সন্তান হারানো মায়ের কাহিনী, অরুণ মাজীর উপন্যাস
----------------------------
দর্পণের বুকের কাছে শুয়ে, চোখ বন্ধ করলাম আমি।
ওর কথাটা মনে পড়লো আবার- 'জানো? স্বপ্নে দেখলাম, তোমার আমার মাঝে ছোট্ট একটা শিশু ঘুমুচ্ছে। আর সেই ছোট্ট শিশুর দিকে চেয়ে খুশির হাসি হাসছো তুমি।'
দর্পণের দেখা স্বপ্নের সেই ছবিটা ভাবতে চেষ্টা করলাম আমি। ভাবলাম, দর্পণের গর্ভের সন্তান আজ থাকলে, সেই শিশুও আজ দর্পণ আর আমার মাঝে শুয়ে থাকতো। ঘুম থেকে উঠে, আজ হয়তো সেই শিশুর দিকে অপলকে চেয়ে থাকতাম আমি। তার সুন্দর মুখ, কচি কচি হাত পা দেখে, নিজের অজান্তেই হয়তো খুশির হাসি হাসতাম আমি।
অথচ দর্পণ প্রেগন্যান্ট হওয়ার আগে, শিশুর ভাবনা বেশি ভাবতাম না আমি। কিন্তু কবে যে দর্পণের চোখের স্বপ্ন আমার হয়ে গেলো, তা টেরও পায় নি।
আসলে, পুরুষ বুকেও এক মাতৃত্ব লুকিয়ে থাকে। পুরুষ বুকের সেই মাতৃত্বের প্রকাশ, নারী মাতৃত্বের প্রকাশের চেয়ে আলাদা। পুরুষ মাতৃত্ব নীরব। কিন্তু নারী মাতৃত্ব বাঙময়। পুরুষ নারীত্ব গন্ধহীন। নারী মাতৃত্ব সুগন্ধযুক্ত। পুরুষরা শিশুকে কোলে নিতে পারে। কিন্তু স্তন পান করাতে পারে না। নারী এক চুমুতে শিশুকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু পুরুষ তা পারে না।
কেন যেন মনে হলো, আসলে আমিও সন্তান চাই। ছোট একটা শিশু আমার গলা জড়িয়ে ঘুমুবে, সেই স্বপ্ন আমিও দেখি। ছোট্ট এক শিশুকে বুকে নিয়ে খেলবো আমি, সেই ভাবনা আমিও ভাবি।
হটাৎ দর্পণ আমার বুকের উপর হাত রাখলো। তারপর মৃদুস্বরে ও জিজ্ঞেস করলো-
'কি ভাবছো? '
হাসলাম আমি। ওরপ্রশ্নের উত্তর না করে, ওকে প্রতি-প্রশ্ন করলাম আমি-
তুমি কি ভাবছো?
আমার দিকে চেয়ে মৃদু হাসি হাসলো দর্পণ। তারপর আমার গলা জড়িয়ে আদুরে গলায় ও বললো-
'সেই স্বপ্নের কথা! '
অবাক হলাম আমি। বললাম-
তাই? আমিও তো তোমার স্বপ্নের কথা ভাবছি।
দাঁত দিয়ে ঠোঁট কেটে কেমন যেন এক মায়াবী হাসি হাসলো দর্পণ। তারপর ওর আঙুল দিয়ে আমার ঠোঁট ছুঁয়ে ও বললো-
'স্বপ্নের কোন কথা ভাবছো? '
ভাবছি, তোমার আমার মাঝে এক শিশু ঘুমিয়ে আছে। আর তার দিকে চেয়ে খুশির হাসি হাসছি আমি। তাকে বুকে নিয়ে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে লুফে নিচ্ছি আমি।
দর্পণ আমার বুকে হাত রাখলো। তারপর নখ দিয়ে বুকে আঁচড় কাটতে কাটতে ও বললো-
'জানো, খুব ভালো এক বাবা হবে তুমি।'
তাই? কি করে জানলে?
'তুমি খুব শান্ত। ক্রোধ তোমার স্বভাব নয়।'
মানে?
'মানে, বাবারা সাধারণত রাগী হয়। সন্তানদেরকে খুব বেশি বকাঝকা করে। তুমি তা করবে না।'
এবার সশব্দে হেসে উঠলাম আমি। দর্পণ জিজ্ঞেস করলো-
'হাসছো তুমি! কেন? '
আমি বললাম-
কথাটা বেশ ডিপ্লোম্যাটিক্যালি বললে তুমি।
'মানে? '
মানে, তুমি চাও তোমার সন্তানকে আমি বকাঝকা যেন না করি।
দর্পণ আমার কপাল ছুঁয়ে বললো-
'আমি জানি। আমি না চাইলেও তা তুমি করবে না।'
কোন উত্তর না করে নিঃশব্দ হাসি হাসলাম আমি। দর্পণ হটাৎ মন্তব্য করলো-
'মা বাবা হওয়ার ট্রেনিং আমরা আগেই করে ফেলেছি। তাই না? '
লাফিয়ে উঠলাম আমি। ওকে জিজ্ঞেস করলাম-
মানে?
