পাহাড়ি মেয়ে খন্ড ৩ খ (Himel) Poem by Arun Maji

পাহাড়ি মেয়ে খন্ড ৩ খ (Himel)

অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস

হিমেল মুখ তুলে তাকালো। আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো-
আমাকে ডাকছেন?

হ্যাঁ। প্লিজ।

হিমেল কাছে এলে, বললাম-
কিছু যদি না মনে করেন তো, আপনাকে এটা দিলাম আমি। আমাকে জানাবেন প্লিজ।

হিমেল কিছুটা ভীত, কিছুটা লজ্জিত। এদিক ওদিক তাকিয়ে ও চিঠিটা নিলো। চিঠিটা নিয়েই ফিরে গিয়ে  ও আবার টেবিল পরিষ্কারে মন দিলো।

হিমেলের দিকে চেয়ে রইলাম আমি।  কিছুক্ষণ পর টেবিল মুছা শেষ হলে, নজর করলাম- ওর মুখের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম। একটু কষ্ট হলো আমার। ও আমার দিকে না তাকিয়েই, রেস্টুরেন্টের কিচেনের দিকে চলে গেলো।

আর এক ওয়েটারকে ডেকে, খাবারের অর্ডার দিলাম আমি। বেশি করে সময় কাটানোর জন্য, আমি ধীর গতিতে খেলাম আমি। দেখলাম- হিমেল দূরে অন্যান্য টেবিলে, খাবার অর্ডার নিচ্ছে, সার্ভ করছে। কিন্তু আমার টেবিলের কাছাকাছি আসছে না।

মনে একটু ভয় হলো আমার। হিমেল যেন ব্যাপারটাকে খারাপ ভাবে নিয়ে কোন হাঙ্গামা না বাঁধায়! যদিও কোন অন্যায় কিছু করি নি আমি, তবুও ভয় এই কারনে যে, ভারতবর্ষের অনেক মানুষইআছে যারা কোন যুক্তি তর্কের ধার ধারে না। কোন এক হুজুগ পেলেই হলো। তারপর, কাউকে গণধোলাই দিয়ে দিয়ে হত্যা করতেও কুন্ঠা বোধ করবে না তারা। এবং তা যদি ঘটে, অসহায় আমি কিছুই করতে পারবো না।

কিন্তু একটু সাহস পেলাম এই ভেবে যে, "যেন কোন কিছুই ঘটে নি", এমন একটা ভাব করে হিমেল তার কাজ করে যাচ্ছে।

নাহঃ প্রায় দুটো বেজে গেলো। আর বসা যায় না। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার এবার অসন্তুষ্ট হবে। বিল মিটিয়ে দিয়ে রাস্তায় এলাম আমি।

মনের মধ্যে একটু ব্যথা।  চিঠির কোন উত্তর পেলাম না। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম- ধুস! এই তো সবে চিঠিটা দিলাম। কাজের চাপে বেচারা হয়তো এখনো চিঠিটা খুলে পড়ারই সময় পায় নি।

বাড়িতে না গিয়ে শহর লাগোয়া ছোট্ট পাহাড়টার দিকে হাঁটতে থাকলাম আমি। বসন্তে, দার্জিলিং নতুন করে সেজে উঠে। রোডোডেন্ড্রন আর সবুজের মিশ্রনে, দার্জিলিং তখন এক স্বর্গভূমি। স্বচ্ছ নীলাকাশ। বরফ ঢাকা উঁচু পাহাড়ের চূড়া। এসময় পাহাড় বেষ্টিত ঢালু উপত্যকার রূপ দেখলে মন হয়, দার্জিলিং যেন এক ঈশ্বরের বিচরণ ক্ষেত্র।

উপত্যকার মাঝে মাঝে কিছু জনবসতি। বেশিরভাগই ছোট্ট ছোট্ট ঘর। কিন্তু পাহাড়ি উপত্যকার ক্যানভাসে, সেই সব ঘরগুলোকে বেশ সুন্দর আর স্বপ্নময় মনে হয়।

প্রকৃতির নিবিড় আলিঙ্গন ছেড়ে, মানুষ ইঁট কাঠ ঘেরা সবুজহীন সৌন্দর্য্যহীন শহরে থাকে কেন? আমিই বা শহরে থাকি কেন? আমি কি পারি না, প্রকৃতির এই নিবিড় আলিঙ্গনে থাকতে? সুন্দর ছেড়ে অসুন্দরের সাথে আমি ঘর করছি কেন? নির্মল আকাশ ছেড়ে, দূষণময় শহরে আমি আয়ুক্ষয় করছি কেন?

হয়তো একদিন আসবে, যেদিন সত্যিই আমি শহরে থাকতে চাইবো না। কিন্তু এখন ইচ্ছে হলেও, এখানে থাকার কথা ভাবতেও পারি না। কিন্তু কেন পারি না? যুক্তি বলছে, মানুষের দৈহিক আর মানসিক স্বাস্থ্য তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। তবুও আমি শহরে, অস্বাস্থ্যকর উদ্বেগপূর্ণ জীবন যাপন করছি কেন?

মানুষ তার নিজস্ব বুদ্ধি বিবেক আর চেতনাকে শ্রদ্ধা করে না। ভয়ানক আশ্চর্য! তাই না? কোন কিছু ভুল জেনেও, মানুষ তা করে। বারবার করে। কিন্তু কেন করে? মানুষ সত্যিই কি অভ্যাসের দাস? যা কিছু অভ্যাস হয়ে যায়, তা মানুষ আর ছাড়তে পারে না? মানুষ কি তার বিশ্বাসের চির ক্রীতদাস? যে বিশ্বাস সে এতদিন করে এসেছে, তা সে পরিত্যাগ করতে পারে না? এমন কি, সেই বিশ্বাস যদি তার প্রাণও  কেড়ে নেয়; তবুও সে, সেই বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করতে পারে না! মানুষ সত্যিই কি বুদ্ধিযুক্ত?

মানুষকে যন্ত্রণা দেওয়া হয় না। মানুষ নিজেই যন্ত্রণাকে আমন্ত্রণ করে। মানুষের জীবন যন্ত্রণার, কতটুকু "অন্যের" দেওয়া? খুবই নগণ্য। মানুষের যন্ত্রণার প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ, তার নিজের সৃষ্টি। মানুষের যন্ত্রণা তার নিজস্ব চিন্তা আর কর্মের ফসল।

আমি এখন যন্ত্রণা পাচ্ছি। কেন? আমি হিমেলকে ভালোবেসেছি। এ আমার নিজস্ব চিন্তা আর কর্ম। আমার এই যন্ত্রণা সেই চিন্তা আর কর্মের ফসল। হিমেল কোন উত্তর করলো না, তা কিন্তু আমার যন্ত্রণার জন্য দায়ী নয়।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, কিছু যন্ত্রণা আছে, যা বারবার পেতে ইচ্ছে হয়। হিমেলকে ভালোবাসার যন্ত্রণাও হয়তো সেই ধরণের। ফুলের পাপড়ি যেমন ফুলকে সুন্দর করে, হয়তো যন্ত্রণাও তেমনি ভালোবাসাকে সুন্দর করে। আবরণহীনতার যন্ত্রণা যেমন যেমন ফুলকে আকর্ষণীয় করে তুলে, না পাওয়ার যন্ত্রণা তেমনি ভালোবাসাকে আকর্ষণীয় করে তুলে।

গণিতের নিয়ম দিয়ে, মানুষের জীবন আর তার যাত্রাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষ হাসবে আবার কাঁদবে।  ঠিক করবে আবার ভুলও  করবে। ভালো মন্দ দোষ গুণ সুখ দুঃখ আশা বেদনা- এই নিয়ে মানুষের জীবন। যৌক্তিক নয়, কিন্তু ভীষণই মানবিক। আঙ্কিক নয়, কিন্তু ভীষণই জৈবিক।

এমনই অনেক কথা ভাবতে ভাবতে, পাহাড়ের কোলে, ছোট্ট সুন্দর এক গ্রামে এলাম। দেখলাম কতগুলো ছোট্ট ছেলে ফুটবল খেলছে। কৌতূহল হলো। তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-
তোমাদের সাথে আমি খেলতে পারি?

ওরা পরস্পরের প্রতি চাওয়া চাওয়ি করলো। ওদের মধ্যে সব চেয়ে বড় ছেলেটি, দূর থেকে আমাকে বললো-
নিশ্চয়।

ওদের সঙ্গে নেমে পড়লাম আমি। আহঃ কি ভালো লাগছে। কৈশোর পেরোনোর পর, ক-বার আর ফুলবল খেলেছি? তাও প্রকৃতির এমন মনোরম পরিবেশে? নিজের মধ্যে শিশুর উদ্দীপনা এখনো যে বেঁচে আছে, তা জেনে ভালো লাগলো।

কিছুক্ষণ পর সূর্য ডুবছে দেখে, ওদের বললাম আমি-
তোমরা খেলতে থাকো, আমি গেলাম।

খেলতে খেলতে নজর করেছিলাম, ওদের বলটার নানা জায়গায় তাপ্পি লাগানো। তো ওদেরকে বললাম- এই নাও দুশো টাকা, তোমরা একটা বল কিনো। আর সুযোগ পেলে, আবার আমি তোমাদের সাথে খেলবো।

ওরা একটু লজ্জিত হলো। কিন্তু আনন্দিতও হলো। বড় ছেলেটি লজ্জিতভাবে আমার কাছ থেকে টাকাটা নিলো।

খেলতে খেলতে বেশ ঘেমেছি। ভাবলাম বাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম- এখান থেকে বাড়ির চেয়ে, শহর বরং কাছে। এখন বরং রেস্টুরেন্টে ডিনার সেরে বাড়ি ফেরাই ভালো।

©অরুণ মাজী

Wednesday, April 22, 2020
Topic(s) of this poem: love,passion
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success