ভুল কি কেবল মানুষই করে? ঈশ্বর করে না?
ঈশ্বর নম্র আর বিনয়ী- ভুল হলে, সংশোধন করেন।
নিজের তৈরী সৃষ্টিকে, আজও তিনিভাঙছেন, আর গড়ছেন।
সৃষ্টিকে আরও বেশি সুন্দর করার জন্য- আজও তিনি উদ্বিগ্ন, নিদ্রাহীন।
আজও তিনি রোদ জল বৃষ্টি উপেক্ষা করে, হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন।
মানুষ যন্ত্রণা পেলে, ঈশ্বরের কাছে নালিশ করে।
কিন্তু ঈশ্বরের যে এতো যন্ত্রণা
মানুষ তো তার জন্য- একটু ভাবে না! মানুষ তো তার জন্য একটু, চোখের জল ফেলে না!
মানুষ যদি ঈশ্বরকে ভালোবাসে, তবে ঈশ্বরের দুঃখে মানুষ কাঁদে না কেন?
মানুষ- আত্মমগ্ন, অন্ধ এক জীব।
মানুষ তার হৃদয় আয়নায়- কেবল নিজেকে দেখে, অন্য কাউকে আর দেখে না।
মানুষ, এক হাঁটু জলে ছোট্ট একটা পুঁটি মাছ। কেবলই খলখল করে! মানুষ তুচ্ছ ক্ষমতা নিয়ে- সর্বজ্ঞ সাজতে চায়, সর্ব্বশক্তিশালী সাজতে চায়। মানুষ- তারসৃষ্টির কারনকেও অস্বীকার করতে চায়।
অথচ- ঠিক এই মুহূর্তে তার জীবনে কি ঘটবে, মানুষ তা জানে না। তবুও মানুষ- একটু নম্র হতে পারে না, বিনয়ী হতে পারে না!
ঈশ্বর প্রথমে, মানুষকে দু-পেয়ে পশু গড়েছিলেন। সেদিনই রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন- তার সদ্য গড়া দু-পেয়ে পশু, কেবল নিজেদেরকেইধ্বংস করলো না, তারা সমগ্র সৃষ্টিকেই ধ্বংস করে দিলো। ঈশ্বর ভয় পেলেন। তিনি কাঁদলেন। নিদ্রা ত্যাগ করে, সেই রাতেই তিনি, দু-পেয়ে পশুগুলোর মধ্যে চেতনা ঢুকিয়ে দিলেন। জন্ম নিলো- চেতনা যুক্ত মানুষ!
সেই থেকে মানুষের মধ্যে শুরু হলো- পশুত্ব বনাম চেতনার কঠিন সংঘর্ষ।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কি? মানুষের মধ্যে- চেতনা বনাম পশুত্বের কঠিন সংঘর্ষ।
রাম-রাবনের যুদ্ধ কি? মানুষের মধ্যে- চেতনা বনাম পশুত্বের কঠিন সংঘর্ষ।
এই সংঘর্ষে- যে সব মানুষের মধ্যে পশুত্ব জেতে, তাদেরকে আমরা বলি নরপশু;
যেসব মানুষের মধ্যে চেতনা জেতে, তাদেরকে আমরা বলি নরদেবতা।
বিবেকানন্দ, সুভাষ বসু, বিদ্যাসাগর- এরা হলেন নরদেবতা। আর আমার মতো পাপীরা হলো- নরপশু।
মানুষ- পশু আর দেবতার মাঝামাঝি। যে মানুষ তার মধ্যেকার পশুত্বকে পুষ্টি যোগায়, সে হয় নরপশু। আর যে মানুষ, তার মধ্যেকার দেবত্বকে (দেবত্ব হলো এক ধার্মিক চেতনা) পুষ্টি যোগায়, সে হয় নরদেবতা।
তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করো- মানুষ তো ভালো মন্দ জানে, তবুও মানুষ মন্দ করে কেন? যারা পাঁড় মাতাল, তারা জানে- মদ খেলে লিভারে সিরোসিস হয়, তবুও তারা হাঁড়ি হাঁড়ি মদ খায় কেন? যারা চোর, তারা জানে- ধরা তারা পড়বেই। তবুও তারা চুরি করে কেন?
আমরা যাকে "জ্ঞান" বলি- সেটা সত্যিই কি এক "জ্ঞান"? তুমি জানো মদ খেলে, তুমি মরবে। তবুও তুমি বোতল বোতল মদ গিলে যাচ্ছো। তাহলে তুমি, সত্যিই কি জানো? নাহঃ তুমি জানো না। তোমার মধ্যে লুক্কায়িত বিশ্বাস এই যে-
"মদ খেয়ে যদু মরেছে ঠিকই, কিন্তু আমি কখনো মরবো না।"
"চুরি করে, মধু জেলে গেছে ঠিকই; কিন্তু আমি জেলে যাবো না।"
সত্যকে তুমি অস্বীকার করলে! কেন? কারন তোমার মধ্যেকার লোভ আর আসক্তি-, তোমাকে, সত্য গ্রহণ করতে দেয় নি। কেবল তোমার মস্তিস্ক-ই জানে মদ খেলে মৃত্যু হয়, কিন্তু তোমার মধ্যেকার হৃদয়- সেই সত্য গ্রহণ করে নি। মস্তিস্ক কেবল বিচার বিশ্লেষণ করে, কিন্তু হৃদয় সেটার আত্মীকরণ ঘটায়। যা কিছু তুমি হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করো না, তা তুমি- বাস্তবে গ্রহণ কখনো করো না।
এই হলো মানব চরিত্রের দ্বিচারিতা। আমরা মুখে বলি এক; কাজে করি অন্য কিছু। মানুষের জ্ঞান, আর বাস্তবে তার প্রয়োগের মধ্যে এই যে তফাৎ, তা মানুষের দ্বিচারিতার জন্য। মানুষ দ্বিচারী কেন? কারন- মানুষ লোভী আর কামনা আসক্ত।
লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। সহস্র বছর পুরানো এই প্রবাদ বাক্য। লোভ করলে, শাস্তি পাবেই। পরজন্মে নয়, এই জন্মে। ঈশ্বরের দ্বারা নয়, তোমার কাজের ক্রমঃফল হিসেবে। তবুও মানুষ লোভে ডুবে মরে কেন?
তুমি সমুদ্র যাত্রা করবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম- কোথায় যেতে চাও ভাই? তুমি বললে- যাঃ তা তো ভাবি নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম- তোমার কম্পাস কোথায়? তুমি বললে- যাঃ কম্পাস কিনতে ভুলে গেছি। লক্ষ্যহীন ভাবে সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে, একদিন তুমি হারিয়ে গেলে। হারিয়ে গিয়ে, তুমি কুখ্যাত সেই "বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল"-এ, প্রবেশ করলে। তুমি- তোমার জাহাজ সহ ডুবে গেলে।
বাঁচতে গিয়ে হে মানুষ
মরণকে আঁকড়ে ধরো কেন?
সুখের পথে হাঁটতে গিয়ে
দুঃখের বুকে আশ্রয় কেন?
তিষ্ঠ ক্ষণকাল হে মানুষ তিষ্ঠ ক্ষণকাল। কখনো কি জিজ্ঞেস করেছো তোমাকে- কে তুমি? এ কিসের যাত্রা তোমার?
© অরুণ মাজী
Painting: Eugene De Blaas
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem
অসাধারণ লেখা! ভালো লেগেছে ।