অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
বিনয়রা একে "সামার হাউস" বলে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে একে বলে বাগান বাড়ি। দুটো ছোট্ট পাহাড়ের মাঝে সবুজ সুন্দর ঢালু উপত্যকায়, মাথা তুলে দাঁড়িয়ে এই বাড়ি। চার ঘর যুক্ত, ছোট্ট সুন্দর এই বাড়ি। বাড়ি ছোট্ট হলেও, বাগান কিন্তু বেশ বড়। প্রায় এক একর জায়গা জুড়ে। বাগানে রয়েছে হরেক রকম ফুল আর সব্জি। বসন্তের দিনে বাগানটা আরও সুন্দর হয়ে ফুটে।
দার্জিলিং শহরে এই রকম সুন্দর বাড়ি বেশ কিছু থাকলেও, অধিকাংশ স্থানীয় মানুষ কিন্তু বেশ গরীব। দার্জিলিংয়ের অর্থনীতি টুরিস্ট আর চা শিল্প নির্ভর। রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক কারনে কোন গোলযোগ ঘটলে, দার্জিলিংয়ের অর্থনীতি ঝিমিয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে বাড়ে স্থানীয় মানুষের জীবন যন্ত্রণা।
হিমালয়ের কোলে ছোট্ট শহর এই দার্জিলিং। মায়ের কোলে শিশু যেমন থাকে; দার্জিলিংও ঠিক তেমনি রয়েছে হিমালয়ের কোলে। পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বত কাঞ্চনজংঘার পাদদেশে দু কিলোমিটার উচ্চতায় এই শহর।
দার্জিলিং নাম মুখে আনলেই মনে পড়ে পৃথিবী বিখ্যাত এক "ব্ল্যাক টি"। কিন্তু এই ব্ল্যাক টি-ই দার্জিলিংয়ের শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য নয়। দার্জিলিংয়ের শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য এর নৈসর্গিক রূপ। নৈঃশব্দ আর একাকীত্ব যারা উপভোগ করতে শিখেছে, তাদের কাছে দার্জলিং শহর একপ্রকার ভূলোকে স্বর্গলোক।
ঊনিশ শতকের গোড়ায় ব্রিটিশরা এখানে এক, সামরিক আস্তানা গড়ে। সম্ভবত সাপ্লাই আর অর্ডন্যান্স ডিপো। তারপর কিছু পরে এখানে শুরু হয় চা চাষ। দার্জিলিং শহরে বেশ কিছু বিখ্যাত প্রাইভেট স্কুল আছে। ভারত এবং সংলগ্ন দেশের বহু ছাত্র সেখানে পড়তে আসে। সংস্কৃতিগত ভাবেও দার্জিলিংয় বেশ বৈচিত্রময়। দার্জিলিংয়ের জনগোষ্ঠী লেপচা, খাম্পা, গোর্খা, নেওয়ার, শেরপা, ভুটিয়া, বাঙালী এবং অন্যান্য আরও কিছু ভারতীয় দিয়ে তৈরী। দার্জিলিংয়ের অদুরেই রয়েছে কালিম্পঙ। ভৌগোলিক ও সংস্কৃতিভাবে কালিম্পঙও দার্জিলিংয়ের মতোই।
বিনয় আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আমরা দুজনেই একই স্কুলে পড়েছি। তারপর দুজন একইসঙ্গে, সিডনি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করেছি। বিনয় এখনো সিডনিতেই রয়েছে, কিন্তু আমি ফিরে এসেছি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে, ল্যাপটপ নিয়ে কিছু কাজ করছিলাম। তো বাড়ির কেয়ার টেকার এসে জিজ্ঞেস করলো-
সাহেব, কি খাবেন আজ?
ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে, হরির দিকে চেয়ে আমি হাসলাম। বললাম-
আজ দুপুরে আমি বাইরে খাবো হরি। তুমি বরং তোমার বাগানে নজর দাও।
প্রায় বারোটার সময় দার্জিলিং শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। পায়ে হেঁটে। হাঁটতে ভালোবাসি আমি। প্রকৃতির এমন সুন্দর রূপের মধ্যে না হাঁটার কথা আমি ভাবতেও পারি না। গাড়িতে যাতায়াত করলে কি, প্রকৃতির রূপ উপভোগ করা যায়।
পায়ের তলায় মাটি, মাথার উপর আকাশ, আর চারপাশে রঙ বেরঙের খেলা। সুন্দর কিছু দেখলে, দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখা যায়। প্রকৃতি ডাকছে অথচ সাড়া দেবো না আমি, এমন অসংবেদনশীল আমি হই কি করে? প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ স্পর্শে যারা সাড়া দেয় না, তারা জীবিত থেকেও মৃত। তারা চক্ষুযুক্ত হয়েও দৃষ্টিহীন। হৃৎপিণ্ড যুক্ত হয়েও হৃদয়হীন। মস্তিস্কযুক্ত হয়েও স্বপ্ন আর কল্পনাহীন। মহাবিশ্বের যা কিছু স্বর্গীয় সুন্দর, তা সবই সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বিনামূল্যে দিয়েছেন।
অথচ মানুষ কত অন্ধ বধির বুদ্ধিহীন। মানুষ দূর্বা ঘাসের উপর, শিশিরবিন্দুর রূপালী শোভা কখনো দেখে না। কিন্তু তারা, গলায় মুক্তো ঝুলিয়ে অহঙ্কার করে। শীতের দিনে সবুজ ঘাস আর শস্যক্ষেতে, শিশিরবিন্দুর রূপ যে বাঙালী দেখেনি, সে কি সত্যিই বাঙালী?
প্রায় সাড়ে বারোটার সময় রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম আমি। দেখলাম- তত বেশি ভিড় নেই এখনো। সৌভাগ্যবশত, ডানদিকের কোনে, আমার ফেভারিট জায়গাটা খালি ছিলো। তো সেখানেই বসে পড়লাম আমি। কিছুক্ষণ বসার পর দেখলাম- হিমেল আমার দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলো। ও তখন দূরে, অন্য একটা টেবিল পরিষ্কার করছে। ওর পরণে হোটেলের ইউনিফর্ম, রঙিন এক ফ্রক, আর তার উপর চাপানো এপ্রন। মুখ তুলে, ওকে ডাকলাম আমি-
হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন?
হিমেল মুখ তুলে তাকালো। আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো
আমাকে ডাকছেন?
হ্যাঁ। প্লিজ।
হিমেল কাছে এলে আমি বললাম-
কিছু যদি না মনে করেন তো, আপনাকে এটা দিলাম আমি। আমাকে জানাবেন প্লিজ।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem