আমি লক্ষ্মীকান্ত, মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য
চলে যাচ্ছি অতিপ্রিয় যশোহর ছেড়ে, আর ফিরবো না কোনোদিন
কৃষ্ণবর্ণ ঘোড়া ছুটিয়ে পালাচ্ছি, বংশধরদের দিয়ে যাবোখুরের গর্বধ্বনি
জখমের রক্তে শুনতে পাচ্ছি বৃষ্টির অঝোর, ধুমঘাট ছেড়ে চলে যাচ্ছি
প্রতাপাদিত্যের অনুচরেরা আমাকে হত্যার জন্য পেছু নিয়েছে, পর্তুগিজরাও
আমি প্রতাপাদিত্যের পালক পিতাকে খুন করার ষড়যন্ত্রে শামিল হইনি
পালক পিতাই কেবল নয়, রক্তসম্পর্কে প্রতাপাদিত্যের বাবার ভাই
তাকে খুন করল প্রতাপাদিত্য, আমার তাতে সায় ছিল না
বিক্রমাদিত্যের অপযশ পেয়েছেন মহারাজা, ছি ছি ছি ছি, চৌর্যবৃত্তি!
ওর বাবা শ্রীহরি, দাউদ খানের সোনাদানা নিয়ে কেটে পড়েছিল
নিজেই নিজেকে মহারাজা উপাধি দিয়েছিল, আমার তিরিশতম
বংশধরদের সময়কার বেহায়া রাজনীতিকদের মতন
স্বর্গে বসে শুনি আমার বংশধরদের পরিবার কুড়ি হাজার ছাড়িয়েছে
আমি প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে ছিলুম বহু যুদ্ধে, কতো শত্রুসেনাকে
কোতল করেছি, তাদের সেনাপতির মুণ্ড চুল ধরে উপহার দিয়েছি
আফগান তুর্কি আরব দক্ষিণি মগ হার্মাদ সেনাপতির মুণ্ড
প্রতাপাদিত্যের পায়ের কাছে, যদিও আমি ব্রাহ্মণের ছিলে, আমাকে
অকুলীন ঘোষণা করা হয়েছে, কায়স্হ রাজার সঙ্গ দিয়েছি, তাই
আমার বাবা কালীঘাটের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মা স্বপ্ন দেখেছিলেন
সরোবরে সতীর হাত পড়ে আছে, অন্ধকার রাতে আমার কালো
ঘোড়া ছুটছে বঙ্গোপসাগরের দিকে, আমি বসত গড়ব সেখানে
আমি জানতুম না যে পর্তুগিজদের হার্মাদদের মগদের মতন
জোচ্চোর সমাজ গড়ে তুলবে বাঙালিরা, তাদের ভাষা পালটে যাবে
নখ চুল বিক্রি করার বাজার গড়ে উঠবে, বাজার বাজার বাজার
বাজার মানে দোকানপাট নয় যেমন ছিল প্রতাপাদিত্যের রাজত্বে
আমার বংশধরদের সময়কার বাজার মানে নিজেকে বিক্রি
প্রতাপাদিত্য কিন্তু নিজেকে বিক্রি করেননি, লড়ে গেছেন
ষড়যন্ত্র করেছেন, দুর্গ গড়ে তুলেছেন, নৌবহর গড়ে তুলেছেন
কিন্তু প্রতাপাদিত্য প্রথম বাঙালি, তিনিই দিয়ে গেলেন বাঙালির
রক্তে আত্মধ্বংসের বীজ, তখন থেকে বাঙালিরা নিজেরা
লড়ে মরছে, শ্রীহরি যেমন নিজেকে মহারাজা ঘোষণা করেছিলেন
জেলায় জেলায় অপরাধীরা নিজেদের মহারাজা ঘোষণা করছে
গরিব চষির লক্ষ লক্ষ টাকা মেরে চিটফান্ড খুলে কেটে পড়ছে
এরা সকলে দাউদ খানের ধনসম্পত্তি নিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে
বাঙালিদের, যশ থেকে যে যশোহর হয়েছিল, সেই যশ আর নেই
প্রতাপাদিত্য ছিলেন হিন্দুদের মহারাজা কিন্তু এখন লোকেরা
নিজেদের হিন্দু বলতে কুন্ঠিত হয়, যদিও তাদের নুনু কাটা নয়
আমি লক্ষ্মীকান্ত, আমার নুনুও কাটা নয়, কিন্তু আমার সেনায়
অধিকাংশ নুনুকাটা আফগান তুর্কি আরব ঘোড়সওয়ার
আমার ঘোড়ার পূর্বপুরুযও এসেছিল আরব দেশ থেকে, বাবরের
সেনাবাহিনীর সঙ্গে, যদিও বাবর আরব ছিল না, বাবরের ছেলেরা
এখানের যুবতীদের বিয়ে করে থেকে গেল, ওদের দেশে এরকম
সুন্দরী কখনও দেখেনি তাতার বাহিনীর সৈন্যেরা, ওদের যুবতীদের
চোখ ছোটো নাক চেপ্টা ঠোঁট পাতলা নয়, যদিও ব্রাহ্মণ সন্তান আমি
তাতার আফগান তুর্কি ফিরিঙ্গি তরুণীদের সঙ্গে শোবার সুযোগ পেয়েছি
অ্যাণ্টনি ফিরিঙ্গির রক্তে আমার বংশের রক্ত বইছে, ওর বাবা
আমার বংশধরের রক্ষিতার ছেলে, শ্যাম রায়কে পুজো করতো লালদিঘিতে
আমি লক্ষ্মীকান্ত, মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য, সাবর্ণ গোত্রের যোদ্ধা
আজ পর্যন্ত কেউ তরোয়াল চালানোয় আমাকে হারাতে পারেনি
কতো মুণ্ড এক কোপে ধরাশায়ী করেছি তার গোনাগুন্তি নেই
আমার বংশধরেরা তাই করবে একদিন, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে
ঘোড়ার পিঠে বসে চালাবে তরোবারি, যারাই সামনে আসবেমূর্খ মুণ্ড
গলা থেকে কেটে ফেলবে ধুলায়, সেসব মুণ্ড বেঁচে থাকবে, কথা বলবে
দরবারে গিয়ে যে-যার লেজটি নাড়িয়ে রাজা বা রানির সেবাদাস হয়ে
সারটা জীবনভর ঘেউ-ঘেউ করে ক্রমে-ক্রমে জীবাশ্মের রূপ নেবে
যশোহর ছেড়ে চলে আসলেও ভুলতে পারিনি কখনও
যশোহর ছেড়ে চলে আসলেও ভুলতে পারনি কখনও
আমার বংশধরেরা যশৌ্র রোড দিয়ে যাবার সময়ে মনে করবে
তাদের পিতৃপুরুষ এই পথে একদিন কালো ঘোড়া
ছুটিয়ে একদিন জঙ্গল সাফ করে কলকাতা সুতানুটি গোবিন্দপুরের
পত্তন করেছিল, ক্লাইভের পোঁদ চাটবার জন্য কৃষ্ণচন্দ্রের মতো
নিজেকে বিক্রি করিনি, আমার বংশধররাও নিজেদের শিরায় শিরায়
আমার রক্ত নিয়ে প্রতিরোধ করে যাবে অন্যায়ের, শোষণ ও অত্যাচারের
১২ মার্চ ২০১৭
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem