মৃত্যু পথযাত্রী এক মেয়ের বুক ফাটা আর্তনাদের কাহিনী
ভাবলাম, তৃষ্ণা আজ একটু ভালো বোধ করছে। তাই ও এত কথা বলছে। কিন্তু সব দিন এমন ঘটে না। আসলে নিরাময়ের পথ, কোনদিনই সোজা পথ নয়। এ এক চড়াই উৎরাই পথ। আঁকা বাঁকা পথ।
কোন কোন দিন, তৃষ্ণা বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব ওর নিত্য সহচরী।
আবার কোন কোন দিন বেশ উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠে ও। সেদিন ও একটু বেশি নড়া চড়া করতে পারে। কাকীমা রান্না করলে, কাকীমার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে ও। কোটরে ঢুকে যাওয়া ডাগর ডাগর চোখে, ওর মায়ের রান্নার দিকে তাকিয়ে থাকে ও।
স্বাধীন অবস্থা থেকে এতটা অসহায় হওয়া, মানতে পারে না তৃষ্ণা। তাই ওর মাকে সাহায্য করতে চায় ও। ওর মাকে উদ্দেশ্য করে ও বলে-
মা, আলুটা ভেজে দেবো আমি?
কাকীমা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন। বলেন-
'তুই একটু রেস্ট কর মা। ক্লান্ত হয়ে পড়ে যাবি তুই! '
মিনমিনে গলায় তৃষ্ণা জিজ্ঞেস করে-
'তবে জলের কেটলিটা এনে দিই আমি? '
কাকীমা আর না বলতে পারেন না। না বললে, মনে ব্যথা পাবে তৃষ্ণা।
আমরা সবাই চাই, তৃষ্ণা যেন কোন ব্যথা না পাক। এমনিতেই অসহ্য যন্ত্রণাতে ভুগছে ও। তাই ওকে ব্যথা দিতে বুকে বাজে আমাদের। কাকীমা বলেন-
'বেশ, এনে দে তবে।'
কেটলি আনতে গিয়ে, আছড়ে খেয়ে পড়ে গেলো তৃষ্ণা। বেচারার চোখ জলে ভেসে গেলো। মেঝেতে শুয়ে, বুকফাটা কান্না কাঁদলো ও। ফুঁপিয়ে কাঁদলো ও। অসহায় শিশুর মত কাঁদলো ও। হায় ঈশ্বর, আর কত কাঁদবে বেচারা তৃষ্ণা!
ওর এই নিদারুন কষ্ট, চোখে দেখতে পারলাম না আমি। ওর নির্মম অসহায়তা সহ্য করতে পারলাম না আমি।
ওকে মেঝে থেকে উঠিয়ে দিয়েই, তাই ঠাকুর ঘরে ছুটে গেলাম আমি। বুকে গভীর এক যন্ত্রণা নিয়ে ছুটে গেলাম। চোখে অশ্রুর প্লাবন নিয়ে ছুটে গেলাম। ঠাকুর ঘরে গিয়ে, ঈশ্বরের কাছে নালিশ করে বললাম-
'হে ঈশ্বর, কোন অপরাধে তৃষ্ণাকে এত যন্ত্রণা দিচ্ছো তুমি? '
ঈশ্বরের নীরবতায় উন্মত্ত আমি। ক্ষুব্ধ আমি। পাথরের মেঝেতে, বারবার মাথা ঠুকলাম আমি।
তৃষ্ণা ভুল। ভীষণই ভুল। হয়তো সব পারি আমি। কিন্তু পারি না আমি তৃষ্ণার যন্ত্রণা সইতে।
তাই প্রতি মুহূর্তে প্রার্থনা করি আমি। হে ঈশ্বর, তৃষ্ণার যন্ত্রণা কেড়ে নিয়ে, সে যন্ত্রণা আমাকে দাও তুমি। নিজের যন্ত্রণা সইতে পারি। কিন্তু তৃষ্ণার যন্ত্রণা সইতে পারি না আমি।
কিন্তু চাইলেই কি ঈশ্বর তা দিয়ে দেন? না, দেন না। তবুও প্রার্থনা করি। প্রার্থনা ছাড়া অসহায় মানুষের আছে কি?
শুধু তৃষ্ণার জন্য, ঈশ্বরের প্রতি ঝুঁকে পড়লাম আমি। অসহায় তৃষ্ণা, অসহায় আমি। আমাদের উপায় কি?
সকালে স্নান সেরে, তৃষ্ণার সঙ্গে ঠাকুর ঘরে যাই আমি। ওর সাথে বসে, প্রার্থনা করি। কিন্তু আমার প্রার্থনা, কেবল এক লাইন।
হে ঈশ্বর, তৃষ্ণাকে সুস্থ করে দাও তুমি।
© অরুণ মাজী
This poem has not been translated into any other language yet.
I would like to translate this poem