Love Poems Of Pablo Neruda Translated In Bengali Poem by Malay Roychoudhury

Love Poems Of Pablo Neruda Translated In Bengali

পাবলো নেরুদার কবিতা

ইলা নেগ্রায় ঝরে তুমুল বর্ষণ
ইলা নেগ্রায় ঝরে দক্ষিণের তুমুল বর্ষণ
একটিমাত্র বৃষ্টি ফোঁটার মত স্বচ্ছ আর ভারী
শীতল পদ্মপাতায় তাকে ধরে সমুদ্রের বুক
পৃথিবী শেখে সুগন্ধী মদে কানা ভরে ওঠা।

তোমার চুমুতে সেই ভরা বর্ষা আমায় দাও
এত দিনের লবনের স্বাদ, মাঠের মধু
আকাশের হাজার ঠোঁটে ভেজা সৌরভ
আর শীতার্ত সাগরের শীলিত ধৈর্য নিয়ে।

কে যেন ডাকে আমাদের নাম, নিজ থেকে সব কপাট খুলে যায়,
জানালার কানে বৃষ্টি তার গুজব ছড়ায়,
আকাশ বাড়ে উল্টো হয়ে, ছুঁতে চেয়ে মাটির শেকড়।

এক স্বর্গীয় জাল বোনে আর খোলে এই অবাক প্রহর,
যে জালে জড়ানো থাকে সময়ের ঘন্টাধ্বনি, ফিসফিস স্বর,

বর্ধিষ্ণু জীবন, পথ, এক নারী, এক পুরুষ আর পৃথিবীর আমূল শীতকাতুরেপনা।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -


আমার কোনো শেষ বার নেই
আমার কোনো শেষ বার নেই, নেই চির প্রতিশ্রুতি;
বালির ওপর জয় তার পায়ের ছাপ ফেলে রেখে গেছে।
আমি এক সাধারণ মানুষ, যে মানুষকে ভালবাসতে চায়।
তোমাকে চিনিনা, অথচ ভালবাসি,

কাঁটার উপহার দিইনা কখনো, বেচিনা তার ধার।
কেউ হয়ত জানতেও পারে, আমার হাতে তৈরী মুকুট
রক্ত চায় না, আমি প্রতিরোধ করেছি বিদ্রূপ; হয়ত জানতেও পারে,
আমার আকণ্ঠ উত্তাল ঢেউ সর্বদা ভরা ছিল সত্যের জোয়ারে।

কদর্যতার প্রতিদানে উড়িয়েছি কপোত। আমার কোনো
চির প্রতিশ্রুতি নেই, কারণ আমি আজ, কাল এবং ভবিষ্যতে, ভিন্ন মানুষ,
হয়ত তাই, আমার পরিবর্তনশীল ভালবাসায় এক পবিত্রতা আছে

আমার কাছে মৃত্যুই চূড়ান্ত নিদান। তোমায় ভালবাসি,
তোমার ঠোঁটে যে আনন্দ খেলা করে, তাকে চুমু দিই আমি।
চলো, পাহাড়ের গায়ে খড়কুটোয় এক নিশ্চিন্ত আগুন জ্বালাই।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
কদর্য প্রেম, তুমি রোঁয়া-ওঠা লোমশ বাদাম
কদর্য প্রেম, তুমি রোঁয়া-ওঠা লোমশ বাদাম
সুন্দর, তুমি ফুরফুরে রূপসী বাতাস।
কুত্সিত, তোমার বিশাল মুখে ভরে যায় দুইটি অধর,
সুন্দর, তোমার চুমুতে সতেজ তরমুজ।

কদাকার, কোথায় রেখে এসেছ দুই স্তন,
গমের দানার মত কৃশ?
তোমার বুক জুড়ে যুগল চাঁদ দেখিনা কেন
আলোকিত, উদ্ধত মহিমায়?

কুৎসিত, তোমার পায়ের নখের মত এক চিলতে ঝিনুক
নেই কোনো সাগরে। সুন্দর, তোমার শরীরের প্রতিটি ফুল, নক্ষত্র, ঢেউ,
কী আশ্চর্য নিয়েছি টুকে, একে একে

কদর্য, তোমার সোনালী কাঁকাল ভালবাসি;
অপরূপ, ভালোবাসি তোমার কপালের ভাঁজ,
সমস্ত আঁধার আর স্বচ্ছতায় আবিস্তার ভালবাসি তোমায়, ভালবাসা।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
ঝিরঝির বৃষ্টির মত বয়স আমাদের আচ্ছন্ন করে
ঝিরঝির বৃষ্টির মত বয়স আমাদের আচ্ছন্ন করে।
সময় অন্তহীন, বিষাদময়;
তার লবনের একটি পালক তোমার মুখ ছুঁয়ে যায়,
আমার আস্তিন ভেজায় তার ক্ষারময় ঘাম।

আমার হাত আর কমলার ঘ্রাণ মাখা তোমার হাতে
সময় কোনো তফাত করে না;
তুষার ঝরায়, বাছাই করে তার যা প্রয়োজন,
আমার ব'লে যাকে পাই, সময় খেয়ে নেয় সেই তোমার জীবন।

তোমাকে উজাড় করে দেওয়া আমার দিনরাত
স্ফীত হয় বছরের ভারে, যেন থোকাথোকা ফল,
তারপর, কাদায় ফিরে যায় একদিন সেই সোনালী আঙুর।

আর মাটির গহীনেও যেন বয়ে যায় মুহূর্তধারা
প্রতীক্ষা করে, বৃষ্টি ঝরায় -ধুলি-সার না-থাকাকে
একদিন সে মুছে দিতে চায়।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
তোমার পায়ের পাতা থেকে চুলে এক আলো
তোমার পায়ের পাতা থেকে চুলে এক আলোর আভাস
তোমার পেলব শরীরকে যা দেয় অতুল সবলতা
সে তো ঝিনুকের ঠাণ্ডা ঝিলিক নয়, নয় রুপালি শীতার্ততা,
সে যে অখণ্ড রুটির আভা, আগুনের নিবিড় হাবাস।

তোমার ভেতর যে ফসল ফলে উঁচু ক্ষেত ভরে
সুসময়ে মথিত ময়ান ফুলেছে তিলতিল,
তোমার স্তনকে সুমণ্ডিত করে সে রুটির ময়ান
আর আমার প্রেম কয়লার আঁচ হয়ে প্রতীক্ষা করে।

আহা, স্ফীত রুটি, ভোরের আলোর মত তোমার কপাল,
চরণযুগল, মুখগহ্বর, গ্রাস করি আমি,
ভালবাসা, কী নতুন আলো দেখায় তোমার সকাল।

আগুন তোমার রক্তে আনে আঁচের প্রত্যাশা,
ঝুরঝুর ময়দা দেয় শুদ্ধতার পাঠ, রুটির কাছে
শেখো তুমি মদির উচ্চারণ, ভালোবাসা।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
আমার জীবনের রঙ প্রেমের জখমে
আমার জীবনের রঙ প্রেমের জখমে বেগুনি যখন,
তখন আমি তড়িঘড়ি অন্ধ পাখির মত পালিয়ে
শেষে তোমার জানলায় পেখম গুটিয়ে বসতেই
তুমি শুনতে পেলে আমার ভাঙা হৃদয়ের ফিসফিস স্বর।

সায়াহ্ন-সাঁতার থেকে উঠে এসে, তোমার বুকে মাথা রেখে
বেভুলে গমের সুগন্ধী স্তূপে নিবিড় হারিয়ে যেতে যেতে
তোমার হাতেই বেঁচেছি জীবন, তোমার আনন্দের দিকে
উঠে গেছি সরল বৃক্ষের মত, সমুদ্রের থৈ থৈ ঠিকানার পর।

তাই তোমার কাছে আমার ঋণ কেউ জানবেনা, প্রেম,
কতটা স্বচ্ছতা, কতটা মাটির গন্ধ লেগে আছে,
আমার দেশের কাদায় বোনা শেকড়ের মত।

তোমার কাছে আমার যা কিছু ঋণ, সব মিলে গেলে,
হয়ত একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হবে, অথবা বালুময় প্রান্তরে সুশীতল জল,
যেখানে ভবঘুরে বিদ্যুতের দিকে তাকিয়ে থাকে মুহূর্তের চোখ।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
দুই সুখি প্রেমিক মিলে তৈরি হয় একটা রুটি
দুই সুখী প্রেমিক মিলে তৈরি হয় অখন্ড রুটি
ঘাসের ওপর এক ফোঁটা টলমলে চাঁদের শিশির।
হেঁটে যেতে দুই ছায়া ঢেউ খেয়ে মেশে। বিছানায়
তারা হয়ত এক চিলতে সূর্য ফেলে যায়।

সত্য থেকে ছেনে আনে তারা একটি দিবস;
তাকে বাঁধে দড়ি নয়, সৌরভের টানে; শান্তির পাপড়ি ধরে রেখে
তাদের শব্দ কাঁচের মত হয় না চুরমার
তাদের সুখ, উঁচুতে বাঁধা কোনো স্বচ্ছ মিনার।

বাতাস আর সুগন্ধী মদ বন্ধু হয়ে তাদের সাথে যেতে চায়,
তারা পায় মাঠ ভরা দেব্পুষ্পের উত্তরাধিকার
রাত তাদের দেহের ওপর ঝুরঝুর পাপড়ি ঝরায় |

দুই সুখী প্রেমিক যাদের শেষ নেই, মৃত্যু নেই
বেঁচে থাকতে গিয়ে তারা বহুবার ফোটে আর ঝরে
তাই প্রকৃতির মত তারা মৃত্যুহীন, অনন্ত ঋতুর পরিসরে।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
নদীর গাঢ় জল আর কুয়াশা
নদীর গাঢ় জল আর কুয়াশা নিংড়ানো
যত অযুত নিযুত তারা আকাশে ভীড় করে
সেখান থেকে ভালবাসার তারাটিকে বেছে
আমি নিশ্চিন্তে ঘুমুতে যাই রাতের পহরে।

সবুজ সাগর, সবুজ শীতার্ততা,
পাতাময় ডাল আর ঢেউ সুনিবিড়,
এর ভেতর শুধু একটি ঢেউ বেছে নিলাম
-সে তোর অবিভাজ্য শরীর।

ফোঁটা ফোঁটা চুঁয়ে পড়া জল, লতানো শেকড়,
আকাশের যে জরির শেষ নেই,
সব ঝিলিকেরা একদিন যেখানে মিলবেই

সেই তোর দামাল চুল একান্তই চাই।
স্বদেশের উদার হাতের দান, শত মধুময়
এখান থেকে নিলাম তোর বন্য হৃদয়।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
বনভূমির হারানো পথে
বনভূমির হারানো পথে ভাঙা ডাল তুলে
তার ফিসফিস তৃষিত ঠোঁটে নিয়ে শুনতে পাই
বৃষ্টির ক্রন্দন, ভাঙা ঘন্টার ঢং,
অথবা কোনো ছিঁড়ে যাওয়া হৃদয়ের বেদনার ঘাঁই।

দূর থেকে মনে হয়, গভীর রহস্য,
মাটির তলায় চাপা পড়ে আছে
যেন এক গুমোট চিত্কার, হেমন্তের ভারে,
ভিজে অন্ধকারে, আধখোলা পাতার নীচে।

বনের স্বপ্ন ভেঙে গেলে, পাতাময় হেজেলের ডাল
যেন নাড়া দেয় চেতনার গহন আবহমান,
আমার জিভের ডগায় সুবাসিত গান গেয়ে উঠে।

যেন আমার শৈশবের হারানো শেকড় কাঁদে
যেন ফেলে আসা মাটি আকুতি জানায়,
আর আমি সেই ঘ্রাণের আঘাতে, থমকাই নিস্পন্দময়।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
ভালবাসি, অথচ বাসি না তোমায়
ভালবাসি, অথচ বাসি না তোমায়,
সব সজীবেরই তো দুই দিক থাকে;
নৈঃশব্দের ডানায় যেমন শব্দের ভার,
যেমন শীতলতার উল্টো পিঠ আগুনকে রাখে।

ভালবাসব বলেই বাসতে যে চাই,
ছুঁতে চাই বারবার সে অসীম অনুভব
শেষ মুহূর্ত ধরে বাসব বলেই
এখনো ভালোবাসিনি যেন তোমার সৌরভ।

ভালবাসি অথচ বাসি না তোমায়,
চিরদিন একগোছা চাবি ধরে আছি,
এক দিক খুলে গেলে -আনন্দের হাট, অন্যদিকে -সংসারের তুচ্ছ কানামাছি।

ভালোবেসে প্রেম বাঁচে যুগল জীবন,
ভালবাসি তবু, হ'লে প্রেমের আকাল,
ভালবাসি তাই, প্রেম, তোমায় আবার, প্রেমময় যদি হয় সবুজ সকাল।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
গান, বনভূমির মত ফুরফুরে
গান, বনভূমির মত ফুরফুরে তার সুন্দরতা;
যে ভাবে আলো চলে যায় গন্ধর্বমণি, কাপড়, গম অথবা ফলের ভেতর,
আর একটি ভাস্কর্য তৈরী হয়, লহমায়,
যে ভাবে নারী ঢেউ-এর দিকে তার টাটকা সুবাস মেলে দেয়।

তার তামাটে পায়ের কাছে তুলি বোলায় সমুদ্রের ঢেউ,
ফিরে ফিরে পায়ের ছাপ আঁকে বালির ওপর,
আর তার কমনীয়, গোলাপি আগুন তৈরী করে এক স্বকীয় বুদবুদ

যাকে ধরে রাখতে পাল্লা দেয় সূর্য, সাগর।

অপরূপ, অফুরান ফেনার প্রতিধ্বনি তুমি।
তাই, ঠাণ্ডা লবণ ছাড়া কিছুই যেন না ছোঁয় তোমায়,
তোমার অটুট বসন্তে বিঘ্ন না ঘটায় যেন প্রেম।

জলের ভিতর তোমার নিটোল নিতম্ব
তৈরী করুক এক নতুন আয়তন, যেন শাপলা অথবা রাজহাঁস,
চিরন্তন স্ফটিকে ভাসমান, কোনো অজর ভাস্কর্যের মত।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
তোমার জাদুময় আঙুল
তোমার জাদুময় আঙুল যতক্ষণ না ফুলের মত
শান্তির পাখনা ছড়ায়, ততক্ষণ ভুলে থাকি
সেই একই হাত কী ভাবে সেঁচন করে লতার শেকড়,
কী ভাবে গোলাপের মেটায় পিপাসা।

গৃহপালিতর মত তোমার পিছু নেয় তোমার
আচড়া, ঝারি -মাটি চাটে, কাদা কামড়ায়,
উন্মুক্ত করে দেয় মাটির গভীর সুবাস,
দেব্পুষ্পের গনগনে, সতেজ ঝলক।

তোমার আঙুলে মৌমাছির দৃপ্ততা, দরদ মিশুক,
যে আঙুল স্বচ্ছ শাবকের মত ফোঁটা ফোঁটা জল মাটিতে ছড়ায়
যে হাত ফের আবাদ করে আমার হৃদয়।

পাথরের মত এই পোড়-খাওয়া বুক
তোমায় কাছে পেলেই তোমার কণ্ঠের কানায় ভরা
বনভূমির জল পান কোরে, আশ্চর্য গেয়ে ওঠে।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
গভীর সাগরে গোলাপের মত
গভীর সাগরে গোলাপ-কুঁড়িরমত লুকিয়ে আছে যে মাটি
সেই লবণাক্ত, পতিত মাটিতে শুধু নয়,
আমি হেঁটে গেছি নদীর তীর ঘেঁষে, মিহি তুষারে পা ফেলে;
যেখানে উঁচু,রুখো পাহাড় আমার পায়ের আওয়াজ কান পেতে শোনে।

লতায় জড়ানো, বাতাসের সুরেলা শিসে ভরা আদিম স্বদেশ,
লিয়ান লতার বিষাক্ত চুমুর জালে জড়িয়ে যাওয়া বন,
উড়ে যাওয়া পাখির শীত ঝেড়ে ফেলা, ভেজা চিত্কার;
এই তো আমার নির্মম, দুঃখময়, ভুলে-যাওয়া পৃথিবী।

তামার বিষাক্ত স্তর, ছড়িয়ে থাকা শোরার লবণ
ইতস্তত তুষারে গুঁড়িয়ে যাওয়া মূর্তির মত -এরাও আমার;
শুধু এরা নয়, লতানো আঙুর, বসন্তের রেখে যাওয়া রক্তিম চেরী, সব কিছু।

আমি পরমাণুর শামিল এইখানে এক অনুর্বর মাটির সন্তান,
যেখানে আঙুর থেকে ঠিকরায় হেমন্তের রোদ,
বরফের পাহাড়ে গড়ে ওঠে ধাতব পৃথিবী।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

মনে হয়েছিল মৃত্যুর হিমেল আঙুল
মনে হয়েছিল মৃত্যুর হিমেল আঙুল খুব কাছে,
আর তাবত জীবনে ফেলে যাওয়ার মত আছ শুধু তুমি:
আমার পার্থিব দিনরাত্রি তোমার মুখের কাছে সমর্পিত,
তোমার ত্বক আমার চুম্বনের স্বায়ত্বভূমি, মাটির সীমানা।

সে মুহূর্তে লেখনীও থমকে গিয়েছিল
ভরে উঠেছিল অবারিত বন্ধুতা আর সম্পদের আকর,
যে স্বচ্ছ গৃহ গড়েছিলাম আমরা দু'জন
তাও মিলিয়ে গিয়েছিল, ছিল শুধু তোমার দুটি চোখ।

কারণ জীবন যখন হিংস্র, তখন ভালবাসা
সব জলোচ্ছ্বাসের চেয়ে উঁচু ঢেউ
তবু, আহা, মৃত্যু যদি দরজার কপাট নাড়ায়

সেই অথৈ শূন্যতার পাশে থাকে শুধু তোমার চাহনি,
বিলুপ্তির পাশে, শুধু তোমার অপরূপ আলো,
ছায়া নির্বাপিত করা, শুধু তোমার অনিঃশেষ প্রেম।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
আজ শুধু আজ
অতীতের ওজন নিয়ে, ভবিষ্যতের পালক নিয়ে,
আজ শুধু আজ।
আজকের ভিতর আমার শৈশবের সমুদ্র পোরা আছে,
যদিও এক আনকোরা কুসুমিত দিনের আঙ্গিকে।

আলোর দিকে, চাঁদের কলার দিকে বাড়িয়ে থাকা তোমার মুখে
যোগ হয় ফুরিয়ে-যাওয়া দিনের বিবর্ণ পাপড়ি
আর অতীত, গতকালের মৃত মুখ চিনে নিতে
এগিয়ে আসে, এক অন্ধকার রাস্তায়, ঘোড়ার খুরের মতো দ্রুত।

আজ, কাল, ভবিষ্যৎ সবই
বলির পশুর মতো আগুনের উত্তুঙ্গ শিখায় ঝলসায়,
আমাদের এক-একটি দিন এইভাবে দহনের অপেক্ষায় থাকে।

অথচ সময় তার ময়ান গুঁড়ো গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয় তোমার হৃদয়ে,
আর আমার ভালোবাসা একটি তন্দুর তৈরি করে, আদিগ্রাম তেমুকোর কাদায়,
তাই তুমি আমার সত্তার অখণ্ড রুটি, প্রতিদিন।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
বেশি দূরকোথাও যেও না
বেশি দূর কোথাও যেও না, এক দিনের জন্যেও নয়,
কারণ...কারণ, কি করে বলব তোমায়, একটি দিন দীর্ঘ কতখানি,
কী নিবিড় অপেক্ষায় থাকব তোমার, যেভাবে পড়ে থাকে
একটি ফাঁকা ইস্টিশন, সব রেলগাড়ি এক কাতারে ঘুমুতে চলে গেলে।

এক প্রহরের জন্যেও যেও না কোথাও,
কারণ তীব্র যন্ত্রণার ঘর্মাক্ত ফোঁটাগুলি মুহূর্তেই গলগল করে নদী হয়ে যাবে
আর যে গৃহহীন ধোঁয়া ঘর খোঁজে অবিরাম,
তারা আমার নিখোঁজ হৃদয়ে ঢুকে প'ড়ে, শ্বাসরুদ্ধ করবে আমায়।

বালিয়াড়ির ওপর হাঁটতে গিয়ে মিলিয়ে যেও না তুমি,
তোমার চোখের কাঁপন যেন পথভ্রষ্ট না হয় শূন্যতায়
এক লহমার জন্যেও যেও না কোথাও প্রিয়তমা।

কারণ সেই এক নিমিখে তুমি হয়ত যোজন দূরে হারিয়ে যাবে
আর সমস্ত পৃথিবী হাতড়ে, আমি বিভ্রান্তের মত,
প্রশ্ন করব, আর্তনাদ, তুমি কি আসবে? আমায় কি এইভাবে ফেলে রেখে মরতে দেবে তুমি?
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
বনভূমির আঁশের মত তোমার চুল
বনভূমির আঁশের মত তোমার চুল, যেন দ্বীপপুঞ্জের সবুজ বনানী
তোমার ত্বকে শত বছরের প্রাচীন ইতিহাস
সাগরের আরণ্যক শোঁ শোঁ শব্দ তোমার শিরায়
সবুজ পাতার রক্ত আকাশ থেকে ঝরে, স্মৃতিতে তোমার।

বনের শেকড় থেকে, জলের ওপর সূর্য-কণার
এই দারুণ বিচ্ছুরণ - এর টাটকা, কড়া, জৌলুস থেকে
আমার হারানো হৃদয়, কেউ ফেরাতে পারবে না।
যে ছায়াময় অতীত আমার সঙ্গে বাস করেনা আর, সেখানে বসত করে আমার অনুভব।

আর তাই যেন তুমি দক্ষিণ থেকে জেগে ওঠো, দ্বীপের মতন,
তোমার মধ্যে ভীড় করে পালক আর বৃক্ষের গুঁড়ি - তোমায় মুকুট পরায়:
আমি সেই ফুরফুরে বনের আঘ্রাণ খুঁজে পাই তোমার ভেতর।

অরণ্যের মজ্জায় যে গাঢ় মধু আমাকে টানে - তাই,
আর তোমার কোমর ছুঁয়ে অনুভব করা বুনো অস্বচ্ছ ফুল,
এই সমস্ত উপাদান, আমার সংগে পৃথিবীতে আসে, আমার সত্তার মতন।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
প্রতিদিন তুমি পৃথিবীর আলো নিয়ে খেলা করো
প্রতিদিন তুমি পৃথিবীর আলো নিয়ে খেলা করো,
ফুরফুরে অতিথির মত ফুলের বিস্ময়ে, জলে, ধরা দাও।
পুঞ্জীভূত ফলের মত যে সফেদ মাথা, আমি দু'হাতের ভেতর
এতটা নিবিড় আঁকড়ে ধরি, তার চেয়ে অনেক অঢেল তুমি।

ভালবাসি বলেই তুমি অনন্য, প্রেম ।
তোমাকে হলদে ফুলের মালায় দেখতে চাই।
কে যেন তোমার নাম আকাশের নক্ষত্রে লিখে রাখে ধোঁয়াময় আখরে।
তোমার অস্তিত্বের আগে কেমন ছিলে তুমি, সে কথা স্মরণ করতে চাই!

হঠাত্‍, বাতাস তুমুল আছাড় খায় আমার দেয়ালে,
আকাশ একটি ছায়াময় জাল হয়ে লুফে নেয় মাছ।
কোনো না কোনো সময় সব -সব দমকা ঝড় আলগা হয়ে যায়।
বৃষ্টি মেয়েটিকে বিবসনা করে।

পলাতকা পাখি উড়ে যায়।
বাতাস। বাতাস ।
আমি শুধু মানুষের ক্ষমতার সঙ্গে লড়াই ছাড়া কিছুই পারিনা।
আর ঝড়, ঘুরে ঘুরে কালো পাতা উড়িয়ে নিয়ে আসে,
গতরাতে আকাশে নোঙর ফেলা ডিঙির বাঁধন ছিঁড়ে যায়।

তারপরও তুমি আছ। যাওনি কোথাও।
আমার শেষ কান্নার উত্তর দেবে বলেই যেন, তুমি থেকে যাও,
আমাকে আঁকড়ে ধরো, সে কি ভয়?
তারপরও, কীসের যেন ছায়া সরে যায় তোমার চোখের তারায়।

এখনো, ছোট পাখিটি আমার, তুমি মধুমালতীর স্তবক তুলে আনো,
আমায় দেবে বলে, তোমার স্তনে সেই গন্ধ লেগে থাকে।
যখন এক বিষাদময় বাতাস হনন করে প্রজাপতি,
তখনও, আমি তোমায় ভালবাসি, আমার আনন্দ
তোমার মুখের টুকটুকে লাল ফলে দাঁত বসিয়ে দেয়

আমাকে নিয়ে এত কষ্ট তোমার,
আমার এই নিঃসঙ্গ, আদিম সত্তাকে মেনে নিতে -যাকে সবাই ছেড়ে যেতে চায়।
কতবার ভোরের শুকতারা আমাদের চোখে চুমু দেয়,
কতবার আমাদের মাথার ওপর ধূসর আভা ঘুরে যায় পাখার মত।

আমার শব্দরাজি তোমার ওপর বৃষ্টি হয়ে পড়ে, তোমাকে আদর জানায়।
বহুদিন তোমার ঝলসানো শুক্তি-শরীর ভালবাসি আমি।
তোমার করতলে সমস্ত পৃথিবী, কল্পনা করি।
পাহাড় থেকে তোমার জন্য গুচ্ছ গুচ্ছ হেসে-ওঠা ফুল আনব এখন,
নীলাভ ব্লু বেল, বাদামী ঝাড়, গ্রামীণ ঝাঁকায় ভরা চুমু।
একটি রক্তিম চেরী গাছকে বসন্ত যা-কিছু করে, তোমাকে আমি তাই করতে চাই
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

ভরাট নারী, ফলন্ত শরীর, গনগনে চাঁদ
ভরাট নারী, ফলন্ত শরীর, গনগনে চাঁদ,
শ্যাওলার গাঢ় ঘ্রাণ, আলো-কাদার ছদ্ম অবয়ব
তোমার প্রাসাদে কোন সে স্বচ্ছ উদ্ভাস আমাকে দেখাও?
কোন সে আদিম রাত, যাকে ছুঁতে পারে কোনো পুরুষ, সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে?

আহা, ভালবাসা, সে তো জল আর তারায় তুমুল সাঁতার,
বাতাসে আকণ্ঠ ডুব, ময়দার সফেদ গুঁড়োয় অবিন্যস্ত ঝড়;
ভালবাসা, সে তো বিদ্যুতের হঠাৎ-সংঘাত,
এক মধুময়্তায় ভেসে-যাওয়া যুগল শরীর

তোমার পেলব অসীমতা আমি চুমুতে বেষ্টন করি
চিনে নিই তোমার দূর সীমানা, নদীপথ, গ্রাম;
আর তোমার যৌনাঙ্গের আঁচ -পাল্টে-দেওয়া, সরস, মধুর,

আমার রক্তের সরু গলি ভেদ করে
রাতের দেবপুষ্পেরমত, চকিতে নিজেকে উজাড় করে মুহূর্তের নিথরতায়:
তারপর এক ঝলক বিন্দুর মত, হয়ে যায় ছায়াঘেরা, শূন্যময়।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

এক ঋক্ষের ধৈর্য নিয়ে দিয়েগো রিভেরা
এক ঋক্ষের ধৈর্য নিয়ে দিয়েগো রিভেরা
তাঁর তুলির ডগায় খুঁজে নেন বনের পান্না-গলানো রঙ,
হৃৎ-গোলাপের সিঁদুর-উদ্ভাসন,
তোমার ছবিতে তিনি পৃথিবীর তাবৎ আলো ভরে দেন ।

তোমার অভিজাত নাক
তোমার চোখের চকিত বিদ্যুত
তোমার চাঁদের কলাকে ঈর্ষা-জাগানো নখ,
আর তোমার গ্রীষ্মময় ত্বকে তরমুজের মত সুশীতল, সুস্বাদু মুখ।

তোমার আগুন, ভালবাসা, আরাউকো-উত্তরাধিকার গেঁথে
তিনি তোমাকে দুটি মাথা দেন, আগ্নেয়গিরির সোনালী লাভার মত,
আর উজ্জ্বল কাদাময় তোমার অবয়বের ওপর

তিনি তোমায় বিস্ময়কর আগুনের শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দেন:
ওখানেই আমার চোখ গোপনে অঢেল ছুটি নেয়,
তোমার ওই প্রাসাদের মত সুডৌল চুলের রহস্যময়তায়।


আমি দুঃখি, আমরা দুঃখময়, প্রিয়তমা
আমি দুঃখি, আমরা দুঃখময়, প্রিয়তমা,
পরস্পরকে ছাড়া, ভালবাসা ছাড়া কিছুই তো চাইনি
অথচ এত গভীর শোকের পরেও ভাগ্যলিখন
আমাদের ব্যথা দেয়, আবার... আবার ।

তোমার তুমিকে, আমার আমিকে চেয়ে, নিবিড় একটি চুম্বনে
সেই তুমিকে, একটি গোপন রুটির ভেতর সেই আমিকে পেয়ে
আমরা অসম্ভব এক সরল জীবন রচনা করেছিলাম
যতক্ষণ না জানালা দিয়ে ঘৃণার ঝাপটা এসে পড়ে।

যারা এই ভালবাসা দেখে ক্রোধে অন্ধ হয়,
সমস্ত ভালোবাসাকে তারা কী আশ্চর্য ঘৃণা করে
একটি শূন্যময় ঘরে ভাঙাচোরা চেয়ারের মত

পাংশু, অর্থহীন, যতক্ষণ না তারা ভস্মীভূত হয়
যতক্ষণ না তাদের অশুভ অদ্ভুত

সূর্যাস্তের আলো পুরো শুষে নেয় ।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
তোমার রাত্রি, বাতাস অথবা সূর্যোদয়
তোমার রাত্রি, বাতাস অথবা সূর্যোদয় আলিঙ্গন করিনি আমি,
শুধু ধরেছি তোমার মৃত্তিকা, থোকাথোকা ফলের পরম অস্তিত্ব,
জলের মিষ্টতা পান করে টুসটুসে হওয়া বৃতিমান আপেল,
তোমার সুরভিত গ্রামের কাদা আর বৃক্ষের আঠালো রজন।

তোমার চোখ যেখানে থেকে হেঁটে আসে, সেই আদি গ্রাম
কুইন্চামালি থেকে ফ্রন্তেরায়, যেখানে তোমার যুগল পা আমার হৃদয় নাড়ায়
তুমি সেই পরিচিত কালো কাদা আমার:
তোমার কোমর দু'হাতে ধরে ফের অনুভব করি ক্ষেতময় যবের ফসল।

আরাউকা থেকে জেগে ওঠা নারী, তুমি জানো কি
তোমাকে ভালবাসার আগে কী ভাবে তোমার আদর বিস্মৃত থাকি
অথচ না জেনেই আমার হৃদয় হেঁটে যায়, তোমার মুখ মনে করে

শুধু হেঁটে যায়, একজন বিক্ষত মানুষের মত,
যতক্ষণ না উপলব্ধি করি ভালবাসা,
যতক্ষণ না সেই চুমু আর আগ্নেয়গিরি-সীমানায় পৌঁছই আমি।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
রাত এলে, ভালবাসা, তোমার-আমার হৃদয়
রাত এলে, ভালবাসা, ঘুমের ভেতর তোমার-আমার হৃদয়
একই সুতোয় গেঁথে আঁধার পরাস্ত করুক, গভীর বনান্তে
দু'টি সুমেদুর দামামার মত
ভিজে পাতার দেয়ালের পুরু গায়ে, অবিরাম স্পন্দনে।

রাতের ভ্রমণপথে ঘুমের লকলকে শিখা
পৃথিবীর আঙুরলতা ছিন্ন করে দেয়,
একটি একরোখা রেলগাড়ির মত নির্ভুল ঘড়ির কাঁটায়
ছায়া আর পাথর ছিটিয়ে যেতে যেতে।

তাই ভালবাসা, আমাকে অন্য কোনো বিশুদ্ধ বেগের সংগে
তোমার বুকের ধ্রুব ছন্দময়তায়, বেঁধে রাখো,
যে ভঙ্গিমায় জল কাটে রাজহাঁসের পাখার ঝাপট।

তারপর, একটিমাত্র চাবি দিয়ে আমাদের ঘুম
রাতের সমস্ত তারা-ঝলসানো প্রশ্নের উত্তর দিক,
ছায়া-বন্ধ একটি দরজা খুলে।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

মাতিলদা: একটি লতা অথবা বৃক্ষের নাম

মাতিলদা: একটি লতা অথবা বৃক্ষের নাম, বয়সি পাথর কিম্বা সুরভিত মদ
যা কিছু শুরু হয় মাটির গহন থেকে, যা কিছু থাকে:
এমন একটি শব্দ যেখান থেকে সূর্যের অবাক উন্মীলন
যার ঝলসানো আঁচে বিচ্ছুরিত হয় লেবুর আভা ।

যে নামের ভেতর দিয়ে পুরোনো জাহাজ ভেসে যায়
আগুন-নীল ঢেউ যাকে ঘেরে
যে নামের বর্ণমালা একটি নদীর মতন
আমার হৃদয়ের শুষ্কতায়, প্রপাত ঝরায় ।

আঙুরলতায় জড়ানো যে নাম ঝলমল করে,
গোপন শুঁড়িপথের মত বেবাক খুলে যায়
পৃথিবীর অসীম সুবাসের দিকে!

তোমার তপ্ত মুখ যদি আমায় গ্রাস করতে চায়, তোমার রাত-জাগা চোখ
যদি খুঁজে নিতে চায়, তবে নিক। তবু তোমার নামের গহনে নাবিকের মত
ভাসতে দাও আমায়, ওই নামের পালকে আমি ঘুমুতে চাই।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

পৃথিবী চিনেছে তোমাকে অনেক বছর ধরে
পৃথিবী চিনেছে তোমাকে অনেক বছর ধরে:
অখণ্ড রুটি অথবা এক টুকরো কাঠের মত
কঠিণ তুমি, পদার্থময়,
সোনাঝুরি গাছের ভারাক্রান্ত সোনালী ভেষজতা।

জানালার মত তোমার দু চোখ খুলে গেলে, যা কিছু আছে,
তার ওপর আলো পড়ে - তবু তোমার অস্তিত্বের পরিচয় এই শুধু নয়,
তুমি একতাল মাটির মত, কাদাময়, কঠিণ প্রতিমা
তুমি চিল্লানের আশ্চর্য ভাঁটার আগুন-ঝলসানো।

যা কিছু আছে, বাতাস, জলকণা অথবা হিম, গলে, উবে যায়।
যা কিছু আছে, আকারহীন, সময়ের স্পর্শে গুঁড়ো হয়,
ঝুরঝুর ভেঙে পড়ে, গত হয়, মৃত্যুর আগে।

কিন্তু আমার সঙ্গে তুমি অক্ষত পাথরের মত
কবরে পতিত হবে: কারণ আমাদের প্রেম
অজর, মৃত্যুহীন, মাটির মত, পৃথিবীর মত।
-অনুবাদ: আনন্দময়ী মজুমদার
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
ভালবাসা, একটি চুমুতে পৌঁছনোর কী দীর্ঘ পথ

ভালবাসা, একটি চুমুতে পৌঁছনোর কী দীর্ঘ পথ!
তোমাকে খুঁজে পাওয়ার আগে চলমান নিঃসঙ্গতা।
রেলগাড়িটি এখন, আমাকে ছাড়াই গড়িয়ে যায় বৃষ্টিতে,
তালতালে এখনো বসন্তের সূর্য ওঠেনি।

অথচ তুমি, আমি, পোশাক থেকে শেকড় পর্যন্ত
আশরীর, আমূল আসঙ্গময়,
আমাদের বেদনার জলে, হেমন্তের ধূসরতায়,
যতক্ষণ না আমরা একাকী থেকেও, নিবিড় হতে পারি।

বোরোয়ার দুর্বার মোহনা থেকে
সারাটা পাথর বয়ে আনার নির্মেদ শ্রম,
এত দেশ, রেলপথ আমাদের বিভাজিত করার পর,

তাবৎ বিভ্রান্তি, পুরুষ, নারী, আর যে মাটিতে
দেবপুষ্প ফোটে, তাদের পেরিয়ে,
তবু পাবো বলে, শুধু ভালোবাসতে হয় নিজেদের।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
মনে পড়ে সেই দুরন্ত নদ
মনে পড়ে সেই দুরন্ত নদ
সুগন্ধে কেঁপে ওঠা নরম মাটি,
একটি জল-ঝরা পাখিকে ঢেকে রাখা
শ্লথতার কাপড়, শীতের পালক

মনে পড়ে সেই মাটির উপহার:
মায়াবী ঝাঁঝালো আঘ্রাণ, সোনালী কাদা,
জট পড়া জংলী আগাছা, আশ্চর্য শেকড়,
ছুরির মতন কাঁটা, জাদুময়

মনে পড়ে তোমার হাতে পুঞ্জীভূত ফুলের স্তবক,
ছায়াময়, শান্ত, জলজ,
ফেনা ঢাকা পাথরের মত।

সেই মুহূর্ত, খুবই নির্বিশেষ অথবা দারুণ অভিনব।
কেউ অপেক্ষা করে নেই বলেই আমরা গিয়েছি সেখানে;
অথচ, দেখেছি সব কিছু সেখানেই অপেক্ষায় আছে।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
যদি মরে যাই, অমিত দৃপ্ততায় জ্বলে যেও তুমি
যদি মরে যাই, অমিত দৃপ্ততায় জ্বলে যেও তুমি
রক্তশূন্য হিমে আগুন ধরিয়ে দাও
অজর চোখদুটো দক্ষিণ থেকে দক্ষিণে
সূর্য থেকে সূর্যে মেলে রাখো, যতক্ষণ না তোমার কণ্ঠে বেজে ওঠে তামাম গীটার।

তোমার হাসি, পায়ের আওয়াজ যেন না থমকায়,
আমার আনন্দের উত্তরাধিকার বেঁচে থাক তোমার ভেতর।
আমার বুকে এসে খুঁজো না আমায়: আমি নেই,
আমার অবর্তমানের ঘরে, তুমি বাস করে যেও।

অবর্তমান এমন এক বিশাল ঠিকানা
যে বাতাসের শরীরেও ঘর সাজানো যায়
দেয়াল ভেদ করে যাওয়া যায় অন্য ঘরে।

অবর্তমান এমন এক স্বচ্ছ বাড়ি,
আমি মরে গিয়েও সেখানে দেখব তোমায়।
তুমি যদি কষ্ট পাও, সে-ই আমার দ্বিতীয় মৃত্যু হবে।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
হয়ত সেই ধারালো মুখের পুরুষ
হয়ত সেই ধারালো মুখের পুরুষকে তোমার মনে আছে
যে একটি ছুরির ফলার মত আঁধার থেকে বেরিয়ে আসে,
আর আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চিনে নেয়
কী আছে ওখানে: ধোঁয়া দেখে বুঝে নেয় আগুনের আঁচ।

সেই রক্তশূন্য নারী, যার চুল কালো
গহন জলের ভেতর থেকে উঠে আসে মাছের মতন,
তারপর দুজন মিলে দারুণ প্রহরায়
ভালবাসার বিরুদ্ধে, আশ্চর্য এক ফাঁদ তৈরী করে।

তারা দুজন মিলে পর্বত আর ফুলের বাগান সাফ করে দেয়
নদীর খাদে নেমে, উঁচু দেয়াল বেয়ে
পাহাড়ের ওপর প্রতিরোধের কামান দাগায়

তারপর, ভালবাসা নিজেকে চিনতে শেখে।
আর তারপর, তোমার নামের দিকে চোখ তুলেই দেখি
তোমার হৃদয় আমাকে আমার পথ বলে দিয়েছে, আগেই।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
সমুদ্র যেখানে দুর্বার পাথরে আছাড় খায়
সমুদ্র যেখানে দুর্বার পাথরে আছাড় খায়
স্বচ্ছ আলো পাপড়ি মেলে হয়ে যায় গোলাপের স্তব
যেখানে সাগরের বলয় ছোট হতে হতে কয়েকটি ফুলের স্তবক,
একটি গভীর নীল লবণের পড়ন্ত দানার মতন শেষ হয়

যেখানে তুমি, ফেনার সাদায় ফুটে ওঠা চাঁপা
চৌম্বকীয়,ভঙ্গুর,
মৃত্যুর রহস্যে জন্মানো, হারিয়ে যাওয়া,
শূন্যময়, টুকরো লবণ, সমুদ্র-ঝলসানো ঢেউ।

তুমি-আমি, এই নীরবতাকে তবু আমূল পাল্টাই
যতক্ষণ সাগর তার জলজ ভাস্কর্য, দুরন্ত বেগ,
সফেদ চুড়ো, নিজের হাতে তছনছ করে।

কারণ ঢেউ-ওঠা অফুরান জল, ঝুরঝুরে বালি,
এইসব অদৃশ্য তাঁত দিয়েই তো
আমরা আবিস্তার ভালবাসার পোশাক বুনে যাই।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

তোমার আঙুল আমার চোখের ওপরে
তোমার আঙুল আমার চোখের ওপর দিয়ে
উড়ে যায় দিনের দিকে। আলো এসে থরেথরে
গোলাপের পাপড়ি খুলে দেয়। ফিরোজা মৌচাকের মত
স্পন্দিত হয় একাকার হওয়া বালি আর আকাশ।

তোমার আঙুল যে বর্ণমালা ছোঁয়, তা বেজে ওঠে,
ঘণ্টার মত, সেই একই আঙুল ছুঁয়ে যায় পেয়ালা,
সোনালী তেল ভরা পিপে, পাপড়ি, ঝর্ণা, প্রধানত, প্রেম।
তোমার হাত প্রেমের পানপাত্র পাহারা দেয়।

দুপুর...আশ্চর্য নিথরতায় জেগে থাকে। রাত পিছলে চলে যায়
একটি ঘুমন্ত পুরুষের চোখের ওপর দিয়ে, একটি অপরূপ ছোট আধারের মত।
মধুমালতী তার আদিম, বিষণ্ণ ঝাঁঝ বাতাসে ছড়ায়।

তখনই তোমার হাত পাখির মত কেঁপে উড়ে আসে আবার,
যে পালক হারিয়ে গেছে আমার কল্পনায়, সেই ডানা ছড়িয়ে দেয়
আমার আঁধার-গ্রাস-করা চোখের ওপর।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

সমুদ্র-কন্যা তুমি, পাতার সুবাস
সমুদ্র-কন্যা তুমি, পাতার সুবাস,
তুখোড় সাঁতারু তুমি, পরিশুদ্ধ জলের শরীর
রাঁধুনি তুমি, মাটির ঝুরঝুরে চকিত রক্ত শিরায়,
তাবত ছোঁয়ায় তোমার, কী আশ্চর্য লেগে আছে পুঞ্জীভূত, মাটিময়, ফুল।

তোমার চোখ সমুদ্রে ধাবিত হলে তুমুল ঢেউ ওঠে
তোমার হাত মাটিতে ডুবলে বীজ পুষ্ট হয়
তুমি চেনো মাটি আর জলের গভীর নির্যাস
তোমার মধ্যে মিশে একাকার হয় কাদাময় জীবনের মুখ।

জল-পরী, গঙ্গাফড়িং, দেহটিকে নীলকান্তমণির মত ছিন্ন করে দাও,
তারা পুনর্জন্ম পায় ঠিক, তোমার রান্নাঘরে।
এভাবেই তুমি যা কিছু জীবন্ত তার আধার হয়ে থাকো।

এভাবেই তুমি ঘুমোও আমার বাহুর বৃত্তময় বৃতির ভেতর
যখন সমস্ত ছায়াময় অন্ধকার সরে যায়:
যত ভেষজ কালচে উদ্ভিদ, শ্যাওলা আর স্বপ্নালু ফেনা।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
আলো নয়, পেয়েছি আগুন
আলো নয়, পেয়েছি আগুন । রুটি নয়, তেতো চাঁদ একফালি।
মল্লিকার গহন গন্ধে লুকোনো কান্না ঘিরেছে আমায়।
এক ভয়ার্ত ভালবাসার আকাল থেকে, দুটি সফেদ হাত
আমার চোখে শান্তিময় পালক বোলায়, আমার রন্ধ্রে পূরে দেয় সূর্যের ভাপ।

আহা, ভালবাসা, এত চকিতে তুমি আমার নগ্ন জখম জুড়িয়ে দাও
ছিন্ন শরীরে এনে দাও স্নিগ্ধ নিরাময়
আমাকে ঘিরে থাকা হিংস্র নখ হটিয়ে
দুজন হয়ে যাই এক অখন্ড জীবন

এমন হয়েছে, হয়, চিরকাল হবে, মাতিল্দে,
মধুর, বন্য ভালবাসা! যতদিন না সময়ের আঙুল
ধরে রাখে শেষ ফুল, বিদায় জানায়

সেই আলোহীনতায় তুমি-আমি থাকব না কেউ,
তবু, পৃথিবীর ছায়ার কিনারে, আঁধারের ফাঁকে
জেগে থাকবে এক যুগল ভালবাসা।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
তোমাকে ফিরে দেখতে চাই অবারিত ডালে
তোমাকে ফিরে দেখতে চাই অবারিত ডালে
একটু একটু করে হয়ে-ওঠা তোমার ফলের আদল,
তপ্ত শেকড় থেকে কত সহজে উঠে আসো তুমি,
শব্দে তোমার, অনুভব করি বনানীর গহন নির্যাস।

তবু এখানে তুমি প্রথম এক মায়াবী মুকুল
তারপর, এক মুহূর্তের নিথরতায়, জমে-যাওয়া চুম্বন,
যতক্ষণ না সূর্য আর পৃথিবী, রক্ত আর আকাশের আঁচ
তোমার মধ্যে সুখের প্রতিশ্রুতি, অমৃতের কলস ভরে দেয়।

ডালের কারুকাজে আমি চিনে নেবো তোমার কেশদাম,
পত্রালী আয়নায় ক্রমশ ফুটে ওঠা তোমার রূপরেখা
আমার তৃষ্ণার দিকে এগিয়ে আসা তোমার পাপড়ির সৌরভ।

আমার মুখ ভরে উঠবে তোমার আস্বাদে
মাটি থেকে উন্মীল সেই চুম্বন, যে চুম্বনে লেগে আছে তোমার,
আর ভালবাসার সুডৌল ফলের রক্তিম ওম।

- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
তোমার চোখে যদি চাঁদের রঙ থাকত না লেগে
তোমার চোখে যদি চাঁদের রং থাকত না লেগে,
কাদা-মাখা দিন, শ্রমের ঝলক, লালচে আগুন,
এই সব আঁচ, আভা না থাকত যদি, যদি এতটা জড়ানো থেকেও
না হতে তুমি বাতাসের মতো ফুরফুরে, শিল্পময়,

যদি না হতে হলুদাভ বাদামী পাথর, হরিৎ লহমার মতন
যে লহমায় হেমন্ত আঙুরের লতা বেয়ে ওঠে
না হতে যদি সুগন্ধী চাঁদের আঙুলে ময়ান দেওয়া সেই অখন্ড রুটি
তোমার সাদা সুরভিত গুঁড়ো না ছড়াতে আকাশের গায়

তাহলে হয়ত, প্রিয়তমা, তোমাকে ভালবাসতাম না
ততটা, যতটা বাসা যায় । কিন্তু যে মুহূর্তে তোমাকে ছুঁয়ে থাকি, ধরে থাকি তোমায়,
সে মুহূর্তে যা কিছু আছে, সময়ের করতলে, তাই যেন পাই:

বালুকণা, মুহূর্ত-স্পন্দন, বৃষ্টি-ঝরানো বৃক্ষরাজি,
সব কিছু জীবন্ত, আমিও জীবিত তাই: এসব অনুভব করি, নিষ্কম্প থেকে,
তোমার জীবন আমাকে জীবন শেখায়।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

তুমি অভাব থেকে এসেছ
তুমি অভাব থেকে এসেছ । দক্ষিণের গ্রাম,
এবড়োখেবড়ো, পাথুরে নিসর্গ, ঠাণ্ডা, ভূমিকম্পময়,
যেখানে মাটির বিগ্রহগুলি হুড়মুড় করে ধসে পড়লেও
আমরা জীবনের কাদা-মাখা পাঠ নিই।


একটি ছোট মাটির ঘোড়া, কালো কাদার আদর তুমি।
ভালবাসা, তুমি আমার এঁটেল পপী ফুল, সাঁঝবেলায়
উড়ে যাওয়া পায়রা। শত দারিদ্র্যেও
মৃত্পাত্রে ধরে রাখা শৈশবের সুখময় রুপালি পয়সা।
ছেলেবেলার অভাবী স্মৃতি তোমার হৃদয়ে
তোমার পায়ে যখন ফুটত কর্কশ পাথর,
তোমার জিভ পেত না রুটি অথবা আনন্দের স্বাদ।


সেই দক্ষিণের মানুষ তুমি, যেখান থেকে আমারও সত্তা বেরিয়ে এসেছে।তোমার-আমার মা, এখন উঁচু আকাশে কোথাও, রোদ্দুরে কাপড় শুকোতে দিচ্ছেন একসঙ্গে
এইজন্যে তো তোমাকে বেছে নিয়েছি, প্রিয়তমা!
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
ভালবাসা তার নিজস্ব দ্বীপ পার হয়
ভালবাসা তার নিজস্ব দ্বীপ পার হয়
এক দুঃখ থেকে অন্য বেদনায়, চোখের জলে সেঁচ দেওয়া
শেকড় চালায়। আর কেউ, কেউই,
হৃদয়ের শব্দহীন, সর্বগ্রাসী পদক্ষেপ থেকে রেহাই পায় না।

তুমি-আমি একটি বিস্তীর্ণ উপত্যকা, একটি ভিন গ্রহের খোঁজ করেছি
যেখানে লবনের তীব্রতা তোমার চুল স্পর্শ করবে না,
যেখানে আমার হাত বেদনা বাড়াবে না।
যেখানে এক খণ্ড রুটি বেঁচে থাকবে অমলিন।

এমন একটি খোলামেলা, জলময়, সবুজ গ্রহ,
যেখানে শুধু শক্ত সমতল, পাথর আর জনহীনতা:
পাখির মতন, নিজেদের হাতে একটি মজবুত বাসা তৈরী করতে চেয়েছি আমরা

যেখানে বেদনা নেই, আঘাত নেই, প্ররোচনা নেই।
কিন্তু ভালবাসা তো তেমন নয়: ভালবাসা একটি উন্মাদ নগরী
যেখানে বারান্দা থেকে, উঠোন থেকে, উপছে পড়ছে মানুষ।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

মাতিলদা, তুমি কোথায়?
মাতিলদা, তুমি কোথায়? এইখানে, আমার
হৃত্পিন্ডের ওপর, বুকের দুই পাঁজরের মাঝখানে,
চকিত তোমার চলে যাওয়ার সাথে সাথে,
খেয়াল করি শোকের ঘাঁই মেরে ওঠা।

সে মুহূর্তে তোমার প্রাণের আশ্চর্য আলো চাই,
চারিদিকে তাকিয়ে চাই আশা, বুভুক্ষুর মত পান করব বলে।
তোমাকে ছাড়া পোড়ো বাড়ির যে শূন্যতা, তার দিকে তাকিয়ে
দেখি দুঃখময় জানালা ছাড়া আর কিছু নেই।

শুধুমাত্র কথা বলবে না বলে বাকরুদ্ধ সিলিঙটা
পাতা-হীন প্রাচীন বৃষ্টির শব্দ শোনে, শোনে ঝরা পালকের উড়ে যাওয়া
রাতের কাছে আটক এটা-সেটার গুনগুন।

তাই, একটি প্রাণহীন, শূন্যময় বাড়ির মতন তোমার অপেক্ষায় থাকি আমি।
যতক্ষণ না তুমি আসো, যতক্ষণ না আমার ভেতর বাস করো তুমি।
ততক্ষণ, আমার জানালাগুলি বেদনায় নীল হয়ে থাকে।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
তোমাকে ভালবাসার আগে
তোমাকে ভালবাসার আগে নিজের বলে কিছু ছিল না আমার।
রাস্তা আর সামগ্রীর ভেতর টালমাটাল হেঁটে
সব কিছু নামহীন, অপ্রয়োজনীয় মনে হত,
পৃথিবীটা বায়বীয় ছিল, কার যেন অপেক্ষায় ।

কিছু ছাইময় ঘর ছিল, কোনো কোনো সুড়ঙ্গে,
ছিল চাঁদের বসবাস। কিছু ভাগাড় ছিল, আমাকে চায়নি যারা,
কিছু হানা-দেওয়া প্রশ্ন ছিল, বালির ভেতর;
সব কিছু খাঁ খাঁ, মৃত, বোবা, ভাঙাচোরা ক্ষয়িষ্ণু, নির্জীব।

পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে সবই আশ্চর্য অচেনা,
অনাত্মিক মনে হয়েছে, যেন এ সমস্ত অন্য কারুর -
হয়ত বা, বেওয়ারিশ সম্পত্তি সব

যতক্ষণ না তোমার সৌন্দর্য্য, তোমার অভাব, এসব এসে
হেমন্তর প্রকৃতিকে বাঙ্ময়, ভরন্ত করে তোলে
যতক্ষণ না তোমাকে ভালবাসি আমি।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
বলেছিলুম, সঙ্গে এসো
বলেছিলুম, সঙ্গে এসো। কেউ জানত না ঠিক কোথায়,
কেমন করে, আমার বেদনা ধুকপুক করে উঠছিল তখন
আমার জন্য কোনো সুমধুর কার্নেশন বা নদীর বুক চিরে ওঠা দেহাতী সঙ্গীত
ছিল না; শুধু ছিল একটি অনাবৃত ক্ষত, ভালবাসার উপহার।

বলেছিলাম, সঙ্গে এসো, যেন আমি বাঁচব না আর,
কিন্তু কেউ আমার মুখের ভেতর নিঃশব্দ জ্যোৎস্নার রক্তপাত,
দেখেনি তখন। ভালবাসা, তারার আলোয় যে কাঁটা থাকে,
সে যন্ত্রণা এখন হয়ত আমরা ভুলতে পারি!

তাই তোমার গলায় ফের, `সঙ্গে এসো' শুনে আমার মনে হয়
তোমার তাবৎ জমে-থাকা শোক, ভালবাসা, উষ্ণ প্রস্রবন,
ফুঁসে ওঠা মদের পুঞ্জীভূত ক্রোধ, সব যেন বেরিয়ে পড়েছে

আর আমার মুখের ভেতর তখন আবার আমি ফিরে পাই
সেই আগুন, সেই রক্তপাতিত ফুল,
সেই কঠিণ পাথর, দগদগে স্বাদ ।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
সমুদ্রের নীলাভ নুন
সমুদ্রের নীলাভ নুন, বিপুল ফেনীল ঢেউ
আর সূর্যকিরণ, যখন তোমার ওপর ঝাপটে পড়ে
ইসলানেগ্রায়, তখন আমি চেয়ে দেখি কর্মব্যস্ত বোলতাটিকে,
স্বকীয় পৃথিবীর মধুর কাছে ওর আত্মসমর্পণ।

দেখি ওর নিয়ত আসা-যাওয়া; নিয়ন্ত্রিত, সোনালী উড়ান।
যেন কোনো অদৃশ্য, সরল তারে ও পিছলে যায়,
দৃপ্ত নাচে, নিপুণ ভঙ্গিমায়। দেখি ওর পিয়াসী কোমর,
একটি একটি করে ওর সূক্ষ্ম সুঁচ নিঃশেষিত হওয়া।

একটি অনচ্ছ কমলা রংধনুর ভেতর
এক চিলতে বিমানের মত, ঘাসের ওপর শিকার করে ও।
দেখি ওর গজালের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত, লহমায় হারিয়ে যাওয়া।

আর এর মধ্যে তুমি সমুদ্র-স্নান শেষে নগ্ন উঠে আসো,
ফিরে যাও লবণাক্ত, সূর্যময় পৃথিবীতে,
যেন অনুনাদী ভাস্কর্য এক, যেন বালিতে ঝলসানো এক শাণিত তরবারি।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
আমার পেছনে হিংস্রতার ছায়ায়
আমার পেছনে হিংস্রতার ছায়ায় তুমি যেন অভ্যস্ত হও,
তোমার হাত দুটো ধুয়ে নাও ফের
তোমার বাহুতে আসুক ভোরের নদীর সতেজ স্বচ্ছতা
লবণের কেলাসের মত সফেদ, দ্রাব্য যে তুমি, প্রিয়তমা।

ঈর্ষাকে ক্লান্ত, পরাস্ত করে আমার তাবৎ গান,
হিংসার নাবিকেরা একে একে ঢলে পড়ে নিদারুণ বেদনায়।
আমি যখন উচ্চারণ করি ভালবাসার নাম, আকাশ জুড়ে পারাবত ওড়ে,
প্রতিটি স্তবক আমার, জাগায় বসন্তের কলি।


আর তুমি উন্মীল হও আমার হৃদয়ে
স্বর্গীয় পাতার মত তোমাকে দেখি,
কেমন করে তুমি শুয়ে থাকো মৃত্তিকায়,

কেমন করে সূর্যের পাপড়ি বদলে দেয় তোমার অবয়ব,
অনুভব করি তোমার শান্ত পদক্ষেপ আকাশে আকাশে
মাতিল্দে, আমার সূর্য-মুকুট, স্বাগত তোমায়!

Tuesday, February 11, 2020
Topic(s) of this poem: love and life
COMMENTS OF THE POEM

Dreams

BEST POEMS
BEST POETS
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success