কিছু জীবনের গল্প আছে যা জীবন বদলে দেয় (On Human Sufferings) Poem by Arun Maji

কিছু জীবনের গল্প আছে যা জীবন বদলে দেয় (On Human Sufferings)

Rating: 5.0

আঘাত আর যন্ত্রণা এক কথা নয়। আঘাত হলো যে কষ্ট দেওয়া হয় তোমাকে। যন্ত্রণা হলো সেই আঘাতের জন্য যে কষ্ট পাও তুমি। কেউ ফুলের ঘায়ে মূর্চ্ছা যায়। কেউ বজ্রের লেজে কেরোসিন তেল ঢেলে, তাকে খেপিয়ে দিয়ে বলে- "আয় না পাগলা। আমার এ বুকে"।

আমার পাড়ার বৃন্দাবনী- ভোরের বেলা ঘুম থেকে উঠে, মুড়ি পেয়াঁজ কাঁচা লঙ্কা বেঁধে মাঠে যায়। সেখানে নিজের গরু গুলোকে চরতে ছেড়ে দিয়ে, সে অন্যের জমিতে কাজ করতে যায়। সারাদিন অন্যের জমিতে মজুরগিরি করে সন্ধ্যেবেলা সে বাড়ি ফিরে আসে।

সন্ধ্যেবেলা তার ভাঙা বাড়ির খোলা দালানে বসে, সে খোল করতাল আর হারমোনিয়াম সহকারে বাচ্চাদের সাথে গায়-
"আহাঃ কি সুখ এ জীবনে!
পান খেয়ে দাঁত গেলো
তবু হাসি ধরে না বদনে। "

বৃন্দাবনীর বয়স যখন ষোলো, তখন বিয়ে হয় তার। বর তার, মদ খেয়ে খেয়ে পেটে জল জমিয়ে অল্পবয়সেই অক্কা পেয়েছে। বৃন্দাবনীর বয়স তখন বাইশ। ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি, ছোট্ট একটা দালান আর তিনটে তুলসী গাছ। এই হলো তার স্বামী প্রদত্ত উত্তরাধিকার।

তার বাপের বাড়ির অবস্থাও, তার থেকে কোন অংশে ভালো নয়। তেতাল্লিশ বছর ধরে মজুরগিরি করে, বুড়ি আজ পঁয়ষট্টি বছরের হলো। আজও সে ভোরের বেলা উঠে, মাঠে গরু ছেড়ে অন্যের জমিতে মজুরিগিরি করতে যায়। আজও সে সন্ধ্যেবেলা ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে গায়-
"আহাঃ কি সুখ এ জীবনে!
পান খেয়ে দাঁত গেলো
তবু হাসি ধরে না বদনে। "

বিদেশে, মানুষের অঢেল ধন সম্পদ আর প্রাচুর্য্য দেখার পর, গ্রামে ফিরে একদিন বৃন্দাবনীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি-
"বুড়ী, কিছুই তো নেই তোমার। কাঁচা বিধবা জীবন থেকে তুমি মজুরগিরি করছো। এতো হাসি তোমার আসে কোথা থেকে? "

বৃন্দাবনী আমার কান ধরে বলেছিলো-
"কে বললো আমার কিছু নেই? আমার তো সবই আছে। ঘর আছে। উঠোন আছে। তুলসী গাছ আছে। লক্ষী সরস্বতী আছে (তার দুটো গরুর নাম) । খোল করতাল হারমোনিয়াম আছে। সন্ধ্যেবেলার আড্ডা আছে। সবই তো সুখ আমার "

তারপর সে, তার পান খাওয়া ঠোঁট দিয়ে আমার গালে চুমু দিয়ে বলেছিলো- "তোর মতো সুন্দর আমার একজন ছেলেও আছে। "

এই হলো বৃন্দাবনী। সে সবার মা। সবার কাকিমা। সবার ঠাকুমা। সবার সব কিছু। সে সবার মধ্যে সুন্দর দেখে। আমার মতো মুখপোড়া বাঁদরের মধ্যেও সে সুন্দর দেখে।

বৃন্দাবনী গাঁয়ের এক নীরব দেবতা। এই বৃন্দাবনীই আমার জন্মের সময়- আমার নংকু প্রথম দেখেছিলো (আমার মায়েরও আগে) । আমার একার নয়। আমার গাঁয়ের বন্ধু- পিকলু বুবাই, রাজা- সবারই নংকু সে প্রথম দেখেছিলো। কারন- সেই গাঁয়ের একমাত্র "ধাই মা"।

যা বলছিলাম- বৃন্দাবনীর কিন্তু অনেক কষ্ট আছে। রোগে ভুগলে তাকে খাওয়ানোর মতো কেউ নেই। বর্ষার দিনে- তার ভাঙা ঘরের খড়ের চাল ভেদ করে বৃষ্টি নামে। তখন পলিথিনের চাদরে নিজেকে জড়িয়ে রাত কাটায় সে। গাঁয়ে যখন চাষাবাদ থাকে না, সে মজুরগিরি করতে পারে না। তখন সে একবেলা খায়, আর একবেলা উপোষ করে।

কিন্তু কথাটা হলো- এতো হরেক রকমের দুঃখ সত্বেও, তাকে কখনো জীবন সম্পর্কে অভিযোগ করতে শুনিনি। কোন মানুষ সম্পর্কে অভিযোগ করতে শুনি নি। যে কোন সময় তার দিকে তাকিয়ে দেখো- হয় সে পান চিবোচ্ছে, নয় সে গুনগুন করে গান গাইছে। রাস্তায় বৃন্দাবনীর সাথে দেখা হলে- তুমি প্রথম যা দেখবে, তা হলো- বৃন্দাবনীর ফোকলা দাঁতের হাসি।

তোমাদেরকে আমার প্রশ্ন- বৃন্দাবনীর তো এতো কষ্ট। তবু জীবনে সে যন্ত্রণা অনুভব করে না কেন? আমাদের অনেকের, বৃন্দাবনীর চেয়ে অনেক অনেক বেশি আছে। তবুও আমরা রগড়ে রগড়ে যন্ত্রণা পাই কেন? তবুও আমরা "আরও বেশি চাই, আরও বেশি চাই"- এর মধ্যে আমাদের সুখ খুঁজি কেন?

নিজেকে এই প্রশ্ন করার ক্ষমতা, তার উত্তর খোঁজা, আর জীবনে তা প্রয়োগ করার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে- আমাদের জীবন যন্ত্রণার মুক্তি।

তোমরা ভালো থেকো। তোমাদের সবাইকে, বৃন্দাবনীর তরফ থেকে তার পান খাওয়া গালের চুমু।


© অরুণ মাজী

কিছু জীবনের গল্প আছে যা জীবন বদলে দেয় (On Human Sufferings)
Friday, January 26, 2018
Topic(s) of this poem: happiness,joy,pain
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Close
Error Success