সাগর সঙ্গমে ১৭ (Dorpon) Poem by Arun Maji

সাগর সঙ্গমে ১৭ (Dorpon)

সাগর সঙ্গমে ১৭ /অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস

সকালে যখন ঘুম ভাঙলো, দেখি, দর্পণ বিছানায় নেই। ঘরের চারিদিকে চেয়ে দেখলাম, নাহঃ ঘরেও নেই ও।

বিছানায়, সোজা হয়ে বসলাম আমি। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখি, সাড়ে সাতটা বাজে। বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবো, তো এমন সময় দর্পণ ঢুকলো ঘরে। ঘরে ঢুকেই, কয়েকটা ফুল বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে।

এক গোছা রজনীগন্ধা ফুল। বেশ সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে নাকে। ফুলটার দিকে চেয়ে খুশির হাসি হাসলাম আমি।

দর্পণও হাসলো। তারপর বললো-
'ছাদে গেছিলাম। একটু পায়চারি করছিলাম।'

কখন উঠলে তুমি?

'বেশ আগে। চলো, একটু হেঁটে আসি আমরা।'

অফিসে যাবো না?

'কি করে যাবে? মা তোমাকে থাকতে বললো না রাতে? '

হুঁ।

'তো কি করে যাবে? '

গভীর এক শ্বাস নিলাম আমি। তারপর বললাম-
জানো? অফিসে কেউ নেই।

'জয়ন্তকে আসতে বলো নি? '

বলেছি। কিন্তু ও জানে, আমিও থাকবো।

'ওকে ফোন করে বলে দাও, আজ ও সামলে নেবে।'

টেবিলের উপর আমার ফোন রাখা ছিলো। ফোনটা তুলে নিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো দর্পণ।

ফোন করলাম জয়ন্তকে। ও ফোন উঠাতেই, জিজ্ঞেসকরলাম ওকে-
কি গো, বাড়িতে নাকি?

'হ্যাঁ দাদা, এবার বেরোবো।'

শোনো, আজ আমি তোমার বৌদির বাড়িতে। আজ একটু সামলে নাও।

জয়ন্ত হাসলো। ও আমাকে জিজ্ঞেস করলো-
'অফিসে আসবে না তুমি?

নাহঃ। কোন দরকার হলে, ফোন করো আমাকে।

'ঠিক আছে দাদা।'

বেশ, রাখছি তাহলে।

জয়ন্তর অনুমতি নিয়ে ফোনটা রেখে দিলাম।

দর্পণ এবার আমার দিকে চেয়ে বললো-
'চলো, হেঁটে আসি। তারপর ব্রেকফাস্ট করবো আমরা।'

বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে ঢুকলাম আমি। বাথরুমে ঢুকে মুখ হাত ধুলাম। তারপর দর্পণের পিছু পিছু নীচে নেমে এলাম।

নীচে নামতেই দর্পণ আমাকে বললো-
শোনো, তুমি সোফাতে বসো। ততক্ষণে চা নিয়ে আসছি আমি।

আমাকে সোফাতে বসিয়ে দিয়ে, রান্না ঘরে চলে গেলো দর্পণ। আর তখনই দেখি, শ্বশুরমশায় ঘরে ঢুকলেন। ওনার হাতে, বড় একটা বাজারের ব্যাগ। আমার দিকে চেয়ে হাসলেন উনি। আমিও হাসলাম। উনি বললেন-
'তুমি রয়েছো, তাই সকাল সকাল বাজার করে নিলাম।'

তারপর একটু থেমে উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-
'চা খেয়েছো? '

চা খাবো। দর্পণ বানাচ্ছে।

'দর্পণ কেন? তোমার শাশুড়ী কোথায়? '

আমাকে কোন উত্তর করতে হলো না। রান্না ঘর থেকে শ্বাশুড়ী মা উত্তর করলেন-
'আমি রান্না ঘরে। ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছি।'

শ্বশুরমশায় আমার দিকে চেয়ে বললেন-
'তুমি বসো, ব্যাগটা রান্না ঘরে রেখে আসি আমি।'


শ্বশুর মশায় চলে গেলেন। আমি জুতো পরে রেডি হয়ে সোফাতে ফিরে এলাম আবার।

দর্পণ ফিরলো। ওর হাতে চায়ের ট্রে। চায়ের ট্রেটা কফি টেবিলে রেখে, ও আমার পাশে বসলো। আমাকে ছুঁয়ে, আমার গায়ের উপর হেলান দিয়ে বসলো ও। তারপর একটা কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ও জিজ্ঞেস করলো-
'কিগো, বিস্কুট খাবে? না পকোড়া খাবে? '

হাসলাম আমি। বললাম-
কিছুই না। শুধু চা খাবো।

ওর কাপে চুমুক দিতে দিতে দর্পণ বললো-
'জানো? নাইনটিন উইক্স স্ক্যানটা আজ দুপুরে করে নেবো।

প্রথমে বিস্ময়ে চমকে উঠলাম। তারপর ওর পেটের দিকে চেয়ে হাসলাম আমি। ওকে জিজ্ঞেস করলাম-
নাইনটিন উইক্স হয়ে গেলো? এখুনি?

দাঁত দিয়ে ঠোঁট কেটে, আমার দিকে চেয়ে রইলো দর্পণ। দর্পণের পেটের উপর কান পেতে, কিছু একটা শোনার চেষ্টা করলাম আমি। আর ঠিক সে মুহূর্তেই শাশুড়ী মা হাজির হলেন। দর্পণ লজ্জা পেয়ে, জোরে ঠেলে দিলো আমাকে। শ্বাশুড়ী মা হাসলেন। দর্পণের দিকে চেয়ে উনি বললেন-
'এতে লজ্জা পাওয়ার কি আছে। ও বাবা, তো একটু শুনতে চাইবে না? '

লজ্জাসুলভ হাসি হাসলো দর্পণ। আবার ওর মায়ের দিকে চেয়ে বললো-
'জানো মা? দুপুরে স্ক্যান করাতে যাবো আমরা।'

শ্বাশুড়ী মা হাসলেন। বললেন-
'স্ক্যান? যাবি, যা।'

একটু থামলেন উনি। তারপর মন্তব্য করলেন-
'আমাদের সময়ে তোদের মত এত স্ক্যানের বালাই ছিলো না। এমনিই বুঝতে পারতাম আমরা। '

দর্পণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
'এমনিই বুঝতে পারতে তোমরা? '

শ্বাশুড়ী মা
'হ্যাঁ, এমনিই। কেন, তোর বাচ্চা পা ছুঁড়ে না? '

দর্পণ ওর পেটে হাত দিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করলো। তারপর মৃদু স্বরে ও বললো-
'নাহঃ কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।'

শ্বাশুড়ী মা
'ছুঁড়লে তুই নিজেই বুঝতে পারবি। প্রথম প্রেগন্যান্সি তো, তাই বোধহয় দেরী হচ্ছে।'

দর্পণ ওর মাকে জিজ্ঞেস করলো-
প্রেগন্যান্সির কোন স্টেজে পা ছুঁড়ে বাচ্চারা?

শ্বাশুড়ী মা
'প্রথমবার যারা প্রেগন্যান্ট হয়েছে, তারা পাঁচ মাস নাগাদ বুঝতে পারে। আর যারা আগেও প্রেগন্যান্ট হয়েছে, তারা চার মাস নাগাদ।

দর্পণ আমার দিকে চেয়ে দুষ্টু হাসি হাসলো। আমিও হাসলাম। কিন্তু আমার হাসি দুষ্টু হাসি নয়। বিস্ময়ের হাসি। গভীর এক বিস্ময়ের হাসি।

মহাবিশ্বের রহস্যকে রহস্য বললে অনেক কম বলা হয়। আসলে, মহাবিশ্বের খেলা এত সুন্দর, এত জটিল যে; মানুষ তা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না।

সামান্য একটা কোষ, যা চোখে দেখা যায় না; তারও গঠন এমন জটিল আর সুন্দর যে মানুষ তা হাতে গড়তে পারবে না। এমন অসীম সংখ্যক কোষ দিয়ে মানুষ তৈরী। সেই অসীম সংখ্যক কোষগুলোর মধ্যে, অদ্ভুত এক মেলবন্ধন আছে। কাজের এক বিন্যাস আছে। তারা একে অপরকে সাহায্য করে। একের তৈরী জিনিস, অন্যে ব্যবহার করে। একে অন্যের উপর নির্ভরশীল।  

অর্থাৎ মানুষ নিজেই এক মহাবিশ্ব। নিজেই এক ইকো সিস্টেম। মানুষের মধ্যেকার এই যে রহস্য, মানুষ তা কতটা বুঝতে পেরেছে? নয় নয় করে, বিজ্ঞান গবেষণার বয়স কয়েক হাজার বছর হয়ে গেলো। এই কয়েক হাজার বছরে, মানুষ তার দেহের রহস্যের কতটুকু জানে?

আর মন? সে তো দেহের চেয়েও জটিল। সে তো দেহের চেয়েও অনেক বেশি ভঙ্গুর আর খামখেয়ালী। দেহের কোষকে তবুও মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়। কিন্তু মনকে? মনকে মানুষ চোখে দেখবে কি করে? আমার মনে কি ঘটছে, তা আমিই জানি না। তো তুমি তা জানবে কি করে?

গর্ভের মধ্যে ভ্রূণ বড় হতে থাকে। তারপর এমন একদিন আসে, যখন সেই ভ্রূণ তার মাকে জানায়- 'মা, আমি বড় হয়ে গেছি।'

কিন্তু সেই ভ্রূণ তখনও কোন ভাষা শিখে নি। তো সে কিভাবে তা জানায় তার মাকে? গর্ভের মধ্যে হাত পা ছুঁড়ে। কখনো মায়ের পেটে লাথি মেরে। কখনো মায়ের গর্ভে সুড়সুড়ি দিয়ে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন- 'QUICKENING'।

এই হাত পা ছুঁড়া, কেবল সংলাপের ভাষা নয়। এ হলো শিশুর বেড়ে উঠার জন্য এক অতি আবশ্যকীয় অভিযোজন। এইভাবে হাত পা ছুঁড়েই, শিশু তার দেহ আর মস্তিস্ককে আরও শক্ত করে তুলে। গর্ভের বাইরে বেঁচে থাকার অভ্যাস, মায়ের পেটেই শুরু করে সে।

দর্পণের গর্ভের মধ্যে এমন সুন্দর এক গল্প লুকিয়ে। এমন সুন্দর এক রহস্য লুকিয়ে, তো বিস্ময়ে অভিভূত হবো না আমি?

আমার হাত ধরে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো দর্পণ। তারপর ওর মায়ের দিকে চেয়ে ও বললো-
'মা, আমরা একটু হাঁটতে যাচ্ছি।'

শ্বাশুড়ী মা হাসলেন। বললেন-
'যা, তাড়াতাড়ি ফিরিস। অমল এখনো ব্রেকফাস্ট করে নি।'

সাগর সঙ্গমে ১৭ (Dorpon)
Friday, September 30, 2022
Topic(s) of this poem: poem,pregnancy
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success