পাহাড়ি মেয়ে খন্ড ১১ অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
এই হলো বিদুদা! হিমেল আমাকে না বলেছে; তাতে, আমি যেমন কষ্ট পেয়েছি, বিদুদাও তেমন কষ্ট পেয়েছে। বিদুদা তাই এখন "সদলবলে দার্জিলিং অভিযান" করতে চায়। আমি জানি, এ বিদুদার কথার কথা নয়। হৃদয় থেকে নির্গত ভালোবাসা। আমি কষ্ট পাবো, বিদুদা তা সহ্য করবে না।
ভালোবাসা পেলে ভরসা বাড়ে, তখন স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে হয়। আর ভালোবাসলে, সাহস বাড়ে। ভালোবাসা দেওয়া আর পাওয়া, কান আর মাথার মতো নিবিড় ভাবে জড়িয়ে। এদের একজনকে অন্যের থেকে আলাদা করা যায় না। ভালোবাসা পেলে ভালোবাসা দিতে ইচ্ছে করে। আর ভালোবাসা দিলে, অন্যের ভালোবাসা এমনিই আসে।
আমি ভলোবাসা পাই বলেই, ভালোবাসতে পারি। ভালোবাসা পাই বলেই, নিজেকে আমি মাটির সাথে ছুঁইয়ে রাখতে পারি। যারা ভালোবাসাহীন, হৃদয়ে তারা- নিঃসঙ্গ আশ্রয়হীন চঞ্চল আর ভঙ্গুর। তারাই কেবল গর্বিত উদ্ধত হয়। তারাই কেবল নিষ্ঠুর হয়। তারাই কেবল ঐশ্বর্য্য আর সম্পদকে মানবিকতার চেয়ে বড় করে দেখে। হৃদয়ের নিঃস্বতা তারা, বাইরের জগতের অর্থ খ্যাতি আর সম্পদ দিয়ে ঢাকতে চেষ্টা করে। হৃদয়ের যন্ত্রণা তারা, খ্যাতি ঐশ্বর্য্যের আড়ম্বর দিয়ে ঢাকতে চেষ্টা করে। কিন্তু ওহে মানুষ, হৃদয়ের যন্ত্রণাকে কি কোন ঘোমটা দিয়ে ঢাকা যায়? কয়লার আগুনকে তুমি ছাই দিয়ে ঢেকে দিলেই কি নিভে যাবে?
ভালবাসাহীন হৃদয় শ্মশানের চিতার মতো। মনুষ্য জীবনের যা কিছু সুন্দর আর কোমল, ভালোবাসাহীনতা- সে সব কিছু পুড়িয়ে দেয়। আর সে কারনেই, ভালোবাসা না পাওয়া মানুষগুলো, নিষ্ঠুর পাশবিক হয়ে উঠে।
আজকের পৃথিবীতে ভালোবাসা একটু একটু করে কমছে, আর মানুষের নিষ্ঠুরতা একটু একটু করে বাড়ছে। নিষ্ঠুরতার এই চারাগাছকে বিনাশ করার একমাত্র পথ হলো, মানুষকে বুঝতে হবে- ভালোবাসার চারাতে জল দিয়ে বড় না করলে, এই পৃথিবীর ভালোবাসা একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে। কেমন হবে সেই ভালোবাসাহীন পৃথিবী? মানুষ তখন আর এক মানুষকে ততদিন খুন করতে থাকবে, যতদিন না এই পৃথিবী মানুষ শূন্য হচ্ছে।
কি পরিহাস! মানুষ বাঁচতে গিয়ে নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নিয়ে, নিজেই একদিন নিজেকে পৃথিবী থেকে মুছে দেবে! The Final Apocalypse. The Final End of Human Civilization. The Final Darkness.
বিদুদা আমার জামাইবাবু হলেও, আমি তাকে বিদুদা বলেই ডাকি। দিদি আমি বিদুদা- আমরা যেন তিন ভাই বোন। বিদুদা এখন শহরের উদীয়মান অর্থোপেডিক সার্জন। মেডিক্যাল কলেজে, আমার বাবার ছাত্র ছিলো। দিদি আর আমি যখন যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি, তখন বিদুদা একদিন এসেছিলো, আমাদের বাড়িতে।
ব্যাস। প্রথমদিন দেখেই বিদুদার প্রেমে পড়েছিলো দিদি। ওদের প্রেমের সম্পর্কে, আমিই ছিলাম ঘটক। বাবা মায়ের অজান্তে, ওদের হয়ে কত চিঠি যে বয়েছি আমি!
মেডিক্যাল কলেজে বিদুদা পোস্টগ্রাজুয়েট করার পর, ওদের বিয়ে। দিদি তখন ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। তারপর ওরা গ্লাসগোতে দশ বছর কাটিয়ে, কলকাতা ফিরে এসেছে। পিকুর জন্ম গ্লাসগোতে। কিন্তু ওরা সকলেই কলকাতাকে বড় মিস করছিলো।
কলকাতা হয়তো পরিচ্ছন্ন শহর নয়, আধুনিক শহর নয়। তবুও কলকাতা, কলকাতাই। এতো হৈ চৈ আনন্দ পৃথিবীর খুব কম জায়গাতে পাওয়া যায়। দারিদ্র্য থাকলেও, বাঙালী মনে এক তেজ আছে। সেই তেজ হলো তার চেতনার। বাঙালী চিন্তা করতে ভালোবাসে। বাঙালী হয়তো টাটা বিড়লা আম্বানী হতে পারবে না, কিন্তু বাঙালী তার চেতনা দিয়ে মানুষকে পথ দেখাতে পারে। বিবেকানন্দ সুভাষ বসু বিদ্যাসাগর রামমোহন কেবল বাঙালীর চেতনা নয়, সমগ্র মানব জাতির চেতনা। দুর্বল দরিদ্র্য পরাধীন মানুষের সংগ্রামের নাম হলো বিবেকানন্দ সুভাষ বসু বিদ্যাসাগর রামমোহন।
দুর্ভাগ্য, বাঙালী তার বাঙালীত্বকে ভুলে যাচ্ছে। বাঙালী আজ তার চিন্তা শক্তি হারিয়ে, রাজনীতির গিনিপিগ হচ্ছে। বাঙালী আজ কোন কিছু না ভেবেই, শেয়ালদের মতো হুক্কাহুয়া ডাক ডাকতে শিখছে। বাঙালীর এ এক চূড়ান্ত অবক্ষয়। বাঙালী যদি তার চেতনাকে জাগ্রত না রাখে, এই বাংলাতে, বিবেকানন্দ বিদ্যাসাগরদের জন্ম আর হবে না।
কটা বাজে এখন? ঊহঃ রাত দুটো! ওহে হিমেল, এখন কি করছো তুমি? ঘুমোচ্ছো? দেখো, এখনও কেমন জেগে রয়েছি আমি!
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem