সাগর সঙ্গমে ২৬ ভেঙে পড়া এক মায়ের কাহিনী অরুণ মাজীর উপন্যাস
তিনদিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলো দর্পণ।
বাড়িতে ঢুকেই, গুটিগুটি পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো ও। ওকে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে দেখে, ব্যস্ত হয়ে ওর কাছে ছুটে গেলাম আমি। ওর পাশে দাঁড়িয়ে ওকে বললাম-
আমার কাঁধ ধরো বাবু। সিঁড়ি চড়তে কষ্ট হবে তোমার।
দর্পণ আমার কাঁধে ভর করে উপরে উঠে এলো। তারপর ঘরে ঢুকেই, বিছানার উপর চড়ে বসলো ও।
টেবিলের উপর একটা ছোট্ট পুতুল রাখা ছিলো। কয়েকদিন আগেই, দর্পণ কিনেছিলো ওটা। ওর বাচ্চার জন্যই হয়তো কিনেছিলো ওটা!
সেটার দিকে প্রথমে অপলকে চেয়ে রইলো দর্পণ। তারপর হাপুশ নয়নে কাঁদতে শুরু করলো। ওর কাঁধ ছুঁয়ে ওকে বললাম-
কেঁদো না। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হও নি তুমি।
কিন্তু দর্পণের কান্না থামলো না। ওর কান্না থামছে না দেখে, টিসু পেপার দিয়ে ওর চোখ মুছিয়ে দিলাম। তারপর বললাম-
দুঃখ করো না দর্পণ। এখনো গোটা একটা জীবন বাকি আমাদের।
কথাগুলো বলে, ওকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। দর্পণ আমার বুকে মাথা রেখে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম-
তুমি খুব সাহসী। তো এক ধাক্কায় এত ভেঙে পড়বে কেন?
দর্পণ কোন কথা বললো না। কেবল ইঙ্গিত করে পুতুলটা চাইলো ও। পুতুলটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম আমি।
ও প্রথমে পুতুলটার দিকে অনেক্ষণ চেয়ে রইলো। তারপর পুতুলটাকে হামি দিলো ও। হাসলাম আমি। বললাম-
যাও, ওকে নিয়ে শুয়ে পড়ো। বিশ্রাম নাও।
দর্পণ প্রথমে পুতুলটাকে শুইয়ে দিলো। তারপর পুতুলটার পাশে ও নিজে শুয়ে পড়লো। শুয়ে শুয়ে পুতুলটার দিকে অপলকে চেয়ে রইলো ও। ওকে জিজ্ঞেস করলাম-
কিগো, খাবে না?
'খিদে নেই।'
সেকি? হাসপাতালে তো প্রায় কিছুই খাও নি তুমি।
হটাৎ কেমন যেন একটু বিরক্ত বোধ করলো দর্পণ। মৃদু বিরক্তির সুরে ও বললো-
'বলছি না, খিদে পাচ্ছে না! '
ওর দিকে চেয়ে চুপ রইলাম আমি। বুঝলাম, দুঃখে বুক ফেটে যাচ্ছে ওর। ওকে আশ্বস্ত করতে আমি বললাম-
জানো? তুমি একটু সুস্থ হয়ে উঠলে, কোথাও একটু বেড়াতে যাবো আমরা।
দর্পণ কোন উত্তর করলো না। পুতুলটাকে ওর বুকে শুইয়ে দিয়ে, সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইলো ও। অপলকে। নিঃশব্দে।
বুঝলাম, দর্পণ এখন কথা বলার মুডে নেই। তাই ভাবলাম, নীচ থেকে বরং ওর জন্য খাবার আনি আমি।
সিঁড়িতে নামছি, তো তখনই দেখি, মা উপরে উঠছে। মায়ের হাতে খাবারের ট্রে। বুঝলাম, দর্পণের জন্য খাবার আনছে মা।
মায়ের সাথে, ঘরে ফিরে এলাম আবার। দর্পণ শুয়ে রয়েছে দেখে, মা প্রথমে একটু থমকে দাঁড়ালো। তারপর কিছুক্ষণ ওকে পর্যবেক্ষণ করলো। তারপর বিছানায় উঠে দর্পণের পাশে বসলো মা।
কোন কথা না বলে, দর্পণের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিলো মা। তারপর আমার দিকে চেয়ে মা বললো-
'খাবারের ট্রে-টা দে তো অমল।'
মাকে খাবারের ট্রে-টা দিলাম আমি। মা চামচ নিয়ে দর্পণের মুখে খাবার ধরলো। কিন্তু খাওয়ার পরিবর্তে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো দর্পণ। বাঁ হাতটা দর্পণের মাথায় রেখে মা বললো-
'কাঁদিস না মা। কিছুদিন পর আবার বাচ্চার মা হবি তুই।'
দর্পণ আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মা বললো-
'মানুষের জীবনে অঘটন ঘটতেই পারে। তা বলে কি বাঁচা বন্ধ করে দেবে মানুষ? '
খাবার নিয়ে, মুখের মধ্যে খাবার ঢুকিয়ে দিলো মা। দর্পণ এবার খেলো। মা বললো-
'এবার একটু উঠে বোস, নইলে বিষম খাবি।'
মা দর্পণকে সাহায্য করলো। দর্পণ উঠে বসলো। মা ওকে ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে বসতে বললো। ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে বসলো দর্পণ।
মা আবার ওর মুখে খাবার ধরলো। দর্পণ এবার মায়ের কাছ থেকে চামচটা নিয়ে নিলো। তারপর ও নিজেই খেতে শুরু করলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মা বললো-
'বাহঃ সোনা মেয়ে তুই। এরকম শক্ত হ। দেখবি, সব ঠিক হয়ে যাবে।'
মা এবার পুতুলটার দিকে চেয়ে দেখলো। তারপর ঠোঁটের কোণে হেসে মা দর্পণকে বললো-
'এক বাচ্চা নয়, এবার দশ বাচ্চার মা হবি তুই।'
মনে হলো, দর্পণ যেন একটু হেসে উঠলো। মা ওর বাঁ হাতে হাত রেখে বললো-
'আমরা মানুষ দর্পণ। বাধা আমাদের আসেই। তাই বলে কি সারাজীবন কাঁদবো আমরা? '
খাবার শেষ করলো দর্পণ। মা ওকে বললো-
'এবার মুখ হাত ধুয়ে, শাড়ি ছেড়ে ভালো করে বিশ্রাম কর।'
দর্পণ কিছু বললো না। মা ওকে বললো-
'যত তাড়াতাড়ি সুস্থ হবি, তত তাড়াতাড়ি বাচ্চার মা হবি তুই।'
দর্পণ কাঁদতে গিয়ে হেসে ফেললো। মা বললো-
'শোন, এবার আসছি আমি। এখন তুই একটু ফ্রেশ হয়ে নে।'
খাবারের খালি ট্রে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো মা। আমি দর্পণকে বললাম-
এসো, নামিয়ে দিই তোমাকে।
দর্পণকে সাহায্য করলাম আমি। দর্পণ খাট থেকে নেমে, ধীর পায়ে বাথরুমে ঢুকলো। আলমারি খুললাম আমি। সেখান থেকে ওর জামাকাপড় নিয়ে সেগুলো ওকে দিয়ে এলাম।
দর্পণ দরজা বন্ধ করলো। বাথরুমের দরজা বন্ধ করলো। কি যেন ভেবে চেয়ারে বসে পড়লাম আমি। ভাবলাম, কয়েকদিনেই, জীবনটা কেমন যেন বদলে গেলো! তাই না? কয়েকদিন আগেও, দর্পণ ছিলো বেশ হাসি খুশি। ওর চোখে ছিলো স্বপ্ন। গর্ভে ছিলো নতুন এক শিশু। বুকে ছিলো মাতৃত্বের ভালোবাসা। দিনরাত শিশুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো ও। বাচ্চার জন্য, কত কত পরিকল্পনা করতো ও।
অথচ, এক মুহূর্তেই সেই স্বপ্ন ভেঙে গেলো। এক ছোট্ট দুর্ঘটনা ওর শিশুকে কেড়ে নিলো। ওর চোখের স্বপ্ন কেড়ে নিলো। ওর গর্ভ শূন্য করে দিলো।
আর আমি? দর্পণের চোখ, আমার চোখ। ওর গর্ভ, আমার গর্ভ। দর্পণ যেমন দুঃখী, আমিও তেমনি দুঃখী।
কিন্তু উপায় কি? জীবন বাধা দিয়েছে বলে, থেমে যাবো আমি? ভেঙে পড়বো আমি? নাহঃ ভেঙে পড়লে চলবে না। দর্পণের উদ্দেশে আমি বললাম-
জানো? মা-ই ঠিক বলেছে।
'মা কি বলেছে? '
মা বললো না তোমাকে, দশ বাচ্চার মা হবি তুই।
'মানে? '
ভাগ্য আমাদের একটা বাচ্চা কেড়েছে। এবার সত্যিই দশ বাচ্চার জন্ম দেবো আমরা।
দর্পণ কোন উত্তর করলো না। আমি ওকে বললাম-
দুর্ভাগ্যের উপর প্রতিশোধ নেবো আমরা। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠো তুমি।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem