পাহাড়ি মেয়ে খন্ড ৩০ (Himel) Poem by Arun Maji

পাহাড়ি মেয়ে খন্ড ৩০ (Himel)

Rating: 5.0

অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
"আর পারছি না অমল। পা ব্যথা করছে আমার।"
মুখে মৃদু যন্ত্রণার ছাপ নিয়ে, দর্পণ কথাগুলো বললো আমাকে।

আমি দর্পণের দিকে চেয়ে দেখলাম- বেচারা দর্পণ! খোঁড়া পায়ে, ক্রাচ আর আমার কাঁধে ভর করে, টাইগার হিলের ভিউ পয়েন্ট পর্যন্ত চড়েছে। পা তো ব্যথা হওয়ারই কথা। আমি বললাম-
বেশ, তাহলে ফেরা যাক এখন।  

আমার কাঁধে ভর করে দর্পণ ধীরে ধীরে নামছে। আর পিকু আগে লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছে। ও কিন্তু আমাদের অনেক আগে আগে। ওকে আমরা চোখে চোখে রেখেছি। কিন্তু বেশ কিছুটা আসার পর, পিকুকে আর দেখতে পেলাম না আমরা। দর্পণ হটাৎ আঁতকে উঠলো। বললো-
"পিকু কোথায় অমল? যাও যাও। এখুনি যাও, ছেলেটা গেলো কোথায়! "

আমি ওর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গেলাম। কিন্তু দর্পণ আমাকে বললো-
"আমার কথা ভেবো না। তুমি আগে পিকুকে খুঁজো।"

দর্পণের হাতে চাবি দিয়ে, ব্যস্ত হয়ে আমি বললাম-
তুমি গাড়িতে গিয়ে বসো। আমি এখুনি দেখছি।

দর্পণকে চাবিটা বাড়িয়ে দিয়েই, দৌড় মারলাম আমি। টাইগার হিল থেকে শহরের দিকের রাস্তা ধরে, অনেকটা এগিয়ে গেলাম। কিন্তু পিকুকে নজরে পড়লো না। প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর ভাবলাম, ও নিশ্চয় এতদূর আসতে পারবে না। তাই আবার পিছন ফিরে, টাইগার হিলের দিকে দৌড়ে গেলাম আমি।

ঘামছি আমি। এতক্ষণ বুকে বল ছিলো ওকে এখুনি খুঁজে পাবোই। কিন্তু বুকের  সেই সাহসটা ক্রমশঃ ফিকে হয়ে আসছে। একটা অজানা ভয় মাঝে মাঝে বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

টাইগার হিলের ঢালে, পিকুকে যেখানে শেষ দেখেছিলাম, সেখানে ফিরে এলাম আবার। সূর্য এখন ঢলে পড়েছে। একটু একটু আঁধার হয়ে আসছে। দর্পণ নিশ্চয়ই ভীষণ চিন্তায়। ফোনটা বের করে দেখলাম, দর্পণের- বারোটা "মিসড কল"।

ইশঃ বেচারা এতক্ষণে বুঝি কাঁদতে শুরু করেছে। ফোনটার ভলিউম কম করে রেখেছিলাম, শুনতেই পাই নি। এতো উদ্বেগের মধ্যে  মৃদু শব্দ কি শোনা যায়? মুহূর্তেই  দর্পণকে ফোন করলাম। ও প্রায় রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলো-
"পেয়েছো? পেয়েছো পিকুকে? "

আমি চুপ।

দর্পণ এবার কেঁদে উঠলো
"এখন কি হবে অমল? এখন কি হবে? "

ওকে আশ্বস্ত করে আমি বললাম-
তুমি কিছু ভেবো না। আমি খুঁজছি ওকে। তুমি বরং গাড়ির উইন্ডো লক করে, নীচু হয়ে শুয়ে থাকো। তোমাকে যাতে, গাড়ির মধ্যে কেউ দেখতে না পায়।

দর্পণ বললো
"আমার কথা ভেবো না। তুমি পিকুকে খুঁজো আগে।"

আমি ওকে সাহস দেওয়ার ভঙ্গীতে বললাম-
হ্যাঁ হ্যাঁ, এখুনি পেয়ে যাবো ওকে। তুমি কিচ্ছু ভেবো না।

দর্পণকে অভয় দিলেও, বুকটা কিন্তু ধড়াস করে উঠলো আমার। দাঁড়িয়ে একটু ভাবলাম। তারপর আবেগ আর উদ্বেগ দূর করতে, মিনিট খানেক ধরে দীর্ঘ আর গভীর শ্বাস নিলাম আমি। তারপর ভাবলাম- আচ্ছা, আমি যদি পিকুর মতো ছোট্ট ছেলে হতাম, তো কি করতাম। তো  ব্যাপারটা এরকম-
ধরো, আমার বাবা-মা পিছনে, আর আমি আগে আগে, লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছি। আর রাস্তার দুধারে অদ্ভুত আর সুন্দর সুন্দর সব জিনিস দেখছি......

এই কথা ভাবতেই, হটাৎ আমার নজরে পড়লো পাহাড়ের গা বেয়ে, সরু একটা রাস্তা নীচে নেমে গেছে। সন্ধ্যাবেলায় রাস্তাটাকে আবছা দেখতে পাচ্ছি। তখুনি ভাবলাম- এমন কি হতে পারে, এই রাস্তায় পিকু এমন কিছু দেখেছে, যে ও এই পথ ধরে এগিয়ে গেছে?

অজানা এই জায়গা। একটু ভয় হলো। কিন্তু সেই ভয়, পিকুকে খুঁজে না পাওয়ার যন্ত্রণার থেকে, বেশি কিছু নয়। রাস্তাটা ধরে দৌড় শুরু করলাম আমি। রাস্তায় কেউ নেই এখন। মিনিট পাঁচেক দৌড়ানোর পর, ভয়ঙ্কর হাঁফাতে শুরু করলাম। হাঁফাতে হাঁফাতে চীৎকার করলাম-
পিকু, পিকু...........

আমার ডাক, পাহাড়ের গায়ে মৃদু এক প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো আমার কাছে। একটু হাঁফ নিয়ে আবার দৌড় শুরু করলাম আমি। মিনিট তিনেক দৌড়ানোর পর দেখলাম- দূরে, ছোট্ট একটু আলো। আলোটার সঙ্গে যদিও পিকুর থাকার কোন সম্পর্ক নেই, তবুও আলোটা দেখে কেমন যেন একটু সাহস হলো আমার। একটু উৎসাহ পেয়ে আবার ডাকলাম-
পিকু, পিকু.....
দূর থেকে আওয়াজ ভেসে এলো
বোম ভোলে, বোম ভোলে.....

একটু দমে গেলাম আমি। ভাবলাম, এ কোন, পাহাড়ি মানুষের গাঁজা খাওয়ার ঠেক হবে। একটু ভয়ও পেলাম। লোকগুলো যদি মাতাল আর হিংস্র হয়! কিন্তু এই মুহূর্তে, পিকুকে খুঁজে না পাওয়ার যন্ত্রণার থেকে, কোন কিছুই বড় নয় আমার কাছে। তাই এগিয়ে গেলাম আমি। ভাবলাম- ওদেরকে অন্তত জিজ্ঞেস তো করতে পারবো, এই পথে তারা ছোট্ট কোন ছেলেকে দেখেছে কিনা!

দৌড়ের গতিবেগ আরও বাড়িয়ে দিলাম আমি। ঠিক সেই মুহূর্তেই  ফোনটা বেজে উঠলো। দৌড়তে দৌড়তে ফোনটা ধরলাম-
"পিকুকে পেয়েছো অমল? পিকুকে পেয়েছো? এখন কি হবে? "
ফোনের মধ্যেই দর্পণ কান্না জুড়ে দিলো। ফোনটা কানে ধরেই, দৌড়তে থাকলাম আমি। দর্পণ একটু থামলে ওকে বললাম-
"কিচ্ছু ভেবো না দর্পণ। ওকে খুঁজে বার করবোই আমি।"
এই বলে ফোনটা কেটে দিলাম আমি।

আলোটার কাছাকাছি এসে পড়েছি এখন। দেখলাম- জায়গাটা ঢালু এক উপত্যকা। সেই ঢালু উপত্যকার উপর ছোট্ট এক বাড়ি। সেই বাড়ির দালানে জ্বলছে এক আগুনের কুন্ডলী। হাঁফাতে হাঁফাতে বাড়িটার কাছে গেলাম আমি। আমাকে দেখেই ওরা সমস্বরে বলে উঠলো-
"বোম ভোলে, বোম ভোলে।"

একি! এতো পুরুষ কণ্ঠের সাথে, নারী কণ্ঠও। সঙ্গে এক শিশু কণ্ঠও। আরও এগিয়ে গেলাম আমি-
দেখলাম- পিকু। কয়েকজন সাধুবেশী পুরুষ আর নারীর সাথে বসে রয়েছে।

অবাক হলাম আমি। আনন্দিত তো  বটেই। সঙ্গে সঙ্গে দর্পণকে ফোন করে বললাম-
শোনো, পেয়েছি পিকুকে। একটু পরে আবার তোমার সাথে কথা বলছি।

দর্পণ কিছু বলার আগেই, ফোনটা কেটে দিলাম। ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে, পিকুর দিকে চেয়ে বললাম- কিরে, এখানে কিভাবে এলি তুই?

পিকু কোন উত্তর করার আগেই, এক পুরুষ সাধু বলতে শুরু করলেন-
"সন্ধ্যের দিকে আমরা যখন আখড়ায় ফিরছি, তখন দেখলাম- এই ছেলেটি আমাদেরকে ফলো করছে। ওকে আমরা জিজ্ঞেস করলাম-
এই ছেলে, তুমি আমাদেরকে ফলো করছো কেন?

ও কোন কিছু না বলে, আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। বুঝলাম, ও পথ হারিয়েছে। ওকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, ও ওর বাবা মায়ের সাথে কলকাতা থেকে এখানে বেড়াতে এসেছে। কিন্তু এখানে কোথায় থাকে, ও তা বলতে পারলো না। আমরা তাই ভাবলাম, আজ ওকে আমাদের সাথে রেখে, আগামী কাল থানাতে পৌঁছে দেবো।"

পিকু প্রায় কান্নার সুরে বলে উঠলো-  
"সরি মামু, আমার ভুল হয়ে গেছে।"

কিছু না বলে পিকুর মাথায় হাত রেখে আলতো একটা চুমু খেলাম আমি। যে সাধু কথা বলছিলেন, তার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। এই সাধুবাবার বয়স প্রায় পঞ্চাশ পঞ্চান্নর মতো।

কিন্তু অন্য দুজনের প্রতি চেয়ে দেখে, বেশ অবাক হলাম আমি। এদের দুজনেই নারী। একজনের বয়স প্রায় পঞ্চাশ, আর অন্য জন এক যুবতী। আমি ওদের দিকে চেয়ে রইলাম।

যুবতী সাধুটিকে, আগে কোথাও যেন দেখেছি মনে হচ্ছে! কোথায়? কোথায়? নাহঃ মনে আসছে না।

যুবতী সাধুটি আমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। তারপর মৃদু এক হাসি হাসলো। কিন্তু কিছু বললো না। আমি আরও একবার ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম-
একি? এ তো হিমেল! প্রায় আঁতকে উঠলাম আমি। বলতে গেলাম, হিমেল তুমি!

কিন্তু হিমেল ওর মুখে আঙুল দিয়ে, আমাকে চুপ থাকতে বললো। পুরুষ সাধুটি বললো-
হেমা, এদেরকে তুই এখন, এদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয়। হেমা কিছু না বলে ভেতরে চলে গেলো।

প্রায় এক মিনিট পর শুনলাম, বাড়ির পিছন থেকে, ভেসে আসছে মোটরবাইকের হুট্ হুট্ আওয়াজ। মুহূর্তের মধ্যেই দেখলাম- পুরানো এক মোটরবাইকের উপর, গেরুয়া পরিহিতা যুবতী এক সাধু। হুট্ হুট্ আওয়াজ করতে করতে, আমার দিকে তাকিয়ে প্রায় আদেশের সুরে বললো-  
"আসুন।"

মনে মনে ভাবলাম- আহাঃ কি বিচিত্র এই ভারতবর্ষ! কি বিচিত্র তার নারী! পিকুকে বাইকের সিটে উঠিয়ে দিয়ে, এক্কেবারে পিছনে চড়ে বসলাম আমি।

দর্পণ কি জানে, পাহাড়ি এক যুবতী সাধুর প্রেমে পড়েছিলাম আমি?  

© অরুণ মাজী

পাহাড়ি মেয়ে খন্ড ৩০ (Himel)
Friday, May 22, 2020
Topic(s) of this poem: love,passion
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success