'কেন? পিকুকে তো তুমি আর আমিই বেশি দেখাশোনা করি।'
হাসলাম আমি। বললাম-
হুঁ, তা বটে!
কিছুক্ষণ থামলাম আমি। তারপর বললাম-
আসলে কি জানো? জীবনে কোন কাজই ব্যর্থ হয় না। তাই না?
দর্পণ বোধহয় আমার কথাটা স্পষ্ট বুঝতে পারলো না। ও তাই জিজ্ঞেস করলো-
'ব্যর্থ হয় না মানে? '
মানে, এই যে পিকুকে আমরা দেখভাল করি, তা কি অত ভেবে করি? অথচ ওকে দেখাশোনা করার মধ্যেই, আমরা বাবা মা হওয়ার ট্রেনিং সেরে ফেললাম।
দর্পণ কিছুক্ষণ সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইলো। তারপর মৃদু স্বরে ও বললো-
'কোন ভালোবাসাই ব্যর্থ হয় না অমল।'
মানে?
'মানে, আমাদের দেওয়া ভালোবাসা এই পৃথিবীর বাতাসে সুগন্ধ হয়ে ভাসতে থাকে। তারপর একদিন সেই ভালোবাসা, আমাদের বুকেই ফিরে আসে।'
দর্পণের গলা জড়িয়ে ধরলাম আমি। তারপর ওর ঠোঁটে কিস করে আদুরে গলায় আমি বললাম-
এত সুন্দর কথা তুমি বলো কি করে?
দর্পণ আমাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো। তারপর কপট অভিযোগের সুরে ও বললো-
'ব্যাস, আর তাতেই আমাকে কিস করার বাহানা পেয়ে গেলে তুমি! '
দুষ্টু হাসি হাসলাম আমি। তারপর বললাম-
তোমার দেওয়া ধাক্কাও কিন্তু, কিসের চেয়ে কম মিষ্টি নয়!
দর্পণ জিব বের করে কপট অনুতাপের ভান করলো। বললো-
'ইশঃ তোমাকে তাহলে ভুল করে ধাক্কা দিয়ে ফেললাম।'
এমন সময় নীচ থেকে পিকুর গলার আওয়াজ ভেসে এলো-
'মামু, দৌড়তে যাবে না? আমরা রেডি।'
হাসতে হাসতে দর্পণের গলা জড়িয়ে ধরলাম আমি। দর্পণ আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। তারপর শাসনের সুরে ও বললো-
'একি! ওরা নীচে অপেক্ষা করছে, আর এখনো ঘুমুবে তুমি? '
গভীর এক হাই তুললাম আমি। তারপর হাসতে হাসতে বললাম-
আজ আর দৌড়তে ইচ্ছে করছে না। ক্লান্ত লাগছে।
তৃষ্ণার্ত চোখে আমার দিকে চেয়ে দেখলো দর্পণ। তারপর দুষ্টুমি করে ও বললো-
'সকালে উঠে এত দাপাদাপি করবে, তো ক্লান্ত হবে না? '
কেন, দাপাদাপি কি আমি একাই করেছি? তুমি করো নি?
'না, আমি করি নি।'
করো নি মানে?
'মানে, আমি তো আর তোমার মত ক্লান্ত হই নি।'
দুষ্টু হাসি হাসলাম আমি। বললাম-
তুমি ক্লান্ত হও নি বটে। কিন্তু আমাকে ক্লান্ত করেছো।
দর্পণ আমার বুকে ধাক্কা দিয়ে বললো-
'বেশ করেছি, করেছি। যাও, এখন ওঠো। '
কথাটা বলেই, দর্পণ সোজা হয়ে বসলো। তারপর বিছানা থেকে ব্লাউজটা তুলে নিয়ে ব্লাউজের হুকগুলো আটকাতে শুরু করলো ও।
দপর্ণের বুকের সুদৃশ্য ঐশ্বর্যের দিকে অপলকে চেয়ে রইলাম আমি। দর্পণ তা দেখে হাসলো। তারপর কপট অধৈর্যের সুরে ও বললো-
'ঊহঃ তুমি একটা যা তা। এগুলোকে নিয়ে এত দাপাদাপি করলে, তাতেও মন ভরে নি তোমার! '
বোকা হাসি হাসলাম আমি। ওকে বললাম-
অমৃতের গুণই তো তাই। যত বেশি পান করবে, তত বেশি অতৃপ্তি বাড়বে।
ব্লাউজ পরা শেষ হলে খাট থেকে লাফিয়ে নেমে পড়লো দর্পণ। তারপর বাথরুমের দিকে যেতে যেতে ও বললো-
'অনেক হয়েছে তোমার কবিতা। এসো, এখন রেডি হয়ে নাও।'
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem