ট্রেনটা ছুটছে। দার্জিলিং ছেড়ে যাচ্ছি আমি। দার্জিলিং ছেড়ে যাচ্ছি অথবা হিমেলকে ছেড়ে যাচ্ছি? কয়েকদিন আগে দার্জিলিং কেবল দার্জিলিং ছিলো। আজ দার্জিলিং-এর অর্থ হিমেল। হিমেলকে বাদ দিয়ে দার্জিলিং-এর অস্তিত্ব ভাবতে পারি না।
কি সাংঘাতিক! এমন তো আগে ভাবি নি! একটা আস্ত শহর কেবল একটি মেয়ের নামে রূপান্তরিত হলো?
মাথার উপর আকাশ। চারপাশে পুকুর ডোবা ধানজমি শস্যক্ষেত। ট্রেনটা ছুটছে- ঝিক ঝিক ঝিক। প্রত্যেকটা ঝিক ঝিক শব্দ যেন হৃদয়ের উপর এক নিষ্ঠুর হাতুড়ির আওয়াজ।
হিমেল এখন কি করছে? রেস্টুরেন্টের ইউনিফর্মের উপর এপ্রন চড়িয়ে, কাগজ পেন্সিল নিয়ে, ঠোঁটের কোন হাসি হেসে লোকজনকে জিজ্ঞেস করছে- "বলুন স্যার, আপনার কি চাই। "
হিমেলের চোখে হিমালয়ের প্রশান্তি। ঠোঁটে ওর সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপের বাহার। কথায় ওর সুমিষ্ট মধু। এমন সুন্দর এক মেয়েকে দিন রাত রেস্টুরেন্টে কাজ করতে হয়? সপ্তাহের সাত দিনই হয়তো কাজ করতে হয়। এ পৃথিবীতে এরূপ কোটি কোটি হিমেল আছে। যাদেরকে হয়তো এরকমই, বা এর চেয়েও কষ্ট করে জীবন কাটাতে হয়।
সৌরভ মাখানো গোলাপ হলেই যে তার স্থান হবে স্বর্ণখচিত পুস্পদানিতে; তা কিন্তু নয়। অনেক সুন্দর সুন্দর গোলাপ রাস্তার এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। তাদের কেউ কেউ পদপিষ্ট হয়ে লাঞ্ছিত মর্দিত হয়। এরই নাম পৃথিবী। এরই নাম জীবন। এরই নাম মনুষ্য সভ্যতা। গোলাপের ভাগ্যের সাথে মানুষের ভাগ্যের কোন তফাৎ নেই।
মানুষ এখনো সুন্দরকে মর্যাদা করতে শিখে নি। তা যদি হতো, গোলাপকে মানুষ- বৃন্ত থেকে তুলে, এখানে ওখানে ছুঁড়ে ফেলে দিতো না। গোলাপকে তাহলে পদপিষ্ট হয়ে লাঞ্ছিত মর্দিত হতে হতো না।
অথচ পৃথিবীতে সৌন্দর্য আছে বলেই মানুষ এই যন্ত্রণাময় জীবনে বাঁচতে চায়। স্বপ্ন আছে বলে মানুষ হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। প্রেমিকার কোমল সুন্দর বক্ষ আছে বলে, মানুষ সাত সমুদ্র সাঁতার কেটে দুর্গম সমুদ্র পাড়ি দেয়। মায়ের প্রশান্ত আঁচল আছে বলে, শিশুও রাত জেগে পড়াশুনা করে। সৌন্দর্য হলো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার প্রেরণা। পৃথিবী যেদিন সৌন্দর্যহীন হবে, মানবজাতি সেদিন একযোগে আত্মহত্যা করবে। চলবে...
অরুণ মাজীর রোমান্টিক উপন্যাস
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem