গাড়ি ছুটছে। কিন্তু মন্থর গতিতে। বিকেলের ট্র্যাফিক জ্যাম। তাই কোন উপায় নেই। পিকু হটাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলো-
'আমরা কোথায় যাচ্ছি মামু? '
হাসলাম আমি। বললাম-
তুই বল, কোথায় যাচ্ছি?
পিকু রাস্তার চারপাশটা দেখে, জায়গাটা চেনার চেষ্টা করলো। তারপর কিছুক্ষণ ভাবলো ও। তবুও বোধহয় অনুমান করতে পারলো না। ও বললো-
'বুঝতে পারছি না।'
তোকে যে বললাম- তোর বোনুর কাছে যাচ্ছি।
'কিন্তু এ তো বাড়ির রাস্তা নয়, মামু।'
তোর মা আর বোনু তো হাসপাতালে।
পিকু যেন বেশ ঘাবড়ে গেলো। ব্যস্ত হয়ে বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞেস করলো-
'হাসপাতালে! মা হাসপাতালে কেন, মামু? '
তোর বোনুর জন্য হাসপাতাল নিরাপদ জায়গা, তাই।
পিকু এবার বোধহয় আশ্বস্ত হলো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর ও বললো-
'বোনুটা কত বড় মামু? ওকে আমি নিতে পারবো? '
আমি হাসলাম। বললাম-
কেন পারবি না? নিশ্চয় নিবি।
কথা বলতে বলতে হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম আমরা। তারপর গাড়ি পার্ক করে সোজা লিফ্টের কাছে এলাম। পিকু হটাৎ বললো-
'বোনু তো এ মিষ্টি খাবে না মামু। তুমি তো ওর জন্য কোন চকোলেট নিলে না? '
পিকুর মাথায় হাত দিয়ে হাসতে হাসতে আমি বললাম-
নেবো। আজ ও নতুন তো। তাই আজ ও চকোলেট খাবে না।
উপরে পৌঁছতেই, পিকু দর্পণকে দেখতে পেলো। দর্পণকে দেখে, সবেগে দৌড়ে গেলো পিকু। তারপর দর্পণের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে পড়লো ও।
ওর ঠাম্মা আর দাদু পাশে ছিলো। তারা ওকে জিজ্ঞেস করলেন-
'কিরে, তোর বোনুকে দেখবি না? '
পিকু সলজ্জ ঘাড় নাড়লো। সম্মতিসূচক। দর্পণ ওকে বললো-
'একটু অপেক্ষা কর, তোর বাবা তোকে ভেতরে নিয়ে যাবে।'
দর্পণ বিদুদাকে ফোন করলো। মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে এলো বিদুদা। ওর বাবাকে দেখে, পিকু বোধহয় বেশ লজ্জা পেলো। বিদুদা পিকুকে বললো-
'এসে গেছিস? আয়, তোর মা ডাকছে।'
পিকুর হার ধরে বিদুদা ভেতরে ঢুকে গেলো। কিন্তু মুহূর্তেই বেরিয়ে এলো ও। তারপর আমার উদ্দেশে ও বললো-
'তুমিও এসো, অমল।'
বিদুদার সাথে রিকোভারি রুমে গেলাম আমরা। দেখি, দিদি বিছানার উপর হেলান দিয়ে শুয়ে রয়েছে। আর ওর বুকের উপর ওর মেয়ে শুয়ে রয়েছে।
দিদির চোখে মুখে, ক্লান্তির ছাপ বেশ স্পষ্ট। বেশ বিধ্বস্ত লাগছে ওকে। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে রয়েছে। কিন্তু পিকুকে দেখেই আনন্দে চোখ জ্বলে উঠলো দিদির। এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে পিকুর উদ্দেশে ও বললো-
'কাছে আয় পিকু।'
দৌড়ে ওর মায়ের কাছে গেলো পিকু। দিদি ওর গাল বাড়িয়ে দিলো। পিকু ওর মায়ের গালি হামি দিলো । তারপর ওর বোনের দিকে, অপলকে চেয়ে রইলো পিকু। ওর ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেলো। ওর মায়ের কানে কানে আদুরে গলায় ও বললো-
'বোনুকে আমি নেবো, মা।'
দিদি হাসলো। পিকুর মাথায় হাত রেখে ও বললো-
'নিবি? যা, হাত ধুয়ে আয় তবে।'
বিদুদা পিকুকে নিয়ে সিঙ্কে গেলো। পিকু হাত ধুয়ে ফিরে এলো ওর মায়ের কাছে। বিদুদা সাহায্য করলো দিদিকে। পিকুর কোলে শিশুকে দিয়ে বিদুদাও ধরে রাখলো শিশুকে।
ছোট্ট শিশুর চোখ বন্ধ। ঘুমুচ্ছে ও। তা দেখে পিকু ওর মাকে বললো-
'মা, ও দেখছে না কেন আমাকে? '
দিদি হাসলো। বললো-
'ও ঘুমুচ্ছে তো, তাই? '
দিদি পিকুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো-
'এবার আমাকে দে। বাড়িতে গিয়ে অনেক আদর করিস ওকে।'
পিকু ওর বোনকে মায়ের কোলে দিলো। তারপর ওর বোনের মাথা ছুঁয়ে আদুরে গলায় ও বললো-
'তোকে বাড়িতে গিয়ে কোলে নেবো, বোনু।'
পাশে এক বয়স্কা নার্স দাঁড়িয়ে ছিলেন। পিকুর কথা শুনে হেসে ফেললেন উনি। বললেন-
'হ্যাঁ, বাড়িতে গিয়ে কোলে নিয়ে ঘুড়ে বেড়াস তুই।'
বিদুদা পিকুর মাথায় হাত রেখে বললো-
'চল, বাইরে যাই আমরা। তোর মা ক্লান্ত, এখন একটু ঘুমাবে।'
কিন্তু পিকুর মন ভরলো না তাতে। ওর মায়ের দিকে চেয়ে ইতস্তত করলো ও। বিদুদা বললো-
'আর কিছুক্ষণ পর, বাড়ি ফিরে যাবে তোর মা।'
দিদি ইঙ্গিতে পিকুকে ডাকলো। পিকু ওর মায়ের কাছে গেলো। পিকুকে হামি দিয়ে দিদি জিজ্ঞেস করলো-
'খেয়েছিস? '
পিকু হাসলো। বললো-
'হ্যাঁ, ম্যাকডোনাল্ডস।'
বয়স্কা নার্সটি পিকুকে বললেন-
'তুই ম্যাকডোনাল্ডস খেলি, তোর বোনুর জন্য আনলি না? '
পিকু সপ্রতিভ ভাবে বললো-
'ও তো ছোট্ট। ম্যাকডোনাল্ডস ও খাবে কি করে? '
নার্সটি বললেন-
'বেশ, ম্যাকডোনাল্ডস না হয় খেতে পারবে না। কিন্তু চকোলেট? '
পিকু বললো-
'মামুকে বলেছিলাম। মামু বললো- আজ ও নতুন তো। তাই আজ ও খাবে না।'
দিদি হেসে ফেললো। বললো-
'হ্যাঁ, একটু বড় হলে ওকে চকোলেট দিস তুই।'
নার্সটি এবার বেশ গম্ভীরভাবে পিকুকে বললেন-
'পিকুবাবু, তুমি এবার তোমার বাবার সাথে যাও। তোমার মা এখন ঘুমুবে।'
পিকু ওর বাবার দিকে চেয়ে দেখলো। বিদুদা পিকুকে বললো-
'চল, বাইরে যাই আমরা।'
দিদি হটাৎ আমাকে বললো-
'ভাই, দর্পণকে মায়ের সাথে বাড়ি পাঠিয়ে দে। বিশ্রাম করুক ও।'
দিদির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। বাইরে বেরোতেই, পিকুর ঠাম্মা পিকুকে জিজ্ঞেস করলো-
'কিরে, দেখেছিস তোর বোনুকে? '
পিকু হাসলো। তারপর বেশ গম্ভীরভাবে ও বললো-
'হ্যাঁ। খুব ছোট্ট! '
ওর ঠাম্মা হাসতে হাসতে ওকে জিজ্ঞেস করলো-
'কি নামে ডাকলি তোর বোনুকে? '
পিকু
'কেন, বোনু নামে।'
মাসিমা এবার হেসে ফেললেন। বললেন-
'তোর বোন তাই বোনু। কিন্তু নাম কি রেখেছিস ওর? '
পিকু এবার ওর বাবার দিকে চেয়ে দেখলো। ওর বাবা হাসতে হাসতে ওকে বললো-
'ঠাম্মাকে বলো, ওর তিনটে নাম- যমুনা, জুঁই আর ধরিত্রী।'
মাসিমা মায়ের দিকে চেয়ে বললেন-
'যমুনা নামটা আমি রেখেছি। কিন্তু জুঁই আর ধরিত্রী নাম কার দেওয়া, মৃণাল? '
মা দুষ্টু হাসি হাসতে হাসতে বললো-
'সে কথা বাড়িতে গিয়ে লাবণ্যকে জিজ্ঞেস করো তুমি।'
বিদুদা এবার দর্পণকে বললো-
'দর্পণ, শ্বাশুড়ীমাকে নিয়ে বাড়ি যাও তুমি। তোমার বিশ্রামের দরকার।'
বাবা বললো-
'সেই ভালো। দর্পণের বিশ্রামের দরকার।'
বাবা এবার বিদুদার মায়ের দিকে চেয়ে বললো-
চলো, আমরা বাড়ি যাই। বিদু আর অমল বরং এখানে থাকুক।
পিকু ওর বাবার হাত ধরে বললো-
'আমি এখানে থাকি, বাবা? '
বিদুদা কিছু বলার আগেই দর্পণ পিকুকে বললো-
'তুমি আমার সঙ্গে এসো, পিকু। তোমারও বিশ্রাম দরকার।'
পিকুর হাত ধরে, দর্পণ লিফ্টের দিকে এগিয়ে গেলো।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem