অরুণ মাজীর নতুন রোমান্টিক উপন্যাস চেনা অমল অচেনা দর্পণ ১
এদিকে সবুজ অরণ্যভূমি। ওদিকে বিশাল নীল জলরাশি। জলরাশি আর সবুজ অরণ্যের মাঝে, সুন্দর এক ওয়াকিং ট্র্যাক। সব কিছুই যেন শিল্পীর আঁকা, সুন্দর এক ছবির মত। সব কিছুই যেন ভীষণই গুছানো। ভীষণই সাজানো।
সামনের নীল জলরাশি কেবল কাব্যিক অর্থেই নীল নয়। সত্যিকারের নীল। মাঝে মাঝে বড় বড় ঢেউ। আর সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। এখন সকাল। আকাশও বেশ সুন্দর। মেঘহীন সকালের নির্মল আকাশ। তবুও কিন্তু ঝোড়ো হাওয়ার দাপট বেশ প্রকট।
ঘাসের উপর বসলাম আমি। হাত পা ছড়িয়ে। উন্মুক্ত আকাশের নীচে, এমন উন্মুক্ত সবুজভূমিতে পা ছড়িয়ে বসবো না? প্রাণ খুলে একটু শ্বাস নেবো না? পা ছড়িয়ে বসে, দীর্ঘ এক শ্বাস নিলাম আমি। তারপর দূরের জলরাশির দিকে মুখ করে, অপলকে চেয়ে রইলাম।
দেখলাম, বড় একটা জাহাজ পোঁ পোঁ করে হর্ণ বাজিয়ে 'ওয়াটসন বে' এলাকার দিকে এগিয়ে চলেছে। বুঝলাম, হয়তো কোন দূর দেশে যাবে জাহাজটা। কারণ, ওয়াটসন বে এলাকা পেরিয়ে গেলেই প্রশান্ত মহাসাগর। প্রায় আদি অন্তহীন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর।
জাহাজটা ফোর্ট ডেনিসনের কাছাকাছি হতেই, আরও বেশি সচেতন হয়ে উঠলাম আমি। দেখলাম, জাহাজটা যখন ক্রস করলো, তখন ফোর্ট ডেনিসন পুরো ঢেকে গেলো। বাপরে বাপ, কি বিশাল জাহাজ!
হটাৎ আমার কাঁধে ঠান্ডা কিছু ঠেকলো। চকিতে পিছন ঘুরলাম আমি। দেখি, ছোট্ট একটা কুকুর, আমার কাঁধে আলিঙ্গন করার চেষ্টা করছে। প্রথমে হকচকিয়ে গেলাম আমি। কিন্তু মুহূর্তেই সামলে নিলাম নিজেকে।
আমাকে চমকে উঠতে দেখে, কুকুরের পালক দম্পতি ছুটে এলেন আমার কাছে। প্রায় সমস্বরে ওনারা জিজ্ঞেস করলেন আমাকে-
'Are you ok? '
ওনাদের দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলাম আমি। দুজনেরই বেশ বয়স হয়েছে। বুঝলাম, সকালে, সমুদ্রের ধারে হাঁটতে বেড়িয়েছেন ওনারা। ওনাদের দিকে চেয়ে হাসলাম আমি। তারপর কুকুরটাকে আদর করতে করতে বললাম-
Yes, I am fine.
বৃদ্ধ পুরুষটি আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। বললেন-
'Good morning.'
হাসলাম আমিও। বললাম-
Very good morning.
বৃদ্ধপুরুষটি বললেন-
'Jimmy, let's go now.'
আমার কোল থেকে ঝাঁপিয়ে নেমে পড়লো জিমি। তারপর ওর পালক পিতা মাতার কাছে দৌড়ে গেলো ও। বৃদ্ধ দম্পতি হাত নেড়ে বিদায় জানালেন আমাকে। তারপর সিডনি অপেরা হাউসের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন ওনারা।
জিমির দিকে চেয়ে রইলাম আমি। কি আশ্চর্য! দেখলাম, জিমিও মাঝে মাঝে পিছন ফিরে দেখলো আমাকে।
অদ্ভুত! তাই না? জিমির সঙ্গে মাত্র এক মুহূর্তের আলাপ। অথচ যেতে যেতে আমাকে পিছন ফিরে দেখছে ও! এও কি সম্ভব? একজন কুকুর কি এত সংবেদনশীল হতে পারে? এত অনুভবী হতে পারে? প্রশ্নটা মনের মধ্যে পাক খেতে শুরু করলো।
ভাবলাম, এমনও তো হতে পারে- কুকুরের অনুভব ক্ষমতা, মানুষের চেয়েও বেশি। কথা দিয়ে সংলাপ করতে পারে না বলে, কুকুরকে ঈশ্বর গভীর এক অনুভূতি দিয়েছেন।
মনে পড়ে গেলো, হেলেন কিলারের গল্প। অনেকেই বলেন, হেলেন কিলার মুক বধির ছিলেন বলেই, আরো বেশি অনুভব ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন উনি।
বিজ্ঞানেও এমন অনেক ঘটনা লক্ষ্য করা যায়, যেখানে- দেহের এক অঙ্গ দুর্বল হয়ে গেলে, অন্য এক অঙ্গ, দুর্বল অঙ্গের কাজের ভার নিতে এগিয়ে আসে। এক দিকের হাঁটুতে চোট লাগলে, অন্যদিকের পা বেশি ভার নিয়ে, আঘাতগ্রস্ত পা-কে চাপমুক্ত রাখে। এজন্য মানুষকে ভাবতে হয় না। মানুষের অবচেতনেই এই ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানী ডাক্তাররা একে বলেন- 'Compensation'।
আমার বাবা অর্থপেডিক সার্জন। বাবাই এই গল্প বলেছে আমাকে। বছর খানেক আগে দর্পণের পা ভাঙলো। ও তখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতো। ভাঙা পায়ের ভার, অন্য পা দিয়ে বইতো দর্পণ।
তাই, যারা ভাষা দিয়ে সংলাপ করতে পারে না; তাদের অনুভূতি বেশি গভীর হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিজ্ঞানের 'Compensation' নিয়ম অনুযায়ী, তা ঘটতেই পারে।
সুদূর জলরাশির দিকে চেয়ে এমন অনেক কথা ভাবছি। অনেক কথা। সেই সঙ্গে দেখছি, সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটছে বহু মানুষ। দৌড়চ্ছে বহু মানুষ। ইচ্ছে হলো, আমিও একটু হেঁটে বা দৌড়ে আসি। কিন্তু না, গুরুত্বপূর্ণ এক কাজে এসেছি আমি। ঘেমে ক্লান্ত হয়ে গেলে চলবে না আমার।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ফোন বেজে উঠলো আমার। নাহঃ কারও কল নয়, এলার্ম। সকাল সাড়ে নটার এলার্ম। সকাল সাড়ে দশটার সময় এক ব্যাঙ্কের 'IT ডিরেক্টরের' সাথে মিটিং আছে আমার। সেজন্যই সুদূর কলকাতা থেকে সিডনি ছুটে এসেছি আমি।
এলার্ম বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালাম আমি। তারপর সিডনি অপেরা হাউসের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। ইচ্ছে, রাস্তায় ব্রেকফাস্ট করে, ব্যাঙ্কের অফিসে ঢুকবো আমি।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem