প্রস্তরখন্ড ৩ Poem by Soumen Chattopadhyay

প্রস্তরখন্ড ৩

P -1
প্রস্তরখন্ড ৩

টিলার কাঁকালে জ্যোৎস্না কাঁপে; প্রাচীন আত্মার বিমূর্ত বিষাদ
প্রেতের মতন হাসে- তবু সেই বিস্মৃত আলোতে তিলাবনী
দ্বারিকা ধারার জন্ম দিয়েছিলো চিত্রিত প্রদেশে জীবনের
স্বতস্ফূর্ত ইসারার জন্মাবেগে। প্রান্তরের ভেতরে এখনো
কাদের ছায়ারা কাঁদে! জানিনা কাদের জন্ম অভিমান মাটি
ফুঁড়ে মেশে আমার সৃষ্টির বিস্তৃত রক্তের তরঙ্গের দেহে।
তাদের মিলিত সমবেত গানের বাতাসে আকালের দগ্ধ
ক্ষুধিত খুলির কালের কান্নার দীর্ণ ধ্বনি নিঃশব্দে শুনেছি।
পৃথিবীতে এইভাবে নিরাশার শবদেহে মৃত্যুফুল ফুটে
আছে, সভ্যতার সুগভীর আবরণে ঘুমের চন্দন বনে।
স্তম্ভিত ব্যাকুল জীবনের আবেদন চিরকাল ভেসে গেছে
নিথর নদীর অন্ধকার জলে। তারই রক্তের নিষ্ঠুর দাগ
হেমন্তের দেহে শস্যের প্রার্থনা জানিয়ে অতীত শ্মশানের
দেহে পুড়ে গেছে আমাদেরই কোনো এক নক্ষত্রকে স্বাক্ষী রেখে।
উজ্জ্বল আলোয় জলের সন্তান আসে নিরপেক্ষ পিতৃধামে।
যুবকেরা যুবতীর হাত ধরে পৃথিবীর গন্ধে ভ্রূণ আনে।
সন্তানের পিতা বারবার ভূখণ্ডের অধিকার দিয়ে গেছে
তার আত্মজকে। তবু খড়ের চালের নিচে সরীসৃপ জেগে
থেকে জন্মভূমির মাটির আঙিনাকে সুর্যাস্তে নিশ্চিহ্ন করে।

অবিচল অশ্বত্থের শাখা প্রশাখা পাখির ডাকে নিরন্তর
উদ্বেল হয়েছে শান্ত অঘ্রান রাত্রির হৃদয়ের খুব কাছে ।
স্মরণীয় সমস্ত বিশ্বাস অনাথ শস্যের মাঠ থেকে ডেকে
P -2
বলে গেছে দুঃখের দুয়ার থেকে তুমি কতদূর যেতে চাও!
আমরা তো তারই সহোদর। সাঁওতালি মেয়েটির সন্ধ্যারাত
দেখেছো কি তুমি! তবে কেন যাও আত্মহননের অন্ধকার
প্রান্তরের অন্তহীন পথে! শোকের শব্দেরা মৃত্যুকে ডিঙিয়ে
একদিন ফলবতী হবে তোমারই জ্যোৎস্নার ভাঙ্গা চাষমাঠে।
সময়ের অবিকল দৃশ্য পৃথিবীতে কবে আর বারবার
থমকে থেকেছে! শকুনের পাখসাট মানুষের ধমনীতে
হাড়ে হাড়ে অভ্যন্তরে লীন হয়ে ডেকে গেছে তবু পলাশের
অরুণাভ ফুল বসন্তের মাটিতে মুখের সুন্দর আদল
এঁকে দিয়ে যায়— জ্যোৎস্নার বিশীর্ণ নদী জোড় আমাদের ঘিরে
রাখে তার সংসারের গভীর প্রবাহে যেখানে স্রোতের গায়ে
অন্তরীক্ষ হতে নক্ষত্র নদীর ডাকে পৌঁছে যায় ক্লান্তিহর
চিরস্থীর শূন্যের মরমী মাতৃকুলের উৎসের প্রিয়গর্ভে।
বাস্তুহারা কৃষি জাতকের রক্তরেখা বটপাকুড়ের মাঠে
রমনের নির্জন ছাউনিটুকু চেয়ে ফিরে গেছে স্বরচিত
সমাজের পোড়া মাটি দেহের শ্মশানে— সেই হাড়হাভাতের
গোলপাতা, খড়ের ছাউনি সেসব মনে কি পড়েনা তোমার!
আমরা ক্রমশ সময়ের শান্তির ব্যাপ্তির দিকে হেঁটে যায়।
মহাকালে রৌদ্রলোক একাকী দাঁড়িয়ে আছে, নদীর বিনম্র
পলি, ফসলের সহজ পল্লীতে সুস্থির জ্যোৎস্নায় আমাদের
হাতে পৃথিবীর পরমান্ন তুলে দিতে তার অন্তিম সৌন্দর্যে।

আহা দেখো ওই বৃক্ষে মায়াবী পাখির কলতান শব্দহীন
পাথরের গায়ে লেগে ধ্বনিত হয়েছে বিশ্ব সৃষ্টির স্বভাবে—
মনেপড়ে এখানে অরণ্য বীজ পড়েছিলো এক দুপুরের
P 3
পুরানো মাটির ছায়ার হৃদয়ে? আরোগ্যের অদৃশ্য সান্ত্বনা
পেয়েছি আমরা বহু গাঢ় রাত্রির নিপুণ সুরের রহস্যে।
বেদনার মহৎ চিন্তারা বোধের ভেতর কালের চেতনা
দিয়ে গেছে আমাদের মনে পৃথিবীর নগ্ন দুঃখের বিস্ময়ে।
সূর্যাস্তে নিজের মৃত মুখ দেখে ভেবেছি শ্মশানবুড়ি তার
নদীচরে শীতল সত্যের কাছে বসে আছে আসশ্যাওড়ার
গভীর শরীরে যেখানে রহস্য বহু শতাব্দীর অন্ধকার
ভেঙ্গে শুনিয়েছে প্রাকৃত প্রবাহে স্থায়ী আশ্রয়ের কোনো চিহ্ন
নেই তবু মানুষের মনে সংঘের সংশয় জেগে থাকে স্রোতে।
রূপাই নদীর বুকে চাঁদ ভাসে, তীরের অদূরে বাঁশবন
নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে- তার ছায়া জলে পড়ে- বুঝেছি পৃথিবী
প্রতিক্ষণে অন্তঃসত্বা হয়। এই বয়ে যাওয়ার ভেতর রয়ে
গেছে আমাদেরই কঙ্কালের ইতিহাস— বলে যায় পৃথিবীর
মরমী জলকে নিজের মতন করে ভালোবেসে চলে যেতে।
গোধূলি কল্লোলে জলরেখাগুলি ফসলের মাঠে জেগে থেকে
জেনেছে চিহ্নিত হতাশার প্রতিচ্ছবি তার প্রত্ন পদচ্ছাপ
কিছুকাল মানুষের দেহে রেখে যায় জীবনের বিপরীতে
নির্জন দহনে মানুষের হৃদয়ের মাটিকে জাগাবে বলে।


জীবন বোধের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থেকেছে বহুমুখী রূঢ়
আকাঙ্ক্ষার জলছবি। চেতনার অন্তঃস্থলে অনুভবে দগ্ধ
আত্মক্ষয় থেকে গেলে আমরা বুঝেছি জগতের দেহজলে
পড়ে থাকে আমাদের জীবনের ঋণ। গৈরিক গোধূলি তার
শান্ত স্বরে জ্যোৎস্নাগানে বলে যায় বিমূর্তের অন্ধকারে আরো
P 4
এক জ্ঞান স্থানের সময়ে অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা হয়ে আছে
যেখানে তরঙ্গদেহ মাতৃগর্ভের সকল নির্মানের মূল
নির্দিষ্ট সত্যকে জানে, যা অস্থিরতার বীজে স্থিরতা এনেছে।
মন্দিরের ছায়াচ্ছন্ন মুখশ্রী স্মরণে আসে; পাথরের দেশে
পিতার স্নেহের মতো বটের করুণ ঝুরি মাথার উপর
নেমে আসে তার অক্ষমতা নিয়ে; তবু ঢেকে রাখে বৈশাখের
রোদ্দুরের দুঃসাহস পাতা বীজের আঁধারে। পার্বত্য প্রহরে
বেঁচে থাকে আমাদের অবশিষ্ট বেঁচে থাকা শুষ্ক আঁকাবাঁকা
আলপথে। অন্ধকার থেকে গন্তব্যের দিকে হেঁটে যেতে চায়
পাথুরে খিলানগুলি; আমাদের হারিয়ে যাওয়ার ব্যবধান
ক্রমাগত বেড়ে যায় সময়ের মহাবনে। স্তব্ধ মরুরাত
শতাব্দীর অনেক মুহূর্ত পেরিয়ে আবার গন্ডোয়ানা যুগে
ফিরে এসে সমযাত্রীদের রাজপথে নিজেকে দেখেছে, শান্ত
অনন্তের মহাকাল আজন্ম সন্ধির স্বাক্ষরে খাদ্যের কথা
লিখে গেছে। তবুও এখন ফসলের মাঠে রক্তাক্ত শরীর
পড়ে থাকে আরো কোনো এক চিরস্থায়ী ব্যবস্থাকে গেঁথে দিতে।
কল্লোলিত শিশিরের গান নির্জন পাহাড়ে একাকী মরেছে
ঘুরে অন্ধকার চতুর্দশী টেনে এনে। অনর্গল নৈঃশব্দ্যের
মধ্যে আত্মাস্থিত বেদনায় ছৌ এর মুখোশে শিল্পকে বেঁধেছে।
সেদিন সন্ধ্যার মোহময় মেঘ পাহাড়চূড়ার মরুদেশ
থেকে নেমে এসে তার প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর পথে চলে
যেতে চেয়েছিলো অতলের তলে যেখানে বোধের বিন্দু চেয়ে
থাকে উৎসে—জন্মের নিবিড় দাগে ঘুমন্ত মায়ের মুখ ভাসে
নিরন্তর। মৃত্যুমুখী সকল ক্ষতের ভেতর ছড়িয়ে থাকে
অভিসারী মন। মৃত আঁধারে আত্মীয়দের মৃদু হাত ডাকে;
P 5
পরিস্রুত বেদনায় উদাসীন হয়ে অনুভব করে তীব্র
সময় প্রবাহ জীবনে যে বিবর্তন দিতে চেয়েছিলো -তার
সেই সব অরণ্য পাহাড়ে স্বাভাবিক অধিকার অন্য কেউ
সম্মিলিত ভাবে নিয়ে গেছে- অস্তিত্বকে ছিঁড়ে নিজেকে যথেষ্ট
সাবলীল করার সহজ পথে। মাটির ভেতর মাটি হয়ে
থেকে যায় পাতাকুড়ানির ঘর মধ্যরাত পুরানো সংসার।
প্রাচীন মন্দির থেকে উঠে আসে গাজনের ঘ্রাণ- বটতলা—
পথের দুপাশে বনতুলসীর ঝোঁপ নিজস্ব ধর্মের ভারে
বহুচেনা এইসব গাছ সক্ষম ভঙ্গিতে আজো চেয়ে থাকে।
সূর্যাস্তে নিজেই নিজেকে দেখেছি ধ্বংস ও ক্ষয়ের পর আমি
জেগে আছি এক গোপন চৈতন্যে যেখানে নির্জনে শৈলসানু,
পাখিপুরাণের জ্যোৎস্নানদী, মহাবিশ্বের জঠরে খেলা করে।
দেখছি অতীশ শ্রীজ্ঞান নীরবে পণ্যের মতন চলে যায়
কাল থেকে মহাকালে সমষ্টির স্রোতে জন্মের আগে ও পরে।
বিগত জন্মের প্রত্ন রোদ্দুরে দেখেছে তারা পিতৃপুরুষের
ক্ষয়িষ্ণু কঙ্কাল আজো কাঁদে জ্যোৎস্নার কাঙালী আলোর শরীরে।
পাথরখন্ডের সন্ধ্যাভাষা আদি বিশ্বের মূলের দিকে টানে
যেখানে আদিম তৃষ্ণার নির্জন চর সহজেই আরণ্যক
পৃথিবীর আত্মার সংসার পেয়েছিল ঘুমন্ত দেহের দেশে।
আলোকঋতুর অবিনশ্বর ছায়ার কথা জেনে নিজেদের
বহমান প্রাণে প্রতিভা খুঁজেছে জন্মের জটিলতম ক্ষণে।
গ্রামের পথের পাথরের গায়ে কৃষ্ণদ্বাদশীর চাঁদ কাঁপে
তারই মাঝে আঘাতে আঘাতে জীবন ভেসেছে ক্ষুধার জ্বালায়
মৃত্যুময় অন্ধকারে। মরুগুল্মের মতন অভিজ্ঞতা নিয়ে
সন্তপ্ত অস্তিত্বে বেঁচে থেকে জীবনের সার্থকতা খুঁজেছিলো
P 6
প্রান্তরের এই জনপদ। অনুষ্ণ আদিম চেতনা আসন্ন
দিনের মৃত্যুর ছায়া তীব্র শোকে ঘুমের গভীর থেকে উঠে
এসে দেখে তারা ক্রমাগত পিপাসায় পরাজয়ে বৃত্তাকার
পথে ঘুরে ঘুরে ক্ষয়ে গেছে। প্রাক্তন দেহাতি পৃথিবীর এক
ভৌতিক জ্যোৎস্নার সংক্ষিপ্ত সময়ে শেকড়ের দৃঢ় ইশারার
অভিজ্ঞানে অসহায় গৃহস্থের আদিরূপে তাকিয়ে রয়েছে।
এইভাবে অনার্য মাটির নির্মল সত্তার ধুলোর ভেতরে
হৃদয়ের লেনদেনে আজো শান্ত সুগভীর স্নায়ুর অন্তরে
পোয়াতি গ্রামের স্বপ্ন দেখে। সুদূরের সময়ের অবিরল
ইতিহাস শতাব্দীর বহু ধ্বংসের শরীরে ফিরে ফিরে আসে।
তবুও সুতীব্র বেদনা উৎসের ক্ষুধিত অন্তরে বারবার
বিকশিত হয় এক অখন্ড বিশ্বাসে আর একাকী ব্যথার
দিনে জেগে ওঠে পাথরের বুক ভেঙে মাটির দুর্লভ গর্ভে।

অন্ধ বাউলের মতো দিনশেষের দিগন্তে খুঁজেছে সৃষ্টির
সেই অভিজ্ঞান যেখানে রাত্রির অন্ধ মন্দিরে মানুষ আজো
প্রসন্নতা ভিক্ষা করে, মৃত বিস্মৃত শতাব্দী জাগিয়ে দেখেছে
বেদনার নিজস্ব আগুন পৃথিবীর প্রথম রাত্রির বুকে
ফিরে যেতে চায়। সকল দুঃখের মাঝে বিপন্ন সন্ধ্যার তীব্র
দহনে শূন্যতা ভেঙে রোদ্দুরের নরম প্রশ্রয় চেয়েছিলো।
নদীতটে সভ্যতার মুখরতা অপচয়ে ম্লান হয়ে এলে
নিজেকে নিলামে তোলে— তারপর নিঃসঙ্গ প্রাণের ব্যর্থতার
ফল অনুভবে বুঝেছে দুঃখিত মৈথুনের পর আত্মজের
যে করুণ জন্ম দিয়ে গেছে তারা সংকটের নীরব মুহূর্তে
বারবার একমুঠো ক্লান্ত ছাই হয়ে উড়ে গেছে সেইসব।
P 7
শোকের অন্তরে তাদের প্রাণের ক্ষুধিত কঙ্কাল বস্তুবিশ্বে
তাদের অতীত বিশ্লেষণ করে বুঝেছিলো আজকের পথে
মানুষের হৃদয়ের সকল গহবর সকলের হৃদয়ের
নিজস্ব দুঃখের গহবর ছিলোনা কোনোদিন। প্রান্তরের নিঃস্ব
বিস্তৃত মাঠের অন্ধকার সেই কথা বলে যায়। জীবনের
অস্থির ব্যথার দিনে অসচ্ছলতায় কেন তবে পৃথিবীতে
নরকের আর্তনাদে পণ্য হয়েছি আমরা একে অপরের
কাছে সুচতুর ভাবে একই স্বাদের মাটিতে— দু-হাতে অনেক
অন্ধকার ঘেঁটে করতলে পেয়েছি শরীরী উষ্ণতার বীজ।

ঘুমন্ত বৃক্ষের পাতারা মাটিতে দিগন্ত পোড়ার শব্দ শোনে
শরীরের প্রতিকৃতি শুভ আকাঙ্ক্ষায় শুয়ে আছে হৃদয়ের
এক কোণে। ফসলের হলুদ সন্তান বিমূর্ত মুহূর্তগুলি
স্পর্শ করে জেনেছিলো নিঃশব্দে দু - হাতে গ্রামের শূন্যতা ভরে
দিলে অনন্তের অন্তরে উজ্জ্বল স্নেহের স্বাক্ষর রয়ে গেছে
জীবনের যন্ত্রণার প্রাকৃত বসন্তে—সেইখানে নীরবতা
পাথুরে প্রকৃতি ভেঙে মুখরতা পায়। আকাশের রৌদ্ররসে
বৃদ্ধের দু - চোখ অনুভব করে পার্থিব রুক্ষতা চিরে দেখে
নির্জন পাহাড়ি বটের শিকড়ে শাখায় সে জেগে আছে মূলে
বহুকাল নিঃসীম প্রবাহে— একদিন সে নির্মিত হয়েছিলো
নক্ষত্র ধুলোর লেনদেনে। অশরীরী আত্মার মতন তারা
আজো ঝরে রাঙ্গামাটির কদমতলে। ঘর বাড়ি হাঁড়ি ঘট
ভাঙ্গা প্রত্নস্তূপ থেকে থেঁতলানো কঙ্কালে জীবাশ্মে সুলগ্নের
প্রেমজাত প্রিয়জনের শীতল অভিযোগে আজ তার মৌন
অভিযান সমূহ জ্যোৎস্নার শালবন জুড়ে— হাহাকার থেকে
P 8
শর্বরী জন্মের পাষাণ প্রতিমা তার নিঃস্ব শিরদাঁড়াটুকু
নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে আপন ছায়ার অন্ধকারে ফাল্গুনের
শাণিত শীতল পাথরের চিরস্থির রামগড়ের জঙ্গলে
জলহীন তরুতলে পাতারা কেঁপেছে মাথার শিয়রে ঝর্না
তার জলশঙ্খে অসংখ্য নদীর জন্ম দিয়ে জন্ম বেদনায়
হিম সূর্যাস্তের সকল সময় তার অছিন্ন সন্তানদের
কাছে পেতে চেয়েছিলো আজ সেখানে পাখিরা অজ্ঞাত আড়ালে
করুণ নিশ্বর হয়ে কোথাও হয়তো বেঁচে আছে শব্দহীন
রক্তস্রোতে একাকী বিষন্ন সময়ের অর্জুন শালের দেহে।

চিরন্তন মেঘ অবিশ্রাম ঘুরে ঘুরে এখানের মুহ্যমান
হিম মরুরাতে অন্ধকার শুষ্ক বাতাসের দীর্ঘ কান্না শুনে
বুঝেছিলো পাথরের হৃদয়ের নূপুরের শব্দে বারবার
সাঁওতালপরগণা উপজাত হয়ে আদি শিলাগন্ধস্রোতে
ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে থেকে তারই আশা নিরাশার অন্তহীন খেদে
বিদীর্ণ করেছে বনভূমি। উঁচু নিচু চড়ায়- উৎরায় স্বাক্ষী
হয়ে রয়ে গেছে তাদেরই প্রাণের অপজীর্ণ স্বেদ অস্থি মাংসে।
পৃথিবীতে মানুষ তাদের জন্মের প্রণয়ে জন্মকে স্বার্থক
করতে রাষ্ট্রের বিপ্লবে নিজেকে যুক্ত করে তার পরবর্তী
প্রজন্মের হাতে জীবনের বহু স্বাদ দিতে গিয়ে দেখেছিলো
ক্ষণিক স্ফুলিঙ্গে বিরসা অনেককাল তাদের বাঁচিয়ে রেখে
বুঝিয়ে গিয়েছে প্রতিযুদ্ধের মাধ্যমে বিপ্লবের জন্ম দিয়ে
সন্তানের সুযোগ্য জন্মের শরীরে কালের ঋণ পরিশোধ
করে পৃথিবীর পরিচিত প্রতিবিম্ব নিজের দুয়ারে টেনে
না নিলে প্রাণের প্রচ্ছন্ন চিহ্নের স্বাদ ক্রমাগত আকাঙ্ক্ষার
P 9
আবহমানের দৃশ্য তার নিশ্চিহ্নের দিকে চলে যেতে থাকে।

উৎসবের দগ্ধ দিনে এখানে দুঃখিত জন্মভূমি পঞ্চকোট
রাজসভা পাষাণের নগ্ন প্রতিধ্বনি শোনে। উঁচু নিচু টিলা
বনটিয়া আজ প্রাসাদে প্রাচীন প্রত্নঘ্রাণ নিয়ে টের পায়
ছলছল জলস্রোত ছিলো কোনো একদিন। অধরা ঝুমুর
ভাদু টুসু ধামসা মাদল আড়বাঁশি নিজেকে উজাড় করে
মাতৃমূলে গেঁথে আছে বহু বিস্মৃত পোয়াতি গাঁয়ের বীজের
গভীরে অলক্ষ্যে যেখানে বুকের অতলে প্রাকৃত ইতিহাস
নতজানু হয়ে আছে নরকের মেধাহীন মস্তিষ্কের গর্ভে।
তবুও নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিতে চেয়ে নির্জনে ভেঙেছে
ধ্বংসের দিনের স্থবিরতা। পাহাড়ি ডুংরির উপল আকীর্ণ
পথে প্রাকপ্রত্নে নিহিত সত্যের হাহাকার প্রত্যাশার জন্ম
দিলে, মৃত্যু মৃত্যুহীন হয়— সূর্যাস্তের গৈরিক গোধূলি সেই
কণ্ঠস্বর জানে— জানে শিকড়ে শিরায় আদিম বৃক্ষের জন্ম
মৃত্যু শেষ ক্ষয় আর ঝুরিনামা রহস্যের নিবিড় সন্ধান।
রাত্রির আতুর গন্ধ দিগন্ত রেখার থেকে নেমে শতখাতে
বয়ে গিয়ে চেতনার রক্তাক্ত শরীরে পার্থিব জন্মের ঘাসে
শ্মশানচুল্লির দগ্ধ অঙ্গার মাটিতে প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছে।
সেঁজুতির আলো নিভে গেছে তবু দুঃস্বপ্নের নদী থেকে উঠে
এসে নাভিকুন্ডে মহাকালের পায়ের ছাপ দেখে আলোকিত
মায়াসুরে ফিরে ফিরে এসেছে বিশ্বের বিস্তৃত বেদনা ছুঁয়ে।
পলাশের বন অন্তিম প্রান্তর অরুণাভ করে চলে যায়
বসন্তের শেষে— অজস্র উড়ন্ত বনটিয়ার সবুজ ঝাঁক
ঈশ্বরপুত্রের দিকে চেয়ে থেকে দেখে জরা মরণের ডাক
P 10
অস্তিত্বের আদি স্বরলিপি মৃত্তিকা জন্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে
আছে। সংঘবদ্ধ মৃত্যুকান্না প্রাগৈতিহাসিক পুকুরের জলে
ধ্বনিত হয়েছে নিরবধি কাল সময়গ্রন্থিকে সাথে নিয়ে।
প্রত্ন অতীতের চৌখুপি দেউল মৃত্যুগন্ধ— ঋজুপালিকার
তটে শালবৃক্ষের মহৎ আকাশতরঙ্গ বাঁচিয়ে রেখেছে
আদিস্বরে একা একা নিজেকে জ্বালিয়ে জলচক্রের আদিম
পুনরাবর্তনে; একদিন যেখানে একাকী প্রাক-মুন্ডা জন
তাদের দেহজ উত্তাপে নির্ঘুম প্রোটো-মেডিটেরেনীয় ক্ষুদ্র
আগুনের জলছবি টেনে এনেছিলো এখানের ভূখণ্ডের
উঠোনের মাটি চুমে জীবনের অনন্ত রক্তিম স্বপ্নসুরে।
এখানে এখন স্মৃতির নির্বাক আকাঙ্ক্ষারা সন্ধ্যার দুঃখিত
মাঠে জেগে থেকে পৌষের প্রচ্ছদে আলপথ শস্যক্ষেত আঁকে।
অরণ্যের পরপারে জন্ম ও মৃত্যুর সংঘাতে শীতের সন্ধ্যা
কেটে যায় শাল মহুয়ার রুক্ষ গাঁয়ে তবুও আশার গভীরে
বেঁচে থাকে নক্ষত্রের নদীজল। ক্ষয়ের গভীরে রয়ে যায়
পৃথিবীর ব্যাপক বিস্তৃতি আর নিঃশব্দে যুদ্ধের বজ্রচিহ্ন।
বিষাদের দেশ মোহময় অন্ধকারে মানুষের মন বিদ্ধ
করে চিরকাল বিষন্ন মাটির করোটির ভিতরে মৃত্যুর
ধ্বনি ভাসিয়েছে। চূড়ান্ত দুঃখের দিনে অরণ্যের কিছু ভাঙ্গা
কোলাহল প্রাণের প্রগাঢ় কথায় তাদের জন্মস্রোতে মিশে
গিয়ে দেখে চিরকাল মানুষের প্রতিভার মেঘ ভেঙে দিয়ে
গেছে করতলে একমুঠো সংহত বিশ্বাস। অতীতের এই
আপৃথিবী ভাঙনের কথা মানুষকে একাকী অচেনা করে
গেছে। নিষাদের দেহ ছুঁয়ে তারই ধূসর ইশারা জেগে থাকে।

P11
লোধ্ররেনুময় সন্ধ্যার অন্তিম আকাশ সৃষ্টির নৈঃশব্দ্যের
মর্মমন্ত্রকথা শান্তভাবে নিজস্ব অভ্যাসে প্রাগৈতিহাসিক
বৃত্তপথে ক্রমশ আত্মস্থ করে সূর্যাস্তের অন্ধকার নিয়ে
দৃঢ় নিঃস্বতার সুরকে বিশীর্ণ হৃদয়ে উৎকীর্ণ করে তারা
জেনেছিলো শরীরী স্রোতের মধ্যে নদীর দহনে বেঁচে আছে
পৃথিবীর সমূহ পথের প্রসারণ। শূন্য দিগন্তের থেকে
তারা দেখে অন্তহীন এক মৃন্ময়ী রূপাঙ্গ অরণ্যদেবীর
বীজের ভেতর নিজেকে কালের মহাক্ষেত্রে ছায়ার আঙ্গিকে
গোপনে রেখেছে। বিমূর্ত বিভঙ্গে ক্ষতচিহ্নগুলি ছায়াহীন
ছায়ার ভেতর এইভাবে রয়ে গিয়ে অজ্ঞাত জীবন থেকে
ক্ষরিত মৃত্যুর অভিজ্ঞতা তাদের উৎসের দিকে নিয়ে যায়।
পুনর্জন্মময় প্রার্থনার পরিসরে দেহাতীত প্রতিবিম্বে
দেখেছি প্রতিটি অনন্ত পথের রেখা অসম্পূর্ণ হয়ে আছে
যেখানে রোগা ও রুগ্ন শিশুর স্বপ্নের হাত ধানের মঞ্জুরি
ছুঁয়ে আকস্মিক জেগে ওঠে। নিজস্ব দু-হাতে সূর্যের সৌভাগ্য
তবু তুলে নিতে চেয়েছিলো শৈশবের প্রোটো-অস্ট্রোলয়েডরা।
অন্তর্গূঢ় বেদনার গোধূলিলগ্নের পুরোনো গুহার গাঢ়
শ্যাওলার স্মৃতির বিস্ময়ে তখনও নেগ্রিটো জীবন তার
কৃষ্ণাঙ্গের শক্ত গ্রীবার চোয়ালে মুখে শঙ্খের মতন তীব্র
ভাষা নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে স্থলচেতনার ফসলের ক্ষেত
ভালোবেসে। বিরতি বিহীন এক ইশারায় অজস্র কোষের
সৃষ্টির সহস্র স্পন্দন মাটিতে মহাজীবনের স্বাদে গেঁথে
যাচ্ছিলো নিজেকে ক্রমাগত প্রসারণশীল ঘন মহাবিশ্বে।


P12
হারানো সন্ধ্যার বুলবুলি নাচ আজ প্রথম সৃষ্টির মতো
কাছে আসে। কৃষ্ণের মুরলি ডাকে সখী শ্রীরাধা আসরে আসে।
জন্ম পুরাণের পথে জীর্ণ পাতার স্পন্দনে মৃতক্ষত ছুঁয়ে
সাঁওতাল গ্রামজননীর হাতের মলিন রেখা ভালোবেসে
একদিন ডেকেছিলো তার আঁকাবাঁকা বিদীর্ণ পল্লীর ঘরে।
পর্বত সংকুল এই মালভূমি পৃথিবীর এক বন্ধামাঠে
শুয়ে আছে; - শুয়ে আছে—সম্ভাবনাময় সকল শস্যের দানা;
সম্ভাবনাময় প্রত্নরক্ত গাঁথা দুঃখিত কাঙালি প্রাণশক্তি।
ক্ষয় ক্ষতি শোক জড়িয়ে জটিল বিহারিনাথের অন্ধগ্রাম
নাড়ি বেয়ে নেমে আসে শৈশবের অতল জলের নাভিপদ্মে।
বাউল রাত্রির ভাষা সন্ধ্যার সন্ন্যাসী আলোর গোধূলি চিহ্নে
মিশে গেছে অবসন্ন আলপথে সেইখানে শস্যের সংলাপ
শুনেছি নিষাদী বাতাসের গানে। অস্ফুটে শুনেছি ভাঙ্গাচোরা
অন্ধকারবুড়ির নির্জন স্বর- দেহজলে ধ্বংস জন্মভূমি
আমাকে পোড়ালো তারই শীর্ণ জোড়ে। শিকড়ের সন্ধ্যা শাখা ছিঁড়ে
জঠরের যতদূরে ভেসে আছি জন্মান্ধ দু-চোখ বহুদূর
সেই ঋণ রেখে ভেসে আছে নিজস্ব দূরত্বে। এখানে এখন
মন্দিরের দীর্ঘ আগ্নেয় শিলার মাটিছায়াগন্ধ মৃদঙ্গের
মতো হৃদয়ের এক কোণে বেজে গেছে দুঃখিত রাত্রির সঙ্গে।

ঋষভনাথের শিখরভূমের উষ্ণীষ ইছরি অজয়ের
জলে ভেসে আছে—ভেসে আছে রাঢ়ভূমি তারই প্রত্ন পদতলে।
ষড়ঋতু জুড়ে বেদনা পাথরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বীরজঙ্গা;
সেই গুহামুখ থেকে অহল্যাবাতাসে অভিমানী দামোদর
দামদাক ভাষা নিয়ে নেমেছে জঙ্গলমহল ধবলভূম
P 13
ঘিরে আদি জীবনের জন্মঘ্রাণে বিষাদের মৃত স্তূপ ছুঁয়ে।
এখানে আমার জীবন শোকার্ত পাতার মতন অবিরল
পেতে চেয়েছিলো গোপন জ্যোতির জল নিজেরই দহন পাত্রে।
জরায়ুর দুঃখী গর্ভজাল ভেঙ্গে ভেঙ্গে কত হিমযুগ আর
বৃষ্টিরাত চিরে কৃষ্ণপক্ষে চতুর্দশীর গোপন ক্ষীণ চাঁদে
ভেসে আছি ক্ষতচিহ্নের আতীব্র রক্তরসে। আজ নাভিকুন্ড
ছেয়ে আছে প্রস্তর জীবাশ্ম; যদিও আমরা আমাদের উষ্ণ
রাষ্ট্রস্রোতে মিশে গিয়ে চেয়েছি অভিন্ন মুখ- এখন পাঁজরে
দূরের নদীর শরীরে নূপুর বাজে সূর্যাস্তের ভিন্নগন্ধে।

অযোধ্যা পাহাড় ঘিরে বৈশাখী পূর্ণিমা নেমে আসে- খরপ্রভা
জীবনের সরল বিস্তার বুনো শুয়োরের দিকে ছুটে যায়;
অরণ্য বাকলে জ্যোৎস্না আসে, দিশুম সেন্দরা মন্থর সৃষ্টির
মন্থনের দিকে নিয়ে যায়। শ্যাওলার সহজাত অন্ধকার
নিথর শূন্যতা নিয়ে পাতা খসার অস্তিত্বে পিতৃপ্রবাহের
ছবি আঁকে- সেইখানে ভাঙ্গা মাটির মানুষ মানুষের কাছে
গল্পের আদিম দৃশ্য খোদিত করেছে ঝিঁঝিঁর নিবিড় ডাকে।
জন্মশোক স্মৃতিজল ছুঁয়ে প্রবীণ বৃক্ষের প্রাকৃত কঙ্কালে
চেয়ে থাকে; অন্তরের নির্জনতা নিজের মরমী অন্তর্লীন
বাঁশির একাগ্র সুরে আত্মগত ছায়ার গভীরে ক্ষতগুলি
দেখেছে, শ্মশানভূমিতে কিভাবে চন্দ্রদগ্ধ এক নদী ভাঙ্গা
মলিন আলোর বাঁশবন থেকে নিরুদ্দেশ হয়- চেতনার
সুগভীর স্তরের ভেতর? শেকড়ের স্নেহের স্রোতের ছায়া
কুটিরে ধ্বনিত হয়েছিল যাদের শিরায় তারা আজ মৃত;
সহস্র রাত্রির আঁধার পেরিয়ে প্রান্তরের দুর্বোধ্য পশ্চিমে
P14
চলে গেছে কোন স্বান্তনার- আকাঙ্ক্ষার উজ্জ্বল পথের দিকে?
নদীর কিনারে অচেনা পাখিরা আসে যায় জ্যোৎস্নায় তাদের
প্রতিবিম্ব ভাসে— শতাব্দীর সূর্যাস্তের পর জীবন কি তবে
তায়- সৃষ্টিবীজে ছাইতাপে হৃদয়ের সেই স্পর্শ রেখে যায়?

বিষাদের প্রিয় মুখগুলি অরণ্য প্রদেশে জীবিতের মাটি
হাঁটুভাঙ্গা দুঃখে নিজের সত্তার থেকে বিযুক্ত হয়েছে, তবু
বীরহড় বেঁচে থাকে নিজস্ব উদ্যমে; আত্মবিনাশের থেকে
বহুদূর সঙ্ঘে জীবন ছায়ার অনেক বিশ্বাস ভালোবেসে।
পাহারতলির বনস্থল অন্ধকার সংশয়ের সীমানার
জঙ্গলে গেঁথেছে পৃথিবীর উচ্ছিষ্ট উৎসাহে তাদের নিজস্ব
আনন্দের জনপদ। পত্রশাখা কুসুমের ফুল শব্দহীন
স্বেদবিন্দুগুলি পার্বত্য পথের ধুলোয় শীতের শিশিরের
গন্ধে বটফুল গৃহস্থের তাপে মিশে গিয়ে সংখ্যাহীন বর্ণে
ঋতুর সকল ডানামেলে মধুবনে উড়ে যায় অভিসারে।
অবেলার স্মৃতিগুলি রদবদলের পরিবৃত্তে সেইসব
অনুবিম্বে চেয়ে থেকে আসন্ন অঘ্রানে আগামীর শস্যক্ষেতে
বনভোজনের পুরোনো পার্বণে জন্মকে সার্থক মহীরুহে
পরিনত করে যেতে চায় বিজ্ঞাপনের চতুর অন্তরালে।
শতাব্দীর এই শহরের হিমঋতু ক্রমশ যখন এক
নিভৃত শোকের দিকে আমাদের নিয়ে যায়— ন্যুব্জ করে রাখে
দেখেছি সেদিন পৃথিবীর গুহার মানুষ মহাজাগতিক
পাখির ডানায় ছায়ার আতপে সুযোগ্য সম্বলে বেঁচে আছে
পিপাসার পুত্র কন্যা নিয়ে প্রেমে পূর্ণ হয়ে পরস্পর একই
দেহস্থিত মনিকোষের মহৎ অন্তরে আচ্ছন্ন হয়ে থেকে।
P15
বিশৃঙ্খলা বিগত স্মৃতিতে যে জ্ঞান দিয়েছে তারই প্রান্তরের
একপাশে দেখি আমাদেরই প্রজ্ঞাবান পুরুষ তন্ময় জ্ঞানে
সুস্থির তরঙ্গ ছড়িয়েছে নিজের সন্তানদের দেহরক্তে—
আবাদভূমিকে পঞ্চতীর্থ - পঞ্চগুণের দহন অশ্রু দিয়ে
ভরাট করেছে। যারা চিরকাল রোদ্দুরে কুণ্ঠিত হয়ে ঝুঁকে
নৈঃশব্দ্যের অন্ধকারে নিহতের মতো বেঁচেছে মলিন মুখে
তারা আজ বিচ্ছেদের দিনে সংগ্রামের দৃঢ় কথা বলে জন্ম
মৃত্যুর জীবন ছড়িয়ে দিয়েছে নির্নিমেষ আলোর গভীরে।
জন্মের আদিমতম অস্তিত্বে যুদ্ধের গভীরেই তারা বেঁচে
আছে নিরন্তর সভ্যতার দেহে। পাতাঝরা ধুলোর কঠিন
ভূমির নাভিতে দুর্বোধ্য বেদনা সহে প্রথম দিনের নগ্ন
পৃথিবীকে-পাখির জীবন পেয়ে শতশোকে আজো ভালোবাসে।
অরণ্যভূমির সন্ধ্যার শেকড়ে ও বীজে যে ক্ষত চিহ্নগুলি
আছে তা প্রাকৃত রাখালের নগ্ন হাতের ছোঁয়ায় ঘুমিয়েছে—
জন্মের নিবিড় মাতৃনাড়ির শুশ্রূষা পেয়ে সূর্যাস্তে আবার
অন্তঃসত্বা হয়- বিশ্বলতার বাঁশির রূপসুরে বেজে চলে।
টিলার ভেতর আগ্নেয় শিলার ঘুমহীন মহাকাশ থেকে
এক দীর্ঘ পথের যন্ত্রণাময় ছায়াপথ অভিমানে নেমে
এসে তার সৃষ্টির বিষন্ন হৃদয়ে নদীর জন্ম দিতে চায়
এখানের অবাধ দিগন্তে- নির্জলা পাথরে জলজ ঘাসের
গ্রাম ভিক্ষে করে — সবুজ ব্যাপ্তিতে দীর্ঘ চরাচর এক মুক্ত
উঠোনের স্বপ্ন দেখে। অতীত বর্ষার স্মৃতি বিশুষ্ক বাতাসে
যুবতী কাঁসায় শীলাবতীর উদ্দাম জলস্রোতের শব্দের
ছবি আঁকে।

প্রস্তরখন্ড ৩
COMMENTS OF THE POEM
READ THIS POEM IN OTHER LANGUAGES
Soumen Chattopadhyay

Soumen Chattopadhyay

Raghunathpur, purulia west Bengal
Close
Error Success