অবশেষে ঠিকানায় পৌঁছলাম। এই নিউ সিটি এলাকা, কলকাতার উঠতি এলাকা। নিউ সিটিতে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন বাড়ি, নতুন নতুন স্কুল, নতুন নতুন রাস্তা, নতুন নতুন হাসপাতাল। কলকাতার তরুণ তরুণীরা নিউ সিটিকে নিয়ে অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে। কিন্তু যতটা স্বপ্ন তারা দেখে, তার ধরে কাছে নিউ সিটি এখনো পৌঁছতে পারে নি। কেন?
রাজনীতি এই বাংলাকে সর্ব্ব দিক থেকে গ্রাস করে ফেলেছে। বাঙালীর জীবনের এমন কোন দিক নেই, যেখানে রাজনীতি তার থাবা বসায় নি। রাস্তার ভিখারীর মৃত্যু হলে, তার মৃতদেহের দখল নিয়ে রাজনীতি হয়। স্কুল কলেজে ভর্তি নিয়ে রাজনীতি হয়। হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে, রাজনীতির নেতাদের সুপারিশ লাগে। রাজনৈতিক সংঘর্ষের কারনে স্কুলের দুগ্ধপোষ্য শিশুর মাথার খুলি উড়ে যায়। সংস্কৃতি কেন্দ্র দখল নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই হয়। চলচ্চিত্র শিল্পকেন্দ্র নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই হয়। বাংলার শিল্পী সাহিত্যিক লেখকরাও আজকাল রাজনৈতিক দলের তাঁবেদার। তারা তাদের নিরপেক্ষ প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।
মিথ্যেকে, প্রচারের আলো দিয়ে সত্য করে দেখানো এক নিত্য ঘটনা। সত্য আজ এতো অসহায় আর সঙ্গহীন, মিথ্যেকেই আজ জীবনের নিয়ম মনে হয়।নৃশংস মিথ্যেবাদীরা আজ "দলে আর বলে" এতো ভারী, সত্যবাদীদেরকে কেমন আগন্তুক আর উন্মাদ মনে হয়।
বুদ্ধি আর সংস্কৃতি চর্চার শিরোমণি বাংলা সত্যিই বদলে যাচ্ছে। এই বদল কিন্তু সুখের নয়। ভীষণই ভীতির।
শুধু কি বাংলা? সারা ভারতে এই একই চিত্র। রাজনৈতিক ক্ষমতা শেষ কথা বলে। দেশের আইন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, তদন্ত ব্যবস্থা তাদের নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলছে। হয়তো আজও কিছু মানুষ দুর্বলদের হয়ে কথা বলতে চায়। তাদের হয়ে লড়তে চায়। কিন্তু তারা তা পারে না। তাদেরকে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়। গালিগালাজ করা হয়। প্রাণ নাশের হুমকি দেওয়া হয়।
ভারতীয়রা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হওয়ার স্বপ্ন দেখে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সভ্যতা, প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার সন্তান হিসেবে তাদের এই স্বপ্ন বিন্দুমাত্র অমূলক নয়। কিন্তু এই মিথ্যে, এই চুরি ডাকাতি খুন আর ক্ষমতা দখলের সংস্কৃতি দিয়ে পৃথিবী শ্রেষ্ঠ হওয়া কি কখনো সম্ভব?
ক দলের সমালোচনা করলে তোমাকে খ বলা হবে। খ দলের সমালোচনা করলে তোমাকে ক বলা হবে। ক বা খ না হয়ে, কেবল একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, কেউ কি অন্যায়কে অন্যায় বলতে পারবে না?
এমন সব ভাবনা ভাবতে ভাবতে আমার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গেলাম। পঁচিশতলা ঝাঁ চকচকে এক আবাসন। এই আবাসনের আঠারো তলায়, দিয়া চ্যাটার্জীর দেহ সিলিংয়ের পাখার সাথে ঝুলানো অবস্থায় পাওয়া গেছে।শহরে গুঞ্জন এই যে, মৃত্যুর সময় দিয়া চ্যাটার্জী নাকি দশ সপ্তাহের গর্ভবতী ছিলো। পুলিশ যদিও এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলছে, শহরের লোক এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি নয়। তাদের কৌতূহল মিশ্রিত প্রশ্ন-
১. ঘর যদি ভিতর থেকে বন্ধ করা ছিলো, তো ঘরে ঢুকে দেহ উদ্ধারের আগেই কিভাবে দিয়ার মাকে জানানো হলো- তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে?
২. ময়না তদন্তের আগেই পুলিশ কমিশনার কিভাবে এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে প্রকাশ্যে বিবৃতি দেন?
৩. দিয়ার বন্ধুরা জানিয়েছে দিয়া দশ মাসের অন্তঃস্বত্তা ছিলো। ময়না তদন্ত আর পুলিশ বিবৃতিতে সেই কথা বলা হয় নি কেন?
৪. দিয়ার ফোনের কল রেকর্ড বলছে মৃত্যুর আগের এক সপ্তাহে, দিয়া বাংলার কোন এক প্রভাবশালী মন্ত্রীকে প্রায় একশো বার ফোন করেছিলো। দিয়া সাধারণ এক মেয়ে। সেই সাধারণ এক মেয়ে, অত্যন্ত ক্ষমতাশালী এক মন্ত্রীর সাথে এতবার কথা বলেছিলো কেন?
এমন হাজারো প্রশ্নে বাংলা আজ উত্তাল। কিন্তু বাংলার মানুষের এই জিজ্ঞাসার উত্তর দেবে কে? বাংলার মানুষ সরকারকে বিশ্বাস করতে পারে না। পুলিশকে বিশ্বাস করতে পারে না। তদন্তকারী সংস্থাকে বিশ্বাস করতে পারে না। সংবাদপত্রকে বিশ্বাস করতে পারে না। বাংলার মানুষ বিরোধী দলকে বিশ্বাস করতে পারে না। বাংলার মানুষ তাহলে কাকে বিশ্বাস করবে?বাংলার মানুষের উপায় কি?
অবসানে ঢুকে সিকিউরিটি কিয়স্কে গেলাম আমি। কিয়স্কে বসা দুইজন লোক আমাকে গভীর ভাবে পর্য্যবেক্ষন করলেন। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন-
"কোথায় যাবেন? "
আমার পরিচয় পত্র দেখিয়ে আমি বললাম -
আমি সাংবাদিক। আমি দিয়া চ্যাটার্জীর ফ্ল্যাটে যেতে চাই।
"ওই ফ্ল্যাটে এখন যাওয়া যাবে না। ফ্ল্যাট বন্ধ।"
আমি দৃঢ়স্বরে বললাম-
কিন্তু আমার কাছে খবর আছে, দিয়া চ্যাটার্জীর বাবা মা এখন এই ফ্ল্যাটে এসেছেন। আমি তাদের সাথে কথা বলতে চাই।
"বললাম তো ওই ফ্ল্যাটে যাওয়া নিষেধ। আপনার ওখানে যাওয়া হবে না? "
আমি আবার দৃঢ় স্বরে বললাম-
শুনুন, আমি সাংবাদিক। আমি শুধু ওনার বাবা মায়ের সাথে একটু কথা বলবো।
হটাৎ ভারী চেহারার মধ্য বয়স্ক এক পুরুষ কাছে এসে, কিয়স্কে বসা লোক দুটির উদ্দেশ্যে বললো-
"যেতে দে না ভাই। পাতলা এক মেয়ে মানুষ তো তোদের সাথে লড়াই করতে আসে নি।"
কিয়স্কে বসা লোকদুটো আমার নাম ঠিকানা আর সই সংগ্রহ করে বললেন-
"যান তাহলে। কিন্তু পাঁচ মিনিটের বেশি থাকা যাবে না।"
মধ্য বয়স্ক পুরুষটি আমার দিকে চেয়ে বললো-
আসুন। আপনাকে আমি ফ্ল্যাটটা দেখিয়ে দিচ্ছি।
লোকটির এই অযাচিত সাহায্যে, একটু খটকা লাগলো। ভয়ও হলো। কিন্তু ভয় পেলে আমার চলবে কেন? ভয়ই যদি করবো তো Investigative Journalist হলাম কেন? লিফ্টের মধ্যে বেশ আড়ষ্ট থাকলাম আমি। পুরুষটিও আমার দিকে তাকালো না। লিফ্ট থেকে বেরিয়ে, একটা ফ্ল্যাটের দরজা দেখিয়ে উনি বললেন-
"শেষ প্রান্তে লোহার গেট লাগানো যে ফ্ল্যাটটা দেখছেন, ওই ফ্ল্যাটটা।"
এই বলে উনি লিফ্টে করে নেমে গেলেন। ফ্ল্যাটে পৌঁছে, ফ্ল্যাটের কলিং বেল টিপতেই, দুজন ছেলে কোথা থেকে আমার দিকে তরি ঘড়ি করে ছুটে এলেন। তারা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলেন-
কাকে চান?
আমি বললাম-
এই ফ্ল্যাটের লোকের সাথে কথা বলতে চাই আমি। আমার কথা শেষ হতে না হতেই, এক বৃদ্ধ দরজা খুললেন। আমি এক প্রকার নিশ্চিৎ এই বৃদ্ধই দিয়া চ্যাটার্জীর বাবা। আমার দিকে চেয়ে উনি জিজ্ঞেস করলেন-
কে আপনি? কাকে চাই?
আমি বললাম-
আমি একজন সাংবাদিক। আমি জানি, আপনি কতটা ভেঙে পড়েছেন। কিন্তু প্লিজ, আমি কি আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?
উনি কোন কথা না বলে ভেতরে ঢুকে গেলেন। ওনার কোন হ্যাঁ বা না উত্তর পেয়ে, আমি ওনাকে ফলো করলাম। ছেলে দুটোও আমার পিছু ঘরে এলেন। ছেলে দুটোকে পিছু আসতে দেখে, উনি বিরক্তির সুরে আমাকে বললেন-
"প্লিজ আমাদেরকে আর ডিস্টার্ব করবেন না। আমি এই ব্যাপার নিয়ে কোন কথা বলবো না।"
এই বলে বৃদ্ধমানুষটি সোফার উপর বসে পড়লেন। ওনার চিবুক শক্ত। চোখ থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে অর্দ্ধদমিত এক ক্রোধ। আমি ওনার দিকে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে রইলাম। ওনার বয়স ষাট পঁয়ষট্টি হবে। পাকা চুল, পাকা দাড়ি। চোখের নীচেকালো ছায়া। ওনার দিকে চেয়ে থাকতে দেখে, উনি আমাকে সোফাতে বসার জন্য ইঙ্গিত করলেন।
সোফাতে বসতেইলক্ষ্য করলাম ভেতরে এক বৃদ্ধা নারী। ভাবলাম- উনি নিশ্চয়ই দিয়া চ্যাটার্জীর মা হবেন। ঘরের মধ্যে খাটের উপর বসে রয়েছেন। বুঝলাম- উনি বাইরে আসতে চাইছেন না।
দিয়ার বাবা আমার দিকে চেয়ে বললেন-
"শুনুন একটা কথাই বলছি, এই মৃত্যু কোনদিন আত্মহত্যা হতে পারে না। এর বাইরে আমি আর একটি কথাও বলবো না। আপনি এখন যেতে পারেন।"
এই বলে উনি সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন। ওনাকে হটাৎ চলে যেতে দেখে আমি বললাম-
প্লিজ, এটা আমার কার্ড। যদি আরও কিছু বলতে চান তো আমাকে জানাবেন। আপনি যদি সত্য খুঁজে পেতে চান, তো বাংলার মানুষ আপনাকে সাহায্য করবে। কিন্তু আপনার কথা আগে মানুষকে জানাতে হবে।
উনি সঙ্কোচের সাথে কার্ডটা আমার হাত থেকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন। ......
© অরুণ মাজী
Painting: Atroshenko
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem