এক চিহ্নিত প্রস্তরখন্ড
সৌমেন চট্টোপাধ্যায়
পাতার আড়ালে ধূসর বিবর্ণ ইতিহাস ছেঁড়া মেঘের মতন উড়ে যায়। এই ভূখণ্ডের খণ্ডহীন নীরবতা পাথুরে পাঁজর ভেদ করে ওঠে। নামগোত্রহীন কালোছায়ার রক্তিল স্মৃতিক্ষত গোপনে প্রচ্ছন্ন রয়ে গেছে। সামনে অহল্যাবাঈ সড়ক, প্রাচীন নিঃশব্দ বেদনার হরিমন্দিরের পাতকুয়ো, পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ক্রমশ একাকী লুপ্ত বহুমাত্রিক অস্তিত্বে আমার নিবিড় স্পর্শ নিতে চেয়ে মৃত্যু ও ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেছে। আমার বিগত বিশ্বাসের এই গ্রামে জন্মভূমির শিকড় ছিঁড়ে আমি এক চিহ্নিত প্রস্তরখণ্ড। শরীরের বায়ু অবিরল টের পায় নিঃসঙ্গতা আর মৃত্যুশব্দ। জীবনের প্রগাঢ় স্থানাঙ্ক সতত অস্পষ্ট হতে থাকে। একদিন এখানের অতীতের জনগোষ্ঠী দেখেছিল মাথার উপর পাহাড়ি দুখের বৃহস্পতি মৃগোশিরা কালপুরুষ রাষ্ট্রের নক্ষত্রমন্ডল।
ধমনীতে স্রোতশীল এই সেই সুপরিচিত ফসলের ক্ষেত নদী - খাল - বিল - ডোবা - মাঠ বিস্ময়ের পর বিস্ময় জাগায়। মৃতবৎসা মায়ের সন্তানপ্রীতি স্মৃতির আকাঙ্ক্ষা মৃত আত্মার কবিতা হয়ে ওঠে।
অজস্র তপস্যামন্ত্র পাহাড়ি জোড়ের সংকীর্ণ জলজ দেহে বয়ে যায়। অন্ধকারের অনন্ত জ্যোতি নিঃশব্দে শিকড় থেকে উঠে আসে। এই বাঁশঝাড় কুলঝোপ পলাশের রুক্ষ বন বুকের ভেতর এক অজানা গভীর গোধূলিকে জাগিয়ে জন্মের প্রখর নিস্তব্ধ ইথারের ইতিহাসে আমাকে ডুবিয়ে রাখে। অবিরত সেই অনস্তিত্বের সকল কাঠামো নিজস্ব জন্মাধীন গন্ধ অবশিষ্ট কিছু ছায়া রেখে গেছে। প্রাচীন শিশিরে ভেজা সন্ধ্যার চড়ুই পাখিগুলি শূন্যতার ওইপার থেকে উড়ে আসে। এমনিই সেই অদৃশ্য আত্মীয়; শরীরের জলরঙ ডেকেছে যাদের বারবার। তাদের ধূসর ডানার বিস্তারে দূরের টিলার রোদ্দুরের ক্লান্তি গেঁথে আছে। রুগ্ন পোড়া কঙ্কালের অশ্রুপাত নিরীহ রাত্রির উপত্যকা দিয়ে নেমে আসে। বীজের ভেতর প্রাণের প্রণয়চিহ্ন অঘ্রাণ গ্রন্থির দেহকোষে আঁকা বিষাদ পথের ইতিবৃত্ত সীমানা ছাড়িয়ে স্থবির রঙের গোপন গহবর দিয়ে মিশে যায় অন্তপুরের বধির গাত্রে।
কল্পনা উৎসের দিকে যেতে গিয়ে দেখেছে স্মৃতির ভেতর নরক ও ঈশ্বর পাশাপাশি নিজস্ব কবরে শুয়ে আছে। দুপাশের দুই হলুদ পৃথিবী তাদের সহস্র আঙুলের খুলির জন্মের ছাপ নিয়ে হেঁটে যায়। নুড়িপাথরের কাঁকুড়ে আহ্বান রাত্রির কঠিন হিম বাতাসে সকল পথের বক্রতা ছুঁয়ে ভেসে ওঠে চিরচেনা শ্মশানের আঁকাবাকা নদীর অন্তরে। ব্যথার বাগানে যে ছাই সৃষ্টির শব্দে বেঁচে আছে তাদের ধোঁয়াটে যুদ্ধক্ষেত্র গোপন অসুখ নিয়ে দামোদর - রূপায়ের অনার্য আড়ষ্ঠ চরে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে এক বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের জন্ম দেয়। নেগ্রেটো - অষ্ট্রিকদের দীর্ঘশ্বাস আত্মকথা সময়ের অনন্ত ছায়ায় ডুবে গেছে। কখনো দেখেছে পূর্বপুরুষের প্রতিবিম্বে শূন্যতা তাড়িত আত্মহত্যার শতাব্দী অন্তবর্তী প্রত্নদীগন্তের মাটিতে জ্যোৎস্নার রাতের সীমান্তে তরল মৃত্যুর মতন কেঁদেছে। তমাল তলের বিস্তৃত বুকের উপর আকাশ ছোঁয়া শালবৃক্ষগুলি মহাকাশ থেকে গভীর রাতের এলোমেলো নরম পলাশ ফুলগুলির জীবনে গৃহস্থের শালিখের সুর বুনে দিয়ে নিজেদের অনিবার্য সামান্য অস্তিত্বে ফিরে আসে। কার্তিকের পুরোনো পাখিরা ক্রমশ তাদের আকাল শোকের শৈশবের নীলাভ শরীরে শোকার্ত মায়ের কৃষ্ণ স্তনবৃন্তের বিভঙ্গ রেখায় তৃষ্ণার্ত মুখ রেখে অশ্রু পান করে। আসন্ন গোধূলি সন্ধ্যার শিয়রে শুষ্ক জলাভূমির কাছেই বেঁচে থাকা সমাধি গোম্বুজগুলি পৃথিবীতে রয়ে যাওয়া তাদের প্রাণের আত্মজের হাতে তর্পনের জল চেয়ে পাহাড়ি অরণ্যে আদিম নীড়ের প্রণয়ের মায়াময় যোগরেখা রেখে যেতে চায় ঋজুপালিকা শিলাবতীর দেহজলে।
জরাগ্রস্ত উলঙ্গ শিশুর নাভিমূলে ঘনীভূত মন্থর আলোর মৃত মেঘ কাঁদে। পৌষের সন্ধ্যায় দূরের নক্ষত্র পর্ণকুটিরের কাছে এলে ধামসা মাদল অটুট বাঁধনে জন্মান্তর বাঁশির করুন স্থবির বিশ্বাসে কোনো এক ছিন্ন পথে একত্রিত সহবাসে মুক্ত হয়। আদিম শিলার চোখের কোটরে এই শ্যাওলা গ্রহের মৃদুভাষী আত্মার গোপন অবসাদে বিগত জন্মের ছিন্নমূল নাবিকের হাহাকার সমুদ্র বাতাসে চেয়ে থাকে। যৌবন হারানো প্রতিটি বিচ্ছিন্ন নদী রক্তের বন্ধনে পৃথিবীর সচ্ছলতা পেয়ে সংঘবদ্ধ হতে চেয়েছিল। শূন্য করতলে কারা দিয়ে গেলো অন্ধ বীজ! অনার্য ধৈর্য্যের জন্য প্রেরিত আকাশ নিয়ে গেলো কারা! অস্তিত্বের অভ্যন্তর অতিক্রম করে সভ্যতার গর্ভাণু বিষাদ ফসিলের নীরব জরায়ু গর্ভে জন্মভোরের মেরুন আলোয় অমৃত গানের মুখোমুখি হতে চেয়েছিল তারা কোনো এক রৌদ্রের ভেতর। প্রপিতামহের ঋজু সুঠাম শরীরে সন্ধ্যার গন্ধে ছেঁড়া কাঁথা জড়ানো আবছা কুয়াশা তিমিরে ছায়া পাখিদের চঞ্চল অভ্যাস আজ ভাঙ্গাচোরা প্রতিচ্ছবির তরঙ্গ।
মৃত্যুর রহস্যলতা মনসাকাঁটার বেড়া থেকে ভাঙ্গাচোরা উঠোনে দাঁড়ায়। মহাকাল ছায়াজালে সময় ও দূরত্ব নির্মাণ করে প্রতিমুহূর্তে অতীত হয়। শিকড়ের স্তব্ধভূমি গাঢ় স্বরে মহুয়ার পাখিদের ডেকে নিলে সৃষ্টির গভীরতর শিল্প নিঃশব্দে মাটিতে নেমে আসে। লাভাস্রোতে পার্বত্য কঙ্কাল দুস্থ প্রেমিকার মুখশ্রীর দৃশ্য চিরন্তনী আত্মীয়তা নিয়ে শুকনো পাতার মতো নিঃস্ব হয়ে খসে যায়। সেইদিন শ্মশানের মৃত নদী অতীত মায়ের মায়াবী দেহটি ধরে রাখে। পাথরের খিলানে জলের অশরীরী চোখ চরাচর জুড়ে রুক্ষ তটে পৃথিবীর আদিম বুড়ির সঙ্গে দুঃখ বিনিময় করে।
নদী ও নক্ষত্রে অন্তরীক্ষের নিশ্চল বিন্দুতে পল্লীর অসংখ্য স্বাদের সূচনার ছবি এঁকেছিল; শুষ্ক রাত্রির শরীরে তারা ফিরে ফিরে আসে। সপ্তর্ষির দগ্ধ ছায়া জন্ম ও মৃত্যুর দুপাশের নিঃসঙ্গ উষ্ণতা অনুভব করে কার্তিকের কাঙ্গালী আঁধারে উড়ে গিয়ে মহামৃত্তিকার দেহে মাতৃচিহ্নের যুবতী কল্পতরুর জরায়ুগর্ভের জন্মের কথা ভাবে।
পাতাহীন অশ্বত্থের তলে শুকনো পাতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দীক্ষিত স্বপ্নের অসমাপ্ত ইচ্ছাগুলির হলুদ আর্তশব্দ মন্থর সন্ধ্যার বিশীর্ণ বন্দিশে বাজে। বহুস্বাক্ষর বিহীন শেষরাতে কোনো এক মৃত প্রাক্তন স্রোতের জনপদে জীবনের নোনা ঘাম চেয়ে কেঁদে ওঠে। আকাশের নিচে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ে অন্তহীন অন্ধকারে অভাবী অস্তিত্ব বাঁধনার অহিরা গানের সমবেত ঘুঙুরের বৃত্তে তারা নিজেদের জাগায়।
দহনের ভ্রূণপুঞ্জের বিপন্ন বিকাশ কাঁকুরে শূন্যতার স্থায়ী অন্ধকারে নিজেকেই নিজে দেখে। অজস্র বিষন্ন জৈন মঠের মৌনতা আজ ধ্যানমগ্ন ঋষির মতন জীবনের গূঢ় মধ্যমণি ছুঁয়ে বেঁচে আছে পাথরের দেশে। স্থিতপ্রজ্ঞ শাল জঙ্গলে প্রপিতামহের দুঃখের শিকড় নিভৃতে প্রাগৈতিহাসিক চৈত্রের আকাশে অতীত বৃষ্টির বিন্দু খোঁজে।
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem