দ্র শ্রীকৃষ্ণ কর্ণ অর্জুন এরিস্টটল প্লেটো - এরাও ভালো মন্দের সঠিক হদিস পাই নি। তো আমি তুমি তা পাবো কি করে? তাই বলছি- মানুষকে কেবল ভালোবাসা দাও, সাহস দাও, প্রেরণা দাও। হিংসাতে বুক জ্বললেও মানুষকে ভালোবাসা প্রেরণা দাও। তাতে তোমার নিজের দুঃখ যন্ত্রণা কমবে।
© অরুণ মাজী
Painting: Andrew Atroshenko
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem