কেউ কি এমন মানুষকে জানো, যে বড় হতে চায় না? সকলেই বড় হতে চায়। এবং তাদের বেশিরভাগ মানুষই, কঠিন পরিশ্রমও করে। তবুও তারা বড় হতে পারে না। কেন? প্রতিভার অভাবে? নাহঃ। প্রতিভা সকলেরই কিছু না কিছু আছে। (এ শুধু আমার কথা নয়, আইনস্টাইনও এই কথা বারবার বলতেন।)প্রতিভার মতো এতো সুলভ জিনিস পৃথিবীতে আর কিছু নেই।
এই প্রশ্ন আমাকে বেশ ভাবায়। যারা সত্যিকারের বড় হয়েছে, তাদের জীবন পর্য্যবেক্ষণ করে দেখেছি, তাদের অদ্ভুত এক নেশা আছে। কি সেই নেশা? যে পথে অন্য কেউ হাঁটতে চায় না, সেই কঠিন পথে এই মহামানবরা হাঁটতে চায়।
বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ কোন পথে হাঁটতে চায়? সোজা পথে। যারা বড় হয়, তারা কিন্তু ইচ্ছে করে কাঁটা ঢাকা পথ বেছে নেয়। কেন? কারন এরা এদের বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা বলে বুঝতে পেরেছে, সোজা পথ আসলে কঠিন পথ। কেন? সোজা পথ কখনো কাউকে কোন ভালো গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে না। কোন ভালো গন্তব্যেই যদি তুমি পৌঁছতে পারলে না, তাহলে সেই পথ কঠিন নয় তো কি? এতো কঠিন যে তোমার গন্তব্যে তুমি কোনদিন পৌঁছতেই পারলে না। কঠিন পথই সত্যিকারের সহজ পথ। সাধনার পথই একমাত্র সহজ পথ।
সোজা পথে হেঁটে তুমি যতই পরিশ্রম করো, তুমি তোমার গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না। কেন? কারন পথটাই তো ভুল।
আমাদের সবার খেদ, কয়েক দশক আগে, আমাদের হেমন্ত বাবু, মান্না বাবু, আলি আকবর খান, বিসমিল্লা খান, রবি শঙ্কর ইত্যাদি ছিলেন। আজকের দিনে কেমন যেন খরা চলছে। কেন? এতো প্রচার, এতো অর্থ পাচ্ছে আজকের শিল্পীরা, তবুও আমরা ঘুরে ফিরে হেমন্ত বাবু, মান্না বাবুর শরণাপন্ন হচ্ছি। কেন?
আমার এক জেঠু (এখন প্রয়াত)আমাকে বলেছিলেন, তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে সকালে কথা বলতে গেছিলেন, তিনি লক্ষ্য করলেন হেমন্তবাবু রেওয়াজ শেষে যখন কথা বলতে শুরু করলেন, তখনও তিনি অবিকল গানের সুরে কথা বলছেন। হেমন্ত বাবুর "সম্বিত" নেই, যে তিনি গানের সুরে "বিষয়ী" কথা বলছেন! এই যে সাধনামগ্ন মানসিকতা, এই মানসিকতাই মানুষকে বড় করে।
আজকের দিনে কি হচ্ছে? কেউ কাগজওয়ালাকে, তেল দিয়ে শিল্পী হতে চায়। কেউ অন্যের লেখা চুরি করে লেখক হতে চায়। কেউ গবেষণা চুরি করে বিজ্ঞানী হতে চায়। কেউ বাহুবলে "ডি লিট" অর্জন করে মহান সাজতে চায়। আজকের দিনে আমাদের কেমন যেন ৪২০ মানসিকতা। সকলেই মানুষকে উল্লুক বানিয়ে বড় হতে চায়।
মানুষ ক্ষণিকের জন্য উল্লুক সাজে ঠিকই। কিন্তু মানুষের হুঁশ একদিন তো ফিরবেই। তখন রঙিন চাদরে আবৃত, এদের গলিত কঙ্কাল তো বেরোবেই। মানুষ হয়েও যাদের আত্মসম্মানবোধ থাকে না, তারাই কেবল লোক ঠকিয়ে বড় হতে চায়। ঠগ আর চোর যারা, তারা ধরা তো পড়বেই।
সাধারণ মানুষও অসাধারণ হয়ে উঠে, যখন তারা সাধনাকে একমাত্র পথ ভাবতে শুরু করে। সাধনার জন্য সংযম দরকার। শৃঙ্খলা দরকার। লোভ সংবরণ দরকার।
আমি আমার রুগীদেরকে মাঝে মাঝেই বলি- "কোন জিনিস যদি সোজা পথে আসে, তাকে গ্রহণ করো না। তা তোমার বিপদ ডেকে আনবেই আনবে।" আমিও জীবনে অনেক ভুল করেছি। যখনই সোজা পথে হেঁটেছি, তখনই দেখেছি- আমার বিপদ বেড়েছে। কোনদিন আমি গন্তব্যে পৌঁছতে পারি নি। আজকাল আমি তাই কেবল কঠিন পথে হাঁটি। আজকাল আমি সাধনার পথে হাঁটি।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সাধনাকে "একমাত্র পথ" হিসেবে "চিনতে পারা"। অরুণ মাজী বলছে বলেই, তাকে তোমরা বিশ্বাস করো না। তোমরা আপন জীবন খুঁড়ে খুঁড়ে দেখো। অরুণ মাজী যা বলছে তা কি বাস্তব? অথবা তা অরুণ মাজীর মাতলামো। আমার দুঃখ, আমি তোমাদেরকে কখনো কোন সোজা পথের হদিশ দিতে পারি না। আমি দুঃখিত। আমি চেষ্টা করলেও ৪২০ হতে পারি না।
© অরুণ মাজী
Painting: Andrew Atroshenko
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem