অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
কলকাতায় ফিরে কাজে ডুবে গেলাম। কত কাজ জমেছিলো! টেকনোলজি ব্যবহার করে, দূর থেকে অনেক কাজ করা যায়। তবুও কিন্তু অফিসের স্টাফের সাথে মুখোমুখি কথা বলতে হয়। ওদের সাথে বসে- একসাথে কাজ করতে হয়। খাওয়ার খেতে হয়। আড্ডা মারতে হয়। কখনো কখনো উইকএন্ডে, খোলা জায়গায় একসাথে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতে হয়। এসব না করলে, কখনো টিম স্পিরিট গড়ে উঠে না।
শুধু স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক নয়। যে কোন সম্পর্কের মধ্যেই দেখাদেখি, ছোঁয়াছুঁয়ি ব্যাপারটা থাকা চাই। ছোঁয়াছুঁয়ি ব্যাপারটা পাশ্চাত্য সভ্যতায় একটু বেমানান, কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতিতে তা অপরিহার্য।
বাবা বলে, ডাক্তার হিসেবে তোমার অনেক ডিগ্রী থাকতে পারে, কিন্তু হৃদয় ছুঁতে না পারলে কিছুই হয় না। কোন বৃদ্ধা রুগীর হাতটা একটু ছুঁয়ে, তুমি যদি তাকে জিজ্ঞেস করো- "কেমন আছেন মাসিমা? " তো সেই বৃদ্ধা নারী, তার হাজার যন্ত্রণার মধ্যেও চোখ আলো করে হাসবে। এবং সেই ডাক্তারকে সেই বৃদ্ধা, বেশি ভরসা করবে। ছোঁয়াছুঁয়ির মধ্যে হৃদয়ের উষ্ণতা থাকে। হাতের স্পর্শ কেবল হাতের স্পর্শ নয়। হাতের স্পর্শ হৃদয়ের স্পর্শও বটে। নিরাময়ের পথে যাত্রা কেবল রুগীর নয়, ডাক্তারেরও।
ব্যবসা বা শিল্প সংস্থাতেও কিন্তু, হৃদয়ের সংযোগ হওয়া চাই। ক্রেতা আনন্দ পেলে বিক্রেতা আনন্দ পাবে। ক্রেতা জিতলে বিক্রেতা জিতবে। তবেই ক্রেতা আর বিক্রেতার সম্পর্ক দীর্ঘ এবং ঘনিষ্ঠ হবে। একজন জিতবে আর অন্য জন হারবে, এরূপ সম্পর্ক কখনো বেশি দিন টিকে না।
কোন সংস্থার কর্মী এবং মালিকের সম্পর্কও তাই হওয়া চাই। কর্মী সুখী হলে মালিক সুখী। কর্মী উৎসাহে কাজ করবে। এবং তাতে সংস্থার শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে। কর্মী যদি শোষিত হয়, তো কর্মীর মনোবল তাতে থাকবে না। কর্মী তাহলে ন্যূনতম কর্তব্যের বাইরে বাড়তি কিছু দেবে না। সে সংস্থার শ্রীবৃদ্ধি কিন্তু কঠিন।
বাবা ডাক্তার মানুষ। ব্যবসায়ী নয়। কিন্তু যন্ত্রণা পীড়িত মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে, বাবা মানুষের মন আর হৃদয় সম্পর্কে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছে।
পৃথিবীর যেমন কিছু মৌলিক নিয়ম আছে, মানুষের জীবন পথে চলারও কিছু মৌলিক নিয়ম আছে। যা সর্ব্বত্র প্রযোজ্য। বাতাসে যদি তুমি সুগন্ধ ছড়াও, তোমার কাছেও সুগন্ধ ফিরে আসবে। বাতাসে তুমি যদি দুর্গন্ধ ছড়াও, তোমার কাছেও দুর্গন্ধ ফিরে আসবে।
আমার সংস্থার ছেলেমেয়েদেরকে আমি "ভাই বোনের" চোখে দেখি। ফল? আমিও কিন্তু ওদের কাছে ভাই হিসেবেই ভালোবাসা পাই। আমার জন্য ওরা লাঞ্চ নিয়ে আসে। ওদের বাড়ির উৎসবে আমাকে নিমন্ত্রণ করে। আমি সুখী এদের নিয়ে। ওরা সুখী আমার সাথে থেকে।
বাবা বলে, দমকা হওয়ার মতো মৃত্যু আসবে একদিন। আর ঝরা পাতার মতো ঝরে যাবে জীবন। কে জানে, সেই দমকা হাওয়া কার ঘাড়ে লাগবে! যতদিন জীবনরূপ বৃন্তে আছি, ততদিন সবুজ পাতার মতো পতপত করে গান গাওয়াই ভালো। নইলে জীবনে, কখনোই হয়তো, গান গাওয়া আর ঘটবে না।
আজকের মতো কাজ আমার শেষ। চেয়ারে হেলান দিয়ে এসব ভাবছি। হটাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম বিনয়ের নাম্বার। হেসে বললাম-
কি রে, তুই? কেমন আছিস?
"ভালো। শুনলাম তুই নাকি ফেঁসেছিস এবার।"
ফেঁসেছি মানে?
"দর্পণকে নাকি বিয়ে করতে চলেছিস।"
বিয়ে? আমি?
"হারামীপনা আর করিস না। আমার মা, তোর বিয়ের কার্ডের ছবি whatsapp-এ আমাকে পাঠিয়েছে।"
আমার বিয়ে? তোর মায়ের কাছে কার্ড?
"হ্যাঁ রে হারামজাদা। শোন, তোকে পড়ে শোনাচ্ছি-
Darpan Chaterjee
weds
Amal Bose
Dear Sir/Madam,
We request your kind presence in this auspicious ceremony on 12th June 2020.
Your sincerely,
Labonyo and Bidur Mukherjee"
আমি হাসলাম। বললাম-
তুই শালা পাক্কা মজা করছিস। কার্ডের ছবিটা তুই এখুনি আমাকে whatsapp কর।
"করছি।"
বিনয় ফোনটা কেটে দিলে, whatsapp খুললাম। দেখি- সত্যিই তো, এতো আমার বিয়ের কার্ড। বিনয়কে ফোন করলাম আমি। বললাম-
হুঁ, দেখলাম।
"এখনো বলছিস তুই এসবের কিছুই জানিস না? "
মাইরি বলছি এসবের কিছুই জানি না আমি। এসব পাক্কা দিদির শয়তানি।
"তোর ভাগ্য ভালো এমন একটা দিদি পেয়েছিস। দেখ আমাকে, কেউ এখনো বিয়ের কথা বলছে না।"
তুই চলে আয়, মিলিদির বোনের সাথে বিয়ে দেবো তোর।
"এইমাত্র কথা বললাম চিকুর সাথে।"
বললি? সত্যি?
"হ্যাঁ। তোর বিয়ের খবর পেয়ে আমারও ব্যথা জাগলো। ভাবছি তোর বিয়ের পর যেদিন ডেট আছে; সেদিনই বিয়ে করবো আমরা।"
করবি? ফাটাফাটি ব্যাপার। তো তুই তাহলে এখনো সিডনিতে কেন? আজই রওনা দে।
"রওনা দিচ্ছি। আগামী সপ্তাহে।"
ঠিক আছে, ফ্লাইট ডিটেলস পাঠিয়ে দিস, নিতে আসবো তোকে।
"পাঠিয়ে দেবো। ভালো থাকিস তুই। লাবণ্যদি আর দর্পণদিকে আমার তরফ থেকে হ্যালো বলিস।"
বলবো।
বিনয় ফোনটা কেটে দিলো। চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথার পিছনে হাত রেখে, চেয়ারে দুলতে থাকলাম। ভাবলাম- ঊহঃ কি শয়তান এই দিদিটা! এখুনি একটা ফোন করি দিদিকে! কিন্তু তারপর ভাবলাম- নাহঃ। আগে দেখি, দর্পণ কিছু জানে কি না! বিনয়ের পাঠানো কার্ডের ছবিটা, দর্পণের whatsapp-এ ফরোয়ার্ড করে দিলাম। তারপর দর্পণকে ফোন করলাম। ফোন ধরেই দর্পণ প্রায় কান্নার সুরে অভিযোগ করলো-
"দেখো তো অমল, কি বিপদে ফেললো লাবণ্য! আমি কিছু জানি না, অথচ সারা কলকাতা আমার বিয়ের কার্ড হাতে পেয়ে গেছে। শেষ আধঘন্টায় অন্তত বারোটা ফোন এসেছে আমার কাছে! "
দিদি কিছু বলে নি তোমায়?
"নাহঃ। আমার মাকেও লাবণ্য whatsapp-এ কার্ড পাঠিয়েছে। দেখোতো কি অস্বস্তি আমার!
"তুমি কার্ড দেখেছো? "
"হ্যাঁ, মা আমায় দেখিয়েছে।"
তোমার মা কি বললো?
"মা বললো, এ দর্পণ আর বিদূরের দুস্টুমি। এবার....."
এবার কি?
"এবার আমার মা-ও, আমাদের সব আত্মীয়কে কার্ডটা ফরোয়ার্ড করে যাচ্ছে।"
মানে, তোমার মা এই রসিকতাকে মান্যতা দিচ্ছে?
"তাই তো দেখলাম।"
আর তুমি?
"জানি না। "
বুঝলাম।
"কি বুঝলে? "
বলছি। বলো তো, পূর্ণিমা কবে?
"আজ।"
আসছি তাহলে।
"কোথায়? "
তোমাদের বাড়িতে।
"কেন? "
দেখি, সেই কমলা শাড়িটা চিনতে পারি কি না!
"এ রকম হৈ চৈ এর মধ্যে, আমাদের বাড়িতে আসবে? লজ্জা করবে না?
সেজন্যই তো রাত্তিরে আসছি।
কেন? রাত্তিরে এলে বুঝি লজ্জা করে না?
নাহঃ আঁধারের আঁচল নারী পুরুষ উভয়েরই লজ্জা ঢেকে দেয়।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem