অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
পিকু দরজা খুললো। দরজা খুলেই, পিকু দর্পণের দিকে তাকিয়ে রইলো। বেচারা পিকুর চোখ ছলছল করছে। মনে হলো, দর্পণকে ক্রাচে দেখে, বেশ দমে গেছে ও। দর্পণ হাসলো। ঘরের মধ্যে ঢুকে ক্রাচ দুটো মাটিতে নামিয়ে পিকুর গালে আলতো একটা চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"খেয়েছিস তুই? "
পিকু-
ধ্যাৎ! তুমি নেই।
দর্পণ
আমি নেই তো কি? তোর খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেলো তো!
পিকু
আমি তোমার সাথে খাবো।
দিদি ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। দর্পণের হাতটা ছুঁয়ে দিদি দর্পণকে বললো-
বিদু যখন বললো, তোর কোন ফ্র্যাকচার নেই তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
দর্পণ দিদির গালটা, আলতো করে টিপে দিলো। দিদি হাসলো। দর্পণও।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে, মাটনের প্যাকেটটা রান্না ঘরে রেখে এলাম। দিদি আর দর্পণ ছেলেবেলার বন্ধু। ত্রিশ বছর ধরে ওদের বন্ধুত্ব সমান মজবুত। মাঝে মাঝে মনে হয়- দিদির এতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে। কিন্তু আমার তো নেই।
কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হয়, আমিই হয়তো ভুল। যতদূর মনে করতে পারি, দর্পণও আমার ছেলেবেলার বন্ধু। দর্পণ দিদি আর আমি, একসাথে বড় হয়েছি। দর্পণও আমার ঘনিষ্ঠ। কিন্তু সেই ঘনিষ্ঠতা কি.... থাক, পরে ভাববো এ ব্যাপারে।
আগেই বলেছি, আমাদের বাড়ির তিনতলায়, দুটো এক কামরার ফ্ল্যাট। একটা দিদির। আর একটা দর্পণের। তিনতলাতে, দিদির জন্য যখন ফ্ল্যাট বানানোর পরিকল্পনা চলছিলো, দিদি তখন বাবাকে বললো- দর্পণের জন্যও একটা ফ্ল্যাট চাই তার। ব্যাস। বাবাও তা বানিয়ে দিলো।
দিদি এক গাল হেসে, দর্পণকে বললো-
পা ভাঙলে কি কেলেঙ্কারী হতো বলতো! এলি তুই মজা করতে, আর ফিরলি তুই পা ভেঙে! যাক গে, উপরে এক্কেবারে শেষ প্রান্তের ঘরটা তোর জন্য। যা, তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নে।
বিদুদা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বললো-
সরি। মাটনটা আজ আর ম্যারিনেড করা যাচ্ছে না। আজ এমনিই রান্না করবো।
দিদি আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
তুইও স্নান সেরে নে। তোরা রেডি হতে হতে, মাটনটা রান্না হয়ে যাবে।
দর্পণ ক্রাচে ভর দিয়ে, সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। বিদুদা বললো-
ক্রাচ নিয়ে সিঁড়িতে উঠো না দর্পণ।
আমি এগিয়ে গেলাম। দর্পণকে বললাম-
এসো।
দর্পণ আমার কাঁধে ভর দিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করলো। আমি পিছন ফিরে একটু তাকালাম। দেখলাম দুজোড়া দুষ্টু চোখ, দুষ্ট হাসি হাসছে। আমিও মৃদু হাসলাম।
দিদিদের চোখের আড়াল হতেই, দর্পণ আমাকে জিজ্ঞেস করলো
"হাসছো কেন? "
এমনিই।
"মানুষ কখনো এমনি হাসে না। মানুষ হাসে- সুন্দর কিছু দেখলে, বা মজার কিছু দেখলে, বা প্রেমে পড়লে। সিঁড়িতে সুন্দর কিছু নেই। আর ভাঙা পায়ে সিঁড়ি ভাঙা, মজার কিছু নয়। তা হলে রইলো কেবল... বলো, কি রইলো? "
প্রেম!
উপরে উঠতে তখনো একধাপ বাকি। দর্পণ হটাৎ আমাকে আলতো করে দেওয়ালে চেপে ধরলো।
"প্রেম কি, তা তুমি জানো? "
একটু অবাক হলাম আমি। একটু আড়ষ্টও। কিন্তু নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কোন চেষ্টা করলাম না আমি। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম-
নাহঃ
"আমার দিকে তাকিয়ে দেখো। কিছু দেখতে পাচ্ছো? "
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম না, কি দেখতে পাচ্ছি।
দর্পণ তখন আমার হাতটা নিয়ে, ওর বুকে চেপে ধরে বললো-
"কিছু অনুভব করছো? "
তোমার বুকের স্পন্দন একটু দ্রুত, আর জোরালো।
"কেবল দ্রুত আর জোরালো। আর কিছু নয়? "
একটু থেমে, হটাৎই প্রায় কান্না ভেজা গলায় দর্পণ বললো
"আমাকে আর কত কষ্ট দেবে অমল? "
এই বলে, আমাকে দেওয়ালে একই অবস্থায় ফেলে বেশ দ্রুত, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ও দোতলার শেষ প্রান্তের ঘরটায় ঢুকে গেলো।
কি করবো কিছু বুঝতে না পেরে, আমি একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রায় ১ মিনিট পর ঘর থেকে বেরোলো দর্পণ। আমাকে দেখে, একরকম অবজ্ঞা করার ভঙ্গীতে চোখ ঘুরিয়ে নিলো। তারপর বারান্দার গ্রিলের কাছে দাঁড়িয়ে চীৎকার করলো-
"লাবণ্য, আমার ছোট ব্যাগটা নীচে রয়েছে। আমায় একটু দিবি ওটা? "
দিদি নীচ থেকে সাড়া দিলো
"দিচ্ছি।"
আমি নীচে নেমে গেলাম। দিদি ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আমাকে দেখলো। আমি হাসলাম।
উপরে উঠে দেখলাম দপর্ণের দরজা বন্ধ। দরজায় নক করতেই, দর্পণ দরজা মেলে ধরলো।
"সরি"
কথাটা বলেই দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলাম আমি। দর্পণের পরণে কেবল শাড়ি আর ব্লাউজ। মনে হলো, স্নানের জন্য তৈরী হচ্ছিলো। হয়তো দিদি এসেছে ভেবে, দরজা খুলেছিলো ও।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem