সাগর সঙ্গমে ৩৫ (Dorpon) Poem by Arun Maji

সাগর সঙ্গমে ৩৫ (Dorpon)

গর্ভের সন্তান হারানো এক মায়ের কাহিনী /সাগর সঙ্গমে ৩৫/
অরুণ মাজীর উপন্যাস

সারাদিন বেশ ধকল গেলো সবার। সকালে, শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং আসা। আর বিকেলে, উঁচু পাহাড়ে উঠা নামা। তারপর রাতে আবার, বাইরে খেতে যাওয়া।

দুপুরে বিশ্রাম নিয়েছি ঠিকই। কিন্তু বিকেলে এত দাপাদাপির পর, আবার ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তাই রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরেই, যে যার ঘরে চলে এসেছি আমরা।
 
বাথরুমে জামাকাপড় চেঞ্জ করে, বিছানায় উঠলো দর্পণ। মুখ হাত ধুয়ে, আমিও ফ্রেস হয়ে নিলাম। তারপর পাজামা পাঞ্জাবি পরে বিছানায় ফিরে এলাম।

বিছানায় উঠতেই দর্পণ বললো-
'জানো? এখানে এসে ভালোই করেছি।'

কোন উত্তর না করে, হাসলাম আমি। তারপর ওর পাশে শুয়ে জড়িয়ে ধরলাম ওকে। দর্পণ আমার দিকে চেয়ে হাসলো। তারপর বললো-
'ক্ষত নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে আমাদেরকে। তাই না? '

কিছুক্ষণ নিঃশব্দে ভাবলাম আমি। তারপর মৃদুস্বরে বললাম-
হুঁ। শুধু আমরা নই। সব মানুষই তাই করে।

'তাই করে মানে? '

সবাই ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকে দর্পণ। তবে ভিন্ন জনের, ভিন্ন ভিন্ন ক্ষত। তোমার আমার সন্তান হারানোর ক্ষত। অন্যের, অন্য কিছু হারানোর ক্ষত।

দর্পণের চোখ জলে ভিজে গেলো আবার। জল ভরা চোখ নিয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলো ও। দর্পণের আঁচল দিয়ে ওর চোখ মুছিয়ে দিলাম আমি। তারপর বললাম-
শোনো, অনেক কষ্ট পেয়েছো তুমি। আর পিছনে দেখো না। সামনে দেখো।

সিলিংয়ের দিকে চেয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো দর্পণ। তারপর বললো-
'দেখতে তো চাই। কিন্তু পারি না।'

ওর কথার উত্তর না করে নিঃশব্দ থাকলাম আমি। দর্পণ বললো-
'জানো? কেমন যেন অপরাধবোধ জাগে মনে। মনে হয়, সেদিন বাজারে নাও তো যেতে পারতাম! '

দর্পণের মাথায় হাত রাখলাম আমি। তারপর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম-
তুমি কোন ভুল করো নি দর্পণ। তো কি জন্য অপরাধবোধ তোমার? বিপদ হতে পারে, এই ভয়ে কি মানুষ হাঁটা চলা বন্ধ করতে পারে?

দর্পণ এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। বললো-
'আমি মা। আমার সন্তানকে রক্ষা করতে পারলাম না আমি! '

কে বলেছে রক্ষা করো নি তুমি! ধাক্কা খেয়ে তোমার পড়ে যাওয়া, এক এক নিছক দুর্ঘটনা! এজন্য তুমি কেন অপরাধবোধে ভুগবে?

'জানি, কিন্তু তবুও শান্ত হতে পারি না।'

দর্পণকে বুকে টেনে নিলাম আমি। তারপর ওর মাথায় হাত রেখে বললাম-
তুমি কষ্ট পেলে, তোমার ভবিষ্যতের সন্তান ভুগবে। তোমাকে তাই সামনে দেখতে হবে।

'মানে? '

অবসাদে ভুগলে, ভবিষ্যতে তুমি সুস্থ বাচ্চা ধারণ করবে কি করে?

'অবসাদে ভুগলে আর প্রেগন্যান্ট হতে পারবো না। তাই না? '

হয়তো পারবে। কিন্তু তা ঠিক হবে না। অসুস্থ মা কখনো সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পারে না।

'আমি ডিপ্রেশানে ভুগছি। তাই না? '

কোন উত্তর না করে চুপ থাকলাম আমি। দর্পণ বললো-
'এখন কি করি বলো তো? '

কি আর করবে? তোমার যা কাজ তাই করতে থাকো। এখানে ঘুরতে এসেছো, তো ভালো করে আনন্দ করো।

কিছুক্ষণ সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইলো দর্পণ। চেয়ে চেয়ে কি যেন ভাবলো ও। তরপর হটাৎ আমাকে ও জিজ্ঞেস করলো-
'আমাকে জড়িয়ে ধরবে না? '

হাসলাম আমি। তারপর দর্পণের ঠোঁটে কিস করে বললাম-
এই তো, তোমাকে জড়িয়েই তো রয়েছি।

'নাহঃ আরও গভীর করে জড়িয়ে ধরো আমাকে।'

কথাটা বলেই গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো দর্পণ। তারপর বললো-
'কতদিন আমরা পরস্পরকে গভীর করে জড়িয়ে ধরি নি।'

ওর কপাল থেকে চুলগুলো সরাতে সরাতে আমি বললাম-
'তুমি দুঃখে রয়েছো। তাই জোর করতে চাই নি।'

আমার বুকে আঁচড় কাটতে কাটতে দর্পণ বললো-
'তুমি জোর না করলে, আমি সুস্থ হবো কি করে? '

হেসে ফেললাম আমি। তারপর দুষ্টুমি করে বললাম-
তুমি বুকের আবরণ না খুললে, আমি জোর করবো কি করে?

আবার একবার দুষ্টু হাসি হাসলো দর্পণ। তারপর এক এক করে, ওর ব্লাউজের বোতামগুলো খুলে ফেললো ও ।

ওর বুকের দুই সুউচ্চ পাহাড়, আমার চোখের সামনে জেগে উঠলো। যেমন জেগে উঠে সবুজ দ্বীপ, আদি অন্তহীন সমুদ্র মাঝে। যেমন জেগে উঠে চন্দ্রমা, বিস্তৃত রাতের আকাশে।

হটাৎ মনে হলো, হায় ঈশ্বর! কতদিন এই সৌন্দর্যকে প্রত্যক্ষ করি নি আমি। কতদিন এই নন্দন কাননে দাপাদাপি করি নি আমি। কতদিন এই নন্দন কাননের মধু আহরণ করি নি আমি।

ওর বুকের পাহাড়গুলোর দিকে চেয়ে রয়েছি দেখে, দাঁত দিয়ে ঠোঁট কাটলো দর্পণ। তারপর আমার দিকে দুষ্টু হাসি হেসে ও বললো-
'কেবল দেখবে? একটু দাপাদাপি করবে না? '

ওর কথা শুনে দুষ্টু হাসি হাসলাম আমিও। তারপর ওকে জিজ্ঞেস করলাম -
শুধু দাপাদাপিই করবো? একটু গড়িয়ে পড়বো না?  

© অরুণ মাজী

সাগর সঙ্গমে ৩৫ (Dorpon)
Friday, October 14, 2022
Topic(s) of this poem: poem,pregnancy
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success