মানুষের জীবনে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যাপার কি জানো? ভালো কাজ করলেই যে তোমার জীবন যন্ত্রণাহীন হয়ে যাবে তা নয়। এ কথা ঠিক- খারাপ কাজ করলে, যন্ত্রণা তুমি পাবেই। কিন্তু কখনো কখনো ভালো কাজ করলেও তুমি যন্ত্রণা পাবে। ছোট বড় বিশ্ববিখ্যাত- সব ধরণের উদাহরণ আমি দিতে পারবো।
কোপার্নিকাস মানুষের ভুল সংশোধন করে বলেছিলেন- "সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে না। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে"। এই ভুল সংশধোন করার ফল কি? কোপার্নিকাসকে বেঘোরে মরতে হয়েছিলো।
অনিতা বসু যখন এমিলি বসুর গর্ভে, সুভাষ বসু তখন- এমিলি বসুকে জার্মানীতে রেখে জাপান চলে যান। স্বামী স্ত্রীর সেই শেষ সাক্ষাৎ। এমিলি বসু আর কখনো সুভাষ বসুকে কাছে পায় নি। অনিতা বসুও তার বাবাকে কখনো দেখেনি। সুভাষ বসু, এমিলি বসু, অনিতা বসুর কি দুর্ভাগ্য জীবনে! দেশের জন্য জীবন যৌবন সংসার, সুখ নিদ্রা আহার সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন- মহামানব সুভাষ বসু! ফল কি হয়েছিলো? ব্রিটিশরা তাকে উগ্রপন্থী বলেছিলো আর ব্রিটিশদের সুরে সুর মিলিয়ে আমাদের ভারতীয়রা তার সম্পর্কে অনেক কটু কথা বলেছিলো। সেই অতি মহামানবের বিরুদ্ধে এখনো কিছু গোষ্ঠী অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এবার তোমার নিজের জীবন নিয়ে ভাবো- অনেক সময় সত্যিই তুমি ভালো কিছু করতে গেছো। কিন্তু তাতে কি ফল হয়েছে? তুমি যন্ত্রণা পেয়েছো। এর অর্থ কি? এর অর্থ- জীবনে যন্ত্রণা তুমি পাবেই পাবে। কেবল ভালো কাজ করলেই, তুমি যন্ত্রণা মুক্ত হবে না।
আমার গল্প প্রবন্ধ- "কিছু জীবনের গল্প আছে যা জীবন বদলে দেয়" (first part)পড়ে, এক দিদি আমাকে প্রশ্ন করেছেন- "বৃন্দাবনীর জীবনে তো সবই দুঃখ। তবুও বৃন্দাবনী সুখী কেন? ব্যাপারটা একটু ভেঙে বলবেন? " খুব সুন্দর প্রশ্ন। তারই উত্তর দিতে এই লেখা।
বিদেশে, মাঝে মাঝে আমার "EMOTIONALLY DISTRESSED" রুগীদেরকে, আমি কি বলি জানো? "তুমি তিনটে জিনিস দিয়ে তৈরী-
১. তুমি কি খাও
২. তুমি কি চিন্তা করো
৩. তুমি কি কর্ম করো।"
তার সঙ্গে আমি তাদেরকে বলি, "মানুষ-
গাইতে গাইতে গায়েন
বাজাতে বাজাতে বায়েন
খেলতে খেলতে খেলোয়াড়
দুঃখ বা অবসাদের চিন্তা করতে করতে সে অবসাদগ্রস্ত।"
তুমি যা চিন্তা করো, কর্ম করো- একদিন তুমি তাই হয়ে যাও। সাইকোলজিক্যাল বিজ্ঞান একে "AUTO SUGGESTION" বলে।
জীবনে যন্ত্রণা আছে, ছিলো, থাকবে। কিন্তু তাকে নিয়ে বেশি ভাবলে জীবনে- দুঃখ বা যন্ত্রণা কেবল বাড়ে। কমে না। অন্ধকার ঘরে তুমি যদি আলো আনতে চাও, তো কি করো? তুমি কি আঁধারের সাথে তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করো? অথবা "আঁধার আঁধার" বলে দিন রাত কাঁদতে থাকো? নাহঃ এদের কোনটাই তুমি করো না। তুমি কি করো? তুমি অন্ধকার ঘরে একটা প্রদীপ জ্বেলে দাও।
তোমার জীবনেও অনেক দুঃখ আছে। সেই দুঃখকে নিয়ে নাড়াচাড়া করলে, বা তার জন্য অন্যকে দোষ দিলে, বা তার জন্য ক্রোধান্বিত হলে, বা দুঃখে অবসাদগ্রস্ত হয়ে কাঁদলে; দুঃখ বা যন্ত্রণা কোন কিছুই কমে না। তোমার যন্ত্রণার সময়ে- তোমাকে "প্রদীপের আলোর মতো" ভালো কিছু একটা করতে হবে। তাহলেই তোমার দুঃখ তোমাকে ত্যাগ করবে।
এবার বৃন্দাবনীর জীবন কাটাছেঁড়া করো। বৃন্দাবনী কি করে? সে সারাদিন আধপেটা খেয়ে- সন্ধ্যেবেলা, বাচ্চা বুড়োদের সাথে নিয়ে, খোল করতাল হারমোনিয়াম সহকারে প্রাণ খুলে গাইতে থাকে। কি গায় সে?
"আহাঃ কি সুখ এ জীবনে!
পান খেয়ে দাঁত গেলো
তবু হাসি ধরে না বদনে। "
সন্ধ্যেবেলার এই গান তার কাছে মহৌষধি। সারাদিনের দুঃখ যন্ত্রণা তার হৃদয়ের মধ্যে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তার সবই- এই গান আর আড্ডাতে সেরে উঠে।
তার এতো কষ্ট থাকা সত্বেও, সে গাইছে- "আহাঃ কি সুখ এ জীবনে! " সে যে এই সুখের কথা ভাবছে- তাতেই তার জীবনে আনন্দ ফিরে আসে। কেন? আগেই বলেছি- "গাইতে গাইতে গায়েন"।তাহলে- "সুখ" ভাবতে ভাবতে, সেও "সুখী" হয়ে উঠে। এও সাইকোলজির "AUTO SUGGESTION" থিওরি অনুযায়ী ১০০ ভাগ নিশ্চিৎ রূপে ঘটে।
এজন্যই আমরা বলি- যারা নেগেটিভ চিন্তা করে, তুমি যদি তাদের সান্নিধ্যে থাকো, তাহলে তুমিও নেগেটিভ হয়ে যাবে। মাতালের সান্নিধ্যে তুমি যদি থাকো, তাহলে তুমিও মাতাল হয়ে যাবে।
তেমনি তুমি যদি একজন দর্শিনিক বা পজিটিভ চিন্তার লোকের সান্নিধ্যে থাকো; তাহলে তুমিও দার্শনিক বা পজিটিভ চিন্তার লোক হয়ে যাবে। বাচ্চা বা বুড়ো, যারাই বৃন্দাবনীর সাথে সন্ধ্যেবেলা গান গাইতে আসে, তারাও খুব সুখী হয়ে যায়।
বৃন্দাবনী আর কি করে? সে আমাদের গাঁয়ের বিভিন্ন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। সে-ই আমাদের গাঁয়ের একমাত্র "ধাই মা"। কারও ছেলের হাতেখড়ি হবে তো তার ব্যবস্থা বৃন্দাবনী করে। কারও বাড়িতে শ্রাদ্ধের প্রস্তুতি চাই, তো সেখানেও বৃন্দাবনীর উপস্থিতি। এই রকম পজিটিভ পজিটিভ কাজ করার মাধ্যমে, বৃন্দাবনী তার নিজের জীবনের কষ্টকে সহস্র মাইল দূরে সরিয়ে রাখে।
আমি কলকাতায় এলে দেখি-
যখন দিনের বেলা স্বামী কাজে যায়, আর ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়; তখন বাঙালী বাড়ির মেয়েরা- বাড়িতে একা একা কেবল টিভি দেখে দিন কাটায়। তাতে "বোরিং" ব্যাপারটা একটু কমে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি কিছু ভালো হয় না। এই সব মেয়েদের অনেকেই কিন্তু মানসিক অবসাদে ভুগছে।
আমাদের অবসাদ যখন খুব খারাপ রকমের (SEVERE)হয়ে যায়, তখন আমরা তাকে "DEPRESSION" বা "মানসিক অবসাদ" আখ্যা দিই। কিন্তু তার আগের স্টেজ-কে তুমি কি বলবে? "অসুখী জীবন"। এইসব মেয়েরা বেশ ভালো রকমের অসুখী।
তোমার যদি পজিটিভ কোন কিছু না করার থাকে, তো তোমার মনের মধ্যে নেগেটিভ চিন্তা ভিড় করবেই করবে। নেগেটিভ চিন্তা করলে তুমি তো নেগেটিভ বা অবসাদগ্রস্ত হবেই হবে। তুমি নেগেটিভ হলে, তোমার সান্নিধ্যে থাকা- তোমার ছেলেমেয়ে বা স্বামী, তারাও নেগেটিভ হবে। নেগেটিভ স্ত্রী যেমন তার স্বামীকে নেগেটিভ করে। তেমনি নেগেটিভ পুরুষও তার স্ত্রীকে নেগেটিভ করে। ভীষণ ছোঁয়াচে এই রোগ।
জীবনের প্রতিমুহূর্তে তুমি যন্ত্রণা পাচ্ছো। কখনো খারাপ কাজ করে তা পাচ্ছো। কখনো আবার ভালো কাজ করে তুমি আঘাত পাচ্ছো। সেই সব আঘাত তোমার মধ্যে প্রতিমুহূর্তে বড় বড় ক্ষত তৈরী করছে। সেই সব ক্ষতের নিরাময় তুমি যদি না করো, তাহলে তুমি যন্ত্রণা কাতর হয়ে অসুখী আর অবসাদগ্রস্ত তো হবেই। এখন প্রশ্ন- এইসব ক্ষতের নিরাময় তুমি করবে কি করে?
বৃন্দাবনী কি করে? সন্ধ্যাবেলা সে গানের আড্ডা বসায়। দিনের বেলা বা রাতের বেলা, সে আমাদের গাঁয়ের নানা কাজে ব্যস্ত থাকে। বৃন্দাবনী যে সুখী, তা তার পান খাওয়া গালের ফোকলা হাসি দেখলে বোঝা যায়। তুমি কতখানি সুখী? তোমার যন্ত্রণা কমাতে তুমি কি করো?
তোমরাও কি প্রতি সন্ধ্যেবেলা- গান বা নাচের আসর বসাতে পারো না? তোমরাও কি পাড়ার বিভিন্ন কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পারো না? পারো। চাইলেই পারো। বাঙালী বাড়ির মেয়েরা গৃহবধূ, কিন্তু সকলেই বেশ ভালো রকমের শিক্ষিত। সেই শিক্ষা তোমরা কোন কাজে লাগাচ্ছো? বাড়িতে বসে, টিভি দেখে দেখে অবসাদগ্রস্ত হওয়ার চেয়ে- নীচের জিনিসগুলো কি তোমরা করতে পারো?
১. রাস্তার ছেলেদের লেখাপড়া শেখাও না কেন?
২. স্কুলে কয়েকদিন VOLUNTARY শিক্ষকতা করো না কেন? কোন স্কুল কি তোমাকে "না" বলবে?
৩. যারা গান বা নাচ জানো, তারা পাড়ার ছেলেমেয়েদেরকে গান বা নাচ শেখাও না কেন?
৪. হাসপাতালে তোমরা VOLUNTEER হিসেবে বিভিন্ন কাজ করো না কেন?
৫. ঘরে বসেই, স্কাইপ বা Whatsapp ইত্যাদি মাধ্যমেও তোমরা বহু লোককে ইংরেজী, গান, অঙ্ক, বিজ্ঞান ইত্যাদি শেখাতে পারো।
শুধু মেয়েরা নয়, শিশু কিশোর যুবক বৃদ্ধ- আমরা সবাই কিন্তু এ ধরণের কাজ করতে পারি। এতে কেবল সেবা হয় না। এতে নিজের জীবনের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা লাঘব হয়। সুন্দর একটা পরিবার-সমাজ-দেশ গড়ে উঠে। তোমার নিজের ছেলেমেয়েরাও, জীবনে পজিটিভ হতে শেখে। সরকার আর নেতাদেরকে গালি দিলেই কি- তোমার নিজের বা দেশের মানুষের কল্যাণ হয়ে যাবে?
কোন কাজই ছোট নয়। যা কিছু মানুষকে আনন্দ দেয়, মানুষের কাজে লাগে, মানুষের যন্ত্রণার উপশম ঘটায়- তার সব কিছুই অত্যন্ত মহৎ। তা যদি রাস্তার একটা ছেলের, গা ধুইয়ে পরিষ্কার করে দেওয়ার মতোও কাজ হয়।
অস্ট্রেলিয়াতে আমার এক কার্ডিওথোরাসিক সার্জন বন্ধু আছে। সে ভীষণই বিখ্যাত মানুষ। প্রতি রবিবার সে কি করে জানো? সকাল ছ-টার সময় ঘুম থেকে উঠে, আমার বন্ধু আর তার স্ত্রী- "চার্চ" এর রান্নাঘরে গিয়ে একশো মানুষের জন্য রান্না করে। সেই চার্চে প্রতি রবিবার দুঃস্থ মানুষদেরকে খাওয়ানো হয়।
সেই বন্ধু আমাকে একদিন বললো- "প্রতিদিন স্যান্ডউইচ, বেকন, আর সসেজ খাওয়াই এদরেকে, তুই কি একদিন ইন্ডিয়ান খাওয়ার রান্না করে দিতে পারবি? " বন্ধুর সাথে গিয়ে, আমিও একদিন ইন্ডিয়ান খাওয়ার রান্না করে দিলাম। সেদিন দেখলাম- আমার বন্ধু ছাড়াও, সেদিন সেখানে প্রায় কুড়ি জন VOLUNTEER রয়েছে। তাদের অনেকে- বিখ্যাত উকিল, পার্লামেন্টের সাংসদ, লেখক, ব্যবসায়ী ইত্যাদি।
ভাবো- অট্রেলিয়ার বিখ্যাত এক কার্ডিওথোরাসিক সার্জন আর তার অসম্ভব সুন্দরী স্ত্রী (প্রাক্তন মডেল) - ঘামতে ঘামতে দুঃস্থ মানুষদের জন্য ছ ঘন্টা ধরে রান্না করে যাচ্ছে! আমাদের ভারতেও অনেক ধনী বিখ্যাত ব্যক্তি দান-ধ্যান করেন। কিন্তু তারা নিজেরা রান্না ঘরে গিয়ে ঘামতে ঘামতে ছ ঘন্টা ধরে রান্না করে কি? আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন- ইত্যাদি দেশেরও অনেক দুর্বলতা আছে। কিন্তু এদের অনেক মহৎ গুণও আছে। এদের এই ভালো জিনিসগুলো আমাদেরকে শিখতে হবে।
মোদ্দা কথা হলো- তোমার জীবনে অন্ধকার তখনই আসবে; যদি না তুমি তোমার জীবনে প্রদীপ জ্বালতে শেখো। কি সেই প্রদীপ?
১. পজিটিভ চিন্তা, পজিটিভ বই পড়া, পজিটিভ সিনেমা দেখা, পজিটিভ লোকের সাথে বন্ধুত্ব রাখা।
২. নেগেটিভ চিন্তার মানুষদের থেকে দূরে সরে থাকা। বা বন্ধুদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া- তুমি কোন নেগেটিভ আলোচনা বা গসিপ শুনতে চাও না।
৩. প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটা হবি (HOBBY)থাকতেই হবে। গান, নাচ, বই পড়া, কবিতা বা গল্প লেখা, ছবি আঁকা, পাড়ার জন্য কাজ করা ইত্যাদি।
৪. সমাজ কল্যাণ মূলক কাজে সরাসরি ব্যস্ত থাকা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য দূরীকরণ, গরীব মানুষদেরকে হাতের কাজ শেখানো ইত্যাদি।
৫. প্রতিদিন আধ বা এক ঘন্টা শরীর চর্চা করা। সুস্থ দেহ আর মনের জন্য- শরীর চর্চা অপরিহার্য্য। এটা তোমাকে করতে হবেই।
জীবনে এতো দুঃখ কষ্ট সহ্য করেও, এগিয়ে যেতে তখনই ইচ্ছে করে; যখন তোমার জীবনের একটা "অর্থ" (MEANING OF LIFE বা PURPOSE OF LIFE)থাকে। আমাদের জীবনে, কিভাবে আসে সেই "অর্থ" (MEANING) ?
ভাবো। ভালো করে ভাবো। MEANING OF LIFE এর উপর একদিন লিখবো আমি। ভুলে গেলে, মনে করিয়ে দিও আমাকে। ভালো থেকো তোমরা।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem