জানো দর্পণ, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। বলতে চাই, কিন্তু সাহস হয়ে উঠে না।
তোমাকে বলতে চাই, তুমি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠো। পিছন দিকে আর চেয়ে দেখো না। কি হবে পিছন দিকে চেয়ে? ফিরে পাবে তুমি, তোমার হারিয়ে যাওয়া গর্ভের শিশুকে? পাবে না। আমিও পাবো না। যা হারিয়ে যায়, তা ফিরে আসে না।
কিংবা, হয়তো আসে। নতুন এক সাজে। নতুন এক রূপে। কিন্তু সেই রূপকে আমরা চিনতে পারি না। তাই হারিয়ে যাওয়ার ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া এত সহজ কথা নয়।
কিন্তু হারানোর বেদনা থেকে মুক্ত না হলে, জীবনে আমরা বেঁচে থাকবো কি করে? হৃৎপিন্ড ধুকপুক করে বাজতে থাকলেই কি তাকে বেঁচে থাকা বলে? মানুষের জীবনে নতুন কোন স্বপ্ন থাকবে না? আনন্দ থাকবে না? গান থাকবে না? নতুন পথে যাত্রা থাকবে না?
তুমি বৃক্ষ। আর তোমার গর্ভের বাচ্চা সেই বৃক্ষের ফুল। গাছ সুন্দর করে না বাঁচলে, সুন্দর ফুল তাতে জন্ম নেবে কি করে? তোমাকে তাই সুস্থ হতেই হবে। যত তাড়াতাড়ি পারো, তত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠো তুমি।
তোমার চোখে ঝিলিক না দেখলে কষ্ট হয় আমার। তোমার ঠোঁটে হাসি না দেখলে বেদনা হয় আমার। বলো, কতদিন তুমি আর এমনি করে বিবর্ণ থাকবে?
তুমি একটু একটু করে সুস্থ হচ্ছো দেখে, খুব ভালো লাগছে আমার। কিন্তু আমি চাই, আরও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠো তুমি।
হয়তো এ কথা বলা সহজ। কিন্তু করা কঠিন। কিন্তু তুমি তো দর্পণ। জীবনে অনেক কঠিন কঠিন কাজ করেছো তুমি। তো এটা পারবে না?
আর আমি? আমি ততটুকুই ভালো বোধ করি, যতটুকু ভালো থাকো তুমি। তোমার চোখে কষ্ট দেখলে, আমি কি ভালো থাকতে পারি? পারি না। আমরা কেউই পারি না। আমার বাবা মা পারে না। তোমার বাবা মা পারেন না। দিদি পারে না। বিদুদা পারে না। পিকুও পারে না।
তুমি তো জানো, তোমাকে কষ্ট পেতে দেখলে, কতটা কষ্ট পায় পিকু? মনে পড়ে তোমার? কয়েক বছর আগে যখন তোমার পা ভেঙে গেছিলো, সেদিন কেমন কেঁদেছিলো পিকু! আসলে কি জানো? আমরা সবাই চাই, খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠো তুমি।
'একি, মা তোমাকে এত করে ডাকছে, শুনতে পাচ্ছো না? '
হটাৎ দর্পণের গলার আওয়াজ। পিছন ফিরে দেখতেই ভর্ৎসনার সুরে দর্পণ বললো-
'তুমি কি গো? মা কখন থেকে ডাকছে তোমাকে! '
আমাকে? কেন?
'মা রসমালাই বানিয়েছে, আর তুমি না খেয়েই চলে এসেছো।'
হাসলাম আমি। খাতাটা বন্ধ করে, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। তারপর দর্পণকে জিজ্ঞেস করলাম-
তুমি খেয়েছো?
'হ্যাঁ, আমরা সবাই খেয়েছি। নীচে যাও, মা অপেক্ষা করছে।'
ঘর ছেড়ে সিঁড়ির দিকে যাত্রা করলাম আমি। সিঁড়ি দিয়ে যখন নামছি, মা আমাকে বললো-
কিরে, রসমালাই না খেয়েই চলে গেলি!
মায়ের প্রশ্নের উত্তর না করে হাসলাম আমি। তারপর হাসতে হাসতে চেয়ারে বসলাম। মা রসমালাইয়ের প্লেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। তারপর আমার বাঁ হাত ছুঁয়ে, মা আমাকে জিজ্ঞেস করলো-
'তোরও খুব কষ্ট হচ্ছে। তাই না? '
মায়ের চোখের দিকে চেয়ে হাসার চেষ্টা করলাম আমি। কিন্তু হাসতে গিয়ে চোখটা ছলছল করে উঠলো আমার। মা আমার দিকে চেয়ে বললো-
'আমাদের সবার কষ্ট হচ্ছে অমল। কিন্তু কি করি বল তো? অপেক্ষা ছাড়া উপায় কি আমাদের? '
মা একটু থামলো। তারপর বললো-
'তবে কি জানিস, দর্পণকে কিন্তু এখন একটু সুস্থ মনে হচ্ছে।'
মৃদু হাসি হাসলাম আমি। মাকে জিজ্ঞেস করলাম-
কি করে বুঝলে?
'কদিন আগেও, ওর মুখে বিন্দুমাত্র হাসি দেখা যেত না। আজকাল ও একটু হাসছে।'
রসমালাইয়ের এক টুকরো মুখে নিয়ে আমি বললাম-
হুঁ, কিন্তু এখনো অনেক পথ বাকি।
মা কিছুক্ষণ সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইলো। তারপর মৃদুস্বরে মা বললো-
'তোর বাবাও বেশ ঘাবড়ে গেছে। হটাৎ কোথা থেকে কি যেন ঘটে গেলো! '
মায়ের দিকে চেয়ে রইলাম আমি। দেখি, মায়ের চোখে জল। মায়ের হাত ছুঁয়ে মাকে আমি বললাম-
তোমরা বড্ড বেশি কাঁদো মা। এত কাঁদো কেন? সামনে দেখো।
চোখ মুছলো মা। তারপর মৃদুস্বরে মা বললো-
'আমি বলি কি, তোরা এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে যা।'
আর তোমরা?
'আমরা কিছুদিন পর কলকাতা ফিরে যাই। লাবণ্য আর বিদুকে নিয়ে থাক তোরা।'
দিদিকে বলেছো এ কথা?
'না, এখনো বলি নি।'
প্লেট শূন্য হলো আমার। মা জিজ্ঞেস করলো-
কিরে, আর একটু দেবো?
না, মা। বড্ড বেশি সুগার এতে।
'তবে আর দেরী করিস না। রাত হয়েছে। সবাই ঘুমাতে গেছে।'
খালি প্লেট নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলো মা। মায়ের উদ্দেশে আমি বললাম-
আমি তাহলে উপরে যাই মা। তুমিও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ো।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem