আমাকে দেখলেই পেন্তীর মা মুড়ো ঝাঁটা নিয়ে দৌড়ে আসে। চীৎকার করে আমাকে বলতে থাকে- "ওরে মুখপোড়া, আবার তুই কবিতা পড়ছিস? সারাদিন কবিতা পড়লে, সংসারে তোর সুখ আসবে কি করে? "
পেন্তীর মা জানে না, আগে দিনরাত অনেক পরিশ্রম করেছি আমি। কিন্তু সুখ নামের সেই সুন্দরী কন্যা, আমার স্বপ্নেই থেকে গেছে। আমার বাহু বদ্ধ সে হয়নি কখনো। আমি একাই বা কেন? তোমাদেরকেও জিজ্ঞেস করছি আমি- "সকাল থেকে রাত পর্য্যন্ত তোমরাও তো অনেক পরিশ্রম করেছো। কিন্তু সেই সুখ সুন্দরীকে এখনো বাহু আবদ্ধ করতে পেরেছো? " পারো নি। কেন পারো নি? পরিশ্রম করলেই যদি সুখ পাওয়া যায়, তাহলে সুখ সুন্দরী এখনো অধরা কেন?
বাঁদর দেখেছো? কি করে তারা? কেবল এক ডাল থেকে অন্য ডালে দিনরাত লম্ফ ঝম্ফ করছে। হাঁস ফাঁস করছে, ঘামছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু করছে কি? নাহঃ। অনেক পরিশ্রম করছে তারা, কিন্তু কাজের কাজ বলতে লবডঙ্কা!
মানুষকে দিনরাত পরিশ্রম করতে দেখলে, আমার বাঁদরের কথা মনে পড়ে। মানুষের জীবনের পরম গন্তব্য কি? একটু শান্তি আর সুখ। মানুষ এতো তো পরিশ্রম করছে। তবুও শান্তি আর সুখ নামের গন্তব্য সে কখনো আর ছুঁতে পারছে না। কেন?
মানুষ যত বেশি পরিশ্রম করছে, তত বেশি তার হতাশা আর যন্ত্রণা বাড়ছে। তুমি একজন ডাক্তার। তোমার তিনতলা বাড়ি। সপ্তাহের প্রতিদিন তুমি মাছ আর মাংস খাও। তবুও তোমার সুখ নেই। তোমার স্ত্রী দিনরাত তোমাকে "এই নেই সেই নেই" বলে গঞ্জনা দেয়। তোমার ছেলের কেবল নাকী কান্না। আজ এটা চাই। কাল ওটা চাই। তবুও তার মুখে হাসি আনা দুঃসাধ্য। এতো পরিশ্রম করে, কাউকে কোন কিছু দিতে তুমি কোন ত্রুটিরাখছো না। তবুও তোমার সংসারে শান্তি নেই। মাঝে মাঝে তুমি ভাবো- "এবার সংসার ছেড়ে, বরং উলঙ্গ এক সন্ন্যাসী হয়ে যাই।"
জীবনের মতো বড় হারামজাদা আর কেউ নেই। দোষ করবে তো শাস্তি পাবে। কোন কোন সময় তুমি ঠিক কাজ করবে, তাতেও তুমি শাস্তি পাবে। তার অর্থ কি? জীবন, তোমার আন্ডারপ্যান্টের নীচে, বিষাক্ত কাঠ পিঁপড়ে ছাড়বেই। সেই কাঠ পিঁপড়ে তোমাকে কুটুস কুটুস কাটবে, আর তুমি কাটা ছাগলের মতো হুঁ হুঁ করে আর্তনাদ করবে।
কখনো গোচরে, কখনো অগোচরে জীবন তোমাকে প্রতিমুহূর্তে যন্ত্রণা দিচ্ছে। সেই যন্ত্রণা কখনো কখনো এতো অল্প, তা তুমি বুঝতেও পারো না।
"টেনিস এলবো" নাম শুনেছো? যারা দীর্ঘ দিন ধরে টেনিস খেলে (বিশেষ করে ব্যাক হ্যান্ড স্ট্রোক খেলে)তাদের কনুইয়ে এই রোগ হয়। কনুইয়ে এরা চোট পায় না, তবুও এদের এই রোগ হয়। কেন হয়? আমার স্পোর্টস মেডিসিনের ভাষায় আমি একে বলি-repetitive micro-trauma বাrepetitive micro stress এর জন্য এই"টেনিস এলবো" রোগ হয়। খেলোয়াড়ের কনুই, বড় রকমের চোট পায় না ঠিকই, কিন্তু প্রতিমুহূর্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, অসংখ্য অসংখ্য চোট সে পেতেই থাকে। তারপর দশ বা বিশ বছর পরে তার "টেনিস এলবো" রোগ হয়।
মানুষ বুঝতে পারে না, সে প্রতিমহূর্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য "মানসিক চোট" পাচ্ছে। এই ভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে কি হবে? সেই ব্যক্তি একদিন ডিপ্রেশান, বা অন্যান্য মানসিক রোগে ভুগবে। এই মানসিক চোটের জন্য তার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমবে, ব্লাড প্রেসার বাড়বে, হার্ট এট্যাক হবে, ডায়াবিটিস হবে ইত্যাদি।
পরিশ্রম করে তুমি সুখের সাধনা করতে গেলে। কিন্তু তুমি পেলে কি? দুরারোগ্য অসুখ। অনেকটা মালবিকার মতো। চাই আমি মালবিকার রাঙা ঠোঁটের চুমু। কিন্তু কপালে জুটে কি? লম্বা এক ফর্দ হাতে, বাজারে যাওয়ার হুকুম। জীবনের মতো বড় হারামজাদা কেউ নেই গো, জীবনের মতো বড় হারামজাদা কেউ নেই।
তুমি প্রতিমহূর্তে ছোট বড় অসংখ্য "মানসিক চোট" পাচ্ছো। তার নিরাময়ের জন্য তুমি কি করো? কৌপিন পরা সাধুরা বলবে- "গাঁজা টানো"। আমার পাড়ার সরস্বতী মহারাজ বলবে- "মেডিটেশন করো" । বটু মাতাল বলবে- "দিনে পাঁচ ছিপি করে, দশবার চোলাই মদ গিলো।"
আশ্চর্য্যের ব্যাপার কি জানো? এরা সবাই কিন্তু ঠিক। জীবনের যন্ত্রণা থেকে সরে, তোমাকে কিছু সময়ের জন্য একটা কিছুতে বুঁদ থাকতে হবে। এই বুঁদ থাকার নামই হলো মেডিটেশন। মদ খেয়ে বুঁদ হতে গেলে অবশ্য অনেক রকম ঝক্কি আর বিপদ আছে। তাই তোমাকে নিরাপদ কিছু বাছতে হবে।
চোখ বুজে মেডিটেশন করা বড় বোরিং ব্যাপার। তাই তোমাকে আনন্দদায়ক কিছু খুঁজতে হবে। সে গুলো কি? অরুণ মাজীর এঁড়ে গরু মার্কা কবিতা? অরুণ মাজীর কবিতা তোমরা নাই বা পড়লে! কিন্তু অন্য কারো তো পড়তে পারো। শুধু কবিতা নয়। গান, আঁকা, নাচ সবই তোমরা করতে পারো। এমন কিছু করো, যার মধ্যে সরল এক রূপ আছে, গভীরতা আছে। ক্রাইম নভেল বা কেচ্ছা পড়ে তুমি মেডিটেশনের ফল পাবে কি?
জীবনে মাতাল তোমাকে হতেই হবে। কবিতা বা গানের প্রেমে তুমি আজ মাতাল না হলে, একদিন জীবন হয়তো তোমাকে চোলাই মদে ডুবিয়ে মাতাল বানাবে। অথবা তোমার ড্রয়ার ভর্তি ওষুধের গন্ধে, তোমাকে মাতাল বানাবে।
© অরুণ মাজী
Painting: Chen Yan Nin
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem