তোমরা যারা, আমার- "আমি ভালো নেই" কবিতাটা পড়েছো বা শুনেছো; তারা জানো, আমি সেখানে লিখেছিলাম-
"জানো মা
অভ্যাসের একটা ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা আছে;
অমৃতও ধীরে ধীরে, কেমন যেন নোনতা হয়ে যায়!
তোমার ভালোবাসাও কেমন যেন, প্রতিদিনকার অভ্যাস হয়ে গেছিলো।
প্রতিদিন মধু খেলে, মধুকে আর মধু মনে হয় না।"
অভ্যাস থেকে অবসাদ আসে। হারানোর যন্ত্রণার চেয়ে, অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হলো- অভ্যাসের গর্ভে জাত অবসাদের যন্ত্রণা। হারানোর যন্ত্রণা অচিরেই কাটিয়ে উঠো তুমি। কিন্তু নিত্য নৈমিত্তিক অভ্যাসের অবসাদকে কিভাবে কাটিয়ে উঠবে তুমি?
মানুষ ক্রমশঃ আরও বেশি বেশি অবসাদের (DEPRESSION)শিকার হচ্ছে। কখনো কখনো মানুষ- সেই অবসাদ কাটিয়ে উঠতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধু খোঁজে। বা বিষের মত ভয়ঙ্কর সম্পর্ককেও সে আঁকড়ে ধরে।ঝুঁকি পূর্ণ সম্পর্ক, ন্যায় কি অন্যায়- তা বিচার করার কোন ইচ্ছে নেই আমার। কারন- তোমরা জানো, ন্যায়-অন্যায়ের বিচারে খুব বেশি আগ্রহী নই আমি। (কেন? তার উত্তর "সত্যের" উপর লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধে লিখেছি আমি।)
আমার কাছে ঝুঁকি পূর্ণ সম্পর্ক এই কারনেই ভয়ঙ্কর- যে তুমি চড়া রোদের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে, দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা, কাঠের উনুনে গিয়ে পড়বে। তুমি নিজের জীবনকে জ্বালাবে, নিজের সংসারকে জ্বালাবে, আর অন্যের সংসারকেও জ্বালাবে। এর পরিণতি খুব ভয়ঙ্কর।
প্রেম স্বপ্নেই সুন্দর। প্রেমকে স্বপ্নে রাখাই ভালো। তাতে প্রেমেরও সুগন্ধ থাকে। আর তাতে তোমার নিজের জীবন আর সংসার- তারাও সুন্দর থাকে। প্রেমকে যতদিন তুমি স্বপ্নে রাখবে- প্রেম ততদিন সুন্দর আর পবিত্র। প্রেমকে যেই না তুমি, মানুষের দেহ দিয়ে ছুঁয়ে দেবে; সেদিনই প্রেম ঈশ্বর থেকে রাক্ষস হয়ে যাবে। প্রেমকে তাই দেহ থেকে দূরে রাখাই ভালো।
যা বলছিলাম- নিত্য নৈমিত্তিক অভ্যাসের অবসাদকে কিভাবে কাটিয়ে উঠবে তুমি? তুমি যদি প্রতিদিন বিধান সরণী ধরে, হেদুয়া থেকে শ্যামবাজার যাও; তাহলে তোমার ভ্রমণ কদিনেই অভ্যাসের অবসাদ হয়ে যাবে। কিন্তু তুমি যদি- কখনো সি আর এভিনিউ, কখনো সায়েন্স কলেজের রাস্তা ঘুরে শ্যাম বাজার যাও; তাহলে ভ্রমণের প্রতি তোমার আগ্রহ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। জীবনে নতুন নতুন জিনিস শিখতে থাকা, করতে থাকাই হলো- দৈনন্দিন জীবনের অবসাদ থেকে বাঁচার উপায়।
কোন শাস্ত্রে লেখা আছে যে- তোমার সুন্দর একটা খাট আছে বলে, তোমাকে কেবল খাটেই শুতে হবে? নিছক "নতুনের আনন্দের" জন্য তুমি রান্না ঘর, বা বাথরুমের মেঝেতে শুতে পারো না? আমি যখন ছোট ছিলাম- গরমকালে আমি, আম গাছের ডালে নিজেকে গামছা দিয়ে বেঁধে দুপুরের ঘুম ঘুমাতাম। আম খাওয়া, ঘুমানো, আর আমার কাকার মারের হাত থেকে বাঁচা- এই তিনটে কাজ আমি এক সাথে করতাম।
জীবনে, নানা ধরণের জিনিস করতে থাকো। খেলা ধূলা, গান বাজনা, হাঁটাহাঁটি, পুতুল তৈরী, ছেলে পড়ানো, হাসপাতালে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করা ইত্যাদি। যেসব কাজ তোমার কাছে এক্কেবারে (আর্থিক ভাবে)অর্থহীন মনে হয়- সেইসব কাজই কিন্তু তোমাকে সত্যিকারের আনন্দ দেবে। সেই সব কাজই তোমাকে মানসিক অবসাদ আর আত্মহত্যা থেকে বাঁচাবে। তোমার কাছ থেকে, তোমার আত্মা সেইসব কাজ আকুল হয়ে চাইছে।
"মানুষের স্পর্শ" কিন্তু একাকিত্বের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়। মানুষের সুন্দর স্পর্শ নিশ্চিতরূপে তোমাকে আনন্দ দেয়। কিন্তু সেই আনন্দ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী নয়। সেই স্পর্শ- বন্ধু স্পম্পর্ক হতে পারে, বা দাম্পত্য সম্পর্কহতে পারে, বা মাতা সন্তানের সম্পর্ক হতে পারে । মানুষের কোন স্পর্শই কিন্তু ফ্রী (FREE)নয়। স্পর্শের সাথে একটা দামও (PRICE TAG)লটকানো থাকে। সেই দাম কখনো কখনো বেশ দুর্মূল্য। "ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রী" হয়ে যায়। কাজেই মানুষের সম্পর্ককে ভালোবাসো, শ্রদ্ধা করো। কিন্তু মানুষের সম্পর্ককে জীবনের একমাত্র সম্বল করো না। তাহলে জীবনে তুমি বারবার চরম আঘাত পাবে।
তাহলে কার সাথে সম্পর্ক গড়বে তুমি? তোমার নিজের আত্মার সাথে। যে মানুষ নিস্তব্ধতায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সে মানুষ নিশ্চিতরূপে তার আত্মার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এই সম্পর্কের কোন প্রকার SIDE EFFECT নেই। সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে সৃষ্টিশীল এই সম্পর্ক। এই সম্পর্কের উপর ভর করে- ভিঞ্চি, ভিঞ্চি হয়েছেন। এঞ্জেলো, এঞ্জেলো হয়েছেন। (কিন্তু এই সম্পর্কের উপর ভর করে- অরুণ মাজী পুরো একটা উন্মাদ হয়ে গেছে।)
তোমরা প্রশান্তির অভ্যাস করো। প্রাথমিক ভাবে তোমরা- নীরবে গান বাজনা প্র্যাক্টিস করো, ডাইরি লিখো, আকাশের সাথে কথা বলো ইত্যাদি। বা তোমরা BREATHING EXERCISE করো। দেখবে, তোমরা ধীরে ধীরে- অন্তরের ভেতর থেকে আনন্দ অনুভব করছো। নইলে তোমরা-
"জনারণ্যে একাকী আমি
দৌলত মাঝে নিঃস্ব।
আপন মাঝে খুঁজি নাই সুখ
খুঁজি আমি মহাবিশ্ব।"
সুখের উৎস তোমার নিজের মধ্যে। তোমার পিতা মাতা বা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে নয়। তোমার ধন দৌলত অট্টালিকার মধ্যে নয়।
আজ এখানেই থাক। উন্মাদ অরুণ মাজীর পক্ষ থেকে তোমাদেরকে অনেক অনেক ভালোবাসা। চলতে থাকবে।
© অরুণ মাজী
Painting: John Willaim Godward
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem