প্রতিভা সকলের আছে।
ঈশ্বর আঁধারের মধ্যেও সৌন্দর্য্য দিয়েছেন। আলোর মধ্যেও সৌন্দর্য্য দিয়েছেন। দুঃখের মধ্যেও সৌন্দর্য্য দিয়েছেন। সুখের মধ্যেও সৌন্দর্য্য দিয়েছেন। ভিন্ন জিনিসের কেবল ভিন্ন ধরণের সৌন্দর্য্য। আঁধারের সৌন্দর্য্য, আলোর সৌন্দর্য্যের চেয়ে আলাদা। দুঃখের সৌন্দর্য্য, সুখের সৌন্দর্য্যের চেয়ে আলাদা। তার মানে এই নয় যে, আঁধার বা দুঃখের মধ্যে কোন সৌন্দর্য্য নেই।
আপাত দৃষ্টিতে যাকে প্রতিভাহীন মনে হয়, তারও কিন্তু কোন না কোন প্রতিভা আছে। সেই মানুষটি কেবল, সেই সৌন্দর্য্যের সন্ধান এখনো পায় নি। শুধু সন্ধান পেলেই চলবে না। সেই প্রতিভাকে আরও বেশি প্রস্ফুটিত করার জন্য, তাকে আহার নিদ্রা সুখ স্বাচ্ছন্দ্য লোভ লালসা সম্বরণ করে, সাধনা করতে হবে।
প্রতিভার মতো এতো সহজ লভ্য, জল বা বাতাসও নয়। যে জিনিসটা সত্যিকারের দুর্লভ- তা হলো মানুষের "আসক্তিহীন তপস্যা"। দুঃখের বিষয়- আমাদের ভারতবর্ষে এই "আসক্তিহীন তপস্যা" ব্যাপারটা ভীষণ রকমের কমে যাচ্ছে।
আমাদের পূর্বপুরুষ আর্যভট্ট, কেবল সাধনার জোরে মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য জানতে পেরেছিলেন। তখনকার সময়ে ম্যাথেমেটিক্স এতো উন্নত ছিলো না, যন্ত্র-প্রযুক্তিও কিছু ছিলো না। অথচ আর্যভট্ট বৃহস্পতিকে বগলদাবা করে, সূর্যের সাথে হুঁকো টানতেন। কি করে তিনি এই ভয়ানক অসম্ভব ব্যাপারকে, সম্ভব করেছিলেন? আসক্তিহীন, আজীবন সাধনার দ্বারা ।
তোমাদেরকে আগেও বলেছি। আমার এক জেঠু আমাকে এক গল্প বলেছিলেন। একদিন এক সকালে-জেঠু আমার, হেমন্ত মুখার্জীর বাড়িতে গেছিলেন। হেমন্ত বাবু তখন রেওয়াজ করছিলেন। রেওয়াজ শেষে হেমন্ত বাবু যখন কথা বলতে শুরু করলেন- তখনও তিনি অবিকল গানের সুরে কথা বলছিলেন। হেমন্ত বাবুর ভ্রুক্ষেপও নেই, তিনি গানের সুরে বৈষয়িক কথা বলছেন। তপস্যার এই যে গভীরতা, বা গানের প্রতি এই যে প্রেম- তা ভারতবর্ষে ক্রমশঃ দুর্লভ হয়ে আসছে।
আজকাল আমরা ক্রমশ ফোর টোয়েন্টি হয়ে যাচ্ছি। সাধনা না করেই আমরা মহাপুরুষ হতে চাইছি। কেউ বন্দুকের ডগায় ডি লিট উপাধি কেড়ে নিচ্ছে। কেউ ক্ষমতার জোরে বিষ্ঠা মার্কা ছবিকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে বিক্রী করছে। কেউ কারও লেখা চুরি করছে। কেউ কারও গবেষণা চুরি করছে। কেউ ফোর টোয়েন্টি মিডিয়ার, ফোর টোয়েন্টি ক্যাম্পেনের জোরে, মহানায়ক বা মহাগায়ক বা মহাকবি হতে চাইছে। চারিদিকে কেবল ধাপ্পাবাজি। চারিদিকে কেবল ছল চাতুরী। কারও, মানুষ হিসেবে কোন আত্মসম্মান বা আত্মমর্যাদা নেই।
সূর্য হতে গেলে, সূর্যের মতো জ্বলতে হবে। রবি ঠাকুর হতে গেলে, রবি ঠাকুরের মতো পুড়তে হবে। নজরুল হতে গেলে, নজরুলের মতো ঘৃণা সহ্য করতে হবে, বিদ্যাসাগর হতে গেলে, বিদ্যাসাগরের মতো ত্যাগ করতে হবে। সুভাষ বসু হতে গেলে, সুভাষ বসুর মতো আত্মত্যাগ করতে হবে। বিবেকানন্দ হতে গেলে, বিবেকানন্দের মতো আসক্তিহীন হতে হবে।
কিন্তু আজকাল কি হচ্ছে? যতসব ফোর টোয়েন্টি মানুষ, সাততলা উঁচু নিজের "কাট আউট" টাঙিয়ে দিয়ে, উচ্চতায় রবি ঠাকুরকে ছাপিয়ে যেতে চাইছে। অসহায় সাধারণ মানুষ তাই, "ফোর টোয়েন্টি অরুণ মাজীর লেখা" না পড়ে, আজও সেই রবি ঠাকুর আর শরৎ বাবুকে, বুকে ধরে বসে আছে। মানুষকে, আমি না হয় কয়েকদিন ঠকাতে পারি। কিন্তু মুখোশ আমার একদিন খুলবেই। তাই না?
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem