ভাবলাম- কাউকে 'নার্স' ডাকা, আর 'দিদি' ডাকার মধ্যে অনেক পার্থক্য। পৃথিবীর কোন দিদিই, তার ভাইয়ের কষ্ট সহ্য করতে পারে না। ডাকের মধ্যেও এক শক্তি আছে। সেই শক্তি, অনেক সম্ভবকে সম্ভব করে। নইলে রুগীর বাড়ির লোকজনকে, কেউ কি কখনো চাদর বালিশ দেয়?
ফিরে এলো দিদি। বালিশ আর চাদর সঙ্গে নিয়ে। সেগুলো আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো ও।
ঘাড়ের কাছে বালিশটা রেখে, চাদর মুড়ি দিয়ে বসলাম আমি।
তৃষ্ণার দিকে নজর যেতেই, বুঝলাম- কখন ঘুমিয়ে পড়েছে ও।
আহাঃ বেচারা বেশ দুর্বল। তাই কথা বলতে বলতেই, ঘুমিয়ে পড়েছে ও।
ঘরের বড় আলোটা নিভিয়ে দিলো দিদি। তারপর আমার দিকে চেয়ে মৃদু স্বরে বললো-
'শোন, কোন কিছুর দরকার হলে, নার্সিং স্টেশনে এসো। ওখানে থাকবো আমি।'
রীতাদি চলে গেলো। চেয়ারে হেলান দিয়ে, ঘুমানোর চেষ্টা করলাম আমি।
অনেক রাতে, ভয়ঙ্কর এক গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। চেয়ে দেখি, তৃষ্ণা যন্ত্রণাতে কাতরাচ্ছে। দ্রুত নার্সিং স্টেশনে ছুটে গেলাম আমি।
দিদি ঘরে ঢুকলো। 'Intravenous Analgesic' দিলো তৃষ্ণাকে। মুহূর্তেই ব্যথা কমে গেলে তৃষ্ণার। কয়েক মিনিটের মধ্যেই, আবার ঘুমিয়ে পড়লো ও।
পড়েছি। বইয়ে অনেক পড়েছি, লিউকিমিয়াতে, হাড়ে অসহ্য যন্ত্রণা হতে পারে। কিন্তু চোখে তা প্রথম দেখলাম। বইয়ে পড়া আর চোখে দেখার মধ্যে অনেক তফাত। যেমন তফাত সাঁতারের বই আর সাঁতারের মধ্যে।
বইয়ে পড়ে, কখনো কষ্ট হয় নি আমার। কিন্তু তৃষ্ণার যন্ত্রণা অনুভব করে, অসম্ভব কষ্ট হলো আমার। আহাঃ যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছে বেচারা!
তৃষ্ণা ঘুমিয়ে পড়তেই, দিদি প্রস্থান করলো। আমিও, ঘুমানোর চেষ্টা করলাম আবার।
কিন্তু শেষ রাতে, জেগে উঠলাম আবার। এবার তৃষ্ণার বমি করার শব্দ।
ধড়ফড় করে উঠে, ওর মুখে স্পু-ব্যাগ ধরলাম। কিন্তু ও বমি বেশী করলো না। অথচ ওর বমি বমি ভাবটা বেশ তীব্র। বেচারা না পারছে শুয়ে থাকতে। না পারছে বসতে।
এরইমধ্যে, হটাৎ হাঁফাতে শুরু করলো ও। ভয়ে পেলাম আমি। রুদ্ধশ্বাসে ছুটে গেলাম নার্সিং স্টেশনে।
দিদিকে ডেকে নিয়ে এলাম। তৃষ্ণাকে, বমির ইঞ্জেকশান দিলো দিদি।
প্রথমে তৃষ্ণার কপালে হাত রাখলো দিদি। তারপর থার্মোমিটার দিয়ে, তৃষ্ণার তাপমাত্রা মাপলো ও। কেমন যেন চিন্তিত মনে হলো দিদিকে। তারপর আমার দিকে চেয়ে বললো-
'জ্বরটা আবার বাড়ছে ওর।'
কথাগুলো বলে, তৃষ্ণাকে প্যারাসিটামল দিলো দিদি।
বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তৃষ্ণাকে। বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তৃষ্ণাকে। বেশ অসহায় দেখাচ্ছে তৃষ্ণাকে। অসহায় আমি। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি।
কিছুই তো করতে পারছি না। তাই ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম আমি। কিছুক্ষণ পর, আবার ঘুমিয়ে পড়লো তৃষ্ণা।
তৃষ্ণা ঘুমিয়ে পড়তেই, নার্সিং স্টেশনে ফিরে গেলো দিদি।
চোখের সামনে তৃষ্ণার কষ্ট দেখে, কাঁদতে ইচ্ছে করলো। দেওয়ালে বারবার মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করলো। ভগবানের কাছে নালিশ জানাতে ইচ্ছে করলো। বলতে ইচ্ছে করলো-
'হে ঈশ্বর, এমন দুর্ভাগ্য তৃষ্ণার মতো ভালো মানুষের জীবনে ঘটে কেন? '
রাগ হলো খুব। কিন্তু সেই রাগ দ্রুত চলে গেলো আবার।
ভাবলাম, রাগ কেবল আমিই করছি। তৃষ্ণা তো রাগ করছে না। কৃষ্ণা কেঁদেছে, কিন্তু ভগবানের কাছে অভিযোগ করে নি। তৃষ্ণা যন্ত্রণা পাচ্ছে, কিন্তু কারও প্রতি রাগ দেখায় নি।
নাহঃ আমাকে শান্ত হতে হবে। তৃষ্ণার কাছে ধীর স্থির অচঞ্চল থাকতে হবে। ওকে আশার আলো দেখাতে হবে।
শেষ আছে। সবকিছুরই শেষ আছে। সূর্য অস্ত যায়। কিন্তু আবার জেগে উঠে সে। আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। কিন্তু আবার রামধনু রঙ নিয়ে ফিরে আসে সে।
তৃষ্ণার যন্ত্রণারও শেষ আছে। শেষ থাকতেই হবে। তৃষ্ণা মানুষকে এত ভালোবাসে। তো এই ছোট্ট বয়সে সে এত কষ্ট পাবে কেন?
তবুও কি জানো হে ঈশ্বর, যন্ত্রণা পাওয়ার চেয়ে, যন্ত্রণা প্রত্যক্ষ করা আরও বেশি কঠিন। আরও বেশি যন্ত্রণার। চোখের জল ফেলার চেয়ে, চোখের জল দেখা আরও বেশি কঠিন। আরও বেশি যন্ত্রণার।
নিজের মধ্যেকার ক্রোধ প্রশমিত হয়ে, এক মমত্ব জেগে উঠলো আমার মনে। মনে হলো, আমিও যেন তৃষ্ণার মত সুন্দর এক নারী হয়ে উঠেছি। যে সহ্য করতে পারে। যে শত যন্ত্রণা প্রতক্ষ্য করেও, স্নেহ মমতার প্রতি অবিচল থাকতে পারে।
নারী যদি না হলাম, তো মাতৃত্বের অনুভূতি কেন আমার বুকে? বুঝলাম, পুরুষের বুকেও মাতৃত্ব আছে।
উথাল পাতাল চিন্তা করতে করতে, কখন যেন ঘুমের বুকে ঢলে পড়লাম আমি।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem