অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
শহরের ছোট্ট নার্সিং হোম। ছোট্ট হলেও যথেষ্ট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। খুশি হলাম আমি। হাসপাতালের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, তার গুণগত মান ফুটিয়ে তুলে। পুরোটা নয়। তবে বেশ কিছুটা। নিরাময় আর স্বাস্থ্যের সন্ধানে এসে, মানুষ যদি হাসপাতালের পরিবেশ নোংরা আর আবর্জনাপূর্ণ দেখে; তাহলে মানুষের নিরাময় পাওয়ার স্বপ্ন বেশ গভীর ধাক্কা খায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, এই সহজ সত্য- স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী বা সরকারী আমলারা বোঝে না। বাংলার হাসপাতালের দিকে তাকালে আমার কান্না পায়। আমরা যারা কিছু পয়সা খরচ করতে পারি, তারা সরকারী হাসপাতাল নামের দুর্ভাগ্যকে এড়িয়ে যেতে পারি। কিন্তু অন্যরা?
বাংলার বেশির ভাগ মানুষই দরিদ্র্য অথবা নিম্ন মধ্যবিত্ত। যারা দরিদ্র্য তারা নিজেদেরকে খেতে আর পরাতেই নিঃস্ব হয়ে যায়। আর যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, তারা ততদিন স্বচ্ছ্বল, যতদিন না তারা কোন কঠিন রোগের সম্মুখীন হচ্ছে। বা তাদের মেয়েকে বিয়ে দিতে হচ্ছে। কিন্তু রোগ ভোগা, আর মেয়ের বিয়ে দেওয়া, বাঙালী পরিবারে একদিন না একদিন ঘটবেই। কাজেই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী, অবধারিতভাবেই একদিন দারিদ্র্যের মুখ দেখে।
আমার বাবা বলে, দারিদ্র্যে যারা কখনো ভুগে নি, তারা কখনো দরিদ্র্য মানুষের যন্ত্রণা বুঝবে না। আর যে সব দারিদ্র্যে ভোগা মানুষ, কোন অলৌকিকতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে একদিন ধনী হয়ে উঠে, তারাও জীবনভর দারিদ্র্যকে ঘৃণা করে। এর অর্থ কি?
এর অর্থ দরিদ্র্য মানুষকে কেউই ভালোবাসে না। সবাই দরিদ্র্য মানুষ আর দারিদ্র্যকে ঘৃণা করে। যদিও এক পৃথিবী মানুষ দরিদ্র্যকে নিয়ে, লোক দেখানো কুমীরের কান্না কাঁদে।
এই পরিহাস তুল্য নিয়মের ব্যতিক্রম কেবল তারা, যারা নিজেরা মৌলিকভাবে চিন্তা করতে পারে। পৃথিবীর হৃদয়যুক্ত চিন্তাবিদরা সমস্যাকে গভীরভাবে ভাবে। তাই তারা দরিদ্র্যের জন্য লুকিয়ে চোখের জল ফেলে। গভীর ভাবে চিন্তা না করলে মানুষের বুকের যন্ত্রণা তুমি বুঝবে কি করে? হৃদয়যুক্ত না হলে, গভীরে তুমি ডুব দেবে কি করে?
আমার কাঁধে হাত রেখে দর্পণ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো। আমি তখনও বেশ চিন্তা মগ্ন। আমার দিকে চেয়ে দর্পণ একটু হাসলো। জিজ্ঞেস করলো-
"কি ভাবছো? "
নাহঃ কিচ্ছু না।
"পাক্কা তুমি কিছু ভাবছো।"
আমাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দেখে, এক ডাক্তারবাবু ছুটে এলেন। উনি জিজ্ঞেস করলেন
ডাঃ বিদূর ব্যানার্জী পাঠিয়েছেন?
আমি বললাম-
হ্যাঁ
তারপর দর্পণের দিকে চেয়ে উনি বললেন-
"নমস্কার।"
দর্পণও প্রতি নমস্কার জানালো।
উনি আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন-
"আসুন আমার সাথে।"
বুঝলাম, ইনিই ডাঃ নিলাদ্রী আচার্য্য। বেশ সপ্রতিভ মানুষ। বিদুদারই বয়সী। অনেকটা বিদুদারই মতো। কিন্তু বিদুদার চেয়ে স্থূল। বিদুদা এখনো উইকএন্ডে ফুটবল খেলে। ইনি বোধহয় খেলাধূলা করেন না। নার্সিং হোম সামলে, খেলাধূলা? তাও আবার ভারতবর্ষে? ব্যাপারটা সহজ নয়।
উনি আমাদেরকে সটান xray রুমে নিয়ে গেলেন। উনি xray টেকনিশিয়ানের উদ্দেশ্যে বললেন-
"মিহিরদা, এই ভদ্রমহিলার এখুনি একটা xray করে দিন তো।"
xray হয়ে গেলে, উনি দেখে বললেন-
"নাহঃ কোন ফ্র্যাকচার নেই। আমি বিদূরকে ফটোটা SMS করছি।"
উনি xray-র ফটো তুলে বিদুদাকে SMS করলেন। এরপর আমরা সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামছি, তো দুমিনিট পরেই ডাঃ আচার্য্যের ফোন বেজে উঠলো। উনি ফোন ধরে বললেন-
"হ্যাঁ আমিও দেখলাম। কোন ফ্র্যাকচার নেই।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি একজোড়া ক্রাচ সঙ্গে দিচ্ছি।"
এরপর উনি আমাদেরকে বললেন-
"আসুন, দোতলায় যেতে হবে আবার।"
এবার উনি আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে স্টোররুমে গেলেন। সেখানে কর্তব্যরত একটি মেয়েকে উনি বললেন
"ঘুঙরু, একজোড়া ক্রাচ দে তো।"
মেয়েটি, একজোড়া ক্রাচ ভেতর থেকে বের করে ডাঃ আচার্য্যকে দিলেন। ডাঃ আচার্য্য দর্পণের উচ্চতা অনুযায়ী ক্র্যাচদুটো সেট করে দিলেন। তারপর দর্পণকে দেখিয়ে দিলেন কিভাবে ক্রাচ ব্যবহার করতে হয়। উনি দর্পণের উদ্দেশ্যে বললেন-
"সিঁড়িতে উঠা নামার সময় কখনো ক্রাচ ব্যবহার করবেন না। বিপদ ঘটতে পারে।"
ছোট্ট ছোট্ট ব্যাপারের উপর ওনার নজর দেখে, আমি বেশ খুশি হলাম। উনি এরপর আমাদেরকে নার্সিংহোমের গেট পর্যন্ত ছাড়তে এলেন। আমি ওনাকে বললাম-
পেমেন্ট করবো কোথায়?
"তা আপনাদেরকে ভাবতে হবে না। সেটা আমি বিদূরের সাথে বুঝে নেবো।"
আমি ওনাকে বললাম
অনেক ধন্যবাদ। আপনি আমাদের জন্য অনেক সময় দিলেন।
উনি হাসলেন। বললেন-
"বিদূর আমার স্কুলের বন্ধু। আমরা এখনো বেশ কাছাকাছি। আমার বাবার জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট করার জন্য বিদূর এক পয়সাও নেয় নি।"
বাইরে বেরিয়ে এসে আমি বললাম-
ঊহঃ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কোন ফ্র্যাকচার নেই।
দর্পণ দুস্টু হাসি হেসে বললো-
"থাকলে ভালোই হতো।"
ফ্র্যাকচার থাকলে ভালো হতো! কেন?
"বেশ কিছুদিন, কেউ একজনের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতাম।"
কথাটা বলেই, সম্মোহিনী দৃষ্টিতে দর্পণ আমাকে দেখলো। আমি ওর দিকে চেয়ে রইলাম। বললাম-
তুমি যা সুন্দর, এক পৃথিবী পুরুষ তাদের কাঁধ বাড়িয়ে দেবে তোমার জন্য।
"এক পৃথিবী পুরুষ চাই না আমি। কেবল একজনকে চাই।"
একজন? কে সেই বিশেষ একজন?
"এক পূর্ণিমা রাতে, তোমাকে একটা কমলা বেনারসি শাড়ি দেখাবো আমি। সেটা যদি চিনতে পারো, তো সেদিন বলবো।"
সে পূর্ণিমা রাত যদি না আসে?
"আসতেই হবে। আকাশ তার বুক মেলে বসে আছে, তো পূর্ণিমা রাত আসবে না? "
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem